ঢাকা, মঙ্গলবার,১২ ডিসেম্বর ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

মাহে রামাদানের তাৎপর্য

গোলাম মাওলা রনি

০১ জুন ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৭:৫৮


গোলাম মাওলা রনি

গোলাম মাওলা রনি

প্রিন্ট

আপনি যদি মাহে রামাদান অর্থাৎ রমজান মাসের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য না জানেন কিংবা না বোঝেন অথবা হৃদয়ঙ্গম করতে না পারেন তাহলে এ মাসের খায়ের, বরকত ও ফজিলতের পরিপূর্ণ স্বাদ আপনি পাবেন না। অন্য দিকে, ফারসি শব্দ রোজার মূল আরবি ও কোরআনি প্রতি শব্দ দু’টি। যথা- সাওম ও সিয়াম। এখন আপনি যদি সাওম ও সিয়ামের অর্থ এবং গুরুত্ব বুঝে ইবাদত করতে পারেন, তবে নিশ্চিতভাবে আপনি আমলের এমন একটি স্তরের সন্ধান পাবেন, যা সাধারণ ইবাদতকারীরা কোনো দিন কল্পনাও করতে পারেন না। রমজান মাস, সাওম ও সিয়ামের তাৎপর্য বুঝতে হলে আপনাকে অবশ্যই সূরা বাকারার ১৮৩, ১৮৪ এবং ১৮৫ নং আয়াতের শব্দগত অর্থ, তাফসির এবং শানে নুজুলের সাথে সূরা জুমু’আহর প্রথম ও দ্বিতীয় আয়াতের অর্থ, তাফসির এবং শানে নুজুল মিলিয়ে পড়তে হবে।
আপনি হয়তো পাল্টা প্রশ্ন করে বলতে পারেন- কী দরকার আমার অতশত জেনে? আমি তো বাবা-দাদা কিংবা মুসলমান জাতির ঐতিহ্য মেনে এবং আলেম-ওলামার কাছ থেকে শুনে যথাসম্ভব সতর্কতা ও চেষ্টা তদ্বিরসহকারে রমজান মাসের পবিত্রতা রক্ষা করে ইবাদত-বন্দেগি, দান-খয়রাত, জাকাত প্রদান এবং আত্মশুদ্ধির চেষ্টাতদবির করি। আপনারা যারা এমনতরো প্রশ্ন করতে পারেন তাদের উদ্দেশে বলছি- মানুষের প্রধানতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে কোনো কিছু ভালোভাবে জেনেশুনে বিশ্বাস করলে অথবা ভালোভাবে বুঝেসুজে কোনো কাজ আরম্ভ করলে, সে ক্ষেত্রে মানুষ যে সফলতা লাভ করে, তা অন্ধ অনুসরণের তুলনায় বহু বহু গুণ উত্তমভাবে ফলদায়ক হয়ে থাকে। আমাদের স্বভাব অনুযায়ী আমরা কোনো একটি বিষয়ের গুণাগুণ এবং কার্যক্ষমতা সম্পর্কে ভালোভাবে অবহিত না হলে সব সময়ই বিভ্রান্ত আচরণ করি। আমরা যখন থেকে সাপসহ হিংস্র প্রাণী, আগুন ইত্যাদির দোষ-গুণ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করি তখন থেকে ওগুলো সম্পর্কে আমাদের সতর্কতা শরীর-মন ও মস্তিষ্কে যুগপৎভাবে কার্যকর হয়। রাজা, বাদশাহ, আমির ওমরাহ, ক্ষমতাবান মানুষ, উপকারী পশুপাখি, বৃক্ষলতা ইত্যাদি পরিচয় জানার পরই কেবল মানুষের মন-মস্তিষ্ক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, প্রাণী অথবা সৃষ্টি সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারে।
এবার মূল প্রসঙ্গে আসি। আপনি যদি মাস হিসেবে রমজানের গুরুত্ব, কল্যাণ ও তাৎপর্য সম্পর্কে ধারণা পেতে চান তবে প্রথমেই জেনে নিন, এই মাসের নামটি রেখেছেন স্বয়ং আল্লাহ এবং তাও আবার মাখলুকাত অর্থাৎ চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র, আকাশমণ্ডলী এবং মানবজাতিসহ তামাম সৃষ্টিকুল পয়দা করার বহু বহু বছর আগে। একমাত্র রমজান মাস ছাড়া আরবি, বাংলা, ইংরেজি, চৈনিক, পারসিক, গ্রিক প্রভৃতি বর্ষ গণনার মাসগুলোর নাম মানুষ রেখেছে। আল্লাহ সূরা বাকারার ১৮৫ নম্বর আয়াতে বলেন- ‘রমজান মাস হলো সেই মাস যাতে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে মানুষের পথ প্রদর্শক, সত্য পথের উজ্জ্বল নির্দশন ও সত্য মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে...।’ রামাদান শব্দটি পুরো কুরআন শরিফে এই একটি আয়াতে মাত্র একটিবারের জন্য উচ্চারিত হয়েছে। অন্য দিকে, এই মাসটির বৈশিষ্ট্য ও তাৎপর্য বোঝাতে গিয়ে আল্লাহ এই আয়াতে সওম বা সিয়াম সম্পর্কে নির্দেশনা দিয়েছেন। একই সূরার ১৮৩ ও ১৮৪ আয়াতে বিস্তারিতভাবে রোজার কথা বলা হয়েছে।
আপনারা জানেন যে, তামাম সৃষ্টিজগত বা মাখলুকাত সৃষ্টির বহু আগে পবিত্র কুরআন আল্লাহর আরশে আজিমের লাওহ মাহফুজে অর্থাৎ একটি বিশেষ ফলকে লিখিত ছিল। কাজেই সেই কুরআনে যখন মাসটির নাম উল্লেখ থাকে তখন এটির গুরুত্ব, সম্মান ও ফজিলত বোঝার জন্য খুব বেশি পাণ্ডিত্যের দরকার পড়ে না। দ্বিতীয়ত, রমজান মাসের গুরুত্ব আমরা কী দিয়ে পরিমাপ করব? আমরা কি রোজা, বেশি বেশি নফল ইবাদত, দান-খয়রাত ইত্যাদি দিয়ে রমজান মাসকে মূল্যায়ন করব, নাকি এ ক্ষেত্রে অন্য কোনো পদ্ধতি রয়েছে? তাফসিরকারকেরা রমজান মাসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বোঝাতে সূরা বাকারার ১৮৫ নম্বর আয়াতের প্রথম বাক্যটি বিশ্লেষণ করে যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, তা হলো- রমজান মাসটি তাৎপর্যপূর্ণ হওয়ার প্রথম ও প্রধান কারণ হলো আল কুরআন।
পুরো কুরআনে যেহেতু রামাদান শব্দটি একটিবার মাত্র উচ্চারিত হয়েছে এবং সেই শব্দের সাথে কেবল মৌলিক শব্দ হিসেবে কুরআন শব্দটি যুক্ত হয়েছে, সেহেতু রমজান এবং কুরআন হলো একে অপরের পরিপূরক এবং পরস্পরের জন্য অবিচ্ছেদ্য। একই বাক্যে কুরআনের বৈশিষ্ট্য বোঝাতে আল্লাহ যে তিনটি বিশেষণ বা গুণবাচক শব্দ উল্লেখ করেছেন তা যদি কেউ হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন তবে তার জন্য হিদায়াতের দরজা সাথে সাথে খুলে যাবে। আল্লাহ কুরআনকে হুদাললিন্নাস অর্থাৎ মানুষের জন্য পথ প্রদর্শক, ওয়াবাইয়্যিনা তিম মিনাল হুদা অর্থাৎ সত্যপথের উজ্জ্বল নিদর্শন এবং আল ফুরক্বান অর্থাৎ সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে বর্ণনা করেছেন।
একই আয়াতের পরবর্তী বাক্যে আল্লাহ রামাদান নামটি দ্বিতীয়বার উচ্চারণ না করে এর সর্বনাম ব্যবহার করে বলেছেন- ‘তোমাদের মধ্যে যে এই মাস পায় সে যেন রোজা রাখে’। ১৮৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন- ‘হে মুমিনরা। তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হলো যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল, যেন তোমরা মুত্তাকি হতে পারো।’ ১৮৪ নম্বর আয়াতে রোজার নিয়মকানুন সম্পর্কে ইঙ্গিত প্রদান করা হয়েছে। এবার আমরা আয়াতগুলো বিশ্লেষণ করি। এখানে আল্লাহর নির্দেশ হলো রোজাকে ফরজ করা হলো। কারণ রোজার মাধ্যমে মানুষ মুত্তাকি হতে পারে। অন্য দিকে মুত্তাকি হওয়ার প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো, তাকওয়া বা আল্লাহ-ভীতি, যা অর্জন করার জন্য কুরআন পড়তে, বুঝতে এবং হৃদয়ঙ্গম করতে হবে।
আয়াতগুলোর বিশ্লেষণ করলে রমজান মাসের স্বাভাবিক কর্ম হিসেবে প্রথমেই আসে রোজার প্রসঙ্গ। অন্য দিকে, আয়াতগুলোর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হলো কুরআনের কারণেই রমজান মাস তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে, রোজার মাহাত্ম্য ও শ্রেষ্ঠত্ব কেবল তখনই অর্জন করা সম্ভব যখন রোজাকে কুরআনের আলোকে বিচার বিশ্লেষণ করে নির্ভুলভাবে প্রতিপালন করা হয়। কারণ কুরআন নাজিল হওয়ার আগেও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী জাতিগোষ্ঠীর জন্য রোজা ফরজ করা হয়েছিল। কিন্তু যথাযথ তাকওয়ার অভাবে আগের জাতিগোষ্ঠীগুলো রোজা পালন করে মুত্তাকি হতে পারেনি। মুসলমানদের রোজার সবচেয়ে বড় নিয়ামত হলো, আল্লাহ আল কুরআনের মাধ্যমে রোজার সুফল লাভের জন্য তার মুমিন বান্দাদেরকে মুত্তাকি হওয়ার, অর্থাৎ তাকওয়ার কৌশল শিখিয়ে দিয়েছেন, যার ইঙ্গিত পাওয়া যায় সূরা জুমু’আহর প্রথম ও দ্বিতীয় আয়াতে।
সূরা বাকারা এবং রোজার বিধান সম্পর্কে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়া আবশ্যক। এই সূরাটি মাদানি সূরা হিসেবে পরিচিত। অন্য দিকে, মদিনায় হিজরতের পর উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে মুসলমানদের আল্লাহ-ভীতি, ঈমান ও ইয়াকিন- মক্কি জমানার মতো ছিল না। মক্কি যুগের মুসলমানদের ঈমানের দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ নেই। কারণ মক্কার কাফির ও মুশরিকদের সাথে লড়াই সংগ্রাম করে প্রতি মুহূর্তে মুসলমানদেরকে ঈমানের পরীক্ষা দিতে হতো। অন্য দিকে, মদিনার জিন্দেগির আরাম-আয়েশ, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার সাথে যুক্ত হয়েছিল মোনাফেক সম্প্রদায়। অর্থাৎ মদিনার মুসলমানরা কাফির ও মুশরিক দ্বারা যতটা না ক্ষতিগ্রস্ত হতেন, তার চেয়েও বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হতেন মোনাফেকদের দ্বারা। এ অবস্থায় মদিনায় যেসব আয়াত নাজিল হতে থাকে তার উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল ঈমানসংক্রান্ত। যেসব বিধিবিধান নাজিল হতে থাকে তাও ছিল মুসলিমদের মুত্তাকি হওয়ার পথ প্রশস্ত করার জন্য। এরই ধারাবাহিকতায় মাদানি সূরা বাকারায় রোজার বিধান ঘোষিত হয়।
রোজার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন করতে হলে সবার আগে আল্লাহ এবং রাসূল সা:-এর মান ও শান সম্পর্কে পরিপূর্ণ বিশ্বাস ও আস্থা স্থাপন করতে হবে। আল্লাহ ও রাসূল সা:-এর শতসহস্র উপাধি ও গুণাবলির মধ্যে চারটি বিশেষ গুণকে অগ্রগণ্য করে মুমিনরা যদি তাদের প্রাত্যহিক কাজকর্ম এবং ইবাদত-বন্দেগি করতে পারেন, তবে আশা করা যায় তারা সফলতা লাভ করতে পারবেন। আল্লাহর চারটি বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সূরা জুমু’আহর প্রথম আয়াতে বলা হয়েছে- ‘যা আকাশে আছে এবং পৃথিবীতে আছে তার সমুদয় বস্তুই আল্লাহর মহিমা বর্ণনা করে যিনি মালিক, কুদ্দুস, আজিজ ও হাকিম।’ এখানে মালিক বলার মাধ্যমে বান্দাকে আল্লাহর একচ্ছত্র আধিপত্য এবং সব কিছুতেই তার মালিকানাকে স্বীকার করে নেয়ার মনমানসিকতা অর্জন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কুদ্দুস নামের অর্থ যিনি পবিত্র ও পরিশুদ্ধ। আয়াতে আল্লাহর পবিত্রতার দুটো দিক বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ তিনি নিজে পবিত্র এবং অন্যকেও পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করে থাকেন। আজিজ শব্দের অর্থ এমন কেউ যার একই সাথে ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, সম্মান-মর্যাদা এবং সার্বভৌমত্ব রয়েছে। আর হাকিম বলতে প্রজ্ঞাবান এবং জ্ঞানী বোঝানো হয়। আয়াতে ব্যবহৃত আজিজিল হাকিম শব্দটি কেবল আল্লাহ তায়ালার জন্যই প্রযোজ্য, যা কোনো মানুষ কোনো দিনই অর্জন করতে পারে না। কারণ আমাদের সমাজে শাসক প্রায়ই সম্মান পায় না। সম্মান পায় তো কর্তৃত্ব থাকে না। অথবা কর্তৃত্ব থাকে কিন্তু প্রজ্ঞা থাকে না।
এবার সূরা জুমু’আহর দ্বিতীয় আয়াত সম্পর্কে আল্লাহর বাণী শোনা যাক। এই আয়াতে আল্লাহ বলেছেনÑ ‘তিনি উম্মিদের মধ্যে একজন রাসূল প্রেরণ করলেন, যে তাদেরকে আয়াত শ্রবণ করায়, তাদেরকে পবিত্র করে বাতিল আকায়িদ ও মন্দ চরিত্র থেকে এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দেয়, যা নিয়ে ইতঃপূর্বে তারা স্পষ্ট ভ্রান্তিতে ছিল।’ এবার লক্ষ করুন- প্রথম আয়াতে আল্লাহর যে চারটি মৌলিক গুণ বর্ণিত হয়েছে, সেই চারটি গুণের বাস্তবায়ন ঘটেছে- রাসূল সা:-এর চরিত্রে। রাসূল সা:-এর ওপর কুরআন নাজিলের প্রক্রিয়া সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মুজিজা এবং আল্লাহ্র কুদরতের নিশানা হয়ে কিয়ামাত পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। ইতঃপূর্বে নবীদেরকে প্রদত্ত মুজিজাগুলো তাদের মৃত্যুর পর অবশিষ্ট থাকেনি। কিন্তু কুরআনের মুজিজা হুজুর সা:-এর ওফাতের পরও রয়ে গেছে এবং থেকে যাবে অনাদিকাল।
কুরআনের উল্লিখিত মুজিজা বোঝানোর জন্য আল্লাহ উম্মিঈন শব্দটি ব্যবহার করেছেন; অর্থাৎ কুরআন এমন একজন মানুষের ওপর নাজিল হয়েছে, যিনি উম্মি অর্থাৎ লিখতে ও পড়তে জানেন না। অন্য দিকে তার সম্প্রদায়ও উম্মি। বিষয়টি কত বড় আশ্চর্যজনক, তা বোঝানোর জন্য একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। ধরুন একটি গ্রামের সবাই অশিক্ষিত, মূর্খ এবং আঞ্চলিক বাংলা ছাড়া কিছু যেমন বলতে পারে না, তেমনি জীবনে আঞ্চলিক বাংলার বাইরে অন্য কোনো শব্দও তারা শোনেনি। তাদেরই মধ্যে একজন লোক কোনো একদিন সকালে পরিশুদ্ধ ইংরেজিতে শেক্সপিয়রের পুরো একটি নাটক মুখস্থ বলতে আরম্ভ করল। লোকটির এই অবস্থা দেখে সেই গ্রামের লোকের প্রথম ধারণা হবে যে, লোকটি যা বলছে তা তার নিজের বক্তব্য নয় এবং কথাগুলো তাদের মধ্যে অন্য কারোও নয়।
রাসূল সা:-এর প্রতি যখন কুরআন নাজিল হলো তখন আরববাসী সবাই বুঝল যে, এটি যেমন মুহাম্মদ সা: নিজের ভাষা নয়, তেমনি কোনো উম্মি আরবের ভাষাও নয়। তারা অনেকে একে অস্বীকার করেছিল কেবল নিজেদের আর্থিক ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধার কথা চিন্তা করে। এবার আয়াতে বর্ণিত শব্দমালার দ্বারা কুরআনের মুজিজা এবং রাসূল সা: বৈশিষ্ট্য বোঝার চেষ্টা করুন। আল্লাহর হুকুমে একজন উম্মি মানুষ কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দেয়ার যোগ্যতা অর্জন করলেন। তিনি তার সম্প্রদায়ের উম্মি লোকজনকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ বানানোর ক্ষমতাপ্রাপ্ত হলেন এবং লোকদেরকে কিতাব শিক্ষা দেয়ার পাশাপাশি ভালো ও মন্দের পার্থক্য নির্ধারণ করার জন্য বিধান বা শরিয়তের আইন প্রণয়ন করতে লাগলেন।
কুরআন পাঠ এবং রোজা রাখার সময় মানুষ যদি আল্লাহর উল্লিখিত চারটি মৌলিক গুণ এবং সেই মৌলিক গুণাবলিকে শরিয়তের বিধানে পরিণত করার খোদায়ি এজাজতপ্রাপ্ত রাসূল সা:-এর ওপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস এবং তার সুন্নাতের ওপর আমল করার দক্ষতা অর্জন ব্যতিরেকে মানুষের মধ্যে তাকওয়া পয়দা হয় না। রোজার সময় পানাহার বর্জন, সময়মতো সেহরি ইফতার, পর্যাপ্ত দান-খয়রাত, নফল ইবাদত, তারাবি, কুরআন তিলাওয়াত ইত্যাদির মাধ্যমে মাহে রামাদান উদযাপনের পাশাপাশি আচার, আচরণ, চিন্তাচেতনা, মনমানসিকতা, দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের বহু শত আদেশ-উপদেশ পাওয়ার পরও আমরা সফলতা লাভ করতে পারি না। কেবল আল্লাহ এবং রাসূল সা: সম্পর্কে নিজেদের বিশ্বাস, আস্থা এবং ভালোবাসার জায়গাটুকু কুরআন ও হাদিসের আলোকে মজবুত না করতে পারার কারণে এটা সম্ভব হয় না। এই একটি জায়গাতেই সাহাবিগণ যে উদাহরণ সৃষ্টি করে গিয়েছেন, তা অন্য কোনো মুমিন-মুত্তাকির পক্ষে এত সহজে করা সম্ভব নয়। তারা রাসূল সা:-এর মুখে যা শুনতেন তা অক্ষরে অক্ষরে বিশ্বাস এবং বাস্তবায়ন করতেন। এই বিষয়টি বোঝানোর জন্য একটি বিখ্যাত হাদিস বর্ণনা করে আজকের প্রসঙ্গ শেষ করব।
সাওম বা সিয়াম বলতে শুধু খাদ্য ও পানীয় বর্জন বোঝায় না, বরং সারা শরীর, মন-মস্তিষ্ক এবং চিন্তাচেতনা থেকে সব নিষিদ্ধ জিনিস বর্জন করাকে বোঝায়। মানুষ যদি পাপের চিন্তা বন্ধ এবং পাপের উৎসমুখ থেকে নিজেকে পরিহার করতে না পারে অর্থাৎ সিয়াম সাধনা না করতে পারে তবে খানা-পানীয় পরিত্যাগের কোনো গুরুত্ব আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না। সিয়াম সাধনার দু’টি উল্লেখযোগ্য উপায় হলো চোখকে নিয়ন্ত্রণ আর আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা। মানুষের বেশির ভাগ পাপের আকাক্সক্ষা ও সুযোগ সৃষ্টি হয় চোখের দ্বারা। যারা চোখকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, তাদের পক্ষে পাপ থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। অন্য দিকে মনের দুষ্ট চিন্তা, কাম ভাব, ক্রোধ, ঘৃণা ও বিদ্বেষের কারণেই সব ফেতনা-ফ্যাসাদ, দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত সৃষ্টি হয়ে থাকে। কাজেই পরিশুদ্ধ মন ছাড়া সিয়াম সাধনা সফলতা পায় না।
রোজার মাধ্যমে দৃষ্টি ও মন পরিশুদ্ধ করার প্রাথমিক প্রশিক্ষণটি শুরু হয়ে যায়। বান্দা যদি তার চেষ্টা অব্যাহত রাখে তাহলে রোজার বরকতে ধীরে ধীরে সে পরম লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে। খানাপিনা পরিহার, বৈধ যৌনসম্পর্কের হালাল কাজও আল্লাহর হুকুমে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বর্জন করার অভ্যাস ও মনমানসিকতা অর্জনের পথ ধরেই মানুষ তার জীবনের অপরাপর হারাম বিষয়গুলো বর্জন করার সামর্থ্য লাভ করে থাকে। এই পথে এগোনোর জন্য মানুষের উচিত মাহে রামাদানের সুযোগে মনকে পরিশুদ্ধ করার জন্য বেশি বেশি ‘ইয়া কুদ্দুসুন’ তসবিহ তেলাওয়াত করা এবং সবাইকে ক্ষমা করে দেয়া। বান্দা যদি চিত্তকে পরিশুদ্ধ করার প্রাথমিক চেষ্টা হিসেবে একান্তে বারবার বলতে থাকেন যে, কারো বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই, ক্ষোভ নেই এবং কোনো ক্রোধ নেই, রমজান উপলক্ষে সবাইকে মাফ করে দিলাম এবং সব শত্রুতা, হিংসা, বিদ্বেষ ও ক্রোধ থেকে নিজেকে বিরত রাখলাম, তাহলে বান্দার জন্য সিয়াম সাধনার অভীষ্টে পৌঁছানো সহজ হয়ে যায়।
মানুষের শারীরিক ইবাদত বন্দেগির চেয়ে আত্মার পরিশুদ্ধি কত বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা বিখ্যাত একটি হাদিসের আলোকে অনুধাবন করার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ। একদা আল্লাহর রাসূল সা: মসজিদে নববীতে সাহাবিদের সাথে নামাজের জন্য প্রতীক্ষা করছিলেন। এমন সময় তিনি বলে উঠলেন, ওমুক দরজা দিয়ে একটু পর একজন জান্নাতি প্রবেশ করবে। সব সাহাবি অধীর আগ্রহে সে দরজার দিকে তাকিয়ে রইলেন এবং দেখতে পেলেন, একজন অখ্যাত সাহাবি সেখান দিয়ে প্রবেশ করছেন, যার দাড়ি থেকে ওজুর পানি ঝরছিল এবং এক হাতে ছিল নিজের জুতা। পরদিন রাসূল সা: একই কথা বললেন এবং সাহাবিরা একই লোককে সেই নির্দিষ্ট দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে দেখলেন। তৃতীয় দিনেও রাসূল সা: অনুরূপ বললেন এবং সাহাবিরা একই দৃশ্য অবলোকন করলেন।
পরপর তিন দিন আল্লাহর রাসূল সা:-এর কাছ থেকে জান্নাতি সার্টিফিকেট পাওয়া অখ্যাত সাহাবির আমল জানার জন্য বিখ্যাত সাহাবা আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা: অধীর হয়ে পড়লেন, যিনি তার ইবাদতের জন্য ইতোমধ্যেই সর্বমহলে সুখ্যাতি পেয়েছিলেন। হজরত আবদুল্লাহ সারা বছর রোজা রাখতেন, সারা রাত নামাজ পড়তেন এবং দৈনিক পুরো কুরআন একবার করে তিলাওয়াত করতেন। তিনি অবাক হয়ে চিন্তা করতে লাগলেন- নিশ্চয়ই উল্লিখিত সাহাবির এমন কোনো আমল রয়েছে, যার কারণে তিনি জান্নাতের সার্টিফিকেট লাভ করেছেন এবং যে আমল অবশ্যই তার আমলের তুলনায় শ্রেষ্ঠ।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা: জান্নাতি সার্টিফিকেট পাওয়া সাহাবার পিছু নিলেন এবং তার অনুমতি নিয়ে তার গৃহে তিন রাত্রি অবস্থান করলেন। তিনি দেখলেন, সাহাবি যথারীতি মসজিদ থেকে এশার নামাজ পড়ে আসেন এবং খানাপিনা করে ঘুমিয়ে যান। আবার ফজরের আজানের সময় ঘুম থেকে উঠে মসজিদে চলে যান। রাতে তাহাজ্জুদ বা অন্য কোনো ইবাদত করেন না। তিন দিন পর তিনি বেশ আশ্চর্য হয়ে সাহাবিকে বললেন, ‘চাচাজান! আপনি আমায় বলুন, কী কারণে আপনি জান্নাতি সার্টিফিকেট পেলেন। কারণ গত তিন রাতে আমি তো আপনাকে কোনো আলাদা বা অতিরিক্ত ইবাদত-বন্দেগি করতে দেখলাম না।’ উত্তরে সাহাবি বললেন- আমি জান্নাতের সার্টিফিকেট পেয়েছি এটা যেমন আমি জানি না, তেমনি এ কথাও জানি না কেন সেটা পেয়েছি। আমার জীবনে উল্লেখ করার মতো কোনো আমল নেই। তবে আমার মন সম্পর্কে একটি কথা বলতে পারি। এই মন একেবারে সাদা। কোনো হিংসা, ক্রোধ, লোভ-লালসা ইত্যাদি কোনো কিছুই আমার মনে স্থান পায় না। এ কথা শুনে হজরত আবদুল্লাহ বললেন- ‘এবার বুঝেছি! এটাই জান্নাতি হওয়ার কারণ।’

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫