ঢাকা, সোমবার,২১ আগস্ট ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

হিসাব-নিকাশের ফাঁদে অবসরভোগীরা

কাজী আশরাফ আলী

৩১ মে ২০১৭,বুধবার, ১৮:১০


প্রিন্ট

বাংলাদেশ সাংবিধানিকভাবে কল্যাণ রাষ্ট্র। সরকার জনকল্যাণে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির প্রসার ঘটিয়েছে। সংস্কার ও পুনর্গঠনমূলক ব্যবস্থায় পেনশন ব্যবস্থা, দারিদ্র্যবিমোচন, দুস্থ মহিলাভাতা, বৈশাখী ভাতা ইত্যাদিতে আর্থিক সহায়তা চালু রেখেছে। অর্থমন্ত্রীর ২০১৬-২০১৭ বাজেট বক্তৃতায় সর্বজনীন পেনশন ধারণা, তহবিল গঠন সম্পর্কে সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ প্রশংসা অর্জন করেছে। সরকারি কর্মচারীদের পেনশনব্যবস্থায় সংস্কার, তহবিল গঠন, সরকারি চাকরির মতো স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিকে পেনশনযোগ্য করার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রীর উক্তি ‘এত বয়সে কোথায় হাত পাতবেন প্রবীণেরা’। সত্যিই প্রণিধানযোগ্য, এতে প্রবীণদের চিন্তার প্রতিধ্বনি রয়েছে। জিপিএফের সদস্যরাই পেনশন পেয়ে থাকেন, তাদের ওই তহবিলে বাধ্যতামূলক চাঁদা দিতে হয়। ওই তহবিলের বাইরে যারা তাদের জন্য তহবিল সৃষ্টির প্রয়োজন হচ্ছে, যাতে তাদেরও পেনশনব্যবস্থায় আনা যায়। পেনশনব্যবস্থার সাথে অসঙ্গতি দূর ও সামাজিক সুরক্ষার দৃঢতার লক্ষ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ০৯.০১.২০১৭ প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী পেনশারগণ গ্রস পেনশনের ৫০% বাধ্যতামূলক সমর্পণ এবং অবশিষ্ট ৫০% নির্ধারিত হারে মাসিক পেনশন হিসেবে নিজে বা অবর্তমানে পরিবার পেনশন হিসেবে পাবেন, যা ১ জুলাই ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দ তারিখ হতে কার্যকর হবে। পেনশন শতভাগ বিক্রয় করাটা পেনশন ধারণার সাথে অমিল হওয়ায় এবং অধিক সুরক্ষা হেতু ৫০ ভাগ বাধ্যতামূলক সমর্পণ করা যাবে। বর্তমানে বেতনের নতুন স্তরগুলো, যা পূর্বের বেতন স্কেল হতে দ্বিগুণ তাই প্রত্যেক পেনশনার-অবসরভোগী এককালীন ও পেনশন হতে প্রাপ্তব্য অর্থ অবসরকালে সচ্ছলতা ও সম্মানজনক জীবনযাপনে সহায়ক হবে।
বিপরীতভাবে যারা জিপিএফের সদস্য পেনশনার কিন্তু পূর্বের বেতন স্কেলে অবসরে তারা পেনশন বিধি মোতাবেক প্রয়োজনে এবং সরকারি বাধ্যবাধকতা না থাকায় শতভাগ পেনশন সমর্পণ করেছেন, তারা মাসিক পেনশন পাচ্ছেন না শুধু দুই ঈদে দুটো বোনাস পাচ্ছেন ও চিকিৎসা ভাতা পাচ্ছেন। নতুন বেতনকাঠামোতে সরকারি কর্মচারীদের বেতন আকর্ষণীয় পর্যায়ে রয়েছে বিধায় ১০০% সমর্পণ না করার বিধান থাকলেও ৫০% বাধ্যতামূলক সমর্পণ এবং অবশিষ্ট ৫০% নির্ধারিত হারে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের আর্থিক সহায়তা পাবেন। পূর্বের প্রতিটি বেতন স্কেল বিবেচনায় পদবি বা গ্রেড অনুযায়ী পেনশন সুবিধা-বোনাস নির্ধারণে শতকরা হারের বৃদ্ধি করে হিসাবায়ন প্রয়োজন। অর্থাৎ, ১ জুলাই ’১৭ হতে ০৯.০১.২০১৭ খ্রিষ্টাব্দ তারিখের প্রজ্ঞাপনে ৫% হারে ইনক্রিমেন্ট, পেনশনার বা পারিবারিক পেনশনারদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। নতুন বেতন স্কেল ও পুরাতন বেতন স্কেলের বেতন পার্থক্য অনেক ক্ষেত্রে দ্বিগুণের অধিক হয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি, দ্রব্যমূল্য, বাজার সামর্থ্য, পদবি বা গ্রেড স্কেল অনুযায়ী ৫%-এর পরিবর্তে প্রতিটি বেতন স্কেলের আর্থিক সুবিধা বিবেচনায় এনে ৫%-এর ঊর্ধ্বে শতকরা হার নির্ধারণ করে বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। যারা জিপিএফে অন্তর্ভুক্ত ছিল কিন্তু শতভাগ সমর্পণ করেছে তারা পূর্বের বেতন স্কেলে পেনশন বা আর্থিক সুবিধা পেয়েছে ৮০% হারে, বর্তমানে নতুন স্কেলে ৯০% হারে। পূর্বে টাকা প্রতি পেয়েছে ২০০ টাকা হিসাবে, আর বতর্মানে হিসাবায়ন হবে ২৩০ টাকা হিসাবে। এ ধরনের আর্থিক পার্থক্যের বিপরীতে শতভাগ পেনশন সমর্পণকারীদের জন্য মাসিক আর্থিক সহায়তাসহ বোনাসের ক্ষেত্রে শতকরা বর্ধিত হারে বৃদ্ধি করে প্রদান করার যৌক্তিকতা রয়েছে। উল্লেখ্য, প্রজ্ঞাপনে পূর্বে শতভাগ সমর্পণকারীদের বিষয়টি সুস্পষ্ট করা হয়নি। চাকরিরতদের মতো অবসরভোগীদের ৬৫ বছর বয়স পর্যন্ত একই অঙ্কের চিকিৎসা ভাতা প্রদান করা হচ্ছে, যা যুক্তিযুক্ত নয়। চাকরিরত অবস্থা ও অবসর অবস্থায় পার্থক্য থাকা দরকার। প্রথমপর্যায়ে ৬০ বছর পর্যন্ত চাকরিকালীন ১৫০০ টাকা, দ্বিতীয়পর্যায়ে ৬৪ বছর পর্যন্ত ৩০০০ টাকা এবং তৃতীয়পর্যায়ে ৬৪ বছর ঊর্ধ্ব বয়সে ৪৫০০ টাকা করা দরকার। সাধারণত যত প্রবীণ বা বয়স বৃদ্ধি ঘটবে তত রোগ-শোক বাড়বে, আর্থিক সক্ষমতা না বাড়ালে তারা চিকিৎসা সেবা কিভাবে পাবে। তাই অবসরভোগীদের মধ্যে যারা জিপিএফে ছিলেন থাকবেন, অবসরে যাবেন তাদের স্বাস্থ্যরক্ষায় চিকিৎসা ভাতা বৃদ্ধি জরুরি।
শতভাগ সমর্পিত সত্তরোর্ধ্ব পেনশনারদের পেনশন ব্যবস্থায় পুনঃপ্রতিস্থাপনের বিষয়টি সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে বলে জানা যায়। ওই বয়স সীমা ৬৫ বছর পর্যন্ত হলে অনেক অবসরভোগী উপকৃত হবেন এবং মানবিক ও প্রত্যাশিতভাবে জীবদ্দশায় সরকারের প্রদত্ত সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। অবসরভোগী সরকারি চাকরি পেনশনারদের নিয়মমাফিক ক্রয়কৃত সঞ্চয়পত্রে লিয়েন রেখে প্রাপ্তব্য আয় মাসিক বা ত্রৈমাসিক হতে সমন্বয়ের শর্তে চিকিৎসা বা শিক্ষা জরুরি খরচ নির্বাহের জন্য ঋণ প্রদানের কাঙ্ক্ষিত বিষয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংক, সঞ্চয় পরিদফতর ও বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক জনকল্যাণে বিবেচিত হতে পারে।
উল্লেখ্য, অনেক সময় তৎক্ষণাৎ অর্থের প্রয়োজন হলে সঞ্চয়পত্র মেয়াদপূর্তির পূর্বে নগদায়ন করে লোকসানের সম্মুখীন হতে হয়। পেনশনার বা অবসরভোগীদের জন্য আয়কর প্রদান ব্যবস্থার সহজীকরণসহ নতুন ফরম্যাট এবং নির্দেশনা পুস্তক সরবরাহ করার প্রয়োজন রয়েছে। সাধারণ ও পেনশনার সঞ্চয়পত্রের ওপর বর্তমানে কর ধার্য করা ও মুনাফা হতে পূর্বেই কর কর্তনের ব্যবস্থা রয়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে কমিশন পায়। সরকারি খাতে কর্তনকৃত করের অর্থ জমা হয় অথচ কর কর্তনের প্রত্যয়ন পত্রের জন্য কোনো কোনো ব্যাংক গ্রাহক হতে চার্জ আদায় করে, যা যুক্তিযুক্ত নয় বিধায় সঞ্চয় পরিদফতর ও বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক বিষয়টি বিবেচনায় এনে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে সুষ্পষ্ট নির্দেশনাসংবলিত প্রজ্ঞাপন জারি প্রয়োজন।
অবসরভোগী পেনশনাররা সমাজের অসংগঠিত একটি অংশ। সরকারের ইতিবাচক সিদ্ধান্ত তাদের আশান্বিত করে। পেনশন সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিষ্পত্তিতে দ্রুততা, সহজীকরণ এবং যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা বিভাগগুলোর সমন্বয় ও সহযোগিতা প্রয়োজন। বিগত বাজেটের মতো ২০১৭-২০১৮ সালের বাজেটে সামাজিক সুরক্ষায় বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনায় পেনশনারদের আর্থিক বৈষম্য দূরীকরণে-হিসাবায়নে এবং আলোচ্য দফাগুলো বাস্তবায়নে কার্যকরী দিকনির্দেশনা থাকবে, এ প্রত্যাশা সরকার তথা মাননীয় অর্থমন্ত্রীর কাছে সব অবসরভোগী পেনশনার বা পারিবারিক পেনশনার ও শতভাগ সমর্পিত পেনশনারদের।
লেখক : নির্বাহী কর্মকর্তা (অবসর), রূপালী ব্যাংক লিমিটেড।
Email : qsstechno@gmail.com

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫