ঢাকা, বুধবার,১৭ জানুয়ারি ২০১৮

উপসম্পাদকীয়

লুটপাটের জন্য দরকার একটি ব্যাংক

আলফাজ আনাম

২৩ মে ২০১৭,মঙ্গলবার, ১৭:০৬


আলফাজ আনাম

আলফাজ আনাম

প্রিন্ট

খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হওয়ার সহজ পথ হচ্ছে ব্যাংক ডাকাতি কিংবা জালিয়াতি করে টাকা মেরে দেয়া। দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে ব্যাংক ডাকাতি ও জালিয়াতির ঘটনা ঘটে থাকে। বাংলাদেশ সম্ভবত বিশ্বের এমন এক দেশ যে দেশে ব্যাংক জালিয়াতি বা ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে ফেরত না দেয়ার জন্য একধরনের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া যায়। এমনকি পুরো ব্যাংক দখলের মতো ঘটনাও এ দেশে সম্ভব। আবার বাংলাদেশ বিশ্বের একমাত্র দেশ, যে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা লোপাট হয়ে যায়। কিন্তু তার রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হয় না।
বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর একের পর এক দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে নানা কায়দায় লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি, সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনার মতো জালিয়াতি ব্যাংকিং জগতে লুটপাটের ইতিহাসে বিরল। রাষ্ট্রায়ত্ত এসব ব্যাংকের এভাবে টাকা লোপাটের কারণে এখন ব্যাংকগুলো সচল রাখতে সরকারকে মূলধন ঘাটতি মেটাতে হচ্ছে। আগামী ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে দুই হাজার কোটি টাকা দেয়ার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে বলে গণমাধ্যমে সংবাদ এসেছে।
দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত বেশির ভাগ ব্যাংক এখন চরম মূলধন সঙ্কটে ভুগছে। সরকারি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণে ২০১১-১২ অর্থবছর থেকে চলতি অর্থবছর পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। ২০১১-১২ অর্থবছরে মূলধন ঘাটতি পূরণে রাখা হয় ৩৪১ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকারি ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণে দুই হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। দেখা যাচ্ছে বছর বছর মূলধন ঘাটতি বেড়েই যাচ্ছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে এভাবে টাকা লোপাটের সাথে ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের নানাভাবে সংশ্লিষ্টতা থাকলেও তা খুব একটা আলোচনায় আসে না। টাকা লোপাটের ঘটনা প্রকাশের পর প্রাথমিক ধাক্কা যায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের শাখ্যা ব্যবস্থাপকের ওপর দিয়ে। সাধারণভাবে পরিচালনা পর্ষদের অনুমতি ছাড়া বড় ধরনের ব্যাংক ঋণ দেয়া হয় না। কিন্তু সোনালী ব্যাংকের যেসব কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে তাতে তাদের কোনোভাবেই শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়নি। আর ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদে যারা থাকেন তাদের বেশির ভাগই রাজনৈতিক নেতা বা সংসদ সদস্য। এই সংসদ সদস্যরা কিভাবে ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে যাচ্ছেন তার খবর মাঝে মধ্যে সংবাদপত্রে আসছে।
সম্প্রতি বনানীর রেইনট্রি হোটেলে একটি ধর্ষণের মামলাকে কেন্দ্র করে একজন সংসদ সদস্যের সম্পদের বিবরণ সংবাদপত্রে এসেছে। এই সংসদ সদস্যর পুত্র-কন্যা তথা পারিবারিক মালিকানায় চলছে হোটলটি। আবার এই সংসদ সদস্য ও তার পুত্র একটি বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালক, যে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান তাদের আত্মীয়। ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া ধনাঢ্য এক স্বর্ণব্যবসায়ীর পুত্রের বন্ধু হচ্ছেন এমপি পুত্র। ফলে আমাদের অভিজাত সম্প্রদায়ের নানা কীর্তি কাহিনী এবং সম্পর্কের পারস্পরিক নানা বিবরণ এবং কিভাবে দ্রুত বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হয়ে যাচ্ছেন মানুষ এখন জানতে পারছে।
ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য ও ধর্ম মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি বি এইচ হারুন ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশনে দেয়া হলফনামায় ৩৮ লাখ টাকার অর্থসম্পদ দেখান। এর মধ্যে রয়েছে শেয়ারবাজার, সঞ্চয়পত্রসহ ব্যাংকে ছয় লাখ ৬২ হাজার টাকা, বাড়ি ও দোকানভাড়া থেকে ১৬ লাখ টাকা, ব্যবসায় থেকে ১৪ লাখ টাকা এবং সম্মানী বাবদ এক লাখ ২০ হাজার টাকা আয়। স্ত্রী মনিরা হারুনের নামে তখন কিছুই ছিল না।
কিন্তু ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনের আগে হলফনামায় বি এইচ হারুন দেখান, তার নিজের ও স্ত্রীর শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ রয়েছে ১৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া নগদ দুই কোটি ৯০ লাখ, ব্যাংকে ৬৭ লাখ এবং ব্যাংকে স্থায়ী আমানত তিন কোটি ৬৮ লাখ টাকা, গাজীপুরে ১৭ কাঠা, মিরপুরে ৫ কাঠা, বনানীতে সাড়ে ৬ কাঠা, বারিধারায় ৬ কাঠার একটি ও সাড়ে ৪ কাঠার আরেকটি প্লট রয়েছে তার।
এ ছাড়া ছোট ছেলে আদনান হারুনকে দু’টি জাহাজ কিনতে ১৩ কোটি টাকা এবং বড় ছেলে নাহিয়ান হারুনকে প্রিমিয়ার ব্যাংকের পরিচালক হতে ২০ কোটি টাকা দেন। এ ছাড়া স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকে ভাই ফয়জুর রব আজাদের নামে জমা রাখেন ১৫ কোটি টাকা।
শেষ হলফনামায় অবশ্য দায় হিসেবে বি এইচ হারুন স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক থেকে ৯ কোটি ৫৯ লাখ টাকা, স্ত্রীর কাছ থেকে তিন কোটি ২০ লাখ এবং বৈদেশিক মুদ্রায় এক কোটি ২৪ লাখ টাকা ঋণ নেন বলে দেখান।
এসবের বাইরেও প্রিমিয়ার ব্যাংকের ২০১৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আটটি কোম্পানিতে মালিকানা রয়েছে বি এইচ হারুনের, এর মধ্যে পাঁচটিরই চেয়ারম্যান তিনি।
এ ছাড়া এই সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে খলিলুর রহমান নামে এক ব্যক্তি অভিযোগ করেছেন, সৌদি সরকারের সাহায্যে ২০০৮ সালে সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য ১৫ হাজার ঘর নির্মাণের ২০৪ কোটি টাকার কাজ পেয়েছিলেন তিনি। তার হিসাব ছিল প্রিমিয়ার ব্যাংকের বংশাল শাখায় এবং কাজ চলাকালে ২৯৭টি চেকের পাতার মাধ্যমে ৭০ কোটি টাকা তিনি উত্তোলন করেন। কাজ শেষে বাকি টাকা তোলার জন্য খলিলুর বংশাল শাখায় গেলে তৎকালীন ব্যবস্থাপক সামসুদ্দিন চৌধুরী (পদোন্নতি পেয়ে বর্তমানে ডিএমডি) জানান, তিনি সব টাকা তুলে নিয়ে গেছেন এবং হিসাবও বন্ধ করে দিয়েছেন। খলিলুর দুই সংস্থাকে বলেছেন, তার অজ্ঞাতে অতিরিক্ত ৩৮৮টি চেকবই ইস্যু দেখিয়ে জাল সইয়ের মাধ্যমে ১৩৪ কোটি টাকা তুলে নিয়ে গেছেন বি এইচ হারুন। (প্রথম আলো ১৯ মে ২০১৭)
একজন সংসদ সদস্য মাত্র পাঁচ বছরে ৩৮ লাখ টাকা থেকে কয়েক শ’ কোটি টাকার বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে গেছেন। এখানে দেখা যাচ্ছে ব্যাংক থেকে তিনি নানা ধরনের ঋণসুবিধা নিয়েছেন। আবার পুত্রকে বেসরকারি প্রিমিয়ার ব্যাংকের পরিচালক বানিয়েছেন। তিনি নিজেও এই ব্যাংকের পরিচালক। প্রিমিয়ার ব্যাংকের চেয়ারম্যান এইচ বি এম ইকবালের ভগ্নিপতি হচ্ছেন বি এইচ হারুন। আবার তার বিরুদ্ধে জালিয়াতির মাধ্যমে টাকা তোলার যে অভিযোগ আনা হয়েছে সেটিও প্রিমিয়ার ব্যাংকের একটি শাখা থেকে। সোনালী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংকেও যখন এ ধরনের লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে সেখানেও আমরা একাধিক সংসদ সদস্যের ভূমিকা দেখেছি। হলমার্কের সাথে একাধিক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীর পদমর্যাদায় এক উপদেষ্টার সংশ্লিষ্টতার খবর এসেছে।
সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলো এখন রাজনৈতিক নেতা বা বিনা ভোটে নির্বাচিত এমপিদের টাকা বানানোর মেশিনে পরিণত হয়েছে। এমপির বিরুদ্ধে অন্যের টাকা তুলে নেয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা বলেন, তিনি পুরো বিষয়টি জানেন না, জানতে চান না এবং জানাতেও চান না। জানাতে না চাওয়ার কারণ জানতে চাইলে শুভঙ্কর সাহা বলেন, ‘জনসমক্ষে বলার মতো ঘটনা এটা না’।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালকের এই জবাবের মধ্যে রয়েছে আসলে সব প্রশ্নের জবাব। রাজনৈতিক ক্ষমতা ও প্রভাবের সাথে যখন বিপুল অর্থের সমাগম ঘটে তখন অনেক কিছুই আড়াল হয়ে যায়। স্বাধীন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সব কথা আর বলতে পারে না। জানলেও না জানার ভান করতে হয়। কারণ এই ধরনের মাননীয় আইন প্রণেতাদের ইজ্জত রক্ষা করাও তাদের দায় হয়ে পড়ে।
দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ফোকলা হওয়ার পর বেসরকারি ব্যাংকগুলো এখন রাজনৈতিক মহল থেকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। দেশের এক নম্বর বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক ক্ষমতাসীন মহলের পৃষ্ঠপোষকতায় দখলদারিত্ব সম্পন্ন হওয়ার পর, এখন দুই পক্ষ তৈরি হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলছেন, ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে লড়াই চলছে। এই ব্যাংকে কিভাবে পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন আনা হয়েছিল তার বিবরণ কয়েক সপ্তাহ আগে লন্ডনের ইকোনমিস্টে প্রকাশ হয়েছে। ক্ষমতাসীনদের সমর্থনপুষ্টরা নিজেরাই এখন এই লড়াইয়ে লিপ্ত হয়েছে। এর ফলে সাধারণ আমানতকারীরা এখন দুশ্চিন্তায় পড়েছে। অন্য বেসরকারি ব্যাংকগুলোতেও ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। সম্প্রতি ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) আইন ২০১৭-এর খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়েছে। সংশোধিত আইনে বেসরকারি ব্যাংকেও পরিচালকদের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিদ্যমান ব্যাংক কোম্পানি আইনে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে কোনো পরিচালকের তিন বছর করে দুই মেয়াদে টানা ছয় বছর দায়িত্ব পালনের সুযোগ থাকলেও সংশোধিত আইনের খসড়ায় তা একনাগাড়ে ৯ বছর করা হয়েছে। তিন বছর বিরতি দিয়ে আবারো পরিচালক হওয়া যাবে।
সংশোধনীতে ব্যাংকে পারিবারিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগও অবারিত করা হয়েছে। বিদ্যমান আইনে এক পরিবার থেকে সর্বোচ্চ দুইজনের পরিচালক পদে থাকার সুযোগ রয়েছে। সংশোধিত আইনের খসড়ায় তা সর্বোচ্চ চারজন করা হয়েছে। নতুন সংশোধনী পাস হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতা খর্ব হওয়ার পাশাপাশি দেশের ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এখন বেসরকারি ব্যাংকগুলোর বেহাল অবস্থার কারণে বিভিন্ন সময়ে দেশের ২৫-২৬টি ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিতে বাধ্য হয়েছে। নতুন আইনের মাধ্যমে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ওপরও বাংলাদেশ ব্যাংক আরো কর্তৃত্ব হারাবে।
ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রী-এমপি ও ব্যবসায়ীরা সবাই এখন ব্যাংকের মালিক হতে চাইছেন। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ফোকলা করার পর তারা বেসরকারি ব্যাংক থেকে টাকা কামানোর কৌশল নিয়েছেন। এতে সুবিধা হচ্ছে নামে-বেনামে যেমন আমানতকারীদের টাকা ঋণ নেয়া যায় তেমনি ব্যাংকের পরিচালক হিসেবে লাভজনক ব্যবসায় করা যায়। নতুন আইনে ব্যাংকগুলো পারিবারিক ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। এই সুযোগ চতুর রাজনৈতিক নেতারা নিচ্ছেন। এরই মধ্যে এর কুপ্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ব্যাংকগুলোর ওপর মানুষের আস্থা কমে এসেছে। ইসলামী ব্যাংকের রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়া এর একটি উদহারণ।
alfazanambd@yahoo.com

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫