ঢাকা, সোমবার,২৩ অক্টোবর ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

আমাদের রেলব্যবস্থা এত অনুন্নত কেন?

সাইফুল ইসলাম তানভীর

২২ মে ২০১৭,সোমবার, ১৫:৪২


প্রিন্ট

রেলগাড়ি অন্য অনেক পরিবহনের তুলনায় নিরাপদ। অনেকেই প্রতিদিন রেলগাড়িতে চড়ে অফিস করেন। গাজীপুরের অনেক লোক ঢাকায় রেলগাড়িতে চড়ে প্রতিদিন অফিস করেন। আমরা ছোটবেলায় পাঠ্যপুস্তকে রেলগাড়ি আবিষ্কারের ইতিহাস পড়েছি। এই অঞ্চলে ১৫ নভেম্বর ১৮৬২ সালে প্রথম রেলপথ চালু হয়। রেলওয়ের দু’টি বিভাগ। রেলওয়ে স্টেশন সংখ্যা রয়েছে ৪৫৪টি। রেলে বেশি না চড়লেও রেলগাড়ি প্রায়ই দেখতাম। রেলের অফিস দেখতাম। কারণ তখন ছিলাম চট্টগ্রাম শহরে। চট্টগ্রামের পনোগ্রাউন্ডে রেলওয়ে কলোনিতেই আমাদের ভাড়া বাসা ছিল। পলো গ্রাউন্ডে পাহাড়ের ওপরে বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল অফিস, যে অফিস দেখতে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। তখন সেই নব্বই দশকের শুরুর কথা।
গত বছর আমার স্ত্রীকে নিয়ে চট্টগ্রামের স্মৃতির জায়গায়গুলো পরিদর্শন করেছি। তবে রেলগাড়িতে যাইনি। ঢাকায় ফেরার সময়ও ট্রেন বা রেলে আসিনি। দীর্ঘসময় পর এই ১৮ জানুয়ারি ২০১৭ আবার ট্রেনে চড়ার সৌভাগ্য হলো। এর আগে ১৯৯৩ সালে চড়েছিলাম। দীর্ঘ সময় পর সেই বিশৃঙ্খল পরিবেশ আবার প্রত্যক্ষ করলাম। এত বছর পর খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। হ্যাঁ পরিবর্তন হয়েছে যেমন রেল কর্মচারী-কর্মকর্তাদের বেতন এবং অন্যান্য বৈধ সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু যাত্রী সুবিধার তেমন উন্নতি হয়নি।
রেলের দুর্নীতির কথা দেশের প্রায় সব মানুষই জানেন। রেলওয়ের চাকরিতে ঢুকতে লাগে লাখ লাখ টাকার ঘুষ লাগে। আবার চাকরিতে যোগ দিয়ে সেটা পুষিয়ে নিতে হয়। রেলের যন্ত্রপাতি, রেলের বগি, ইঞ্জিন কেনাকাটিতে রয়েছে শত শত কোটি টাকার কমিশন। সেটা বড়রা পান। ১৮ জানুয়ারি ঢাকা থেকে খুলনার উদ্দেশে ট্রেনে উঠি। এটির নাম ছিল চিত্রা। এটার নম্বর ছিল ২৬৪। ট্রেনে উঠে দেখলাম অনেকের কাছে টিকিট নেই। আমি টিকিট নিয়েছিলাম ১৭ জানুয়ারি বিমানবন্দর রেলস্টেশন থেকে। টিকিট নিতে গিয়ে দেখলাম বিমানবন্দর রেলস্টেশন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা খুবই কম। সেখানে হকারদের বাজার। রেলস্টেশনের দোকানে ২০ টাকার পানির বোতল ২৫ টাকা। ১৫ টাকারটা ২০ টাকায়। অন্যান্য কিছুর দামও বেশি। আমার বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে ওখানে এমনকি হয়েছে যে, প্রয়োজনীয় খাবার সামগ্রীর অধিক মূল্য থাকবে? রেলের কর্মচারীরা কোথায়? রেলে টিকিট ছাড়া কিভাবে যাত্রী উঠছে? রেলে যাত্রীদের মালপত্র রাখা নিয়ে অনেক ঝামেলা হয়। সেখানে কি টোকেন ব্যবস্থার মাধ্যমে যাত্রীদের মালামাল নিরাপদে রাখা যায় না? রেলের মধ্যে যখন তখন হকার এসে যাত্রীদের বিরক্ত করছে। যাত্রীদের জন্য রেল কর্তৃপক্ষ কি নিরাপদ খাদ্যের ব্যবস্থা করতে পারে না? সেটা হবে অর্থের বিনিময়ে। হ্যাঁ হকাররাও বিক্রি করবে। কিন্তু সেটার জন্য ভালো একটা শৃঙ্খলাও তো থাকা দরকার এবং হকারদের কাছের খাবারগুলো নিরাপদ স্বাস্থ্যকর কিনা সেটাও দেখা দরকার। রেলের জানালাগুলো অনেকটাই নষ্ট। শীতের দিনে আমার সেদিনের রেল ভ্রমণে অনেক কষ্ট হয়েছে। রেল ছাড়ার পর রেলের জানালা দিয়ে গাঁজার ঘ্রাণ এলো।
সব রেলপথ, রেলের জমি সম্পত্তিগুলো যেন অরক্ষিত। বুঝতে কষ্ট হয় যেকোনো স্বাধীন দেশের সরকারি সম্পদ এভাবে নষ্ট হতে পারে কি না। রেলের জমিগুলো থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে জনগণের সেবায় কি কিছু করা যায় না? সেখানে ভূমিহীনদের জন্য, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য কল্যাণকর কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব। সম্প্রতি রেল কর্তৃপক্ষ রেলের জমিতে কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ব্যবস্থা নিয়েছে। সেখানে একটি ফাইভস্টার হোটেলও নির্মাণ হবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে ফাইভস্টার হোটেল এতবড় জনসংখ্যার দেশের কতজনের উপকার হবে?
সম্প্রতি দেখা গেল রেলপথে বাঁশ দেয়া হয়েছে লোহার পরিবর্তে। এটা কি নতুন আবিষ্কার! না দুর্নীতি? ব্রিটিশ শাসকরা রেলপথ রেখে গেছেন। এরপর পাকিস্তান ২৩ বছর রেল চালিয়েছেন। এরপর ৪৬ বছর পর হয়ে গেল। এখন অঙ্ক করে দেখা দরকার ব্রিটিশ, পাকিস্তানিদের তুলনায় আমরা কতদূর এগিয়েছি? রেলগাড়ির ভিআইপি সিট নিয়ে হয় চরম অব্যবস্থাপনা। ভিআইপির কোনো শেষ নেই। সেখানে ভিআইপির মহা যন্ত্রণা। আমার এক পরিচিত শুভাকাক্সক্ষী তার সন্তান সম্ভবা স্ত্রীকে নিয়ে ট্রেনে সিলেট যাচ্ছিলেন শ্বশুড়বাড়িতে। তিনি কেবিন ভাড়া নিয়েছিলেন। তার কাছে ছিল বৈধ টিকিট। কিন্তু হঠাৎ একজন লোক উঠে আমার ওই শুভাকাক্সক্ষীকে ধমক দেয়া শুরু করলেন। তিনি একজন আইনপ্রণেতা। তিনি সিলেটের একজন সংসদ সদস্য। তিনি আমার ওই শুভাকাক্সক্ষীকে বললেন, আমি কে চিনেন? আমি অমুক এমপি! কত বড় লজ্জার বিষয়। একজন আইনপ্রণেতা হয়ে সাধারণ একজন মানুষকে তার বৈধ সিট থেকে থমক দিয়ে তিনি উঠিয়ে দিলেন। অবশ্য তিনিও কথায় ছাড়েননি। তিনি বলেছিলেন, ‘আপনি এমপি হয়েছেন তো কী হয়েছে’। কিন্তু তাতে কী আর হলো। বেচারা তার অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে সিট ছাড়তে বাধ্য হলেন। একবার একজন সংসদ সদস্য স্টেশন মাস্টারকে গালে থাপ্পর মেরেছিলেন ভিআইপি কেবিন না দিতে পারায়। সেটা মিডিয়ায় প্রচার হয়েছিল।
আমাদের বর্তমান রেলমন্ত্রী বৃদ্ধ বয়সে সুন্দরী তরুণী, শিক্ষিত নারী দেখে বিয়ে করেছেন। তিনি কী চান না রেলব্যবস্থাটাও সুন্দর হোক, ডিজিটাল হোক? তাহলে কেন এত বাজে পরিস্থিতি, বাজে পরিবেশ, শৃঙ্খলাহীন? কালো বিড়াল না হয় বহু আকাম-কুকাম করে গেছেন, এখন কেন এ অবস্থা? রেলের টিকিট কেন ইংরেজিতে? ইংরেজি আন্তর্জাতিক ভাষা, সেটা থাকতেই পারে।
আমাদের সরকারি পরিবহন বাংলাদেশ বিমান, বিআইডব্লিউটিসি, বিআরটিসি প্রায় সবাই নাকি শুধু লোকসান করছে। কিন্তু কেন? আমি সরকারি এসব পরিবহনে ভ্রমণ করেছি। সব জায়গায়ই শুধু অনিয়ম দেখেছি। বাজে পরিবেশ দেখেছি। কিন্তু এমন তো আমরা আশা করিনি। আমাদের স্বাধীনতা তো এ জন্য আসেনি। আমরা মুখে মুখে প্রচুর সংখ্যায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা উচ্চৈঃস্বরে বলে থাকি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় কি এই অনিয়ম দুর্নীতি থাকার কথা? কাদের হাতে এই সরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়দায়িত্ব? স্বাধীন বাংলাদেশের কোন নাগরিকের হাতে? না পাকিস্তানি বা ভারতীয়দের হাতে?

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫