কবি নজরুলের ত্রিশাল

মো. জাভেদ হাকিম

বাইকে চড়ে বিয়ের দাওয়াতে গিয়েছিলাম নেত্রকোনা। পথে পড়েছিল কবি নজরুলের ত্রিশাল। বহুবার এ পথে গেছি কিন্তু একদা কবির জায়গীর থাকা বিচুতিয়া বেপারী বাড়িতে ঢুঁ মারা হয়নি। তাই এবার আর সুযোগ হাতছাড়া করিনি। ত্রিশালে কবি কাজী নজরুল ইসলাম ডাকবাংলো থেকে একটু এগিয়ে কাজী নজরুল কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক ধরে আগাতে থাকি। অবশেষে পেয়ে যাই নামাপাড়া গ্রামের বিচুতিয়া বেপারীবাড়ি। বাড়ির প্রবেশ মুখেই চির নিদ্রায় শায়িত আছেন মরহুম বিচুতিয়া বেপারী। সরকারি ব্যবস্থাপনায় বর্তমানে বাড়িটি নজরুল স্মৃতিকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। ২০০৮ সালের ২৫ আগস্ট তৎকালীন সরকারের উপদেষ্টা বেগম রাশেদা কে চৌধুরী কেন্দ্রটি উদ্বোধন করেছিলেন। নজরুলপ্রেমিক ও সাধারণ দর্শনার্থীরা স্মৃতিকেন্দ্রের তৃতীয়তলায় অবস্থিত গ্যালারিতে প্রদর্শিত কবির ব্যবহৃত তৈজসপত্র ও তার লেখা বিভিন্ন গল্প-কবিতার বই নেড়েচেড়ে পড়ে বেশ আপ্লুত হন। বিশেষ করে দেয়ালে টাঙানো সংরক্ষিত কবির বিভিন্ন কবিতার লাইনগুলো পড়ে দর্শনার্থীরা বেশ উজ্জীবিত হন। দর্শনার্থী খাতায় মন্তব্য করতে গিতে আমি কবিকে উদ্দেশ করে কয়েক লাইন কবিতাও লিখে ফেলছিলাম।
দ্বিতীয়তলায় অফিস কক্ষ ও তথ্যকেন্দ্র এবং নিচতলায় অডিটরিয়াম। পুরো স্মৃতিকেন্দ্রটি সবুজে ঘেরা। রয়েছে ঘাটলা বাঁধা পুকুর, ফুটে থাকা বিভিন্ন ফুলের সুবাস। কবি ছনের তৈরি যে ঘরটিতে থাকতেন ঠিক সে জায়গাতেই এখন বেলকনিসহ সুদৃশ্য একটি টিনের ঘর করা হয়েছে। সপ্তাহে এক দিন সেই ঘরে শিশুদের নজরুলসঙ্গীত চর্চা করানো হয়। বিচুতিয়াবাড়ি তথা নজরুল স্মৃতিকেন্দ্রটির বিশাল আঙিনায় হরেক জাতের গাছের ছায়া আপনাকে বেশ পুলকিত করবে নিঃসন্দেহে।
এবার জেনে নেই কবির জীবনীর কিছুটা। আসানসোলের রুটির দোকানে সুশ্রী শান্ত স্বভাবের ভদ্র কিশোর নজরুলকে কাজ করতে দেখে ১৯১৪ সালে দারোগা কাজী রফিজ উল্লাহ ত্রিশাল নিয়ে আসেন। ভর্তি করিয়ে দেন দরিরামপুর উচ্চবিদ্যালয়ে। কবি এখানে সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করেন। বর্ষা মওসুমে দারোগাবাড়ি হতে স্কুলে আসা যাওয়ায় সমস্যা হওয়ায় কবি বিচুতিয়া বেপারী বাড়িতে জায়গীর থাকেন। বর্তমানে স্কুলটি নজরুল একাডেমি নামে পরিচিতি লাভ করেছে। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৮৯৯ সালের ২ মে আর মৃত্যুবরণ করেন ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, গীতিকার, সুরকার, নাট্যকার ও অভিনেতাসহ অনেক প্রতিভার অধিকারী। এর পরেও তার পরিচিতি একজন কবি হিসেবেই। দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠার পরেও তিনি কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি। কবি সবসময় জুলুম, নির্যাতনের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর ছিলেন। যে কারণে তাকে বিদ্রোহী কবি বলা হয়ে থাকে। তিনি আজীবন মজলুমের পক্ষে ছিলেন। কবিকে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ২৪ মে পুরো পরিবারসহ বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। তাকে দেয়া হয় জাতীয় কবির মর্যাদা। কবি নজরুল ইসলামের শেষ দিনগুলো কেটেছে চিকিৎসাধীন অবস্থায়। কবি মাত্র ৭৭ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
খোঁজখবর : সপ্তাহের দু’দিন শুক্র ও শনিবার বন্ধ থাকে। এ ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে।
যোগাযোগ : ঢাকা মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে ময়মনসিংহগামী যেকোনো বাসে চড়ে ত্রিশাল যেতে হবে। সেখান থেকে অটোতে যাওয়া যাবে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.