ঢাকা, শুক্রবার,১৮ আগস্ট ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

মন পুড়ানো গল্প...

মাসুদ আনসারী

২০ মে ২০১৭,শনিবার, ১৪:৩৬


প্রিন্ট

২০১৩ সালের গল্প। রমজান মাসের মাঝামাঝি সময়। সপ্তম শ্রেণীতে আমি। মাত্র অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে।
আমার মায়ের একটা সঞ্চয়ী অ্যাকাউন্ট ছিল। ওই অ্যাকাউন্টে যা জমিয়েছিলেন হঠাৎ ফ্যামিলির একটা বড় সমস্যার কারণে প্রায় সব টাকাই তুলে নিয়েছিলেন। মাত্র অল্প ক’টা টাকা অ্যাকাউন্টে বাকি ছিল, যেটা আমি আপুর কাছ থেকে জানতে পারি। আর্থিক দৈন্যতার কারণে মা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আর টাকা অ্যাকাউন্টে জমা দিবেন না। এভাবে অনেকদিন কেটে গেলেও আম্মু ওই অ্যাকাউন্টের বাকি টাকাগুলো উঠানোর কথা ভুলেই গেয়েছিলেন মনে হচ্ছে!
তবে একদিন আপু থেকে এও জানতে পারলাম, অ্যাকাউন্টে তিন হাজার কী চার হাজার হবে আছে। আমি আপুর কাছ থেকে শোনার পর আর স্থির থাকতে পারলাম না। তখন আমার টাকার প্রতি অনেক দুর্বলতা ছিল। আসলে ছোটবেলায় এরকম সবারই থাকে! এরপর ছোট অঙ্কের টাকা, ছোটবেলায় ছোট অঙ্কের টাকায় ছোটদের কিছু ভাগ পাওয়া যায়! তারপর টাকাগুলো উঠানোর জন্য মাকে অনেকবার বললেও তার কাছ থেকে কোনো সাড়া পেলাম না। উনি আমার কথা শুনতেই চাচ্ছেন না, কাজেই ডুবে থাকেন সবসময়।
রমজানে ফ্যামিলির কাজকর্মে তেমন ঝামেলা না থাকায় মা রাজি হলেন ব্যাংকে যাবেন। তিনি তো আর একা যেতে পারবেন না। বাজার এবং ব্যাংক তিনি চিনেনও না। কিভাবে টাকা তুলতে হবে এও জানেন না। তখন আমি আমার মায়ের খুঁটি হয়ে নিজেকে আবিষ্কার করি।
অবশেষে আম্মুকে নিয়ে রমজানের ঠিক দুপুরবেলায় রিকশা করে ব্যাংকে গেলাম। ব্যাংকে প্রচুর ভিড়। মানুষের ঈদের কেনাকাটা এবং ব্যবসায় বাণিজ্য ইত্যাদির কারণে ব্যাংকে রমজানে একটু ঝামেলা বেশিই থাকে। আমি পিয়নের কাছে কোনো ডেস্কে টাকা তুলব জানতে চাইলে তিনি আমাকে একজন ভদ্র লোকের ডেস্ক দেখিয়ে দেন। ভদ্র লোকটার দেহ গড়নও আলহামদুলিল্লাহ্, তার ডেস্কের সামনে ভিড় একটু বেশি। তাই আমরা মা-ছেলে সবার শেষের অপেক্ষায় বসে থাকলাম।
প্রায় অনেকক্ষণ পর ভদ্র ব্যাংক কর্মকর্তার ডেস্কের ভিড় একেবারেই শেষ। তখন আমি আর মা তার ডেস্কের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমি ঠিক এর আগে ব্যাংকে না যাওয়ায় কেমন জানি বিব্রতবোধ করছিলাম। তার পরেও সাহস নিয়ে ভদ্র লোকটাকে আমাদের অ্যাকাউন্ট সম্পর্কে বিস্তারিত ইনফো দিলাম। তিনি আমাদের মা-ছেলেকে দেখে কেমন জানি বিরক্তি ভাব দেখাচ্ছেন। কেন বিরক্ত দেখাচ্ছেন আমি বুঝতে দেরি করিনি। একটা বয়স্ক মহিলা, তার সাথে ছোট একটা ছেলে, এ ছাড়া অ্যাকাউন্টে টাকাও একদম কম। তার মুখের ভাষ্য যেন, আমাদের মতো নিচু লোকদের ব্যাংকের পরিবেশে মানাচ্ছে না যেটা বুঝতে পারলাম! তিনি আমাদের সাথে উচ্চৈঃস্বরেও কথা বলছেন। তার পরেও আমার মন খারাপ হয়নি!
এখন সব ফাইনাল, মায়ের একটা স্বাক্ষর দরকার। তখন আমি বললাম, স্যার, মায়ের হাত ধরে আমি স্বাক্ষরটা করে দেই? আম্মু তো স্বাক্ষর দিতে পারেন না। মাও আমার সাথে গলা নাড়ালেন। তারপর ভদ্র লোকটা আমার মাকে বিশ্রী ভাষায় যা বলেছে, যে বাক্যগুলো আজো আমার কানে লাগে। পুরো শরীরে শিহরণ জাগায়। নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারি না। আমার সামনে আমার মাকে এরকম অপমান আর কেউ করেনি। এই বাক্যগুলো এখনো আমাকে অনেক অনেক কষ্ট দেয়, এই কথা মনে পড়লেই চোখে পানি ভাসে। একজন মানুষ এত খারাপ কিভাবে হয়!
‘ভদ্র ব্যাংক কর্মকর্তার একটা বাক্য এরকম ছিল...
নাম লিখতে পারে না, ব্যাংকে টাকা তুলতে আসছে। একটু লজ্জা করে না? যান বাসায় গিয়ে নিজের নাম শিখে আসেন। তারপর টাকা তুলতে পারবেন।’
মা এ কথাগুলো শোনার পর স্বাভাবিকই থাকলেন। চোখে-মুখে কোনো লজ্জা নেই। যেটা আমি পারি না, সেটা নিয়ে এভাবে কথা শোনায় তিনি স্বাভাবিকভাবেই বিষয়টা নিলেন। তবে আমি সন্তান হিসেবে তো স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিতে পারলাম না। এই ঘটনাটা আমাকে আজীবন পুড়িয়ে মারবে, আজীবন। আজ এত বছরও পুড়াচ্ছে। স্মৃতির অবয়ব থেকে মুছতেও পারি না।
তখন আমার মনে হয়েছিল লোকটারে কিছু বলতাম। তবে ছোট এবং ব্যাংকে প্রথম আসা এজন্যই কিছু বলতে পারিনি। তবে সাথে সাথে মাকে বলেছিলাম, মা। টাকা আমাদের লাগবে না বাড়ি চলো। তোমার আত্মসম্মান অনেক বেশি। মা আমাকে একটু ধমক দিয়ে বললেন, টাকা যখন নিতে আসছি, নিয়েই যাবো। এরপর আমাদের মা-ছেলের এই অবস্থা দেখে ভদ্র লোকটা একটা কাগজ বাড়িয়ে দিয়ে বলেন, এই যে এখানে একটা টিপসই দেন। মায়ের টিপসই দেয়ার পর টাকা হাতে নিয়ে আমি-মা ব্যাংক থেকে বেরিয়ে গেলাম। তখন আমার কাছে এত কষ্ট লাগছিল তা ভাষায় প্রকাশ অসম্ভব। ছেলের কাছে মায়ের আত্মসম্মান এভাবে মাটিয়ে দিবে, কত কষ্টের, কত ব্যথার...! এ ছাড়া নিজেকেও অপরাধী মনে হচ্ছিল। আমার এতদিন জোরজবরদস্তির কারণেই মা ব্যাংকে টাকাগুলো তুলতে আসছিলেন। না হয় আসাও হতো না, আমার মাকে এরকম কথা শুনতেও হতো না।
আমার মা সহজ সরল মানুষ। তাদের সময়ে মেয়েদের পড়ালেখার রেওয়াজ ছিল না। পারিবারিকভাবে যা শিখনো হতো এতটুকুই। এ ছাড়া এই শিখা আর কতকাল মনে রাখতে পারে? আমার মায়ের বয়সও অনেক। আমি মায়ের শেষ বয়সের সন্তান। আমার পাঁচ ভাই, দুই বোন। মায়ের বয়সও হবে ৬০ বা তার কাছাকাছি কিংবা একটু বেশি। পুরো শরীরে বৃদ্ধ বয়সের চাপ। এই বয়সে নিজের নাম লিখতে না পারা কি অপরাধ?
আমার মা নিজে অশিক্ষিত হয়েও তো আমাদের ভাইবোন একটাকেও অশিক্ষিত বানাননি! বাবা অসুস্থ হয়ে যাওয়ার পর পরিবারে এত কষ্টের মাঝেও তিনি আমাদের সবাইকে শিক্ষিত বানিয়েছেন। আমরা ভাইবোন একটাও অশিক্ষিত নয়। সবাই তো অন্তত নিজের নাম লিখতে পারি এখন! এবং মায়ের ছোট ছেলেও মাকে নিজের নাম শিখিয়ে দিতে পেরেছে। মা এখন নিজের নাম লিখতে পারেন। বাংলা পড়তে পারেন। এখন আমার মাও শিক্ষিত। আমার কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিক্ষিত আমার মা। আমার মা একটা পাঠশালা, এই পাঠশালায় মৃত্যু আগ পর্যন্ত আমি ছাত্র হয়ে থাকতে চাই।
দাগনভূঞা, ফেনী

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫