ঢাকা, বুধবার,২২ নভেম্বর ২০১৭

শেষের পাতা

অপহরণের ২৭ ঘণ্টা পর মায়ের কোলে ফিরল ছোট্ট শিন

নিজস্ব প্রতিবেদক

২০ মে ২০১৭,শনিবার, ০০:০০


প্রিন্ট
মায়ের কোলে ফিরেছে অপহৃত শিশু শিন :নয়া দিগন্ত

মায়ের কোলে ফিরেছে অপহৃত শিশু শিন :নয়া দিগন্ত

বাবা অফিসে। বাসায় মায়ের পাশে ঘুমাচ্ছে তিন মাসের ছোট্ট কিনারা রহমান শিন। মাও ফোনে কথা বলছিলেন এক স্বজনের সাথে। হঠাৎ বাসার দরজা নক করার শব্দ পেয়ে দরজা খোলেন শিনের মা। দরজা খুলেই দেখলেন পরিচিত সেই ইলেকট্রিশিয়ান ছেলেটা। ঘরে বসতে দিয়ে নিজের কাজে ব্যস্ত ছিলেন শিনের মা। আর এই ফাঁকেই কন্যাশিশুটিকে নিয়ে সটকে পড়েন স্থানীয় ইলেকট্রিশিয়ান সুমন। সন্তান অপহরণের খবর শুনেই দ্রুত বাসায় আসেন বাবা। মায়ের আহাজারিতে ঘটনা জেনে যান পিতৃছায়া-মাতৃছায়া নামের সাত তলা ভবনটির বাসিন্দারা। 
ঘণ্টা খানেক পড়ে মা রিতু ইসলাম মিতুর মোবাইলে ফোন আসে সুমনের। ফোনে সুমন জানায়, ‘আমি তোর মেয়েকে নিয়ে চলে এসেছি, তুই যদি তোর মেয়েকে ফেরৎ পেতে চাস তবে দুই লাখ রেডি রাখ। যখন বলব নিয়ে আসবি।’ র‌্যাব-পুলিশ কাউকে জানালে তোর মেয়েকে পাবি না বলে সুমন ফোন কেটে দেয়। গত ১৭ মে বুধবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে ঢাকার কেরানীগঞ্জের জিনজিরায় এ চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে। বুকের ধনকে কেড়ে নেয়ায় বাবা-মায়ের চোখে নেমে আসে অন্ধকার। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় বাবা-মা ও  অন্য স্বজনরা। শিশুটির বাবা মেডিক্যাল প্রমোশন অফিসার সাখাওয়াত হোসেন যান র‌্যাবের কাছে। অপরাধীকে ধরতে অভিযান শুরু করে র‌্যাব। অবশেষে অপহরণের ২৭ ঘণ্টা পর ৩ মাস বয়সের বুকের ধনকে ফিরে পেয়ে মা ও বাবা আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন। মাতৃক্রোড়ে তুলে দেয়ার পর শিশুটি জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে থাকেন। গতকাল এমন এক আবেগময় মুহূর্তের সৃষ্টি হয় কাওরান বাজার র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে। 
মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব ১০-এর কমান্ডিং অফিসার জাহাঙ্গীর হোসাইন মাতাব্বর জানান, অপহরণকারী সুমন টিভি-ফ্রিজ মেরামতের কাজ করে। কেরানীগঞ্জের জিনজিরায় তার একটি দোকান আছে। সেই সূত্রে জিনজিরার মেডিক্যাল প্রমোশন অফিসার সাখাওয়াত হোসেন ও তার পরিবারের সঙ্গে পরিচয়। ১৭ মে সন্ধ্যা ৭টার দিকে সাখাওয়াতের বাসায় যায় সুমন। সেখান থেকে শিশুটিকে অপহরণ করে। এর ঘণ্টা খানেক পড়ে মুক্তিপণ চেয়ে ফোন করে সুমন। রাত ১১টার দিকে সুমন আবার ফোন করে তাড়াতাড়ি টাকার ব্যবস্থা করতে বলে। পরের দিন বৃহস্পতিবার সকাল পৌনে ৯টার দিকে আবার ফোন করে শিন সুস্থ আছে জানিয়ে কখন কোথায় টাকা নিয়ে আসতে হবে জানায়। একই সঙ্গে পুলিশকে জানালে মেয়েকে হারাতে হবে বলে হুমকি দেয় সুমন। এ দিকে কোনো উপায় না দেখে সাখাওয়াত হোসেন র‌্যাব-১০ কে বিষয়টি জানায়। অভিযোগের পরিপ্রেেিত ওই দিনই অভিযান শুরু করে র‌্যাব। 
তিনি আরো বলেন, বৃহস্পতিবার দুপুরে র‌্যাব-১০ এর একটি টিম মুক্তিপণ পরিশোধের ফাঁদ পেতে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের গোলাম বাজার কাঁচাবাজারের লাকড়ি ঘরের কাছ থেকে অপহরণকারী সুমনকে গ্রেফতার করে। পরে জিজ্ঞাসাবাদে অপহরণের কথা স্বীকার করে সুমন। এরপর বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে গোলাম বাজারের হাবিব কলোনির গলিতে হাবিব মিয়ার দোতলা বাড়ির দ্বিতীয় তলার ভাড়াটিয়া আব্দুল হক নলীর বাসা থেকে শিনকে উদ্ধার করা হয়। শিশুটির শরীরে জ্বর আসায় সারাক্ষণই কান্নাকাটি করছিল। ফলে ওই রাতেই শিশুটিকে বাবা-মার কাছে ফেরত দেয়া হয়। 
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে শিশুটির মা রিতু ইসলাম মিতু বলেন, সাত-আট মাস আগে সুমন নামে এক মিস্ত্রি বাড়ির টিভি ও ফ্রিজ মেরামত করে দেয়ার সূত্র ধরে তার সঙ্গে পরিচয়। এর পর থেকে বাসার ইলেকট্রনিক সামগ্রীর সমস্যা হলে তাকে সংবাদ দেয়া হতো। বাসায় এসে সুমন মেরামত করে দিয়ে যেত। গত বুধবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে সুমন তার বাসায় আসে। দরজা খুলে দিতেই তাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘ভাবী কেমন আছেন? কোনো সমস্যা আছে কি না?’ কোনো সমস্যা নাই বলে তিনি ড্রইং রুমে বসতে দেন। এ সময় কোলের শিনকে ড্রইং রুমের খাটের ওপর রেখে পাশের কক্ষে সন্তানের কাপড় আনতে যান। ফিরে এসে দেখেন মাঝের রুমের ছিটকিনি বাইর থেকে আঁটকানো। তিনি দরজা খোলার কথা বললে পাশের রুম থেকে কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে চিৎকার করে কাঁদতে থাকেন। পাশের ফ্যাট থেকে হেমা নামের এক মহিলা এসে দরজার ছিটকিনি খুলে দেন। পরে ড্রইং রুমে গিয়ে দেখেন খাটের ওপর শিন নেই। সুমনকে রুমে না পেয়ে তিনি চিৎকার করে বাড়ির বাইরে বের হয়ে কাউকে পাননি। 
এ দিকে খবর পেয়ে শিনের বাবা সাখাওয়াত হোসেন বাসায় আসেন। প্রায় এক ঘণ্টা পর শিনের মায়ের মোবাইল ফোনে সুমন ফোন করে দুই লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। বিষয়টি পুলিশ বা র‌্যাবকে জানালে শিনের লাশ তাদেরকে দেয়া হবেÑ এমন হুমকিও দেয়া হয়।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫