ঢাকা, সোমবার,২১ আগস্ট ২০১৭

মতামত

ভারতের প্রধান বিচারপতি ও তত্ত্বাবধায়ক ইস্যু

আব্দুর রহমান

১৯ মে ২০১৭,শুক্রবার, ১৯:৫৬


প্রিন্ট

একটি দৈনিক পত্রিকার ২২ মার্চ সংখ্যা থেকে জানা যায়, ক্ষমতাসীন বিজেপির নেতা সুব্রামনিয়াম স্বামীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ‘বাবরি মসজিদ-রাম মন্দির’ বিতর্ক আদালতের বাইরে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে মিটিয়ে ফেলার পরামর্শ দিয়েছেন। প্রধান বিচারপতি জে এম খেহর বলেছেন, ‘বিতর্কটি ভাবাবেগপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়। তাই আদালতের হস্তক্ষেপের আগে বিবদমান দুই পক্ষ নিজেদের মধ্যে আলোচনায় শান্তিপূর্ণভাবে এর মীমাংসা করুক। একান্তই মীমাংসা না হলে সর্বোচ্চ আদালত হস্তক্ষেপ করবে। দুই পক্ষ চাইলে সর্বোচ্চ আদালত মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ করতে পারেন। তিনিও মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা গ্রহণ করতে পারেন। তবে সে ক্ষেত্রে তিনি বিচারপতির দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। এতেও সমাধান না হলে আদালত রায় দেবেন।’ আমরা যত দূর জানি, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাওয়ের কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের কর্মীরা বর্তমান ক্ষমতাসীন বিজেপির তৎকালীন শীর্ষ নেতা এল কে আদভানির নেতৃত্বে ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। ২২ বছর পর ২০১৪ সালের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর ওই দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা সুব্রামনিয়াম স্বামী গুঁড়িয়ে দেয়া বাবরি মসজিদের জায়গায় রাম মন্দির নির্মাণে আইনি বাধা সর্বোচ্চ আদালতের মাধ্যমে দূর করতে চাওয়ায় ভারতের প্রধান বিচারপতি বিরোধটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের পরামর্শ দিয়েছেন।
অনেকেই ভাবতে পারেন, বাবরি মসজিদ-রাম মন্দির বিতর্কের সাথে আমাদের দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলে সাবেক প্রধান বিচারপতির রায়ের কী সম্পর্ক? তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বেশি লাভবান হয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। ক্ষমতাসীনেরা ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করতে না পারায় জনগণ অবাধে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে সরকার পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারত। এটা বাতিলেও সবচেয়ে লাভবান হয় আওয়ামী লীগ। কারণ বাংলাদেশে ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করতে পারলে ক্ষমতাসীনদের পরাজয়ের আশঙ্কা শূন্য শতাংশ। এটা প্রমাণিত হয়েছে ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে দুই বছর বয়সী জাতীয় পার্টির কাছে ৩৭ বছর বয়সী আওয়ামী লীগের পরাজয়ে।
বাবরি মসজিদ বিজেপির নেতাকর্মীরা ১৯৯২ সালে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল এবং রাম মন্দির তারাই নির্মাণের লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল। অনুরূপভাবে ১৯৯৪ সালে একটি উপনির্বাচনে বিএনপি সরকারের কারচুপিকে পুঁজি করে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বর্তমান ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় জোট, জামায়াতসহ কয়েকটি দলের ১৪৭ জন এমপি ওই বছরেই পদত্যাগ করেছিলেন। ‘অসাংবিধানিক’ দাবিতে তাদের ওই পদত্যাগপত্র তৎকালীন স্পিকার গ্রহণ না করায় তারা সুপ্রিম কোর্টে রিট করলে সর্বোচ্চ আদালত ‘পদত্যাগের অধিকার এমপিদের মৌলিক অধিকার বিধায় তা খর্ব করা যায় না’, এ যুক্তিতে রিটকারীদের পক্ষে রায় দেন। মার্চ ১৯৯৪-৯৬ পর্যন্ত ১৭৬ দিন হরতাল, ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ থেকে ২০ মার্চ ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত অবরোধ-অসহযোগ আন্দোলন সর্বোপরি তৎকালীন সচিব মহিউদ্দিন খান আলমগীরের নেতৃত্বে সরকারি কর্মচারীদের বিদ্রোহ ঘোষণা এবং মেয়র হানিফ প্রতিষ্ঠিত ‘জনতার মঞ্চ’ চালু করার মাধ্যমে প্রশাসন ও দেশ অচল করে দেয়া হয়। এরপর ৫ ’৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জয়ী বিএনপিকে সংসদে ত্রয়োদশ সংশোধনী পাস করে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠানের বিধান করে। এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ১২ জুন ১৯৯৬-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ+জাপা+জাসদ (রব) জোট সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জয়ী হয়। তবে ২০০১ সালের ১ অক্টোবর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তাদের শোচনীয় পরাজয়ের দায় চাপানো হয় রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ, প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি লতিফুর রহমান এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবু সাঈদের ওপর। এর জেরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়। চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে ২০০৪ সালে ওই রিটের শুনানি শেষে হাইকোর্ট খারিজ করে দেন। রিটকারী সুপ্রিম কোর্টে আপিল করার পর মৃত্যুবরণ করলে আরেকজন আইনজীবী এতে পক্ষভুক্ত হয়ে আপিল ‘জীবন্ত’ রাখেন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ওই আপিলকারীকে হাইকোর্টে বিচারপতি নিয়োগ করলে তার স্থলে তৃতীয় একজন আপিলে পক্ষভূক্ত হন ২০১১ সালে প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক তার অবসরের যাওয়ার ১০ দিন আগে এবং ২০১৪ সালের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের ৩৩ মাস আগে এ আপিলের শুনানি করেন। তার নিযুক্ত ১০ জন অ্যামিকাস কিউরির ৯ জনের মতামতকেই গুরুত্ব না দিয়ে নিজেদের কাস্টিং ভোটের (৪-৩) রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক বলে ঘোষণা করেন। ফলে ১৯৯৬ সালে নিষ্পত্তিকৃত একটি রাজনৈতিক বিরোধ পুনরুজ্জীবিত হওয়ায় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি জাতীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে সব স্থানীয় নির্বাচনে জনগণ ভোটাধিকার হারায়। আর ১৪ দলীয় জোট ব্যতীত বাকি ২৮টি দল ওই নির্বাচন বর্জন করায় ১৫৪ জন এমপি বিনা ভোটে, বাকি ১৪৬ জন এমপি ‘গায়েবি’ ভোটে নির্বাচিত হলেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত দু’টি নির্বাচনেই অব্যবহিত আগে ক্ষমতাসীনেরা পরাজিত হয়েছিলেন। তারা ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করতে পারলে পরাজিত হতেন না। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৪৬টি আসনে জয়ী হয়ে জাপা ও জাসদের (রব) সাথে কোয়ালিশন সরকার গঠন করে এবং বিএনপি ১১৬টি আসন পেয়ে বিরোধী দলে বসে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে বর্তমান ক্ষমতাসীনদের দীর্ঘ দিনের আন্দোলনে জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ক্ষমতাসীনদের নির্বাচনকালীন ক্ষমতার দাপট নিয়ন্ত্রণের জন্য এর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে জনগণ সমর্থন দিয়েছিল। তাই এ ক্ষেত্রে শুধু ক্ষমতাসীনদের নির্বাচনকালীন সরকারে থাকার বিষয় বিবেচিত হতে পারে না। এখানে জনগণের ভোটদানের মৌলিক অধিকারের বিষয়টি সবার উপরে। জনগণের প্রশ্ন হচ্ছেÑ বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সৃষ্ট একটি স্পর্শকাতর বিষয় আদালতের বাইরে পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তির পরামর্শ দিয়ে নজির সৃষ্টি করতে করেছেন। তাহলে আমাদের দেশের সর্বোচ্চ আদালতের সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক দেশের জনগণের মৌলিক অধিকার-ভোটাধিকার নিশ্চিত করার বৃহত্তর স্বার্থে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলে রায় দেয়ার আগে নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা নিয়ে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মধ্যে ঐকমত্যে পৌঁছার পরামর্শ দিয়ে ইতিহাসের নজির কেন সৃষ্টি করতে পারলেন না? নিজেদের সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের পরাজয়ের রেকর্ড যেমন নেই, তেমনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের জয়ের রেকর্ডও নেই। এতে প্রমাণ হয়, বর্তমান ও অতীত সরকারগুলো নির্বাচনকালীন সরকার নিরপেক্ষভাবে পরিচালনার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেনি। এটা করলে নির্বাচনে পরাজয়ের মাধ্যমে ক্ষমতা হারানোর ঝুঁকি ছিল।
মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ফলে বর্তমান ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতায় থেকেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির এক তরফা নির্বাচনে এবং পরে স্থানীয় নির্বাচনে জনগণের অবাধে ভোটদানের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারেনি। তাই সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের রায়ের পর্যবেক্ষণ অনুসারে, একাদশ সংসদ নির্বাচন নিরপেক্ষ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করার জন্য দশম জাতীয় সংসদের সদস্যদের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি। তাহলে এ দশম সংসদ ইতিহাসে নজির হয়ে থাকবে। স্মর্তব্য, ’৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে গঠিত ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনকালীন নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান করে ইতিহাসে নজির সৃষ্টি করেছে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫