ঢাকা, মঙ্গলবার,১২ ডিসেম্বর ২০১৭

রাজশাহী

রাণীনগরে দড়ি তৈরি করে স্বাবলম্বী কয়েক হাজার পরিবার

কাজী আনিছুর রহমান, রাণীনগর (নওগাঁ)

১৯ মে ২০১৭,শুক্রবার, ১৪:২৬ | আপডেট: ১৯ মে ২০১৭,শুক্রবার, ১৪:৪১


প্রিন্ট

নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার পূর্ব বালুভরা গ্রামের বয়োঃজ্যেষ্ঠ সুফিয়া বেগম। এক সময় জীবিকা নির্বাহের জন্য মাঠি কাটা ও কৃষি কাজ করতেন। কষ্টে খেয়ে না খেয়ে স্বামী সন্তানদের নিয়ে দিন পার করতে হতে। গত ১৭ বছর থেকে সেই কষ্টটা লাঘব হয়েছে। ইটের আধাপাকা বাাড় করেছেন। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। সংসারে এসেছে সচ্ছলতা।

শুধু সুফিয়া নয়। ছাট কাপড় থেকে দড়ি তৈরিতে মঞ্জুয়ারা, পারভিন, সরভান, আছিয়া বেগম, সামাদ আলী, জবদুলসহ অনেকেই স্বাবলম্বী হয়েছেন। উপজেলার পূর্ব বালুভরা, উত্তর বালুভরা, দক্ষিন রাজাপুর বিষ্ণপুরসহ প্রায় ১৫টি গ্রামের কয়েক হাজার পরিবার এ দড়ির উপর নির্ভরশীল। আর এ দড়ি তৈরিতে তারা পেশা হিসাবে বেছে নিয়েছেন। এসব গ্রাম এখন দড়ি গ্রাম হিসাবে পরিচিত।

কাঠের পাল্লার সাথে বিয়ারিং ও লোহার রড যুক্ত করে দড়ি পাকালোর মেশিন তৈরি করা হয়। এটি খুবই সহজ একটি মেশিন। কাঠমিস্ত্রি দিয়ে তৈরি করা হয়। তার খুঁটি হিসাবে ৪-৫ ফুট উচ্চতার দুটি বাঁশ বা কাঠ ব্যবহৃত হয়। খরচও খুব অল্প।

জানা যায়, ১৯৯৮ সালে নওগাঁ সদর উপজেলার ইলশাবাড়িতে ছাট কাপড় থেকে দড়ি তৈরির কার্যক্রম শুরু হয়। আর এ দড়ি তৈরি তৈরির উপকরণ ছাট কাপড় চট্টগ্রাম থেকে স্থানীয় পাইকার নিয়ে আসেন। প্রতি কেজি ছাট কাপড় ৩০ থেকে ৫০ টাকা দাম। পাইকারদের কাছ থেকে দড়ি তৈরির কারিগররা এসে নিয়ে যান। দড়ি তৈরি করে কারিগররা হাটে-বাজারে খুচরা ও পাইকারি বিক্রি করেন।

এক মণ ছাট কাপড় থেকে দুই হাজার টাকার মতো দড়ি বিক্রি হয়। ৬, ৮, ১২ ও ১৬ হাত মাপের দড়ি তৈরি করা হয়। আর লাভ থাকে প্রায় ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা। প্রথমে ইলশাবাড়িতে তৈরি হলেও চাহিদা বাড়ায় এখন উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে তৈরি করা হয়। যারা এ পেশার সাথে সম্পৃক্ত তারা সবাই গরীব প্রকৃতির। ছাট কাপড় থেকে দড়ি তৈরি করতে দু’জন মানুষ লাগে। একজন মেশিন দিয়ে পাক দেন ও অপর জন ছাট কাপড়গুলো জোড়া দেন। সারা বছরই এ কাজ করা যায়।

ছাট কাপড় থেকে তৈরি দড়ি বেশী টিকসই। আর এ জন্য পানের বরজে বেশি ব্যবহার করা হয়। আর এ দড়ি পানিতে সহজেই পঁচা ও নষ্ট না হওয়ায় চাহিদাও বেশি। কয়েক বছর পর্যন্ত টেকসই থাকে। বিশেষ করে পাবনা, চাঁপাই নবাবগঞ্জ এবং রাজশাহী জেলায় পানের বরজে ব্যবহার হয়।

সুফিয়া বেগম বলেন, সংসারে অভাব থাকায় এক সময় নিজেই ইরি-বোরো লাগানোর কাজ করতাম। এক বেলা ভাত হলে অন্য বেলা উপোস থাকতে হতো। কাজ না করলে ভাত হতো না। বড় মেয়ে ফাতেমার বয়স যখন ১০ বছর তখন দড়ি তৈরির কাজ শিখে। এরপর কাঠমিস্ত্রি দিয়ে দড়ি পাকানোর একটা মেশিন তৈরি করে ইলশাবাড়ি থেকে ছাট কাপড় কিনে দড়ি তৈরি শুরু করে। পরের বছর বাড়ির গৃহকর্তা মারা যান। সংসারে চার মেয়েসহ পাঁচজন সদস্য। মা মেয়েসহ সবাই মিলে তখন দড়ি তৈরি শুরু করতাম।

তিনি আরো বলেন, দড়ি বিক্রি করে যখন লাভ আশা শুরু হয় তখন বেসরকারি সংস্থা থেকে টাকা ঋণ নেয়া হয়। আর লাভ থেকে ঋণ পরিশোধ করা হয়। এরপর দড়ির চাহিদা বেড়ে যায়। কাজও বেড়ে যায়। টাকা আয় হতে থাকে। নিজের উপার্জিত টাকা দিয়ে ৮-৯ বছর আগে চার শতাংশ জমির উপর আধাপাকা ইটের বাড়ি করা হয়। এত প্রায় আড়াই লাখ টাকার খরচ হয়। দড়ি তৈরি করে সংসারে ফিরে এসেছে সচ্ছলতা। দড়ি তৈরি করে মেয়েদের বিয়ে দিয়েছি। এখন আর মাঠে কৃষি কাজ করতে হয় না। আল্লাহর রহমতে ভালো আছি। মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার পর এখন প্রতিবেশিদের সাথে দড়ি তৈরির কাজ করি। যা লাভ থাকে তা অর্ধেক ভাগ করে নেয়া হয়।

একই গ্রামের গৃহবধূ পারভীন আক্তার বলেন, গত চার বছর থেকে দড়ি তৈরির কাজ করছেন। সংসারের কাজের পাশাপাশি এ কাজ করেন। এ থেকে বাড়তি অর্থ নিজের ও সংসারের কাজে ব্যয় করেন। আগে দাম ভালো ছিল। এখন দাম কিছুটা কমেছে। তমে মওসুমে দাম বৃদ্ধি পায়। এ হস্তশিল্পে সরকার থেকে ক্ষুদ্রঋণ দেওয়া হলে এর প্রসার আরো বৃদ্ধি পেত।

ছাট কাপড় ব্যবসায়ী (পাইকার) হাসু বলেন, ছাট কাপড় থেকে দড়ি তৈরি করে অনেকেই তাদের অভাব দূর করেছেন। কারিগররা বিভিন্ন গ্রাম থেকে ছোট কাপড় এসে নিয়ে যায়। আবার দড়ি তৈরি করে এখানে পাইকারিও দিয়ে যায়।

তিনি আরো বলেন, এটার সঙ্গে সম্পৃক্তদের সরকার থেকে ক্ষুদ্রঋণের ব্যবস্থা ও প্রশিক্ষণ দেয়া হলে এর প্রসার আরো বৃদ্ধি পাবে। এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়ন হবে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫