ঢাকা, বুধবার,২৪ মে ২০১৭

অন্যদিগন্ত

নিজ দেশের পরমাণু অস্ত্রের কথা ফাঁস করেন যে বিজ্ঞানী

১৯ মে ২০১৭,শুক্রবার, ০০:০০


প্রিন্ট
ভার্জিনিয়ার সেফ হাউজে স্ত্রীর সাথে তাইওয়ানি বিজ্ঞানী চ্যাং শিয়েন-ই : ফাইল ছবি

ভার্জিনিয়ার সেফ হাউজে স্ত্রীর সাথে তাইওয়ানি বিজ্ঞানী চ্যাং শিয়েন-ই : ফাইল ছবি

তাইওয়ান ১৯৮৮ সালে গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিল। কিন্তু দেশটির এক বিজ্ঞানী পালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ফাঁস করে দেন সে কথা। চ্যাং শিয়েন-ই নামের ওই বিজ্ঞানীকে পশ্চিমা বিশ্ব ‘শান্তিকামী’ হিসেবে দেখলেও নিজ দেশের কাছে তিনি একজন ‘বিশ্বাসঘাতক’। দীর্ঘ ২৯ বছর নিজের কাজ সম্পর্কে নীরব থাকলেও কিছু দিন আগে এক সাক্ষাৎকারে এ বিষয়ে কথা বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী ৭৩ বছর বয়সী চ্যাং।
গত শতাব্দীর আশির দশকে গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি শুরু করে তাইওয়ান। পরমাণু বিজ্ঞানী ও কর্নেল পদমর্যাদার সেনা কর্মকতা চ্যাং ছিলেন দেশটির পরমাণু গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উপপরিচালক। প্রত্যক্ষভাবে তিনি জড়িত ছিলেন ওই কর্মসূচির সাথে। গোপনে এই কর্মসূচি এগিয়ে চললেও যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ তা টের পেয়ে যায়। আশির দশকের শুরুতেই সিআইএ দলে ভেড়ায় চ্যাং শিয়েন-ইকে। দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় পরমাণু বিজ্ঞানী হিসেবে চ্যাংয়ের জন্য রাষ্ট্রীয় আর্থিক সুযোগ সুবিধাসহ সব কিছুই ছিল ঈর্ষণীয়। তারপরও তিনি কেন সিআইএর গুপ্তচর হিসেবে নাম লিখিয়েছেন সেটি একটি রহস্য। একপর্যায়ে সিআইএ তাকে প্ররোচিত করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে বিশ্বের কাছে পারমাণু কর্মসূচির কথা ফাঁস করে দিতে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পাওয়ার পর তিনি এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেন।
যেভাবে পালালেন
তাইওয়ানের সামরিক কর্মকর্তাদের রাষ্ট্রীয় অনুমতি ছাড়া বিদেশ ভ্রমণ নিষিদ্ধ। সিআইএর পরামর্শে চ্যাং প্রথমে তার স্ত্রী ও তিন সন্তানকে ছুটি কাটানোর অজুহাতে জাপান পাঠান। স্ত্রী বেটি চ্যাং কিছুই জানতেন না স্বামীর ডাবল এজেন্ট চরিত্র সম্পর্কে। তবে স্বামীর মুখে যুক্তরাষ্ট্রে একটি ভালো চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনার কথা শুনেছিলেন একবার। ১৯৮৮ সালের ৮ জানুয়ারি সন্তানদের নিয়ে টোকিওর ডিজনিল্যান্ডে বেড়াতে যান বেটি চ্যাং। ঠিক পরদিনই সিআইএর দেয়া নকল পাসপোর্টে দেশ ছাড়েন বিজ্ঞানী চ্যাং। অল্প কিছু নগদ অর্থ ও ব্যক্তিগত দু-একটি জিনিসপত্র ছাড়া কিছুই সাথে নেননি তিনি। সাক্ষাৎকারে চ্যাং বলেছেন, পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি সম্পর্কে কোনো প্রমাণ তার সাথে নেয়ার প্রয়োজন ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের হাতে সব প্রমাণই ছিল। তারা শুধু চেয়েছে একজন বিশ্বাসযোগ্য লোককে দিয়ে ঘটনাটি ফাঁস করাতে।
টোকিওতে অবস্থানরত বেটিং চ্যাং এক নারীর মাধ্যমে স্বামীর কাছ থেকে একটি চিঠি পান। এরপরই তিনি জানতে পারেন, তার স্বামী সিআইএর একজন গুপ্তচর, যিনি এরই মধ্যে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। চিঠিতে লেখা ছিল, ‘তোমরা জাপান থেকে কিছুতেই তাইওয়ানে ফিরবে না, তোমরা যুক্তরাষ্ট্র যাবে’। বেটি চ্যাং জানান, স্বামীর এমন চিঠি পেয়ে তিনি যেন আকাশ থেকে পড়েন। আর কখনো মাতভূমি তাইওয়ান ফিরতে পারবেন না জেনে কেঁদে ফেলেন। পরিবারটিকে যুক্তরাষ্ট্রের শিয়াটেলগামী বিমানে তুলে দেয়া হয় টোকিও থেকে। শি য়াটেল বিমানবন্দরে তাদের স্বাগত জানান চ্যাং।
বিজ্ঞানী চ্যাং ও তার পরিবারকে কঠোর নিরাপত্তায় ভার্জিনিয়ার একটি বাড়িতে রাখা হয়। তাইওয়ানের এজেন্টরা তাদের হত্যা করতে পারে এমন শঙ্কা ছিল সিআইএর। সংগৃহীত প্রমাণ ও চ্যাংয়ের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে এক মাসের মধ্যে তাইওয়ানকে পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধে চাপ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ধারণা করা হচ্ছে, আর মাত্র এক বা দুই বছরের মধ্যে তাইওয়ান তাদের প্রথম পারমাণবিক অস্ত্রটি প্রস্তুত করতে পারত।
চ্যাং কি বলেন
গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত হয় চ্যাংয়ের সাক্ষাৎকার ভিত্তিক একটি বই যার নাম ‘নিউকিয়ার! স্পাই? সিআইএ : রেকর্ড অব অ্যান ইন্টারভিও উইথ চ্যাং শিয়েন-ই’। সাক্ষাৎকারে চ্যাং বলেন, ’৮৬ সালের সোভিয়েত ইউনিয়নের চেরনোবিলে ভয়াবহ পারমাণবিক দুর্ঘটনার পর তিনি ভাবতে শুরু করেন তার দেশের এমন মারণাস্ত্র প্রয়োজন আছে কি না। যুক্তরাষ্ট্র তাকে বুঝিয়েছে, ‘পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা দরকার শান্তির জন্য। এতে চীন, তাইওয়ান উভয়ই লাভবান হবে’। চ্যাংয়েরও আশঙ্কা ছিল, তাইওয়ান চীনের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা লাভের জন্য পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে। তাই পারমাণাবিক অস্ত্রের প্রতিযোগিতা ও ধ্বংসযজ্ঞ থেকে দেশকে রক্ষা করতে তিনি সঠিক কাজটিই করেছেন মনে করেন চ্যাং। দেশবাসী তাকে যে দৃষ্টিতেই দেখুক, তার কোনো অনুশোচনা নেই এ নিয়ে।
ওই ঘটনার পর তাইওয়ানের সামরিক বাহিনী চ্যাংকে পলাতক হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। দেশটির আইন অনুযায়ী ২০০০ সালে তার গ্রেফতারি পরোয়ানার মেয়াদ শেষ হলেও তিনি আর দেশে ফেরেননি। ভবিষ্যতেও আর ফেরার পরিকল্পনা নেই। ১৯৯০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আইদাহো অঙ্গরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন চ্যাং। সেখানকার একটি সরকারি গবেষণাগারে পরামর্শক বিজ্ঞানী হিসেবে যোগদান করে ২০১৩ সালে অবসরে যান। মৃত্যুর আগে বাবা-মাকে দেখতে না পাওয়া ছাড়া আর কোনো আফসোস নেই তার। দেশের বিষয়ে এই পরমাণু বিজ্ঞানী বলেন, ‘তাইওয়ানকে ভালোবাসার জন্য তাইওয়ানে থাকার দরকার নেই। আমি তাইওয়ানকে ভালোবাসি। আমি একজন চীনা, একজন তাইওয়ানি। তাইওয়ান প্রণালীর দুই পারের মানুষ পরস্পরকে হত্যা করুক তা দেখতে চাই না।
সূত্র : বিবিসি

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫