ঢাকা, রবিবার,২২ অক্টোবর ২০১৭

দিগন্ত সাহিত্য

জাতীয় কবি নজরুল

মোশাররফ হোসেন খান

১৯ মে ২০১৭,শুক্রবার, ০০:০০


প্রিন্ট
নজরুল কত বড় কবি ছিলেনÑ এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের জন্য নজরুলের বিপুল রচনাসম্ভারই যথেষ্ট। অজস্র লেখার ভেতর নজরুলের সে শক্তিমত্তার পরিচয় ভাস্বর হয়ে আছে। নজরুল সাহিত্যের তাত্ত্বিক আলোচনার জন্য বিজ্ঞ সমালোচক ও পণ্ডিত ব্যক্তিরা রয়েছেন। এখানে কেবল ল করার বিষয়, নজরুল এমন এক দুঃসময়ে ধূমকেতুর মতো উদয় হয়েছিলেন, সাহিত্য েেত্র যখন বাঙালি মুসলমান ছিল অনগ্রসর, পশ্চাদপদ এবং অসহায়। 
কাজী নজরুল ইসলাম কবি হিসেবে যত বড়, মানুষ হিসেবেও ততধিক উদার, মহৎ এবং তুলনারহিত। তাঁর হৃদয় ছিল সমুদ্রের মতো বিশাল। তিনি ছিলেন হিন্দু-মুসলমান মিলনের প্রথম এবং প্রধান প্রবক্তা। 
গাহি সাম্যের গান,
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান,
যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রীশ্চান।
গাহি সাম্যের গান।
বলে বিশ্ব সাম্য, ভ্রাতৃত্ব এবং উদার মানবিকতার জয়গানই গেয়েছেন। 
বিশ্বের মানুষকে তিনি একই পরিবারভুক্ত ভেবেছেন। নজরুলের এই উদার মানবিকতার মূল্য তিনি পাননি। কোনো কোনো েেত্র তাঁর এই চারিত্র্য নজরুলের দুর্বলতা বলে প্রতিপরা প্রকারান্তরে উপহাস করার প্রয়াস পেয়েছে। যদিও আপাতদৃষ্টিতে তাতে নজরুল এবং তাঁর জাতি কিছুটা হলেও তিগ্রস্ত হয়েছে, তবুও এটাই নজরুলের বৈশিষ্ট্য। তাঁর উদারতার উচ্চারণ দিয়ে প্রমাণ করেছেন, তিনি কোনো গোষ্ঠী, জাতি বা একক কোনো ধর্মের কবি নন। তিনি কবি সকল মানুষের। সমগ্র বিশ্বের। নজরুলের বিশেষত্ব এবং ব্যাপ্তি এখানেই। তাঁর কবিতা, গদ্য এবং গানের ভেতর তিনি নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন গোত্র, দেশ, মহাদেশের বাইরেও। 
কবিতা কিংবা গানে নজরুলের যে উচ্চকণ্ঠ ধ্বনিত হয়েছে, তা বিশ্ব সাহিত্যে খুব বিরল। নজরুলের প্রতিতুলনা কেবল নজরুলই। ‘বল বীর, বল উন্নত মম শির’Ñএ ধরনের বজ্রকণ্ঠ কোনো একটা দেশ বা কালের মধ্যে গণ্ডিবদ্ধ করা যায় না। এ আওয়াজ মহা দূরগামী, কালের অধিক। 
নজরুলের ভেতর ছিল বিশ্ব মানচিত্রের এক বিশাল ক্যানভাস। এর প্রমাণ পাওয়া যায় এলবার্ট হলে তাঁর প্রদত্ত সেই ভাষণে (১৯২৯)। যেখানে তিনি বলেছেন : 
‘যারা আমার নামে অভিযোগ করে তাঁদের মত হলুম না বলে, তাঁদেরকে অনুরোধ, আকাশের পাখীকে, বনের ফুলকে, গানের কবিকে তাঁরা যেন সকলের বলেই দেখেন। আমি এই দেশে এই সমাজে জন্মেছি বলেই শুধু এই দেশেরই এই সমাজেরই নই। আমি সকল দেশের সকল মানুষের।’
নজরুল ইসলামকে জাতীয় কবি হিসেবে বাংলাদেশ সরকার স্বীকৃতি দিয়েছে। যদিও একজন কবির জন্য সরকারি স্বীকৃতি-অস্বীকৃতিতে কিছুই যায় আসে না, তবু কথা থেকে যায়। নজরুল ইসলামকে জাতীয় কবির লিখিত স্বীকৃতি দিয়ে বাংলাদেশ সরকার যেন কবির জন্য সকল দায়িত্ব চূড়ান্তভাবে পালন করে ফেলেছে। কবি নজরুলকে জাতীয় কবির স্বীকৃতি দিলেও তাঁকে এখনো পর্যন্ত জাতীয় কবির মর্যাদা দেয়া হয়েছে কি? নজরুলকে জনমনে প্রতিষ্ঠিত করার কোনো উদ্যোগ কি তেমনভাবে নেয়া হয়েছে? হয়নি। জাতীয়পর্যায়ে নজরুলের জন্ম-মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা হচ্ছে। সেটা একটা আনুষ্ঠানিকতামাত্র। একটা উৎসব বা গ্রামীণ মেলা ছাড়া এসব আয়োজন ভিন্ন কোনো অর্থ বহন করে বলে মনে হয় না। কেননা সেখানে নজরুলের সৃষ্টিশীলতা, তাঁর মেধা ও মননের কোনো স্বার থাকে না। কোনো কোনো েেত্র প্রমাণিত হয়, স্বয়ং নজরুলই এসব অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত। 
কে না জানে, নজরুল ইসলাম তাঁর সাহিত্যজীবনের অধিকাংশই মুসলিম সমাজকে জাগানোর জন্য ব্যয় করেছেন। তিনি মানুষের হৃদয়ে যেভাবে নাড়া দিতে পেরেছিলেন তেমন করে আর কেউ কি পেরেছেন? তবু আমাদের দেশেই, তাঁর স্বজাতির কাছেই এই কবিসম্রাট কিছুটা উপেতি। 
কিন্তু কেন? কী তাঁর অপরাধ? 
যে নজরুল এত বড়। এত উদার ও মহান, আমাদের হীনম্মন্যতার জন্য তিনি অতীতেও যেমন ছিলেন অজানা, এখনো তেমনি রয়ে গেলেন। তিনি একটি জাতির আশা, আকাক্সা এবং স্বপ্নের কথা বলেছিলেন। তিনি আন্তর্জাতিকতার আকাশ ছুঁয়েছিলেন। এই মহান কবি, তিনি এই সমাজের, এই বিশ্বেরÑ অর্থাৎ আমাদেরই লোক।
কবি নজরুল ইসলাম আমাদের জন্য কেন এত প্রাসঙ্গিক! কেন এত অনিবার্য! প্রাসঙ্গিক এই জন্য যে, নজরুলের রচনাসমগ্র স্পর্শ করলেই আমরা যে আরামদায়ক গন্ধটা পাই, সেটা আমাদেরই শেকড় বা অস্তিত্বের ঘ্রাণ। আমাদের স্বপ্নে, সংগ্রামে, সংােভে, বিদ্রোহ কিংবা প্রেমের অনুষঙ্গে বিশ্বকবি নজরুল তাই এত প্রাসঙ্গিক, প্রতি মুহূর্তের জন্য তিনি তাই এত অনিবার্য। 
এই বিশ্বপরিমণ্ডলের কবিকে আমাদের জাতীয় সত্তার সাথে গ্রথিত করার দায়িত্ব এক দিকে যেমন এ দেশের সরকারের তেমনি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারেন এ দেশের কবি, সাহিত্যিক, গবেষক এবং বুদ্ধিজীবীরাও। 
করে যাচ্ছেন। এই সঙ্কটময় অবস্থার পরিবর্তন হওয়া একান্ত জরুরি। 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫