ঢাকা, সোমবার,১৮ ডিসেম্বর ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

সনদ বিতর্ক ও আলেম সমাজের কর্তব্য

এনামুল হক

১৯ মে ২০১৭,শুক্রবার, ০০:০০


প্রিন্ট
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে কিছু দিন আগে হাটহাজারী মাদরাসার মুহতামিম ও হেফাজতে ইসলামের প্রধান মাওলানা আহমদ শফীর নেতৃত্বে কওমি মাদরাসার একদল নেতৃস্থানীয় আলেমের গণভবনে সাক্ষাৎকার ঘটে। এ সাক্ষাতের ফলে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত আসে, যাতে কওমি মাদরাসাগুলো কর্তৃক প্রচলিত দাওরায়ে হাদিসকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্টগ্র্যাজুয়েটের মর্যাদাসম্পন্ন হিসেবে সরকারি স্বীকৃতিদানের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী। তদনুযায়ী সরকারি গেজেটও প্রকাশিত হয়েছে। বিষয়টি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বিধায়, এটা নিয়ে দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সংবাদমাধ্যমে আলোচনা-পর্যালোচনা হচ্ছে। সরকারের এ সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য যা-ই হোক না কেন, তা বহু দিনের প্রত্যাশিত এবং দেশের জন্য অত্যন্ত জরুরি বলেই স্বীকৃত। তাই প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ দিতেই হয়। কওমি মাদরাসার শেষপর্যায়ের কোর্স দাওরায়ে হাদিস ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কাছে সব সময়ই পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি হিসেবে স্বীকৃত ছিল। তবুও তার সরকারি স্বীকৃতি না থাকায় সমাজের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ ছিল সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় অপাঙ্ক্তেয়, যেন ভাসমান। তাই ধন্যবাদ। আশা করি, এ সিদ্ধান্তের ফলে এক অসহনীয় অবস্থা থেকে এসব মানুষ মুক্তির স্বাদ পাবে। বৃহত্তর সমাজের কার্যকর উন্নয়নে অংশগ্রহণকারী হিসেবে তাদের জন্য সম্মানিত জীবন ধারণের প্রবেশদ্বার উন্মোচিত হবে, তদুপরি বৃহত্তর সমাজ বর্তমানে দুর্নীতিগ্রস্ত, তারা পাবে একদল নীতি-নৈতিকতাবাহী ‘আল্লাহর সৈনিক’। কওমি মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থাটি ১৮৬৬ সালে মাওলানা কাশেম নানুতবী ও মাওলানা রশিদ আহমদ গাংগুহীসহ ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রচেষ্টায় উত্তর প্রদেশে দেওবন্দ-সাহারানপুরে প্রতিষ্ঠিত, যা ছিল সে যুগের রাজনৈতিক ও সামাজিক যুগসন্ধিক্ষণে মুসলমানদের আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থার অংশ। এ মাদরাসার পাঠ্যক্রম অনুযায়ী পরবর্তীকালে এ সময় পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশে অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কওমি মাদরাসা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত হচ্ছে। তৎকালীন প্রয়োজন মোতাবেক, সে সময়কার পাঠ্যক্রমে এককভাবে শুধু ধর্মীয় শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত ছিল না, বরং তা ছিল তখনকার দিনে প্রচলিত সব রকমের পাঠ্যক্রম যথাÑ মানতেক, হেকমত ইত্যাদিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ভারতীয় উপমহাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৪৭ সালে এসব মাদরাসার শিক্ষাক্রমে ব্যাপক সংশোধন, সংযোজন, বিয়োজন ও পরিবর্ধনের প্রয়োজন ছিল; কিন্তু হয়নি। অথচ এ দেশে রাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানের ক্ষেত্রে বিরাট পরিবর্তন ঘটে গেছে। এ দেশের সরকারগুলো এ মাদরাসা কর্তৃপক্ষ কওমি মাদরাসার শিক্ষাপদ্ধতিতে পর্যাপ্ত পরিবর্তনের প্রচেষ্টা চালায়নি। তাই এ শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষ সমাজে অপাঙ্ক্তেয় রয়ে গেছে। আগের মতো কর্মহীন শিক্ষা ও ধর্মহীন শিক্ষা-রয়ে গেল। দুটোই শিক্ষার আধুনিকায়ন বা উন্নয়ন না করে কর্তৃপক্ষ মাদরাসা শিক্ষার্থীদের অবহেলিত রেখে হীনম্মন্যতার দিকে ঠেলে দিতে কুণ্ঠাবোধ করেনি। শিক্ষার বিভিন্ন শাখার প্রতি অনীহা সৃষ্টি করে মাদরাসায় শিক্ষাপ্রাপ্তদের গতানুগতিক ধর্মীয় কাজ বা ুদ্র ুদ্র মাদরাসা সৃষ্টি করা ছাড়া আর কোনো উন্নত জীবন ধারণের ব্যবস্থায় প্রশিক্ষিত করা হয়নি। তবুও কওমি মাদরাসার ফারেগদের চাকরি প্রার্থীদের দীর্ঘ তালিকায় না থাকার ব্যাপারে গর্ব অনুভব করেন কেউ কেউ। শিক্ষাব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত, যা একজন মানুষের জন্য, দুনিয়া ও আখিরাতে সুখ ও শান্তি প্রাপ্তিতে সহায়ক হয়। এ জন্য আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের তার কাছে এভাবে প্রার্থনা করতে নির্দেশ দিয়েছেন : রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাহ, ওয়াফিল আখিরাতি হাসানাহ। হালাল রুজি আহরণ সবার জন্য ফরজ বা অবশ্যকর্তব্য হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। ইসলামি চিন্তাধারায় শিক্ষাব্যবস্থা হওয়া উচিত ‘মা ইয়ানফাউন্নাস’, যা মানুষের জন্য কল্যাণকর। অর্থাৎ দুনিয়াতে সম্মানের সাথে জীবন যাপন করা এবং আখিরাতে দুর্দশামুক্ত থাকা। তাই আল্লাহর নৈকট্যলাভের এবং পৃথিবীতে হালাল রুজির মাধ্যমে সমৃদ্ধ জীবনযাপন করতে হবে। তাই প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ইলম শিক্ষা বা জানার্জন ফরজ করা হয়েছে। তা পার্থিব হোক বা পারলৌকিক হোক সব জ্ঞানই আহরণ করতে হবে। তাই হাদিসে রাসূলে বলা হয়েছে, ‘আল হিকমাতু দাল্লাতুল মুমিন আখাজাহা মিন আইনা ও অজাহাদা’, অর্থাৎ জ্ঞান-বিজ্ঞান মুমিন বান্দাদের হারানো সম্পদ যার কাছে তা পাওয়া যায়, তার কাছ থেকে তা গ্রহণ করো। রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ইয়াদুল উলিয়া খায়রুন মিন ইয়াদু সুফলা। ওপরের হাত নিচের হাত থেকে বেশি আকাক্সিত। তাই দারিদ্র্য থেকে দূরে থাকতে মুসলমানদের বলা হয়েছেÑ কাদাল ফাকরু আল ইয়াকুনা কুফরান, দারিদ্র্য থেকে দূরে থাকো; দারিদ্র্য মানুষকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়।
কওমি মাদরাসার নেতৃস্থানীয় আলেমদের সম্মুখে যে সুযোগের দ্বার উন্মোচিত হয়েছে, শিগগিরই তার সুযোগ নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে মাদরাসার পাঠ্যক্রম সংস্কার ও পরিশুদ্ধ করার কার্যক্রম গ্রহণ করা উচিত। তাই তাদের উচিত আল্লাহর রশিকে শক্তভাবেও ধরে ঐক্যবদ্ধভাবে কর্মহীন শিক্ষাপদ্ধতিকে কর্মক্ষম শিক্ষাব্যবস্থায় রূপান্তরের পদক্ষেপ যেন নেয়। এ পদক্ষেপ নেয়া অতি সহজ। যেমনÑ কওমি মাদরাসার পাঠ্যক্রমে বেশ কিছু বিষয় ও পাঠ্যবই সময়োত্তীর্ণ ও অকার্যকর। উদাহরণস্বরূপ মানতেক হেকমত, কাফিয়া, শরহেজামি ইত্যাদির পরিবর্তে ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, ভূগোল, বিজ্ঞানের বিষয় বা অর্থনীতির ব্যবসায়-বাণিজ্য ইত্যাদি বিষয়ে পাঠ্যক্রম চালু করা উচিত। এসব আলিম কাস পর্যন্ত যার যার পছন্দমতো অনুসরণ করবে। পরে যে যার মতো ধর্মবিষয় বা আধুনিক জ্ঞানের বিশেষায়িত বিষয়গুলো অধ্যয়ন করতে পারবে। ১০০ নম্বরের একটি নীতিনৈতিকতার বিষয় পার্থিব জ্ঞানের অধ্যয়নকারীদের জন্য অবশ্যপঠনীয় করতে হবে। এরপর সবাইকে জীবনযুদ্ধে অবতরণে ‘ফানতাসেরু ফিল আরদি ওয়াবতাগু মিন ফাদলিল্লাহ’তে যোগ দেবে।
আলেম সমাজে ‘সালফে সালেহিন’-এর অনুকরণ ও অনুসরণের প্রবণতা দেখা যায়। এটা অনেক সময়ে কুরআনের শিক্ষার পরিপন্থী হতে পারে। সালফে সালেহিনদের আনুগত্য ততক্ষণ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে, যতক্ষণ পর্যন্ত তা মানুষের সমৃদ্ধি ও উন্নতির জন্য বাধা সৃষ্টি না করে। তারা তাদের সময়ের প্রয়োজনে কোনো কার্যক্রম নিয়েছিলেন। সে কার্যক্রম বর্তমান সমাজে কার্যকর নাও হতে পারে। এর প্রতি অন্ধ আনুগত্য ইসলামি শিক্ষার বিপরীত। তাই আল্লাহ তায়ালা আল কুরআনে পূর্বপুরুষদের অনুকরণ নিরুৎসাহিত করেছেন। নতুবা একদিন এমন অবস্থার সৃষ্টি হবে, যে জন্য হা-হুতাশ করেও পার পাওয়া যাবে না। তেমনটি হয়েছে আল-কুরআনের হস্তলিপিকারদের অবস্থা। তারা অতিমাত্রায় প্রিন্টিংয়ের বিরোধিতা করতে গিয়ে বর্তমানে বিলীয়মান অবস্থায়। বাস্তবধর্মী দু’পক্ষ লাভবান হবেন। কওমি শিক্ষার্থীরা সম্মানিত জীবনযাপনের অধিকার পাবে, আর দেশ পাবে নীতিনৈতিকতাবাহী অসংখ্য সৈনিক। 
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত স্কোয়াড্রন লিডার, 
বাংলাদেশ বিমানবাহিনী

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫