ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২৪ আগস্ট ২০১৭

ইসলামী দিগন্ত

শাবান রমজানের প্রস্তুতিপর্ব

মুহাম্মদ রুহুল আমিন

১৯ মে ২০১৭,শুক্রবার, ০০:০০


প্রিন্ট

শাবান শব্দটি আরবি শাব শব্দ থেকে উৎপন্ন। আভিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে যার অর্থ দল, গোত্র, বংশ, জাতি, শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত ইত্যাদি। শাবানকে এ নামে নামকরণের কারণ সম্পর্কে ইবনু হাজর আসকালানি উল্লেখ করেন, যেহেতু জাহেলি যুগে আরবরা এ মাসে গোত্রে গোত্রে বিভক্ত হয়ে পানি অন্বেষণ করত অথবা নিষিদ্ধ রজব মাস শেষ হওয়ার পর এ মাসে তারা যুদ্ধের ভয়ে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নিত, এ জন্য একে শাবান বলা হয়। (ফতহুল বারি) আরো বলা হয়, যেহেতু মাসটি দু’টি সম্মানিত ‘রজব’ ও ‘রমজান’ মাসের মধ্যবর্তী সময়ে উদিত হয় সেহেতু একে শাবান বলা হয়।
বছরের সেরা মাস পবিত্র রমজানের আগের মাস ও রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার মাস হিসেবে শাবানের গুরুত্ব অপরিসীম। রাসূল সা:, সাহাবি, তাবেই ও তাবে-তাবেইরা বিভিন্ন আমলে সালেহের মাধ্যমে এ মাসকে বরণ করে নিতেন। এটি মূলত পবিত্র রমজানে অধিক হারে কল্যাণকর্ম করার জন্য দৈহিক, মানসিক ও বস্তুতান্ত্রিক প্রস্তুতি গ্রহণের মাস। এ প্রস্তুতির ধরন বিভিন্ন হতে পারে। 
প্রথমত, বেশি বেশি রোজা রাখা : আয়েশা রা: থেকে বর্ণিতÑ তিনি বলেন, ‘রাসূল সা: রোজা রাখতেন এমনকি আমরা বলতাম, মনে হয় তিনি রোজা থেকে বিরত হবেন না; তিনি রোজা থেকে বিরতি দিতেন এমনকি আমরা বলতাম তিনি আর রোজা রাখবেন না। আমি রাসূল সা:-কে কখনো রমজান ছাড়া পুরো মাস রোজা রাখতে দেখিনি, আর শাবান মাসের মতো অন্য কোনো মাসে তাকে অধিক হারে রোজা রাখতে দেখিনি।’ (বুখারি ও মুসলিম)
ইবনু হাজের রা: বলেন, এ হাদিস থেকে প্রমাণিত হয়, রাসূল সা: অন্য মাসের চেয়ে এ মাসেই অধিক হারে নফল রোজা করতেন এবং এ মাসের বেশির ভাগ দিন তিনি রোজাদার হিসেবে অতিবাহিত করতেন। আয়েশা রা: থেকে বর্ণিতÑ তিনি বলেন, ‘রাসূল সা:-এর কাছে নফল রোজা রাখার জন্য অধিকতর প্রিয় মাস ছিল শাবান এবং তা রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দেয়া। (আবু দাউদ; আল্লামা আলবানি হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন) 
উসামা বিন জায়েদ রা: থেকে বর্ণিতÑ তিনি বলেন, ‘রাসূল সা: যখন রোজা রাখতেন তখন বিরামহীন রোজা রাখতেন, এমনকি বলা হতোÑ তিনি মনে হয় আর রোজা থেকে বিরতি নেবেন না। আবার যখন বিরতি দিতেন তখন সপ্তাহের দুই দিন ছাড়া রোজা রাখার কোনো সম্ভাবনা দেখা যেত না। শাবান মাসে যত রোজা রাখতেন, অন্য কোনো মাসে এত রোজা রাখতেন না। এ জন্য আমি জিজ্ঞাস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি যখন রোজা রাখা শুরু করেন তখন বিরতি দেয়ার কোনো সম্ভাবনা থাকে না, আর যদি বিরতি দেয়া শুরু করেন তবে সপ্তাহে দুই দিন ছাড়া অন্য কোনো রোজা রাখার সম্ভাবনা থাকে না। তিনি (রাসূল সা:) বললেন, কোন দুই দিন? আমি বললাম, সোমবার ও বৃহস্পতিবার। তিনি (রাসূল সা:) বললেন, ওই দুই দিন মানুষের আমল আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে উপস্থাপিত হয়; আর আমি চাই আমার আমল এমন অবস্থায় উপস্থাপিত হোক যে, আমি একজন রোজাদার। আমি বললাম, শাবান মাসে আপনি যে পরিমাণ রোজা রাখেন অন্য কোনো মাসে আপনাকে এত রোজা রাখতে দেখি না! তিনি (রাসূল সা:) বললেন, রজব ও রমজান মাসের মধ্যবর্তী ওই শাবান মাস সম্পর্কে লোকজন গাফেল থাকে অথচ ওই মাসে মানুষের আমল আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে উপস্থাপন করা হয়, আর আমি এটাই ভালোবাসি, আমার আমল এমন অবস্থায় উপস্থাপিত হোক যখন আমি রোজাদার। (আহমদ, নাসায়ি)
শাবান মাসের এক দিনের রোজা অন্য মাসের দুই দিনের রোজার সমান। ইমরান বিন হুসাইন রা: থেকে বর্ণিত আছে যে রাসূল সা: তাকে বা অন্য কাউকে বলেছেন, তুমি কি শাবানের গোপনভাগে (শেষে) রোজা রেখেছ? তিনি বললেন, না; তখন রাসূল সা: বললেন, যখন তুমি (রমজানের রোজা থেকে) ইফতার করবে তখন দুই দিন রোজা রেখে দেবে (বুখারি ও মুসলিম)। অন্য বর্ণনা অনুযায়ী রাসূল সা: শাবানের শেষ দিকে (কোনো কোনো বর্ণনায় মধ্যভাগ থেকে শেষের দিনগুলো) রোজা রাখতে নিষেধ করেছেন। আলেমরা উভয় বর্ণনার সমন্বয়সাধন করেছেন এভাবেÑ ১. রমজান শুরু হয়ে গেছে এমন সন্দেহে শাবানের শেষ দুই দিনে রোজা রাখা নিষিদ্ধ। ২. মানত, কাজা বা কাফফারার রোজা রাখা বেশির ভাগ ওলামায়ে কিরামের মতে বৈধ। ৩. যদি কেউ অভ্যাসগত কারণে মাসের শেষ দুই দিন রোজা রাখে তবে সেটি বৈধ।
শাবানের রোজার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি : আধুনিক বিজ্ঞান রাসূল সা: কর্তৃক শাবান মাসে অধিক পরিমাণ রোজা রাখার নির্দেশনা প্রদানের মূল রহস্য উদঘাটনে সম হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, রোজার প্রথম দিনগুলোতে আকস্মিক খাদ্য ও পানীয় থেকে বিরত থাকার ফলে তার শরীরে চর্বি, প্রোটিন জাতীয় রিজার্ভ ধ্বংস করতে পারে, যার ফলে শরীর তার উচ্ছিষ্ট বের করে দেয়ার আগে এটি রক্তে (এড্রিনালিন হরমোন) বায়ুর চাপ সৃষ্টি হতে পারে। ফলত রোজাদার তাৎণিকভাবে মাথা ধরা, কান্তি-অবসন্নতা, খিটখিটে মেজাজ, হঠাৎ রাগান্বিত হওয়া, গালমন্দ করা ইত্যাদি বিভিন্ন উপসর্গে আক্রান্ত হতে পারেন। এ অবস্থা তাকে কোনো কোনো সময় রোজা ছেড়ে দেয়ার উপক্রম করে ফেলে। কিন্তু যদি রক্তে হরমোনের অবস্থান স্বাভাবিক থাকে তখন রোজাদার এসব সমস্যা থেকে মুক্ত থাকে। এ জন্য শাবানের রোজা অনুশীলন হিসেবে কাজ করে। যারা শাবানে কয়েকটি রোজা রাখে তাদের জন্য রমজানের রোজাগুলো বিশেষ করে প্রথমপর্বের রোজাগুলো সহজ হয়ে যায়। আল্লামা ইবনু রজবসহ বিভিন্ন ওলামায়ে কিরাম তাই শাবানের রোজাকে রমজানের রোজার প্রশিণ হিসেবে নামকরণ করেছেন। 
দ্বিতীয়ত, কুরআন তিলাওয়াত ও ইসলামি পুস্তক অধ্যয়নের পরিমাণ বৃদ্ধি করা : সালামাহ বিন কুহাইল শাবানকে বলতেন কারিদের মাস। হাবিব বিন আবি সাবিত বলতেন, এটা কারিদের মাস। আমর বিন কায়েস আল মালাবি শাবান মাস আগমন করার সাথে সাথে তার ব্যবসায়িক পণ্যশালাগুলো বন্ধ করে দিতেন এবং সারা দিন কুরআন তিলাওয়াতে নিয়োজিত হতেন। 
তৃতীয়ত, বেশি বেশি ইস্তেগফার বা মাপ্রার্থনা করা : সহিহ হাদিসে আবু মুসা আশয়ারি রা: রাসূল সা: থেকে বর্ণনা করেনÑ তিনি বলেছেন, মহান আল্লাহ শাবানের মধ্যবর্তী রাতে তাঁর সৃষ্টির মুখোমুখি হন এবং মুশরেক (আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপনকারী) ও ঝগড়া-ফ্যাসাদকারী ব্যতীত সবাইকে মা করে দেন। (ইবনু মাজাহ, তিবরানি, ইবনু হাব্বান; আলবানি হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন।) অতএব নিজেকে এই দলভুক্ত করার জন্য বেশি বেশি ইস্তেগফার করা একান্ত কর্তব্য। 
চতুর্থ, দরুদ ও জিকর : এই শাবান মাসেই রাসূল সা:-এর ওপর দরুদ ও সালাম আদায় ওয়াজিব হয়। এজন্য এ মাসে বেশি বেশি দরুদ ও সালাম পাঠানো প্রয়োজন, যাতে করে আমরা তার শাফায়াতের হকদার হতে পারি, ‘কিয়ামতের দিন আমার (রাসূল সা:) সাথে থাকার সবচেয়ে বেশি হকদার হবে সেই ব্যক্তি যে আমার ওপর সবচেয়ে বেশি দরুদ পড়বে।’ (তিরমিজি) 
এ ছাড়া এ মাসে দৈনন্দিন দোয়ার সাথে সাথে বেশি বেশি ওই দোয়া পাঠ করা যেটি রাসূল সা: পড়তেন, ‘আল্লাহুম্মা বারিকলানা ফি রজব ও শাবান ওয়া বাল্লিগনা রমজানা।’ (হে আল্লাহ! রজব ও শাবান আমাদের জন্য বরকতময় করো এবং রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দাও।)
অতএব আমাদের উচিত এ মাসকে পবিত্র রমজানের প্রস্তুতিপর্ব হিসেবে গ্রহণ করে এ মাসে ব্যক্তিগত আমল বৃদ্ধি করা, যাতে রমজানের মূল্যবান সময়গুলো অপচয় না হয়। এজন্য আবু বকর বলখি রহ: বলতেন, ‘রজব বীজ বপনের মাস, শাবান পানি সেচের মাস এবং রমজান ফসল ঘরে তোলার মাস।’ তিনি আরো বলতেন, ‘রজব, শাবান ও রমজানের দৃষ্টান্ত যথাক্রমে বাতাস, মেঘ ও বৃষ্টির মতো। অতএব যে ব্যক্তি রজবে বীজ বপন করল না, শাবানে ফসলে পানি সেচ করল না, সে কী করে রমজানে ফসল ঘরে তোলার চিন্তা করে? রাসূল সা: ও তাঁর আহলের ওপর আল্লাহর অসীম রহমত বর্ষিত হোক।
লেখক : প্রভাষক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ
ক্যামব্রিয়ান কলেজ, ঢাকা

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫