ঢাকা, বৃহস্পতিবার,১৭ আগস্ট ২০১৭

ইসলামী দিগন্ত

বিয়েশাদির সেকাল-একাল

মাহমুদা ইয়াসমিন

১৯ মে ২০১৭,শুক্রবার, ০০:০০


প্রিন্ট
সেকাল মানে বিশ্বমানবতার মুক্তির সনদ হজরত মুহাম্মদ সা:-এর যুগে বিয়েশাদি কিভাবে হতো। আর যুগের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে কিংবা ডিজিটালের এখনকার যুগে কিভাবে হচ্ছে।
ইসলামে নারী ও পুরুষের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য বিয়েই একমাত্র বৈধ উপায়, একমাত্র বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা। বিয়ে ছাড়া অন্য কোনোভাবে নারী-পুরুষের মিলন ও সম্পর্ক স্থাপন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিয়ে হচ্ছে পুরুষ ও নারীর মাঝে সামাজিক পরিবেশে ও সমর্থনে শরিয়ত মোতাবেক অনুষ্ঠিত এমন এক সম্পর্ক স্থাপন, যার ফলে দু’জনে একত্রে বসবাস ও পরস্পরে দাম্পত্য সম্পর্ক ও সন্তান উৎপাদন সম্পূর্ণরূপে বৈধ হয়ে যায় এবং যার ফলে পরস্পরের ওপর অধিকার ও দায়িত্ব-কর্তব্য অবশ্য পালনীয় হয়ে দাঁড়ায়। রাসূলাল্লাহ সা: বলেন, ‘আল্লাহ’ দাম্পত্য সম্পর্ককে নৈকট্য ও আত্মীয়তার মাধ্যম হিসেবে নির্ধারণ করেছেন এবং এটাকে আবশ্যকীয় বিষয় করেছেন, যার কারণে আত্মীয়তার বন্ধন মজবুত হয়। সমগ্র মানব-মানবীর মধ্যে এ বিষয়ে আকর্ষণ ও অনুরাগকে সহজাত করেছেন এবং বংশের দ্বারা সম্মানিত করেছেন। এ প্রসঙ্গে সুমহান আল্লাহ বলেন, ‘তিনি সেই সত্তা যিনি অপবিত্র পানি হতে মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং বৈবাহিক সম্পর্ককে বংশ ও আত্মীয়তার অন্যতম মানদণ্ড নির্ধারণ করেছেন। আর আপনার প্রতিপালক প্রবল পরাক্রমশালী (সূরা ফোরকান ৫৪)।
ইসলামে বিয়ের শর্ত মূলত তিনটি। প্রথমত, ছেলে এবং মেয়ে দুইজন দুইজনকে অবশ্যই পছন্দ হতে হবে। সাী থাকবে দুইজন এবং মেয়েকে দেনমোহর দিতে হবে। ছেলের সামর্থ্য অনুযায়ী যে দেনমোহর দিতে সম তা মেয়ে যদি মেনে নেয় তাহলেই হবে ইসলামি মতে বিয়ে; কিন্তু আমরা যদি সমাজের দিকে তাকিয়ে দেখি তাহলে দেখতে পাই ইসলামি নিয়মের সম্পূর্ণ বিপরীত। আমাদের সমাজে একজন পাত্রের অভিভাবক কোরবানির হাটের গরুর মতো পাত্রের দাম হাঁকেন। যে যত দাম বেশি দেবে বিয়েটা শেষ পর্যন্ত সেখানেই হয়। এখানে অভিভাবকেরা পাত্রপাত্রীর পছন্দ-অপছন্দের মূল্যায়ন করে কম।
আর মেয়ের অভিভাবকেরা একটা মেয়েকে পার করার জন্য পাত্রপরে চাহিদা পূরণ করার জন্য সাধ্যের বাইরে চেষ্টা করেন, অনেক সময় দেখা যায় পাত্রপরে এই চাহিদা পূরণ করার জন্য জায়গাজমি, সহায়-সম্পত্তিও বিক্রি করতে হয়। তারপরও যদি শ্বশুরবাড়ির নির্যাতন থেকে নিস্তার পাওয়া যেত! নববধূর হাতের মেহেদির রঙ মুছতে-না-মুছতেই শুরু হয় নতুন উৎপীড়ন। প্রতিদিন যৌতুকের বলি হচ্ছেন হাজার হাজার নারী, কাউকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করা হচ্ছে। কতগুলো ঘটনা আমরা জানতে পারি আর কতগুলো ঘটনা আমাদের অজানাই থেকে যায়। আমরা যদি মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোর দিকে তাকাই তাহলে আমাদের উপমহাদেশের বিপরীত চিত্র দেখতে পাবো।
সেখানে পাত্রীর অভিভাবকেরা মোটা অঙ্কের দেনমোহর হাঁকেন, যা একজন পাত্রের সাধ্যের বাইরে। তাই সেখানে একজন ছেলে বিয়ে করার আগেই প্রায় প্রৌঢ়ত্বে পদার্পণ করেন, অনেকে বিয়েতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন, অনেকে তাদের চাহিদা পূরণ করতে হয় আরব উপমহাদেশের বাইরে গিয়ে অবৈধ উপায়ে। পাশ্চাত্য সমাজের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, সেখানে নারী-পুরুষেরা বিয়েকে একটা বোঝা হিসেবে মনে করে।
ওদের দর্শন হলো, অর্থ উপার্জন কর এবং যত পারো ভোগ কর। যতদিন যৌবন থাকে এই দর্শনে তারা বিশ্বাসী থাকে, পরে যখন জীবন বয়সের দিকে ঝুঁকতে থাকে এই দর্শনের প্রতি আস্থাও কমতে থাকে, লাখ লাখ নারী-পুরুষ পড়ে অনিশ্চয়তায়। কোনো পরিবার নেই, মনের ভাব আদান-প্রদান করার কেউ নেই। প্রচণ্ড হতাশায় দিন কাটাতে হয়। এই হতাশা কাটাতে নির্ভর করতে হয় মাদকের ওপরে, জীবনের উপার্জিত সম্পদ ব্যয় হতে থাকে মাদক আর বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। একসময় হাসপাতালে বা বৃদ্ধাশ্রমে প্রাণত্যাগ করে।
বর্তমানে আমাদের সমাজে একটা বিয়ে মানেই পাত্র এবং পাত্রী উভয়পরে অর্থের অপচয়। অথচ রসূলুল্লাহর সা: আদরের মেয়ে জান্নাতের রানি ফাতেমা রা:-কে বিয়ে দিলেন তাঁর চাচাতো ভাই আলী রা:-এর সঙ্গে। বিয়ে ঠিক হওয়ার পর রসূলুল্লাহ সা: আলী রা:-কে জিজ্ঞেস করলেন তাঁর কাছে কী আছে? আলী রা: জবাব দিলেন তেমন কিছুই নেই। থাকার মধ্যে আছে একটি ঘোড়া, একটি তলোয়ার আর একটি লোহার বর্ম। মহানবী সা: তাকে বললেন, ‘আর কিছুই যখন নেই তখন বর্মটি বিক্রি করে অর্থ নিয়ে এসো’। তাই করা হলো এবং ওই অর্থ দিয়ে বিয়ের খরচ চালানো হলো এবং দেনমোহর হলো চার শ’ মিসকাল রুপা। আরেকটি উদাহরণ দিই, একজন সাহাবির বিয়ের প্রশ্ন উঠলে রসূলুল্লাহ সা: তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘দেনমোহর দেয়ার মতো তোমার কী আছে?’ সাহাবি বললেন, ‘আমার কোনো কিছুই তো নেই’।
রসূলুল্লাহ সা: জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি কুরআনের কোনো আয়াত জানো?’ সাহাবি বললেন, ‘হ্যাঁ। আমি কুরআনের এতগুলো আয়াত জানি।’ রসূলুল্লাহ সা: বললেন, ‘তোমার দেনমোহর হচ্ছে তুমি এই আয়াতগুলো তোমার স্ত্রীকে শিা দেবে’। তখন এভাবেই বিয়ে হলো। চিন্তা করে দেখুন ইসলামের বিয়ে কত সাধারণ ও সহজ! আল্লাহর রাসূল সা: কী পারতেন না তাঁর আদরের কন্যার বিয়ে অতি জাঁকজমকপূর্ণভাবে দিতে? কিন্তু প্রকৃত ইসলাম বর্তমান সমাজের এই অপচয় মোটেও সমর্থন করে না। আসুন, বিয়েশাদিতে বাড়তি অপচয় রোধে সবাই সচেতন হই। 
লেখক : প্রবন্ধকার

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫