রামপালে পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা

বিদ্যুৎ উৎপাদন দরকার তবে দেশের ক্ষতি করে নয়

সুন্দরবনের কাছে রামপালে নির্মিত হতে যাওয়া বিদ্যুৎকেন্দ্র ব্যাপক পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণ হবেÑ এমন প্রমাণ তুলে ধরার পরও বাংলাদেশ সরকার ও তার ভারতীয় সহযোগীরা প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ভারত নিজ দেশে এমন ক্ষতিকর নতুন প্রকল্প যেখানে নিচ্ছে না, অর্থদাতা ভারতের প্রতিষ্ঠান এ কারণে ইউরোপে কালো তালিকাভুক্ত হয়েছে। তারপরও উভয় দেশের আগ্রহের কোনো ঘাটতি নেই। সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্রের এক গবেষক এ প্রকল্পের বিপুল বিপর্যয়ের আশঙ্কার কথা তুলে ধরেছেন। তাতে দেখা যাচ্ছে, সুন্দরবনকে ঘিরে প্রকৃতির যে মিলনমেলা তা একসময়ে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। নি¤œমানের কয়লার ব্যবহার মৎস্যসম্পদ ও উদ্ভিদসম্পদকে চেইন প্রক্রিয়ায় নিশ্চিহ্ন করে দেবে বলে তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেছে। এই অবস্থায় দেশের জনগণ সরকারের কাছ থেকে শুভবুদ্ধি উদয় হওয়ার প্রত্যাশা রাখে। 
সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞ ডেনিস লেমলি তার গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করে জানান, রামপালে প্রস্তাবিত কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের ছাই অপসারণ ও ব্যবস্থাপনা সুন্দরবনের নদীতে ও খালগুলোতে বিষাক্ত ভারী ধাতু যোগ করবে। এতে ম্যানগ্রোভ বন ও বিভিন্ন জলজ প্রজাতি ধ্বংস হবে। ওই অঞ্চলের গরিব মানুষের খাদ্যের জোগানদাতা মৎস্যসম্পদকে বিপন্ন করে তুলবে। কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ৯০ শতাংশ উৎপাদন দক্ষতায় ৬০ বছর কর্মক্ষম সময়ে ৩৮ মিলিয়ন টনেরও বেশি ছাই উৎপাদন করবে। ছাই পুনঃব্যবহার পরিকল্পনা অনুসারে শুধু কয়লার ছাইয়ের একটি মাত্র অংশ গৃহস্থালির কনক্রিট ও ইট তৈরির কারখানায় ব্যবহার করা হবে। ছাইবর্জ্য রাখার পুকুরটি ১২ বছরের মধ্যে ভরে যাবে; আরো কমপক্ষে ২০ মিলিয়ন টন ছাই অপসারণের জন্য বাকি থাকবে, যাতে অতিরিক্ত ৫০০ হেক্টর জায়গায় গর্ত ভরাট, রক্ষা-আস্তর ছাড়া ভরাট ও সারফেস ডাম্পিং করা ছাড়া উপায় থাকবে না। রামপালে এর ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি নি¤œমানের। ফলে সুন্দরবনের চার দিকে ভূগর্ভস্থ ও ভূ-উপরিস্থ পানিকে একাধিকভাবে ও স্থানে দূষিত করবে। রামপাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মক্ষম সময়ের মধ্যে ৭.৪ মিটার উঁচু জলোচ্ছ্বাস ছাই রাখার পুকুরের দেয়ালকে ভেঙে ফেলতে পারে। এতে করে দেখা দেবে মহাদুর্যোগ। ফলে বিপুল দূষিত পানি বানের পানির মাধ্যমে যুক্ত হয়ে বিশাল এলাকায় ছড়িয়ে যেতে পারে। অতিরিক্ত ছাইয়ের জন্য জরুরি ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা নেই, পৃথিবীর বিভিন্ন সাইটের উদাহরণ থেকে দেখা যায়, এ ছাই অপসারণ পদ্ধতি স্বল্প সময় ধরে বা দীর্ঘ সময় ধরে বিপুল বিষাক্ত দূষক অবমুক্ত করে। ফলে পলিমাটির তলানিতে বেশি মাত্রায় ক্ষতিকর সেলিনিয়াম জমা হবে। পলির তলানিতে যুক্ত সেলিনিয়াম রিসাইকেল হয়ে খাদ্যচক্র এবং মাছ ও বন্যপ্রাণীতে ফিরে আসতে পারে। দশকের পর দশক পরেও তা ঘটতে পারে, যদি সেলিনিয়াম সরবরাহ বন্ধ করে দেয়াও হয়। 
বিদেশের এই বিশেষজ্ঞের আগেও অনেকে এসব ক্ষতিকর প্রভাবের কথা বলেছেন। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বড় মাত্রায় দূষণ ঘটায়। একে সর্বনি¤œ পর্যায়ে নামিয়ে আনার জন্য যে ধরনের নিরাপত্তা উদ্যোগ নেয়া হয় রামপালে সেটা নেয়া হচ্ছে না। তার ওপর এতে ব্যবহৃত হতে যাওয়া ভারতীয় কয়লার বিষাক্ততার হার সর্বোচ্চ। বিষয়টি দেশ-বিদেশে ব্যাপকভাবে আলোচনা হয়েছে। এ ধরনের ক্ষতিকর প্রকল্প থেকে সরে আসার জন্য সরকারকে বারবার অনুরোধ জানানো হয়েছে। পরিবেশ সংগঠন, দেশী-বিদেশী সংস্থা সরকারের শীর্ষপর্যায়ে এ ব্যাপারে সতর্কতা জানালেও সরকার এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করার জন্য বেপরোয়া অবস্থানে রয়েছে। আমরা মনে করি, বিদ্যুৎ জনগণের জন্য প্রয়োজন। কিন্তু একটি উপকার করতে গিয়ে দশটা অপকার হয় সেই প্রকল্প না করাই উত্তম। সরকার পরিবেশদূষণ ও বিপর্যয়ের বিষয়টি মাথায় নেবে আশা রাখি। জনগণের জন্য ক্ষতিকর এমন কিছু থেকে নিশ্চয়ই পিছু হটবে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.