ঢাকা, সোমবার,২৩ অক্টোবর ২০১৭

মতামত

প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি

সোলায়মান আহসান

১৮ মে ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৮:৪৭


প্রিন্ট

ভূরাজনীতির এক কঠিন সময় যাচ্ছে। পারস্পরিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করা আগের ফর্মুলায় বা ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় আদৌ সম্ভব নয়। এটা বোঝার মতো পরিপক্বতা পরিলক্ষিত হচ্ছে না আমাদের দেশে। আমাদের বিদেশ মন্ত্রণালয়ে যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত, তারা পরদেশী কূটনীতিকদের সাথে আন্তঃসম্পর্কে বোঝাপড়ায় দেশের স্বার্থ রক্ষায় দক্ষতা দেখাতে কি ব্যর্থ হচ্ছেন? বাংলাদেশ স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ। এ কারণেই বিগত কয়েক বছরে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান, প্রতিরক্ষামন্ত্রী, সেনাবাহিনী প্রধান কিংবা সামরিক উচ্চপদস্থ সদস্যরা এ দেশে উপর্যুপরি সফর করেছেন। এটা এক দিকে যেমন ভালো, অপর দিকে শঙ্কার কারণ রয়েছে। দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় এসব সফরের এজেন্ডা। স্বার্থ যে উভয় দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই স্বার্থ কিভাবে কূটনীতির মারপ্যাঁচকে উদ্ধার করছে, সেটাই দেখার বিষয়। এর সাথে শুধু জাতীয় স্বার্থই জড়িত নয়, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের বিষয়ও রয়েছে। তাই দেশের জনগণও তা বুঝতে ও জানতে চায়।
এসব সম্পর্কের ধারায় সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরে সম্পাদিত চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকের বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে প্রচুর। এর মধ্যে বিরুদ্ধ মতই বেশি। প্রাধান্য পেয়েছে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি না হওয়া এবং প্রতিরক্ষাসংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক সইয়ের প্রসঙ্গ।
ভারতের পক্ষ থেকে সামরিক ব্যক্তিত্বদের তোড়জোড় পদচারণায় বাংলাদেশের মানুষ আন্দাজ করতে পেরেছিলেন, এর পেছনে সামরিক সম্পর্কের বিষয় রয়েছে। সেটা শেখ হাসিনার দিল্লি সফরে প্রতিরক্ষাবিষয়ক সমঝোতা স্মারকে সই হওয়ার মাধ্যমে আমরা জানতে পারি। ভারতের পক্ষ থেকে দাবি ছিল ২৫ বছরের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি। কিন্তু আমাদের দেশের দেশপ্রেমিক একটি অংশের সুস্পষ্ট বাধার মুখেই নাকি তা হতে পারেনি। বিষয়টি চীনা সরকারি দৈনিক পত্রিকা ‘চায়না ডেইলি’ উল্লেখ করেছে।
বাংলাদেশের ব্যাপারে চীনের উৎসাহ আছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং গত বছরের অক্টোবরে বাংলাদেশ সফরের মাধ্যমে তা প্রমাণিত। যাওয়ার আগে স্বল্পভাষী চীনা প্রেসিডেন্ট পরিষ্কারভাবে বলে গেছেন, তাদের চাওয়া-পাওয়ার তেমন কিছু নেই, শুধু বাংলাদেশকে ‘স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার’ হিসেবে পেতে চান। চীনা প্রেসিডেন্ট যা বলেছেন, তার মর্মার্থ হলো- ভবিষ্যতে চীন যদি কোনো যুদ্ধে জড়ায়, সেখানে বাংলাদেশকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে পেতে চায়। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, চীন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে কোন দেশের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সাপোর্ট দরকার। বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে এমন অবস্থানে, যা ভারত ও চীন- বিবদমান এই দু’টি দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। চীনের সাথে ভারতের সীমান্ত নিয়ে বিরোধ দীর্ঘ দিনের। যুদ্ধও হয়েছে ১৯৬২-তে দুটো দেশের মধ্যে। সেই যুদ্ধে ভারত শোচনীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভূমি হারিয়েছে ১৫০০ কিমি। তাই চীন ও ভারতের সম্পর্ক মোটেই স্বাভাবিক নয়।
তাই ভৌগোলিক গুরুত্বের অধিকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ যে সুবিধাগুলো উভয় দেশ থেকে আদায় করতে পারত, তার পরিবর্তে এখন আমাদের ‘শ্যাম রাখি, না কূল রাখি’ অবস্থা। ভূরাজনীতির খেলায় জড়িত না হয়ে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থ উদ্ধার করতে হবে। কিন্তু মনে হচ্ছে, আমরা ব্যর্থ হতে চলেছি। বিশেষ করে ভারতের সাথে প্রতিরক্ষা সমঝোতা স্মারকে সই করায় সম্পর্কের ভারসাম্য বিপন্ন হয়ে পড়েছে। চীনের সাথে প্রীতিময় সম্পর্ক বুঝি বা হোঁচট খেল। চীনা বিনিয়োগের যে উজ্জ্বল সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল তা অবারিত থাকবে কি না সন্দেহ।
শোনা যাচ্ছে, রাশিয়া ও অন্যান্য দেশের সাথেও এমন সমঝোতা করার কথা ভাবছে বাংলাদেশ। অস্ত্র সংগ্রহের ব্যাপারটা নিয়েও চলছে কানামাছি খেলা।
চীনা প্রেসিডেন্টের সফরের মাধ্যমে উন্মোচিত ঢাকা-বেইজিং সহযোগিতার সম্পর্কের ক্ষেত্র আরো সম্প্রসারিত করতে গত ১১ এপ্রিল চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রী ঢাকা সফর করার কথা ছিল। বেশ কিছু বড় প্রকল্পে চীনের অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তার বিষয়ও আলোচনার অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর আগে বাংলাদেশের পানিসম্পদ মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বেইজিং সফর করেছেন। দুই দেশের বিশেষজ্ঞ ও প্রশাসন পর্যায়ে সফর বিনিময়, আলোচনা এবং দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করা হয়। আশা করা গিয়েছিল, চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রীর ঢাকা সফরকালে গঙ্গা ব্যারাজ, বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুজ্জীবন, ইস্টার্ন বাইপাস ও নদীর চ্যানেল যুক্ত করাসহ বড় বড় প্রকল্পে চীনা সহায়তা পাওয়া যাবে। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে চীনা মন্ত্রীর সফর স্থগিত হয়ে গেছে।
মিয়ানমারের বন্ধুদেশ হিসেবে চিহ্নিত চীনা সরকারের অব্যাহত সমর্থন ও সহযোগিতায় দেশটিতে দীর্ঘ সেনাশাসন বলবৎ ছিল। চীনের সহায়তায় মিয়ানমার সামরিক দিক দিয়ে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে চীনের মধ্যস্থতা ও সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য জরুরি। যা হোক, চীনা প্রতিনিধিদল সফর স্থগিত করায় এ ব্যাপারে তাদের অনীহাই প্রকাশ পেল। দ্বিপক্ষীয় সমস্যায় এখন আর ইচ্ছে করলেও কেউ তৃতীয় বা চতুর্থ পক্ষের প্রবেশে বাধা দিতে পারে না। যেমনÑ পাকিস্তানের সাথে কাশ্মির নিয়ে দীর্ঘ ৭০ বছরের বিরোধ মীমাংসায় এগিয়ে এসেছে তুরস্ক ও চীন। কাশ্মিরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি সরেজমিন তদন্তের জন্য বহুজাতিক তদন্তপ্রতিনিধি পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান। কাশ্মির প্রশ্নে জাতিসঙ্ঘে আলোচনার সময় পাকিস্তানের প্রতি রাশিয়া ও চীনের সমর্থন ভারতকে একগুঁয়েমির পথ থেকে সরে আসতে বাধ্য করেছে। সম্প্রতি চীন ও নেপাল প্রথমবারের মতো যৌথ সামরিক মহড়ায় অংশ নিয়েছে। ভারত এই মহড়াকে সুনজরে দেখেনি। এর আগে মার্চে চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী শ্রীলঙ্কা ও নেপাল ঘুরে গেছেন। কথা ছিল, বাংলাদেশেও তিনি সফর করবেন, কিন্তু তা হয়নি। এ দিকে চলতি মে মাসে চীনের সবচেয়ে বড় ইভেন্ট ‘এক অঞ্চল, এক পথ (ঙহব ইবষঃ, ঙহব জড়ধফ)’ শীর্ষক সম্মেলনে যোগ দিতে বাংলাদেশের ছয়জন মন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এদের মধ্যে চারজন অনেক আগেই সম্মেলনে যোগ দিতে সম্মতি জ্ঞাপন করেছেন।
এ সম্মেলনে যোগ দেয়ার মূল উদ্দেশ্য চীনা বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতিকে কিভাবে এগিয়ে নেয়া যায়, সে ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করা এবং নতুন নতুন অবাকাঠামো উন্নয়নে চীনা কারিগরি ও অর্থায়নে সহযোগিতার আহ্বান জানানো।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে নিজ পায়ে দাঁড়িয়ে যাক, স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব সুসংহত করুক, তা কোনো কোনো শক্তি চায় না। তেমনি দেশের ভেতর বসেও (কী পয়েন্টে) ইঁদুরের মতো ক্ষতিকর ভূমিকায় কেউ কেউ লিপ্ত। বাংলাদেশ একটি মুসলিমপ্রধান দেশ। সেই হিসেবে বর্তমান সরকারের মুসলিম বিশ্বের সাথে সখ্য গড়ে তোলা উচিত ছিল। তা কিন্তু এ পর্যন্ত তেমন লক্ষ করা যায়নি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত এরশাদ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যের সাথে সম্পর্ক উন্নত করে প্রচুর আর্থিক সহযোগিতা লাভ করেছিলেন। তাকেও কাজে লাগাতে পারেনি বর্তমান সরকার। ফলে জনশক্তি রফতানির মতো বিষয়েও তেমন অগ্রগতি ঘটেনি। আগের স্বাভাবিক সম্পর্কেও ধস নেমেছে কোনো কোনো দেশের সাথে।
আমাদের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করতে হবে। সেটা বিশেষ কোনো দেশের ঘেঁষা হলে চলবে না।
স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সংহত করতে ‘বাহুবল’ অবশ্যই অর্জন করতে হবে। সব দেশই উন্নয়নের পথে হাঁটার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সমরশক্তিও অর্জন করে থাকে। কোটি কোটি ডলার ব্যয়ে অস্ত্র কেনার আগে এটা মাথায় রাখতে হবে, অস্ত্র কার বিরুদ্ধে কতটুকু কার্যকর হতে পারে। একটা সুস্পষ্ট নীতির আলোকে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার।
বিশ্বে সামরিক শক্তির ধ্যানধারণা অনেক পাল্টে গেছে। বিপুল সমরাস্ত্র ও সৈন্যসংখ্যা, মানববিধ্বংসী বিস্ফোরক, বিমানবাহী রণতরী ইত্যাদি আর সামরিক শক্তির নিয়ামক নয়, বরং একটি মোক্ষম মিসাইলই সব হিসাব বদলে দিতে সক্ষম। নৌবাহিনীর জন্য কেনা দুটো সাবমেরিনের মতো উন্নত আরো প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে বাংলাদেশকে।
বিশেষ কাউকে খুশি করার জন্য যেনো অনুপযুক্ত অস্ত্র ক্রয় করা না হয়। ভারত সিন্ধু নদের পানি পাকিস্তানের জন্য যেভাবে আটকাতে পারেনি, তেমনি শক্তির ভারসাম্য অর্জন করতে পারলে বাংলাদেশের জন্য তিস্তাসহ অভিন্ন ৫৪ নদীর পানিপ্রবাহে বাধা দিতে পারবে না।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫