ঢাকা, সোমবার,২৯ মে ২০১৭

ময়মনসিংহ

ধ্বংসের পথে সন্তোষপুর রাবার বাগান : বেহাত হচ্ছে জমি

আবুল কালাম ফুলবাড়ীয়া (ময়মনসিংহ) সংবাদদাতা  

১৮ মে ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৫:০৭


প্রিন্ট

ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলার সন্তোষপুর বনাঞ্চল। উপজেলার রাঙামাটিয়া এবং নাওগাঁও ইউনিয়নের প্রায় ১ হাজার ৭৩ একর এলাকাজুড়ে এই বনাঞ্চলে রয়েছে বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফআইডিসি) রাবার উন্নয়ন প্রকল্প (রাবার বাগান)। অভিযোগ উঠেছে, অদক্ষ টেপার রাবার কষ সংগ্রহকারী শ্রমিক), অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং স্থানীয় প্রশাসনের ছত্রছায়ায় সংঘবদ্ধ পাচারকারী চক্রের অবাধে রাবার পাচারের কারণে সাদা সোনাখ্যাত (রাবার কষ) ফুলবাড়িয়ার সন্তোষপুরে সরকারিভাবে গড়ে তোলা এই রাবার উন্নয়ন প্রকল্পটি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে। অনিয়মতান্ত্রিক ভাবে কষ আহরণের ফলে মরে যাওয়া গাছগুলো কেটে ফেলা হচ্ছে। এরই মধ্যে প্রায় ৪০ একর জমির রাবার গাছ কেটে পরিস্কার করা হয়েছে। গতবার ২০ একর জমির গাছ কেটে রাবার চারা রোপন করেছে বশিউক। সাথী ফসল আবাদের নামে জবরদখরকারীদের হাতে একর প্রতি ৩০ হাজার টাকা নিয়ে রাবারের জমি জবরদখলের সুযোগ করে দিয়েছে দালাল ও বাগান কর্তৃপক্ষ। এবার ২০ একর জমির রাবার গাছ কেটে পরিস্কার করা হয়েছে। এ জমি জবরদখলকারীদের হাতে তুলে দেয়ার জন্যও চেষ্টা চলছে। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার ইউসুফ আলী জানান, রাবার বাগানের আশে পাশের দরিদ্রদের জমি না দিয়ে একর প্রতি ৩০ হাজার টাকা করে নিয়ে নেতা ও বাগান কর্তৃপক্ষ জমি দিচ্ছে প্রভাবশালীদের হাতে। এ নিয়ে রাবার বন এলাকার আশে পাশের জনগন ও বাগান কর্তৃপক্ষের মধ্যে টানাপোড়ন চলছে।

স্থানীয় চোরাকারবারিরা অফিসের নিয়োগ করা ট্রেনিংপ্রাপ্ত টেপারদের বাতিল করে তাদের নিজস্ব অনভিজ্ঞ লোকদের দিয়ে নামকাওয়াস্তে টেপার হিসেবে কাজে লাগানোর ফলে রাবার গাছ থেকে কষ সংগ্রহ আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। ১ হাজার ৭৬ একরের বিশাল বাগানটির প্রায় অর্ধেক গাছ শুধু অদক্ষ টেপার দিয়ে টেপিংয়ের কারণে কষ উৎপাদনে অক্ষম হয়ে অকালেই মারা যাচ্ছে। অতি সম্প্রতি ৪০ একর জমির রাবার গাছকে উৎপাদন ক্ষমতায় অক্ষম দেখিয়ে কর্তৃপক্ষের নির্দেশে কেটে ফেলা হচ্ছে। যদিও বাগানের ওই ৪০ একরের মধ্যে বেশিরভাগ গাছের বয়স ১০-১১ বছরের ওপরে নয়।

সন্তোষপুর রাবার অফিস সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন সময় বাগান ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিয়ে বদলি হয়ে আসা ম্যানেজারদের ম্যানেজ করে বাগান ব্যবস্থাপনার কোনো রূপ নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে প্রশিক্ষিত টেপারদের ছাঁটাই করে চোরাকারবারিরা তাদের পছন্দের টেপার দিয়ে যত্রতত্র অপ্রাপ্তবয়স্ক রাবার গাছ টেপিং করায়। এতে গাছগুলো অচিরেই জীবনকাল হারিয়ে কষ দেওয়া বন্ধ করে দেয়। যদিও ৭ বছরের কম হলে রাবার গাছকে টেপিং বা কষ আহরণে রাবার চাষ প্রকল্পে নিষেধ থাকা সত্ত্বেও কেউ তা মানছে না।

পুরনো রাবার গাছ কেটে নতুন চারা লাগানো হবে এমন সংবাদে সরেজমিনে রাবার বাগানে গিয়ে দেখা যায় অন্তত ৪০ একরের বেশি এলাকায় রাবার গাছ কেটে ফেলে হয়েছে। পড়ে আছে ছোট-বড় মিলিয়ে কয়েক হাজার গাছ। চোখে পড়ে প্রতিটি গাছে অদক্ষ টেপিংয়ের কারণে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলা আঘাতের চিহ্ন। এর মধ্যে ২০ একর জমিতে নতুন করে লাগানো হয়েছে রাবার গাছের চারা। রাবার চারার নিচে লাগানো হয়েছে আনারস হলুদসহ পঞ্চমুখী কচু। বাগানে দলবেঁধে কাজ এসব সাথী ফসলের কাজ করছে শ্রমিকরা। পুরাতন অনেক বাগান দখল করে সেখানে সাথী ফসল হিসাবে লাগানো হয়েছে ফসল। নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, এরই মধ্যে প্রায় ২/৩শ একর জমিতে লাগানো হয়েছে সাথী ফসল। কোন কাগজ ছাড়াই নিয়মনীতি তোয়াক্কা না সাথী ফসলের আবাদে স্থানীয় রাবার বাগানের এ সিদ্বান্ত এক সময় কাল হয়ে দাঁড়াবে। রাবার বাগানের আশেপাশের লোকজন জানান, দরিদ্র মধ্যে জমি না দিয়ে সরকারীদলের নেতা মাসুদ ও আঃ খালেকসহ ৮/৯ জন বাগান কর্তৃপক্ষের সাথে আতাঁত করে প্রতি একর জমি ৩০ হাজার করে টাকা নিয়ে প্রভাশালীদের হাতে তুলে দিচ্ছে।

রাবার বাগান পরিদর্শনে দেখা গেছে, নিয়ম না মেনে কষ আহরণে রাবার গাছ টেপিং করা হয়েছে। অনিয়ন্ত্রিত টেপিং শুধু নয়, দায়ের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলা হয়েছে গাছের বাকলগুলো। প্রশিক্ষণ ছাড়া অনেক টেপারকে রাবার গাছ টেপিং করতে দেখা গেছে বাগানে। দুই ফিট বেড়ের রাবার গাছগুলোতে সর্বোচ্চ ১ থেকে দেড় ফুট টেপিংয়ের নিয়ম থাকলেও বাস্তবে মেলে তার উল্টো চিত্র। প্রতিটি গাছে ৭-৮ ফুট পর্যন্ত টেপিং করা। পুরো বাগান ছেয়ে গেছে জঙ্গলে। কোনো কোনো রাবার গাছের পুরো ব্লকে স্থানীয় প্রভাবশালীরা চাষাবাদ করছেন আনারস হলুদ ও কচু। টেপাররা সকালে কষের জন্য বাটি রেখে গেলেও কষ চুয়ে মাটিতে পড়ে নষ্ট হচ্ছে। টেপারদের রাবার চুরি করে অন্যত্র লুকিয়ে ফেলতে দেখা গেছে।

সন্তোষপুর বাগানে দীর্ঘদিন ধরে টেপিং করে আসা জুলেখা খাতুন বলেন, 'অহন আমগো টেপিং কইরা আর পোষায় না, গাছে আর কষ দেয় না, সব গাছ মইরা যাইতাছে। এক সময় ২০-২৫ কেজি কইরা কষ পাইতাম। কিন্তু আমগোরে বাদ দিয়া নতুন টেপার কামে নিয়া গাছগুলাইনরে শ্যাষ কইরা ফালাইছে।'

বাগানটির বর্তমান ব্যবস্থাপক মিজানুর রহমান জানান, এই বাগানে আগে যে গাছ ছিল সেই গাছগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা কমে যাওয়ায় অর্থনৈতিক লাভের কথা ভেবে বিএফআইডিসির নির্দেশে পুরনো গাছ কেটে নতুন চারা লাগানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এ ছাড়াও টেপারদের চাকরির নিশ্চয়তা প্রদান, নির্দিষ্ট মজুরি কাঠামো নির্ধারণসহ বাগান ব্যবস্থাপনায় আরও লোকবল বৃদ্ধির ব্যাপারে বিএফআইডিসির কাছে সুপারিশ করা হয়েছে।

বাগান ব্যবস্থাপক মিজানুর রহমান আরও বলেন, '১৯৯৪ সালে রাবার বাগান গড়ে ওঠার পর বিভিন্ন সময় অসাধু কর্মকর্তাদের অব্যবস্থাপনায় অনিয়ন্ত্রিত টেপিংয়ের কারণে রাবার গাছগুলো অকালেই জীবনকাল হারায়। রাবার গাছ কেটে সাথী ফসল আবাদের নামে জবরদখলকারীদের হাতে রাবার বাগানের জমি তুলে দেয়া হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে তিনি জানান, রাবার গাছগুলো দেখাশুনা করার জন্য শুধু ৩ বছর তারা সাথী ফসল আবাদ করবে। ৩ বছর পর আর তারা সাথী ফসল আবাদ করতে পারবে না। এ জন্য কোন কাগজ করে তাদের সাথী ফসল আবাদের সুযোগ দেয়া হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে তিনি জানান আসলে কোন কাগজ নয় মুখে মুখেই দেয়া হচ্ছে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫