ঢাকা, শনিবার,২২ জুলাই ২০১৭

থেরাপি

ডুব থেরাপি

রম্য গল্প হ তারেকুর রহমান

১৮ মে ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

১.
গ্রামে নতুন এক লোক এসেছে সবাই তাকে ডুব বাবা বলে। তার কাছে আসলেই ডুব থেরাপি দেয়। তার নাম শুধু এ গ্রামের লোক জানে এমন নয়। আশপাশের সব গ্রামের লোকজনের মধ্যে জানা হয়ে গেছে ডুব বাবার নাম। ডুব বাবার ডুব থেরাপির কারণে অনেকের অনেক জটিল রোগের অবসান ঘটেছে। তাই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসে ডুব থেরাপি নিয়ে যাওয়ার জন্য।
ডুব বাবা একটি পুরনো পুকুর পাড়ে একটা বড় গাছের নিছে তার আস্তানা তৈরি করেছে। পুকুরের পানি গাছের পাতা পচে কালো রঙের আকার ধারণ করেছে। কেমন যেন ভ্যাপসা একটা গন্ধও বের হয়েছে। ডুব বাবার ডুব থেরাপি এই পুকুরেই হয়। কেউ কোনো রোগ নিয়ে এলে ডুব বাবার চিকিৎসা হলো এই ডুব থেরাপি। রোগীকে প্রথমে এই পুকুরে নামানো হয়। এরপর অনবরত ডুব দিতে দেয়া হয়। যতণ পর্যন্ত রোগীর চোখ লাল না হবে, কান্ত না হবে ততণ পর্যন্ত এই ডুব থেরাপি চলবে। রোগীরা প্রথমে এই পচা পানিতে নামতে চায় না। ডুব বাবার কিছু লোক আছে যারা জোর করে রোগীকে পানিতে নামিয়ে দেয়। ডুব বাবার ফিও খুব কম। এই ধরেন একটা তাজা দেশী মুরগি আর সাথে অল্প কিছু টাকা। কথিত আছে এই ডুব থেরাপিতে বেশির ভাগ রোগীই ভালো হয়ে যায়। তাই ডুব বাবার কদর দিন দিন বাড়তে লাগল। তবে ডুব বাবার ও একটা ইতিহাস আছে। কেনই বা তিনি এই পচা পানির পুকুরে মানুষকে ডুব দিতে বলে তার ও একটা কাহিনী আছে।
২.
গ্রামের যুবক ছেলে বদরুল ভালোবাসে একই গ্রামের চেয়ারম্যান কানা আক্কাসের মেয়ে বিলকিসকে। বিলকিস-বদরুলের প্রেমের কাহিনী সবার মুখে মুখে। বদরুল সুযোগ পেলেই বিলকিসকে নিয়ে ঘুরতে বের হয়। বিলকিস ও বদরুলের সাথে প্রেম করে বেশ খুশি। বদরুলের আবার অনেক ভালো একটা অভ্যাস আছে যেটা বিলকিস খুব পছন্দ করে। বিলকিস কোনো কিছু চাওয়ামাত্রই বদরুল সেটা এনে দেয়ার চেষ্টা করে। এক দিন বিলকিস বদরুলকে বলেÑ আইচ্ছা এইভাবে বাইরে ঘুইরা ঘুইরা কথা আর কত কমু?
-কী করোন যায় বিলকিস?
-একটা মোবাইল অইলে ভালো অইত না?
-এত দিন পর এই কথা কইলা তুমি? কালকেই তোমারে মোবাইল কিইন্যা দিমু।
-তোমার নামডা কেন বদরুল রাখছে? বদ কাইটা ভালো মানে ভালোরুল রাখা উচিত।
-কী যে কও বিলকিস।
বদরুল বাপের পকেট থেকে টাকা চুরি করে বিলকিসের জন্য মোবাইল কিনে দেয়। দুজনে মোবাইলে কথা বলতেই আছে। এখন আর তাদের তেমন দেখা হয় না।
-আইচ্ছা, বিলকিস তোমার বাবা যদি আমাগো ভালোবাসা মাইন্যা না নেয় তখন তুমি কী করবা?
-এডা কি কওন লাগে? আমি তোমার লগে পলাইয়া যামু।
এ দিকে বদরুল-বিলকিসের প্রেমের খবর বিলকিসের বাবা কানা আক্কাসের কাছে পৌঁছে গেল। কিন্তু কোনো প্রমাণ পাচ্ছে না। একদিন বিলকিস ফোনে কথা বলতেছিল হঠাৎ কানা আক্কাস তা দেখে ফেলে। বিলকিসকে ডাক দেয় কানা আক্কাস।
-বিলকিস তুই এই মোবাইল কই পাইলি?
-এইডা আমার মোবাইল না।
-বিলকিস, এই কানা আক্কাসের লগে ফাইজলামি কইরো না। এইডা কি তোমারে ওই বদরুল দিছে?
-হ,আব্বা ওই বদরুলেই দিছে।
কানা আক্কাস বদরুলকে লোক পাঠিয়ে ধরে নিয়ে আসে।
-তুই কেন বিলকিসরে মোবাইল দিলি?
-ও চাইছে তাই দিছি।
বিলকিসকে ডাকা হলো।
-এই বিলকিস, তুই নাকি বদরুলের কাছে মোবাইল চাইছোস?
-না আব্বা, আমি চাই নাই। ওই জোর কইরা দিছে।
-কিরে বদরুল কথা কি সত্যি?
-না, এইডা মিথ্যা কথা। বিলকিস আমারে ভালোবাসে তাই সে আমার কাছে মোবাইল চাইছে। এই জন্য আমি তারে মোবাইল কিন্যা দিছি।
-না আব্বা, আমি এই বদরে কেন ভালোবাসুম? আমি কানা আক্কাসের মাইয়্যা এই আলতু ফালতু পোলারে কেন ভালোবাসুম?
কানা আক্কাস আজ ভীষণ রাগ নিয়ে আছে। এই বদরুলকে উপযুক্ত শাস্তি দিতেই হবে। একটা ুর দিয়ে বদরুলের চুল সব ফেলে দেয়া হলো। এরপর বদরুলকে নিয়ে যাওয়া হলো এক পুরনো পুকুরে। যেখানে সব ময়লা পানি। সেই পুকুরে বদরুলকে নামানো হলো। বদরুলকে এই পচা পানিতে ডুব দিতে বলা হলো। বদরুল ডুব দিচ্ছে আর গ্রামের লোকজন হাসতেছে। কয়েক শ’ ডুব দেয়ার পর বদরুলের চোখ লাল হয়ে গেল। শরীরে আর কোনো শক্তি নাই। কিন্তু এরপরও কানা আক্কাসের ােভ কমেনি। বদরুলকে এই গ্রাম থেকে বের করে দেয়া হলো। বদরুল চলে যাওয়ার পর বিলকিসের বিয়ে হয় এক মুরগি ব্যবসায়ীর সাথে।
৩.
গ্রামে আসা এই ডুব বাবা আসলে কে? অনেকের মনে প্রশ্ন কিন্তু কেউ উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না। উত্তর খোঁজার দরকারও মনে করছে না। কারণ সবাই মনে করে ডুব বাবা তাদের কাছে আশীর্বাদ হয়ে এসেছেন। আর ডুব থেরাপি না থাকলে এ গ্রামের মানুষের রোগ ভালোই হতো না। ডুব বাবার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়তেই লাগল। কিন্তু কেউ জানে না এই ডুব বাবাই সেই বদরুল। যাকে এই গ্রাম থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। বদরুলকে বের করে দেয়ার সময় একটা প্রতিজ্ঞা করেছিল। সে এই গ্রামে আবার ফিরবে। সব মানুষকে এই পচা পানিতে ডুব দিতে বাধ্য করবে। এই জন্য সে আজ ডুব বাবা হয়ে ফিরে এসেছে।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫