ঢাকা, রবিবার,২৮ মে ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

সব তরুণ রমণীবল্লভ কামিনীকাতর নয়

বিবিধ প্রসঙ্গ

মাসুদ মজুমদার

১৮ মে ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

নারীর প্রতি সহিংসতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। প্রচার-প্রচারণা পায় না এমন ধর্ষণ ও সহিংস ঘটনার সংখ্যা অনেক বেশি। প্রশ্ন ওঠে, হঠাৎ করে আমাদের তরুণসমাজ এতটা রমণীবল্লভ, কামিনীকাতর হয়ে পড়ল কেন? নৈতিক অধঃপতনের এমন ভয়াবহ সামাজিক রূপ সম্ভবত বর্গি-হার্মাদ যুগে দেখা যেত। মনে হয় আমরা আবার সেই মগের মুল্লুকে ফিরে গেছি। নয়তো সন্তানের এমন অপরাধ ও নৈতিক স্খলন বাবার কাছে স্বাভাবিক মনে হতো না। সাধারণভাবে রাজনৈতিক অনাচারের উদর থেকে অনৈতিক সামাজিক অপরাধের বিস্তৃতি ঘটে। আইনের শাসনের অভাবে যেকোনো অরাজকতা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে। বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি নৈরাজ্যের জন্ম দেয়। ইনসাফের অভাবে সমাজে অস্থিরতা অনিবার্য হয়ে পড়ে। সামাজিক অপরাধ, নৈতিক অবক্ষয় এবং দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার সমাজের ভেতরে শুধু নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দেয় না, জনমনে ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি করেÑ যা সামগ্রিকভাবে নৈতিক শক্তির জাগৃতি ঘটানো সম্ভব না হলে রোধ করা সম্ভব হয় না।
এবার বনানীতে ছাত্রী ধর্ষণ মূল রোগ নয়, উপসর্গ। নয়তো অসভ্য বাবার এমন অরুচিকর ও ঘৃণ্য মন্তব্য জাতিকে কেন শুনতে হবে? এতে স্পষ্ট, উচ্চবিত্তের কিছু কুলাঙ্গার মা-বাবার কারণেই অনেক সন্তান দিক-ভ্রষ্ট হচ্ছে। রাষ্ট্রশক্তির দৃষ্টি গলিয়ে ঢাকাসহ দেশের প্রায় সব অভিজাত এলাকায় ইয়াবা পৌঁছে গেছে। সিসা বার নামে একধরনের নেশাগার গড়ে উঠেছে অভিজাত এলাকায়। এসব বার-কাব ও নেশার রাজ্যের সাথে রয়েছে ক্ষমতার আশীর্বাদপুষ্ট ধনিক শ্রেণীর পোষ্যরা। এ কারণেই হরেক নামের মাদকের ব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। চরিত্রহীন তথাকথিত বড়লোক এবং দুর্নীতিগ্রস্ত ধনিক শ্রেণীর বখে যাওয়া সন্তানেরা মা-বাবার অবৈধ টাকা উড়ানোর জন্য এ ধরনের জায়গাগুলো বেছে নিচ্ছে। সাথে পাচ্ছে বস্তুবাদী ও নৈতিকভাবে উচ্ছৃঙ্খল বেলেল্লাপনাকে প্রগতিশীলতা ভাবে, এমন সব পরিবারের অর্ধনগ্ন মেয়েদের। এই মেয়েরা শুধু নিজেদের মেলে ধরে না, তরুণদের প্রলুব্ধ করে মারাত্মকভাবে। এসব কথিত অভিজাত, আসলে নোংরা নর্দমাতুল্য জায়গাগুলো অবাধ যৌনাচারের লীলাভূমি। এসব বার ও কাবে একধরনের তরুণী নিজেদের এমনভাবে মেলে ধরছে, যাতে যুবকদের মাঝে ধর্ষণের কামনা জাগে এবং অসভ্যতার সংক্রমণ ঘটে। অবাধ মেলামেশাও তারুণ্যকে ধর্ষণে উদ্বুদ্ধ করছে। বস্তুবাদী সংস্কৃতি এবং ভোগবাদ তরুণ-তরুণীর কাছে প্রেরণা হয়ে আসছে। ইন্টারনেট তা নাগালের মধ্যে এনে দিচ্ছে।
এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে হালাল রুজির মানুষের এবং ধার্মিকজনের অর্থবিত্ত বেশুমার নয়। হালাল রুজি মানুষকে স্বাচ্ছন্দ্য দেয়, মানসিক স্বস্তি দেয়, কিন্তু টাকা উড়ানোর মতো বিত্তের অধিকারী বানায় না। আমাদের শ্রেণিবিভক্ত সমাজে শোষক ও শাসিতের মাঝে মস্তবড় দেয়াল তৈরি হয়েছে। রাজনীতি মানে, বিত্তশালীদের লুণ্ঠন ও দাপট প্রদর্শনের ব্যাপার। এখন ক্ষমতার জন্য ভোট লাগে না। ক্ষমতাচর্চার জন্য জবাবদিহি করতে হয় না। ক্ষমতার পক্ষপুটে বসে অল্প কিছু লোক দেশের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে। ব্যাংকপাড়াও তাদের দখলে। শেয়ারবাজার তাদেরই নিয়ন্ত্রণে। পরিবহন সেক্টর তারাই নিয়ন্ত্রণ করে। তাবৎ বাণিজ্য চলে তাদের অঙ্গুলি হেলনে। তারাই উন্নয়নের পরিকল্পনা সাজায়। টেন্ডার প্রকাশ করে। আবার তারাই সেটা ভাগবাটোয়ারা করে নেয়। অবৈধ ক্ষমতা উপচে পড়া বিত্তবৈভব তারুণ্যকে গ্রাস করছে।
পাকিস্তানি আমলের ২২ পরিবার এখন ২২ হাজার। এরাই ক্ষমতার মগডালে বসে সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করে। যারা ভোটডাকাতি করে ক্ষমতা দখল করে, তাদের কাছে নৈতিকতার সবক অর্থহীন। এরাই নৈতিকতার উৎস মূলে আঘাত হানে।
দেশের লোক মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমায় দেশের প্রতি একধরনের নেতিবাচক ধারণার কারণে। রেমিট্যান্স প্রবাহে ভাটা পড়ে কেন, সেটা কোনো অদৃশ্য কারণে নয়। যে দেশে ব্যাংকের টাকা লোপাট হয়, রিজার্ভ হয়ে যায় হাওয়াÑ বেশুমার টাকা পাচার হয়, দেশে দেশে সেকেন্ড হোম গড়ে ওঠে, সে দেশে রেমিট্যান্স এসেইবা কী লাভ? রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের কাছে জনগণের প্রত্যাশা সম্ভবত হতাশার তলানিতে পৌঁছে গেছে। রাজনীতি মানে আর মহান ব্রত নয়, ক্ষমতার নগ্ন প্রতিযোগিতা। রাজনীতিবিদ মানে, সব কিছুর ঊর্ধ্বে এমন এক ক্ষমতাধর মানুষ, যিনি সব পারেন। তার কাছে বৈধ-অবৈধ বলে কোনো কথা নেই; ন্যায় ইনসাফ বলে কোনো শব্দ নেই। নীতি-নৈতিকতা যেন এক ধরনের অধরা বিষয়। অথচ তারা ভাব দেখান ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরের মতো। তারা ক্ষমতার স্বার্থে নেকড়ের মতো হিংস্র হতে পারেন। আবার কপটচারী হয়ে মানুষের সাথে প্রতারণা করতে পারেন। বিচারবহির্ভূত হত্যায় তারা অতি উৎসাহী, গুমে তারা পারঙ্গম। কোনো কেলেঙ্কারিতে তাদের অরুচি নেই। মানুষের জীবন নিয়ে যারা খেলতে পারে তাদের কাছে ধর্ষণ কোনো অপরাধ নয়। আপন জুয়েলার্সের মালিকের মতো বাবাদের আপন সন্তানরাই অনৈতিকতা ও ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের বিস্তার ঘটাচ্ছে।
যে তারুণ্য দেখতে পাচ্ছে, তার বাবা অবৈধ ক্ষমতাচর্চা ও অর্থ কামাইয়ের মেশিন; মা সোসাইটি গার্ল। পরিবার বলতে কোনো কিছু অবশিষ্ট নেই। তার মা-বাবার পুরো জীবনটা বৈপরীত্যে ভরপুর। তাদের কোনো ইতিবাচক প্রভাব সন্তানকে ভালো হতে উৎসাহ জোগায় না, বরং বাবার প্রতি ঘৃণা লুকাতে তারা বাইরের জগতে হিংস্র হয়ে ওঠে। মদ ও নারীতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। এরাই ধর্ষক, এরাই খুনি। এরাই হাইজ্যাকার। এরাই মদে মাতাল হয়ে হোটেল বারে বেলেল্লাপনা করে বেড়ায়। অনেক মা-বাবা এসব আড়াল করতে সন্তানকে বিদেশে পাঠান কিন্তু শেষ রক্ষা হয় না।
যেসব তরুণ মা, বাবা ও সমাজপতিদের প্রতি দ্রোহী হয়ে ওঠে, তারাই একসময় চরমপন্থী সেজে যায়। প্রতিবাদী হতে গিয়ে উগ্রবাদী হয়ে পড়ে অনেকেই। ভাবে এভাবে, সমাজটা পাল্টানো যাবে। তাই এমন এক পথে হাঁটতে শুরু করেÑ যে পথ থেকে লাশ না হয়ে আর কখনো ফিরে আসা যায় না। বড় বড় সন্ত্রাসী আমাদের পচন ধরা রাজনীতির সাধারণ পরিণতির ফসল। এ সমাজব্যবস্থা ও শিক্ষানীতি অমানুষ বানায়। ধর্ষককে সেঞ্চুরি পালনের সুযোগ দেয়।
জুলুম, অত্যাচার, নির্যাতন ও নিপীড়ন যেমন মানুষকে একসময় প্রতিশোধস্পৃহ করে তোলে, তেমনি অর্থনৈতিক শোষণ, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং সাংস্কৃতিক দেউলিয়াপনার ভেতর থেকে হতাশাবাদী প্রজন্মের সৃষ্টি হয়। এরা সঠিক পথ না পেলে জঙ্গি সাজে। হঠাৎ বিপ্লবী হয়ে ওঠে। ক্ষেপাটে আচরণ করে। সন্ত্রাসের পথে হাঁটে। একসময় যখন নিজেকে আবিষ্কার করে, তখন দেখতে পায়Ñ তার ওপর নিজের আর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। কোনো-না-কোনো গডফাদার তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। সে ক্ষমতার রাজনীতির লাঠিয়াল হয়ে উঠেছে।
মায়ের কোল থেকে শিশু অপহরণ, বাবার কাছ থেকে মেয়ে ছিনিয়ে নেয়া, তরুণীদের ধর্ষণ, সব ধরনের নারীর প্রতি অসম্মান ও সহিংসতা রাজনৈতিক অনাচারের স্বাভাবিক পরিণাম। রাষ্ট্র যারা চালায় তাদের ভেতর অনৈতিকতা বাসা বাঁধলে সমাজের ধস ঠেকানো যায় না। তাই বলা যায়Ñ ব্যাংক লুণ্ঠন, অর্থপাচার থেকে শুরু করে ধর্ষণের আধিক্য রাজনৈতিক সঙ্কটের পেট থেকেই জন্ম নিয়েছে। এখন উপসর্গকে রোগ ভাবলে সমাধান মিলবে না। নেতৃত্বের ভেতর নৈতিক শক্তির উত্থান ঘটানো জরুরি। সেটা ধর্মীয় অনুরাগ থেকেই জন্ম নেয়া অপরাজেয় ইচ্ছা ও নৈতিক শক্তি, যা আসমান থেকে আসে না।
আমাদের জানা মতে, সব যুগে সব ধার্মিক মানুষ নৈতিক মানে উন্নত ছিলেন, আছেন। হোন না তিনি খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ, হিন্দু কিংবা মুসলমান। এখনো ধার্মিক মানুষ সৎ ও নীতিবান। ন্যায়নীতি তাদের আশ্রয় করে দাঁড়ায়। ইনসাফ তাদের অলঙ্কার। তারাই আমানতদার। তারাই অসাম্প্রদায়িক। এখনো তারা প্রতিশ্রুতি দিলে ভঙ্গ করেন না। কোনো আমানতের খেয়ানত করেন না। সত্যের অবশিষ্টটুকু তারাই আঁকড়ে ধরে আছেন।
পৃথিবীর সব ধর্ম, সব ভালো সমাজ নারিত্ব ও মাতৃত্বকে সম্মান করে থাকে। কোনো ধার্মিক মানুষ ব্যতিক্রম ছাড়া নারীর প্রতি সহিংস হন না। মাদক তাদের স্পর্শ করে না। অনাচার থেকে তারা দূরে থাকেন। আমাদের রাজনীতিবিদ এবং বুদ্ধিজীবীরা এমন এক সহিংস পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন যা থেকে প্রাথমিক সঙ্কট উত্তরণের পথ একটাই। ইতিবাচক সমাজসভ্যতার লক্ষ্যে সর্বাগ্রে রাজনীতির অঙ্গনে সহাবস্থান এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটাতে হবে।
এ লেখার উদ্দেশ্য এটা নয় যে, আমাদের সব তরুণ বখে গেছে, এটা প্রমাণ করা। জনসংখ্যার হিসাব মতে, তরুণসমাজ মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বেশি এ দেশে। এখনো আমাদের তরুণরা ভাঙার নয়, গড়ার স্বপ্ন দেখে এবং গুণগত পরিবর্তনের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে সক্রিয়। মূলকথা, সমাজ ও রাষ্ট্রের চালিকাশক্তির মগজে পচন ধরেছে। তাই ধর্ষিত কন্যা-জায়া-জননীর আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে। যে দেশে রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ সংস্কৃতি সবটাই পাপ-পঙ্কিলতায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত, যে দেশে ক্ষমতাধরদের আইন স্পর্শ করতে পারে না, ওরা বিচার এড়ায়Ñ সে দেশে কিছু তরুণ আশকারা পাবে নিশ্চিতভাবেই। পরীক্ষায় নকল, প্রশ্নপত্র ফাঁস, বাহবা নেয়ার জন্য নাম্বার ও পাসের হার বাড়ানোর মতো চৌর্যবৃত্তিকে যারা লালন করে, তাদের নিয়ন্ত্রিত সমাজ নীতিনৈতিকতার ধার ধারবে কেন? আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ শুধু অর্থনীতি নয়, রাজনীতি নয়; জাতীয় স্বাতন্ত্র্যের গৌরব রক্ষার সাথে সাথে নৈতিক শক্তির জাগৃতিও জরুরি। রাজনীতিবিদেরা পথপ্রদর্শক হলে শাসকের ইচ্ছায় সেই জাগৃতি সম্ভব। এখনো সময় আছে, শিক্ষাজীবনে নৈতিকতার চাষ বাড়ান। ধর্মীয় ও নৈতিক অনুশাসনগুলোকে সম্মান করুন। সন্তানদের আমানত ভেবে নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করুন। নিজেদের জীবন থেকে বৈপরীত্য দূর করুন। সব অসামাজিক কাজ বর্জন করুন। ভোগ ও বস্তুবাদী ধারণা থেকে সরে আসুন। মহামানবদের জীবনাচার নিয়ে নিজেরা চর্চা করুন। সন্তানদের সামনে সেই মডেল তুলে ধরুন। দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টান, জীবন পাল্টে যাবে। তখন সমাজ সভ্যতা ও রাষ্ট্রজীবনেও এর প্রত্যক্ষ ইতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য।
এই পৃথিবীতে মা-বাবার কাছে শ্রেষ্ঠ সম্পদ সুসন্তান; অর্থবিত্ত নয়। সন্তানের কাছে শ্রেষ্ঠ সম্পদ সৎ মা-বাবা। এই সম্পদ সাধ্যমতো আগলে রাখা এবং সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করা জীবনের ব্রত হওয়া উচিত।
masud2151@gmail.com

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫