ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২৯ জুন ২০১৭

মতামত

সাধ্বী প্রজ্ঞার খালাসকাহিনী

মাসুম মুরাদাবাদী

১৭ মে ২০১৭,বুধবার, ১৭:০৫


প্রিন্ট

উগ্র সন্ত্রাসবাদের হোতা স্বামী অসীমানন্দের পর মালেগাঁও বোমা বিস্ফোরণের প্রধান আসামি সাধ্বী প্রজ্ঞা ঠাকুরেরও জামিন হয়ে গেছে। সাধ্বী প্রজ্ঞাকে মুম্বাই হাইকোর্ট অপর্যাপ্ত প্রমাণাদির ভিত্তিতে মুক্তির নির্দেশ জারি করেন। মুক্তির পর সাধ্বী প্রজ্ঞা তার গ্রেফতারি ও উগ্র সন্ত্রাসবাদের মতো অভিযোগের জন্য ইউপি সরকারকে দায়ী করেছেন। সাধ্বী প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরম ও কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে উগ্র সন্ত্রাসবাদের ষড়যন্ত্র তৈরি ও তাকে কারাগারে নিক্ষেপের অভিযোগ আরোপ করেছেন। উগ্র সন্ত্রাসবাদের সর্বপ্রথম মুখোশ উন্মোচন করেছিলেন মহারাষ্ট্র এটিএসের (অ্যান্টি টেররিজম স্কোয়াড) প্রধান হেমন্ত কারকারে। তিনি অনেক পরিশ্রম করে নিরপেক্ষতার সাথে তদন্ত করে প্রমাণ করেছিলেন, ভারতে উগ্র সন্ত্রাসবাদের চূড়ান্তভাবে সংগঠিত একটি গ্র“প তৎপর রয়েছে এবং ২০০৮ সালের মালেগাঁও বোমা বিস্ফোরণে ওই গ্রুপের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তদন্ত মোতাবেক, সাধ্বী প্রজ্ঞা ঠাকুরই ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০০৮ সালে মালেগাঁওয়ে সংঘটিত বোমা হামলার পরিকল্পনা তৈরি করেন। হেমন্ত কারকারের সাধ্বী প্রজ্ঞার সাথে পরিচয় ঘটেছিল একটি মোটরসাইকেলের মাধ্যমে। ওই মোটরসাইকেলে বোমা বেঁধে দেয়া হয়েছিল এবং তদন্ত সংস্থাগুলোকে ধোঁকায় ফেলতে ওই মোটরসাইকেলে ‘সিমি’ লিখে দেয়া হয়েছিল। যাতে বোমা বিস্ফোরণের অভিযোগে তদন্ত সংস্থাগুলো নিয়মমাফিক সিমির (স্টুডেন্টস ইসলামিক মুভমেন্ট অব ইন্ডিয়া) সদস্যদের গ্রেফতার করে। কিন্তু যখন সূক্ষ্মভাবে ওই মোটরসাইকেল পরীক্ষা করা হলো, তখন জানা গেল, ওই মোটরসাইকেলটি সাধ্বী প্রজ্ঞার নামে রেজিস্ট্রেশন করা। ধোঁকা দেয়ার জন্য ওই মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশন নম্বর ও ইঞ্জিন নম্বর মুছে দেয়া হয়েছিল। এটা প্রথম ঘটনা যেখানে ভারতে সন্ত্রাসবাদের এমন এক গ্র“পের মুখোশ উন্মোচন করা হয়েছিল, সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ধর্মোন্মাদদের সাথে যাদের সম্পর্ক ছিল। নতুবা এর আগে সন্ত্রাসবাদের প্রতিটি ঘটনার জন্য ঢালাওভাবে মুসলমানদেরই শুধু অপরাধী সাব্যস্ত করা হতো। মালেগাঁও বোমা বিস্ফোরণের অভিযোগেও মুসলমানদেরই গ্রেফতার করা হয়েছিল। হেমন্ত কারকারের ঘটনার আসল তথ্য উদঘাটনের পর সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলো ক্রোধে ফেটে পড়েছিল এবং তারা হেমন্ত কারকারের বিরুদ্ধে হিন্দুবিদ্বেষী হওয়ার অভিযোগ আরোপ করে তাকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি পর্যন্ত দিয়েছিল। এ কথা আজো রহস্যময় থেকে গেল, মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসী হামলার সময় জীবন উৎসর্গকারী হেমন্ত কারকারেকে একটি অসম্পূর্ণ জ্যাকেট দিয়ে ওই স্থানে কে পাঠিয়েছিল, যেখানে তিনি সন্ত্রাসীদের গুলির লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন?
সাধ্বী প্রজ্ঞা ঠাকুরের গ্রেফতারির সাথেই শহীদ হেমন্ত কারকারে যাদেরকে এ চক্রান্তে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার করেছিলেন, তাদের মধ্যে লেফট্যানেন্ট কর্নেল পি এস পুরোহিতও ছিলেন। যিনি ভারতে রীতিমতো হিন্দুরাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা এঁটেছিলেন। ওই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ২০ জানুয়ারি ২০০৯ সালে নিয়মমাফিক চার্জশিট দাখিল করা হয় এবং সাক্ষীদের বিবরণও নথিভুক্ত করা হয়। পরবর্তীকালে সন্ত্রাসী ঘটনাগুলোর তদন্তের জন্য এনআইএ (ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি) গঠিত হলে ২০১১ সালের এপ্রিলে মালেগাঁও বোমা বিস্ফোরণ মামলাও এনআইএর কাছে হস্তান্তর করা হয়। ২০১৪ সালের মে মাসে কেন্দ্রে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর উগ্রবাদী সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো উগ্রসন্ত্রাসবাদের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া লোকদের সসম্মানে মুক্তির জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ওই সময় সাধ্বী প্রজ্ঞা ঠাকুরকে কারাগার থেকে বের করে নিয়ে গিয়ে ভুপালের একটি আয়ুর্বেদিক কলেজে, আদালতের অর্থে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। অর্থাৎ মোদি সরকার ক্ষমতায় বসতে না বসতেই সাধ্বী প্রজ্ঞা কার্যত কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে যান। আর তিনি ওই সময় থেকেই ভুপালের সরকারি আয়ুর্বেদিক কলেজে তার ‘চিকিৎসা’ করাচ্ছিলেন। ওই সময় মালেগাঁও বোমা বিস্ফোরণের মামলায় সম্পৃক্ত সরকারি উকিল রোহিনী শৈলান ২০১৫ সালে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন এই তথ্য দিয়ে যে, এনআইএর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মালেগাঁও বোমা বিস্ফোরণ মামলার অপরাধীদের সাথে কোমল ব্যবহারের জন্য তার ওপর অব্যাহত চাপ দিয়ে যাচ্ছেন। অবশ্য এনআইএ ওই অভিযোগকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। তবে পরবর্তীকালে রোহিনী শৈলান চাপ সৃষ্টিকারী কর্মকর্তাদের নাম প্রকাশ করে দিয়ে ওই মামলা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। সাধ্বী প্রজ্ঞার জামিনে মুক্তির পর তিনি মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, এমন পদক্ষেপে তিনি বিস্মিত হননি। কেননা এনআইএ প্রজ্ঞারই ইশারায় কাজ করছে।
আমরা আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, এনআইএ ১৩ মে, ২০১৬ যে চার্জশিট দাখিল করেছিল, তাতে সাধ্বী প্রজ্ঞা ঠাকুরের বিরুদ্ধে সব অভিযোগ উহ্য রাখা হয়েছিল। তারই ভিত্তিতে ২৩ মে, ২০১৬ সাধ্বী যখন সেশন আদালতে জামিনের জন্য আপিল করেন, তখন এনআইএ তার বিরোধিতা করেনি। তবু ২৮ জুন, ২০১৬ সেশন আদালত এ বলে আপিল খারিজ করে দেন যে, সাধ্বীর বিরুদ্ধে আগে থেকেই প্রমাণ বিদ্যমান রয়েছে। সাধ্বীর উকিলরা সাহস হারাননি। তারা ২২ আগস্ট, ২০১৬ মুম্বাই হাইকোর্টে সেশন আদালতের রায়কে চ্যালেঞ্জ করেন, যেখানে গত ২৫ এপ্রিলে তাকে জামিনে মুক্তি দিতে গিয়ে উচ্চ আদালত বলেন, আপাতদৃষ্টিতে ৪৪ বছর বয়সী সাধ্বী প্রজ্ঞার বিরুদ্ধে কোনো শক্ত মামলা দায়ের করা হয়নি। উল্লেখ্য, হাইকোর্ট সাধ্বী প্রজ্ঞাকে জামিনে মুক্তি দিয়েছেন, তবে এ মামলার অপর আসামি কর্নেল পুরোহিতের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোকে আপাতদৃষ্টিতে সঠিক আখ্যা দিয়ে জামিন দিতে অস্বীকার করেন। আমরা আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, কর্নেল পুরোহিত সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকাবস্থায় অভিনব ভারত নামের সংগঠনের আওতায় হিন্দু রাষ্ট্র কায়েমের জন্য রীতিমতো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কর্নেল পুরোহিত তার স্বপ্নের লজ্জাকর বাস্তবায়নের জন্য নতুন দিল্লিতে অবস্থিত ইসরাইলের দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ করে হিন্দুরাষ্ট্রের প্রথম প্রবাসী সরকারের হেডকোয়ার্টার তেল আবিবে খোলার অনুমতি প্রার্থনা করেন। এসব কথা পুরোহিতের গ্রেফতারির পর সবিস্তারে মিডিয়ায় এসেছিল। আদালত পুরোহিতের আবেদন প্রত্যাখ্যান করে বলেন, আমাদের সুচিন্তিত মতে, পুরোহিতের বিরুদ্ধে রেকর্ডে আপাতদৃষ্টিতে প্রয়োজনের বেশি প্রমাণ বিদ্যমান রয়েছে। আদালত এ প্রতিক্রিয়াও ব্যক্ত করেন যে, ‘পুরোহিতের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ মারাত্মক ধরনের। তিনি ভারতের ঐক্য ও অভিন্নতার বিরুদ্ধে লড়াই বাধানোর কাজে লিপ্ত ছিলেন। আর তিনিও বোমা বিস্ফোরণের মতো মারাত্মক কর্মকাণ্ডে জড়িত, যাতে জনগণের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা যায়।’ এনআইএর পক্ষ থেকে সরবরাহকৃত চার্জশিটের বরাত দিয়ে বিচারকরা বলেন, ‘পুরোহিত তাদেরই একজন, যারা হিন্দুরাষ্ট্রের জন্য উগ্রবাদী পতাকার সাথে পৃথক সংবিধান রচনা করেছিল। তিনি মুসলমানদের পক্ষ থেকে হিন্দুদের ওপর ‘অত্যাচারের বদলা’ গ্রহণের ব্যাপারেও চিন্তাভাবনা করেছিলেন।’
উল্লেখ্য, উগ্র সন্ত্রাসবাদের ঘটনাগুলোর সাথে জড়িত সবাই ‘অভিনব ভারত’ নামে উগ্রবাদী সন্ত্রাসী সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত, যারা তাদের সদস্যদের পুরোদস্তুর সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়। সাধ্বী প্রজ্ঞাকে ওই সংগঠনের দায়িত্বশীল সদস্য বলা হয়। ওই সংগঠন মুসলমানদের ওপর ‘বদলা’ নেয়ার জন্য ভারতের কয়েকটি অংশে সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। তন্মধ্যে রয়েছে মালেগাঁওয়ের জামে মসজিদ, হায়দরাবাদের মক্কা মসজিদ, আজমীরের খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতী রহ.-এর দরগা এবং সমঝোতা এক্সপ্রেসে সংঘটিত অত্যন্ত ভয়ানক বোমা বিস্ফোরণ, যেখানকার সব নিহত ব্যক্তিই মুসলমান। এখন যেভাবে ওই সব বোমা বিস্ফোরণের অপরাধীদের একের পর এক সব অভিযোগ থেকে মুক্তি দেয়া হচ্ছে, তাতে এ কথাই প্রমাণিত হয়, এনআইএ সঙ্ঘ পরিবারের কপাল থেকে উগ্র সন্ত্রাসবাদের দাগ মেটানোর চেষ্টায় লিপ্ত। এক দিকে, এনআইএ সারা ভারতে আইএসের মতো ভয়ানক সন্ত্রাসী সংগঠনের প্রতি ‘সমবেদনা’ প্রকাশকারী মুসলিম যুবকদের গ্রেফতার করছে; অপর দিকে তারা উগ্র সন্ত্রাসবাদের কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ওই অপরাধীদের বেকসুর প্রমাণে ব্যস্ত, যাদের বিরুদ্ধে জানবাজ পুলিশ অফিসার হেমন্ত কারকারে শক্ত প্রমাণ জোগাড় করেছিলেন। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, ভারতে ইনসাফের ক্ষেত্রে দুই ধরনের নীতি অবলম্বন করা হচ্ছে। সন্ত্রাসকে যেকোনো মূল্যে উৎখাতের শপথ গ্রহণকারী সরকারের এ কর্মধারা বুঝে ওঠা কঠিন। যদি সন্ত্রাস নির্মূলের দু’মুখো নীতি অবলম্বন করা হতে থাকে, তাহলে এ পুরনো দাগ নিরসন কখনো সম্ভব হবে না। হ
মুম্বাই থেকে প্রকাশিত দৈনিক উর্দু টাইমস ৩০ এপ্রিল, ২০১৭ থেকে উর্দু থেকে ভাষান্তর ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
ahmadimtiajdr@gmail.com
লেখক : ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫