ঢাকা, বুধবার,২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

রক্তচোষা-২

সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক

১৬ মে ২০১৭,মঙ্গলবার, ১৯:২৪


সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম

সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম

প্রিন্ট

কে কার রক্ত চোষণ করছে?
গত সপ্তাহের কলামের বিষয়বস্তু ছিল অর্থপাচার। আজকেও অর্থপাচার ও দুর্নীতি নিয়ে লিখব। পাচারকৃত অর্থ বাংলাদেশের অর্থনীতি থেকেই চলে যাচ্ছে। অর্থনীতি একটি দেশের প্রাণ; অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মানুষের প্রাণ; একটি শরীরে যেমন রক্ত সঞ্চালন থাকে তেমনই অর্থনীতিতেও লেনদেন হচ্ছে রক্ত সঞ্চালনের মতো। আত্মীয় বা বন্ধুর জন্য প্রতি তিন মাসে এক ব্যাগ রক্ত দান করা ভালো জিনিস। কিন্তু মাদকে আসক্ত ব্যক্তিরা মাদক সেবনের জন্য অর্থ আহরণের জন্য নিজেদের শরীরের দূষিত রক্ত বিক্রি করতে থাকে ঘন ঘন; তিন মাস বলে কোনো কথা তাদের ডিকশনারিতে নেই। আবার কিছু লোক আছে যারা মানুষের রক্ত নিয়ে কারবার করে; ওই মানুষগুলোকে বন্দী রাখে; এবং ওই বন্দী মানুষগুলো থেকে রক্ত নিয়ে বিক্রি করে; বন্দী মানুষের সম্মতি ব্যতিরেকেই; তিন মাসের কোনো বাছবিচার না করে। উভয় ক্ষেত্রেই, এটা রক্ত শোষণ বা রক্ত চোষণ বা রক্ত লুণ্ঠন বলে অভিহিত করা যায়। অর্থনীতি থেকেও এরকমভাবে টাকা চোষণ বা শোষণ বা লুণ্ঠন করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ভদ্র ভাষায় বলা হচ্ছে অর্থপাচার। এ বিষয়েই, গত সপ্তাহের কলামে লিখেছিলাম, আজকের কলামে আরেকটু লিখব। গত সপ্তাহের কলাম ৩ মে এবং ৪ মে ২০১৭ ইংরেজি তারিখের বিভিন্ন পত্রিকার সংবাদের শিরোনাম উদ্ধৃত করেছিলাম।

অতীতে প্রকাশিত অর্থপাচারের সংবাদ
গত সপ্তাহের কলাম প্রকাশিত হওয়ার পর, ঘটনাক্রমে আমি কিছু পুরনো পত্রিকা খুঁজে পেলাম আমার ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে। ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসের ১০ তারিখে ঢাকা থেকে প্রকাশিত অনেক পত্রিকায় বড় বড় শিরোনাম আছে (বা ছিল); মাত্র তিনটি উদ্ধৃত করছি। বণিক বার্তা নামক অর্থনীতি ও বাণিজ্যবিষয়ক পত্রিকায় প্রথম পৃষ্ঠার শিরোনাম ছিল ‘এক বছরে অর্থপাচার ১০০০ কোটি ডলার।’ সমকাল পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠার শিরোনাম ছিল, এক বছরে ৭৫ হাজার কোটি টাকা পাচার: ১৪৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ২৬ নম্বরে।’ যুগান্তর পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠার শিরোনাম ছিল, ‘১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে পাচার সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি ডলার।’ যুগান্তরে দেয়া বর্ণনা মোতাবেক, বাংলাদেশ থেকে ১০ বছরে পাচার হয়েছে ৫ হাজার ৫৮৭ কোটি ডলার যেটা প্রায় চার লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকার সমান; যেটা বাংলাদেশের বর্তমান (অর্থাৎ ২০১৪-১৫) বছরের বাজেটের দেড় গুণ।
যুগান্তরের ভাষ্য মোতাবেক আলোচ্য ১০টি বছরে, প্রতি বছর গড়ে পাচার হয়েছে, ৪৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। বছর বছর পাচারের হার বাড়ছে। শুধু ২০০৪ সালে ৩৩৪ কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থপাচার হয়। ক্রমেই এর হার বেড়েছিল। ২০০৫ সালে ৪২৬ কোটি ডলার, ২০০৬ সালে ৩৩৭ কোটি ডলার, ২০০৭ সালে ৪০৯ কোটি ডলার, ২০০৮ সালে ৬৪৪ কোটি ডলার, ২০০৯ সালে ৬১২ কোটি ডলার, ২০১০ সালে ৫৪০ কোটি ডলার, ২০১১ সালে ৫৯২ কোটি ডলার, ২০১২ সালে ৭২২ কোটি ডলার এবং ২০১৩ সালে এসে সেই পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৬৬ কোটি ডলার। ২০১৩ সালে পাচারকৃত অর্থের মূল্যমান বা সমপরিমাণ টাকা হচ্ছে প্রায় ৭৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকা; এবং ২০১৩ সালে পাচারকৃত অর্থটি আগের বছরের পাচার করা অর্থের তুলনায় ৩৪ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ ২০১২ সালে যদি ১০০ টাকা পাচার হয়ে থাকে, তাহলে ২০১৩ সালে পাচার হয়েছে ১৩৪ টাকা।
আমরা জিএফআইর প্রতিবেদনের সূত্র ধরে কিছু তথ্য ওপরে উল্লেখ করেছি। আমি এই কলাম লেখার জন্য, ১০ ডিসেম্বর ২০১৫ তারিখের পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সাহায্য নিয়েছি। জিএফআইর সূত্র ছাড়াও আরো অনেক সংস্থাই, অর্থপাচার নিয়ে তথ্য বা বক্তব্য রেখেছে। ১০ ডিসেম্বর ২০১৫ তারিখের বণিক বার্তায় প্রকাশিত বিবরণ মোতাবেক, ২০১৪ সালের জুন মাসে ইউএনডিপি কর্তৃক প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনেও বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচারের সংবাদ উল্লেখ ছিল। ইউএনডিপির ওই প্রতিবেদন মোতাবেক, স্বাধীনতার পর চার দশকে অর্থাৎ ২০১০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ প্রায় তিন লাখ কোটি টাকা; যেটা বাংলাদেশের জিডিপির আকারের প্রায় ৩০.৪ শতাংশ; আর মাত্র ৩ শতাংশ বেশি হলেই এটা জিডিপির তিন ভাগের এক ভাগের সমান হতো।
বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচারের কারণ মূলত তিনটি। এর মধ্যে প্রধান হচ্ছে দুর্নীতি। দুর্নীতি বেড়েছে বলে অর্থপাচারও বেড়েছে। এ ছাড়া দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ না থাকা, দেশে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিরাজ করা ও দেশে নিরাপত্তাহীনতার কারণেও অর্থপাচার বাড়ছে। অর্থপাচার রোধ করতে হলে, দুর্নীতি কমিয়ে আনার বিকল্প নেই; বিনিয়োগের পরিবেশ ফিরিয়ে আনার বিকল্প নেই; নাগরিক জীবনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

দুর্নীতির সংবাদের উদাহরণ
অনেক উদাহরণ দেয়া যাবে, মাত্র কয়েকটি উল্লেখ করছি; সংবাদপত্র থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে। এক. যুগান্তর, তারিখ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৫, শিরোনাম: ‘দুই হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ।’ পত্রিকা মোতাবেক, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন তথা ডিএনসিসি ২০১২-২০১৪ অর্থবছরে উন্নয়ন প্রকল্প
বাস্তবায়নে সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। ব্যয়ের ক্ষেত্রে যথাযথ নিয়ম মানা হয়নি। বিল-ভাউচারে রয়েছে ব্যাপক গরমিল। বিধিবিধান এবং বাস্তবতাবিবর্জিত চুক্তি বাস্তবায়ন করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে একচেটিয়া আর্থিক সুবিধা দেয়া হয়েছে। দুই. যুগান্তর, তারিখ : ১২ অক্টোবর ২০১৫, শিরোনাম : ‘অগ্রণী ব্যাংক পর্ষদের জালিয়াতি: ফেরত পাবে না জেনেও ২৬ কোটি টাকা ঋণ!’ পত্রিকা মোতাবেক, কোম্পানির উৎপাদন নেই, লেনদেন নেই, টার্মওভার বা আয়ও নেই, শাখার কোনো সুপারিশও নেই, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদনও নেই; তবুও ঋণ পেয়েছে চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানি (বিডি) লিমিটেড নামক একটি প্রতিষ্ঠান; টাকার পরিমাণ ২৬ কোটি টাকা। তিন. যুগান্তর, তারিখ : ১৬ নভেম্বর ২০১৫, শিরোনাম : ‘গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে ৬৯১ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলা।’ পত্রিকা মোতাবেক, বেসরকারি মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোন ও এই প্রতিষ্ঠানের শীর্ষপর্যায়ে পাঁচজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ৬৯১ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আদালতে নালিশি মামলা করেছেন প্রতিষ্ঠানটির শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের পাঁচজন কর্মচারী। মামলার আবেদনে বলা হয়, বিবাদিরা গ্রামীণফোন ওয়ার্কার্স প্রফিট ফান্ড অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার ফান্ডের ১৩০০ কর্মচারীর প্রায় ৭০০ কোটি টাকা দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করেন। চার. যুগান্তর, তারিখ : ২২ নভেম্বর ২০১৫, শিরোনাম: ‘টেলিনরের ৭ হাজার কোটি টাকা পাচার অনুসন্ধানে দুদক।’ পত্রিকা মোতাবেক, গ্রামীণফোন কোম্পানির মূল প্রতিষ্ঠান টেলিনরের বিরুদ্ধে প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। দুদক সূত্র মোতাবেক কৃত্রিমভাবে লভ্যাংশ বেশি দেখিয়ে গ্রামীণফোনের মূল প্রতিষ্ঠান টেলিনর, বাংলাদেশ থেকে ৬৭০০ কোটি টাকা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। অনুমোদনহীন প্রত্যাহারের এই অর্থপাচার, বাংলাদেশে বিরাজমান আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ। পত্রিকা মতে, দেশে গ্রামীণফোনের মোট বিনিয়োগ ২৬ হাজার কোটি টাকা হলেও এই অর্থের বেশির ভাগই বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ হিসেবে গ্রহণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। পাঁচ. যুগান্তর, তারিখ : ১৮ জানুয়ারি ২০১৬, শিরোনাম: ‘বছরে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি লোপাটের অভিযোগ : জ্বালানি তেলে ৮০ ভাগই লাভ।’ পত্রিকা মোতাবেক, জ্বালানি তেল বিক্রি করে ৮০ ভাগ মুনাফা করছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন; কিন্তু ঘোষণা করছে এর অর্ধেকেরও কম। বাকি টাকা নানাভাবে লোপাট হচ্ছে এবং মূলত এরূপ লুটপাটের কারণেই জ্বালানি তেলের দাম কমানোও হচ্ছে না। ছয়. যুগান্তর, তারিখ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, শিরোনাম : ‘পচা গম আমদানি : শত কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ আদায়ের সুপারিশ।’ পত্রিকা মোতাবেক, বাংলাদেশে পচা গম আমদানি হয়েছিল। খাদ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির দাবি মোতাবেক, নিয়ম না মেনেই আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আগেই ৯০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। গমগুলো পচা হওয়ার কারণে, বাস্তবে আর্থিক মূল্য কম কিন্তু পরিশোধিত মূল্য দেখানো হয়েছে বেশি। সাত. বণিক বার্তা, তারিখ : ৮ নভেম্বর ২০১৫, শিরোনাম : ‘না দেয়ার সুপারিশ সত্ত্বেও ৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ।’ পত্রিকা মোতাবেক, এটা বেসিক ব্যাংকের বিভিন্ন শাখার ঘটনা। লোন হিসেবে প্রদান করা এই পরিমাণ টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে প্রচুর সন্দেহ বিদ্যমান। আট. বণিক বার্তা, তারিখ : ৪ জানুয়ারি ২০১৬, শিরোনাম : ‘ফারমার্স ব্যাংক : যাত্রার তিন বছরেই ৪০০ কোটি টাকার ঋণ অনিয়ম।’ পত্রিকা মোতাবেক, বিভিন্ন ভুয়া প্রতিষ্ঠানকে বা পরিচিত বিভিন্ন ব্যক্তিকে বেনামে লোন দেয়া হয়েছে। পত্রিকা মোতাবেক লোনের টাকাগুলো ফেরত পাওয়া সন্দেহজনক। নয়. বণিক বার্তা, তারিখ : ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, শিরোনাম : ‘সোনালী ব্যাংকে ডাকাতি, বেসিকে লুট হয়েছে।’ ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ তারিখে ঢাকা মহানগরীর একটি বিখ্যাত হোটেলে, দেশের অন্যতম রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক জনতা ব্যাংক লিমিটেডের বার্ষিক সম্মেলন ২০১৬ অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি তার বক্তৃতায়, বাংলাদেশের আর্থিক জগতের অবস্থার ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে, বিভিন্ন ব্যাংকের পারফর্ম্যান্স বা কর্মফলের বর্ণনা করতে গিয়ে উদাহরণ দেন; উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সোনালী ব্যাংকে যা হয়েছে সেটা ডাকাতি এবং বেসিক ব্যাংকে যা হয়েছে সেটা ব্যাংক লুট। এই কথাগুলোকেই পত্রিকা শিরোনাম করেছে : ‘সোনালী ব্যাংকে ডাকাতি, বেসিকে লুট হয়েছে।’ আমরা কিছু দুর্নীতির উদাহরণ দিয়েছি পত্রিকার শিরোনাম দেখে দেখে। যতসংখ্যক উদাহরণ পত্রিকায় সংবাদ হিসেবে ছাপা হয়, তার থেকে হাজার গুণ বেশি ঘটনা বা উদাহরণ ছাপা হয় না। আমার সীমিত জ্ঞান দিয়েও আমি অন্তত ১০০ প্রকারের দুর্নীতির উদাহরণ লিপিবদ্ধ করতে পারব; কিন্তু দু-তিনটি মাত্র উল্লেখ করছি পরের অনুচ্ছেদগুলোতে। তার আগে সাম্প্রতিককালে ভীষণভাবে আলোচিত বনানীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনার রেশ ধরে একটু আলোচনা করছি।

বনানীর ধর্ষণ ঘটনা ও টাকা
গত বুধবার ১০ মে তারিখের কলামে এবং আজকের কলামেও ইতোমধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অর্থপাচারের অন্যতম কারণ দুর্নীতি। একটু ব্যাখ্যা করি। মানুষ মাত্রই সম্পদ সংগ্রহে আগ্রহী। প্রত্যেক মানুষই পরিশ্রম করবে, নিজ যোগ্যতা অনুযায়ী অর্থ উপার্জনের সুযোগ গ্রহণ করবে এটাই সমাজের স্বাভাবিক অবস্থার বর্ণনা। কিন্তু সমাজ থেকে যদি স্বাভাবিক অবস্থা বিতাড়িত হয়ে অস্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করে, তাহলে ফলাফলও অস্বাভাবিক হবে। আজ বুধবার ১৭ মে ২০১৭ থেকে তিন দিন আগে অর্থাৎ রোববার ১৪ মে তারিখে মানবজমিন এবং যুগান্তর পত্রিকায় প্রথম পৃষ্ঠার শিরোনামের প্রতি আমি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। মানবজমিন পত্রিকায় লাল ব্যাকগ্রাউন্ড (বা জমিনের ওপর) তিনজন যুবকের ছবিসহ, সাদা অক্ষরে বড় করে শিরোনাম দেয়া হয়েছে এরূপ : ‘পার্টি, ইয়াবা, নারী : লাগামহীন জীবন ওদের।’ যুগান্তরের প্রথম পৃষ্ঠায় ওপরের অর্ধেকে বড় শিরোনাম ছিল এরকম : ‘দুই শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ : সাফাতের হাতখরচ দিনে দুই লাখ টাকা।’ বিখ্যাত স্বর্ণালঙ্কার বিক্রয়ের দোকান ‘আপন জুয়েলার্স’-এর মালিক দিলদার আহমেদের ছেলে (ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত) সাফাত আহমেদ, রিমান্ডের প্রথম দিনেই গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে বলেছে, প্রতিদিন তার বাবা তাকে দুই লাখ টাকা হাতখরচ দিতেন। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন করতে পারি, মাসে ৬০ লাখ টাকা ফুর্তি করে ওড়ানোর জন্য যেই পিতা দিতেন সেই পিতার কি টাকার প্রতি মায়া ছিল? ৯ মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা পাওয়া এই বাংলাদেশে লাখ লাখ গরিব ছাত্র যেখানে টাকার অভাবে লেখাপড়া করতে পারে না, সেখানে একজন ছেলে ৬০ লাখ টাকা মাসে খরচ করে ফুর্তিতে! এরূপ ব্যক্তিমালিকানা এবং এরূপ ব্যক্তিস্বাধীনতা দ্বীন ইসলামের মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বা মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যথেষ্ট কারণ আছে আমাদের সন্দেহ করার যে, এই আপন জুয়েলার্স স্বর্ণ চোরাচালানকারীদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে এবং অনৈতিক ও অবৈধ পন্থায় টাকা উপার্জন করে বিধায় টাকার প্রতি মায়া কম; এবং মায়া কম বিধায় যেমন খুশি তেমন খরচ করার জন্য ছেলের হাতে দেয়া হয়।

দুর্নীতি প্রসঙ্গে আরো আলোচনা
অফিস-আদালতে গেলে একটি ফাইল এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে নিতে হলে অথবা ফাইলে নিজের পক্ষের জেনুইন কথা লেখাতে হলেও ঘুষ দিতে হয়; এটা দুর্নীতি। দেশের আমদানি-রফতানি প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফাঁকে ফাঁকে যেই দুর্নীতি হয়, সেই প্রসঙ্গে বিভিন্ন পত্রিকায় অনেক প্রকারের সংবাদ বের হয়েছে; যদিও নাম-নমুনা উল্লেখ করছি না। এই যে অতিরিক্ত টাকা রফতানিকারক বা আমদানিকারকরা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি চাকরিজীবীরা নিজেদের পকেটে সঞ্চয় করেন, সেটার কী গতি হবে? অথবা মনে করুন আপনি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতা। আপনি অনেক বিষয়ে তদ্বির করেন চাকরি পাইয়ে দেয়ার জন্য, মামলা থেকে মুক্তি দেয়ার জন্য, চার্জশিট থেকে নাম বাদ দেয়ার জন্য, সরকারি বরাদ্দ পাওয়ার জন্য, সরকারের বড় টেন্ডার পাওয়ার জন্য ইত্যাদি ইত্যাদি। বাংলাদেশে বড় বড় উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে; এই প্রকল্পগুলোতে প্রকল্পব্যয় ধারাবাহিকভাবে কিছু দিন পরপর বৃদ্ধি পাচ্ছে; এই প্রকল্পগুলোতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু ‘লভ্যাংশ’ বা ‘উপার্জন’ থাকে বলে মানুষের সাধারণ বিশ্বাস। এই যে টাকাগুলো কামাই করা হলো, এই টাকা দিয়ে কী করা হবে? এই টাকা বৈধ ইনকাম নয়। এই আয়গুলো অপ্রদর্শিত আয় নয়। এরূপ অপ্রদর্শিত আয়, অনেক রাজনৈতিক নেতা, সরকারি কর্মকর্তা, বড় বড় ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের থাকে।

অবৈধ ইনকামের গন্তব্যস্থল
এই অপ্রদর্শিত আয় দেশে বৈধভাবে প্রদর্শন করা যায় না বা ব্যবহার করা যায় না; বেনামীতে স্ত্রী, শ্যালিকা, ভাই, অফিসের কর্মচারী, শ্বশুর, গ্রাম্য সম্পর্কের চাচা, মানসিক প্রতিবন্ধী, জ্ঞাতি ভাই ইত্যাদির নামে সম্পদ কেনা যায়। সেটাও পুরোপুরি নিরাপদ নয়। সে জন্য এই অবৈধ ইনকামের নিরাপদ গন্তব্যস্থল হচ্ছে বিদেশ। বিদেশে টাকাটা কী রকম ব্যবহার হয়? অনেক দিন ধরে শুনে আসছি কিছু কথা; ওই কথার সূত্র ধরে একটি সুপরিচিত নামের আলোচনায় আসি। নামটি হচ্ছে বেগমগঞ্জ। বিদেশে এরূপ টাকা দিয়ে বাড়ি কেনা হয়। কানাডার একটি বড় শহরে একটি এলাকায় বাংলাদেশের অনেক বড় বড় (বেশির ভাগ ক্ষমতাসীন) রাজনৈতিক নেতা কর্তৃক এবং বড় বড় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্তৃক বাড়ি কেনা হয়েছে। বাড়িগুলো বেশির ভাগ কেনা হয়েছে স্ত্রী, ভগ্নি বা শ্যালিকার নামে। স্ত্রীকে অনেক সময় বেগম বলা হয়। সে জন্য কানাডার ওই এলাকাটির সাংবাদিকতা জগতের বা আলাপচারিতার জগতে অনানুষ্ঠানিক ডাকনাম বেগমগঞ্জ। বেগমগঞ্জ আসলেই, বৃহত্তর নোয়াখালীর একটি থানার নাম। কানাডায় বেগমদের বাড়ির গঞ্জ হিসেবে, এলাকাটির নাম হয়েছে বেগমগঞ্জ। এখন মালয়েশিয়া প্রসঙ্গে আলোচনা করি। মালয়েশিয়া নামক দেশে একটি প্রক্রিয়া আছে যেটার নাম সেকেন্ড হোম। আপনার ফার্স্ট হোম বা প্রথম বাড়ি হলো বাংলাদেশ। মালয়েশিয়াতে যদি আপনি বাড়ি কেনেন তাহলে সেটা হবে আপনার সেকেন্ড হোম বা দ্বিতীয় বাড়ি। সেকেন্ড হোম করলে, মালয়েশিয়ানদের মতো ব্যবসাবাণিজ্য করতে পারবেন, সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। কানাডায় বা মালয়েশিয়ায় বাড়ি কিনতে হলে বাংলাদেশী টাকায় কেনা যাবে না। লাগবে ডলার। সেই ডলার কোথায় পাওয়া যাবে? অবৈধ ইনকামের টাকা দিয়ে অবৈধভাবে ডলার কিনতে হবে। যেমন মালয়েশিয়ার রাজধানীতে অথবা সৌদি আরবের রাজধানীতে অথবা ইতালির রাজধানীতে চাকরি করেন একজন বাঙালি; এই বাঙালি তার গ্রামের বাড়িতে পরিবারের কাছে টাকা পাঠাবেন পাঁচ লাখ (উদাহরণস্বরূপ মাত্র); আপনি আপনার তহবিল থেকে পাঁচ লাখ টাকা তার পরিবারকে দিয়ে দিলেন; ওই বাঙালি আপনাকে পাঁচ লাখ টাকার সমপরিমাণ ডলার ওই বিদেশী রাজধানীতে হাতে হাতে দিলো। আপনার কাজও হলো,পরিশ্রমী বাঙালির কাজও হলো, পরিবারের কাজও হলো এবং দুর্নীতিও প্রশ্রয় পেল, আশ্রয় পেল। আমি অতি সাধারণ বা সহজ উদাহরণ মাত্র এই অনুচ্ছেদে উপস্থাপন করলাম। পৃথিবীটা এত সহজ বা সরল নয়, সব মানুষের ব্রেইন এত সহজ বা সরল নয়, সব মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা এত সহজ বা সরল নয়, সে জন্যই দুর্নীতির ডালপালা ছড়াতে সময় লাগে না।

উপসংহার বা সমাপনী বক্তব্য
আমরা দু’টি পত্রিকার শিরোনামকে উপলক্ষ করে, একটুখানি আলোচনা করলাম সমাজচিত্রের উদাহরণস্বরূপ মাত্র। যেই টাকা বাংলাদেশে ফুর্তি-ফার্তি করে খরচ করা যাচ্ছে সেটার কথা বাদ দিলাম। যেই টাকা বাংলাদেশে খরচ করা যাচ্ছে না, সেটা কোথায় যায়? সেটা পাচার হয়ে যায়। দুর্নীতির মাধ্যমে বড়লোক হওয়া, দুর্নীতির মাধ্যমে গাড়ি-বাড়ি, জায়গা-সম্পত্তি করা, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ ব্যয় করে দানবীর সেজে যাওয়া, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ ব্যয় করে বড়লোকের সঙ্গে আত্মীয়তা সৃষ্টি করে অথবা দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ ব্যয় করে উচ্চস্তরের রাজনৈতিক নেতাদেরকে হাত করার মাধ্যমে সমাজে প্রতিপত্তি স্থাপন করা বা সমাজে একজন ‘গণ্যমান্য’ হয়ে যাওয়া এখন রেওয়াজে পরিণত হয়েছে, এখন ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে, এখন প্রগতিশীলতায় পরিণত হয়েছে, এখন অগ্রসর চিন্তার প্রতিফল হিসেবে পরিণত হয়েছে! দুর্নীতি করা যেন এখন ফরজ কাজ; সৎ থাকা এখন গোপন কাজ! দুর্নীতি করা এখন সাহসের কাজ, সৎ থাকা এখন ভয়ের কাজ! এই অবস্থার পরিবর্তন করতেই হবে। দুর্নীতি ও অর্থপাচার পরস্পরের যমজ ভাই; এদের চিকিৎসা এক সঙ্গে করতে হবে।
লেখক: মেজর জেনারেল অব:; চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণপার্টি
www.generalibrahim.com

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫