ঢাকা, শনিবার,২৭ মে ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহার

প্রকৌশলী এস এম ফজলে আলী

১৬ মে ২০১৭,মঙ্গলবার, ১৯:২১


প্রকৌশলী এস এম ফজলে আলী

প্রকৌশলী এস এম ফজলে আলী

প্রিন্ট

ভারত পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের হিসাব মোতাবেক দেশটি প্রাকৃতিক বিভিন্ন উৎস থেকে (বৃষ্টি, জলপ্রপাত ও নদী) প্রতি বছর ছয় হাজার ৫০০ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি পেয়ে থাকে। সারা বছরের সব কাজের জন্য সর্বোচ্চ মোট ৯০০ বিলিয়ন ঘনমিটার পানির প্রয়োজন ভারতের। এক হিসাবে ভারত এ পানি দিয়ে ২০২৫ সাল নাগাদ কোনো সমস্যা ছাড়াই চালাতে পারবে। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, তারা যে পানি পাচ্ছে, তার মাত্র শতকরা ১৫ ভাগ কাজে লাগাতে পারছে। এটা দিয়ে জলসেচ, শিল্প, গৃহস্থালি ও অন্যান্য সব কাজ সারতে পারে। এর পরও একতরফাভাবে যৌথ নদীগুলোতে ব্যারাজ, স্লুইস গেট, মাটির বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার করে চলেছে এবং শুষ্ক মওসুমে বাংলাদেশকে একরকম শুকিয়ে মারছে। যৌথ নদী কমিশনের হিসাবে আন্তঃনদীর সংখ্যা ৫৭টি। এর মধ্যে ভারত থেকে ৫৪টি এবং মিয়ানমার থেকে তিনটি নদী বাংলাদেশে এসেছে।
গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, দুধকুমার, ধরলা ও মহানন্দাসহ হিমালয় অঞ্চলের অভিন্ন নদী ও উপনদীতে ৫০০টিরও অধিক বাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে ভারতে ৪৫০টি, নেপালে ৩০টি এবং ভুটানে ২০টি বাঁধ দেয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পে বাংলাদেশকে অংশীদার করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল জেআরসির মাধ্যমে। কিন্তু ভারত তা প্রত্যাখ্যান করেছে। সমন্বিতভাবে এ প্রকল্পগুলো কার্যকর করলে প্রচুর জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেত। এভাবে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। তাতে ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের বিদ্যুতের চাহিদার অনেকটাই পূরণ করা যেত। এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপালে কয়েকটি উঁচু ড্যাম করে এ বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এর জন্য বিশ্ববাংক, এডিবি এবং আইএমএফ আর্থিক সহায়তা দিতে আগ্রহী। ভারত-পাকিস্তান অভিন্ন সিন্ধু নদের পানি আন্তর্জাতিক বিধান মেনে এভাবেই ভাগাভাগি করে ব্যবহার করা হচ্ছে। দুই বৈরী দেশও কিভাবে যৌথ নদীর পানি ব্যবহার করে উপকৃত হচ্ছে, তার একটা উদাহরণ এটি। আর ভারতের সাথে বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালের তেমন রাজনৈতিক মতপার্থক্য নেই, অথচ ভারতের বৈরিতার কারণেই যৌথ নদীব্যবস্থাপনা আজো হলো না। এমনকি, যে নেপালে জলবিদ্যুৎ উৎপন্ন হবে তাকে বিদ্যুতের অংশ দিতেও ভারত নারাজ। এ ধরনের প্রতিবেশীর সাথে যৌথভাবে কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা দুরূহ।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মাথাভাঙ্গা, বেতনা, সোনামুখী, ভৈরব, রায়মঙ্গল, ইছামতি- এ ছয়টি অভিন্ন নদী রয়েছে ভারতের সাথে। এগুলোর ওপর নির্ভর করে সাতক্ষীরা, যশোর, ঝিনাইদহ জেলার কৃষি ও নাব্যতা। ভারতের নদীয়া জেলার গঙ্গারামপুরের আট কিলোমিটার ভাটিতে সীমান্তের প্রায় কাছাকাছি ভৈরব নদের উৎসমুখে একটি ক্রস ড্যাম নির্মাণ করা হয়েছে। উজানে ভৈরব নদ সংযুক্ত জলঙ্গী নদীতেও ভারত নির্মাণ করেছে একটি রেগুলেটর। এভাবে ভারত পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। ফলে ভাটিতে ভৈরব নদ মরে গেছে; পানি পাচ্ছে না কপোতাক্ষ নদ। কপোতাক্ষ নদ ভরাট হয়ে যাওয়ায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে স্থায়ী জলাবদ্ধতাসহ নানা মারাত্মক বিপর্যয় নেমে এসেছে। ওই অঞ্চলের লোকজন সারা বছর পানির মধ্যে বাস করতে বাধ্য হচ্ছে। তাদের চাষাবাদ প্রায় বন্ধ। রায়মঙ্গল নদী সাতক্ষীরার শ্যামনগর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ এবং ভারত ও বাংলাদেশকে বিভক্ত করেছে। ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ নদীতে ভারত নদী শাসন করে প্রবাহ বহুলালোচিত তালপট্টি দ্বীপের পূর্ব দিক দিয়ে প্রবাহিত করার কাজে তৎপর। তা করতে পারলে ১৯৪৭ সালে স্যার র‌্যাডক্লিফের উপমহাদেশ বিভাজনের সুযোগ নিয়ে তালপট্টি ভারতের অংশ বলে দাবি পাকাপোক্ত করতে পারবে নয়াদিল্লি। র‌্যাডক্লিফ রোয়েদাদ মোতাবেক নদীর মধ্যস্রোত দুই দেশের সীমানা বলে বিবেচিত হবে। এ দিকে কুনিয়া নামক স্থানে স্লুইস গেট করে পানি আটকে বেতনা ও কোদালিয়া নদীকে শুকনো খালে পরিণত করে প্রায় ২০০ বর্গকিলোমিটার ভূমির চাষাবাদ বন্ধ করে দিয়েছে ভারত।
বাংলাদেশের প্রধান নদী গঙ্গা-পদ্মা। এ নদীতে বর্ষা মওসুমে ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ পানি আসে নেপাল থেকে। আর শুকনো মওসুমে তা ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ। ১০ শতাংশ পানি আসে চীন থেকে, আর ২০ শতাংশ আসে ভারত থেকে। কিন্তু ভারত ফারাক্কা বাঁধসহ উজানে ৩০টি বাঁধ দিয়ে এর পানি প্রত্যাহার করছে। ফলে ফারাক্কা পয়েন্টে পানি অস্বাভাবিকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এ নদীতে ভারতের প্রাপ্য মাত্র ২০ শতাংশ পানি, অথচ শুষ্ক মওসুমে বলতে গেলে তারা গঙ্গার পুরো পানিই প্রত্যাহার করে কৃষি ও অন্যান্য কাজে ব্যবহার করছে। শুষ্ক মওসুমে বলতে গেলে বাংলাদেশ মোটেই পানি পাচ্ছে না। পদ্মা নদীর বুকে শত শত চর জেগে উঠেছে। হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নিচ দিয়ে শুষ্ক মওসুমে ট্রাক ও গাড়ি চলাচল করে। ১৯৭৫ সালে মাত্র ৪১ দিনের জন্য পরীক্ষামূলক ফারাক্কা বাঁধ চালু করার কথা বলে, তা আর কোনো দিন বন্ধ করেনি ভারত। ফলে দুই বছরের মধ্যেই শুকিয়ে যেতে থাকে পদ্মা। দুর্ভোগ শুরু হয় বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের। দেশের বৃহৎ সেচ প্রকল্প জিকে প্রকল্প আজ প্রায় পানিশূন্য। সে অঞ্চলের উপনদীগুলো মরে যাচ্ছে। জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। মিঠাপানির অভাবে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ অরণ্য সুন্দরবনের গাছ মরে যাচ্ছে। বিপদে পড়েছে বাংলাদেশের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ মানুষ।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের সাথে ৩০ বছরের যে ফারাক্কা পানিচুক্তি করেছে, তাতে গঙ্গার পুরো পানিপ্রবাহের হিসাব না করে শুধু ফারাক্কা পয়েন্টের পানি ভাগ করেছে। কিন্তু ভারত গঙ্গার উজানে বহু ক্রস-ড্যাম দিয়ে বিপুল পানি প্রত্যাহার করায় ফারাক্কা পয়েন্টে তেমন পানি থাকছে না। ফলে বাংলাদেশের প্রাপ্তি ঘটছে সামান্য। ভারত যদি সমতার ভিত্তিতে পানিচুক্তি করত, তাহলে বাংলাদেশ গঙ্গার মোট পানির ৪০ শতাংশ পেত। এখন ফারাক্কা পয়েন্টের ৬০ শতাংশ পানিও যদি বাংলাদেশকে ভারত দেয় তাতেও পদ্মার নাব্যতা রক্ষা করা যাবে না এবং জলসেচ ও অন্যান্য কাজের জন্য পানি পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। চুক্তির সাথে কোনো গ্যারান্টি ক্লজ না থাকায় ভারত এই সুযোগ নিচ্ছে। দূরদর্শী রাজনৈতিক নেতৃত্বের অভাবে বাংলাদেশ আজ বিপন্ন। গুগল আর্থ ম্যাপে দেখা যায়, বাংলাদেশে পদ্মা শুকিয়ে মরা নদীতে পরিণত হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রধান সীমান্ত নদী মহানন্দা। ভারত একতরফাভাবে বাঁধ দিয়ে সে নদীর পুরো পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। এতে রংপুর ও দিনাজপুর জেলার ৩৫টি নদী প্রায় মরে গেছে। শুষ্ক মওসুমে পানি থাকে না। আবার বর্ষায় ভারত বাঁধের সব রেগুলেটর খুলে দিয়ে বাংলাদেশে বন্যার সৃষ্টি করে। এখন আমরা উভয় সঙ্কটে। ভারত উজানের সব নদীতে রেগুলেটর দিয়ে পানি প্রত্যাহার করায় নওগাঁ এলাকার প্রায় ৬০০ বর্গকিলোমিটার জমি পানির অভাবে এখন বিরান। বরেন্দ্র অঞ্চল এতে ক্ষতিগ্রস্ত। আন্তঃদেশীয় নদী আত্রাইয়ের উৎপত্তি মাতৃনদী করতোয়া নদী থেকে। করতোয়ার উজানে জলপাইগুড়ি জেলার আমবাড়ি কালকাটায় একটি ব্যারাজ নির্মাণ করে পুরো পানি প্রত্যাহার করা হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের প্রায় ১২০০ বর্গকিলোমিটার এলাকার ছোট নদীগুলো পানিশূন্য হয়ে চাষাবাদে মারাত্মক বিঘœ সৃষ্টি করছে। করতোয়া নদীর একটা অংশ জলপাইগুড়ির গজলডোবার কাছে তিস্তা নদীতে মিলিত হয়েছে। ভারত সেখানে ব্যারাজ নির্মাণ করে তিস্তা নদীর পানি পুরোপুরি সরিয়ে নিতে চাচ্ছে। ভারত তিস্তা নদীর পানি নিয়ে চুক্তি করার কথা মুখে বললেও তারা আন্তরিক নয়। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা মুখোপাধ্যায়কে শিখণ্ডী বানিয়ে দিল্লি তিস্তা চুক্তি হতে দিচ্ছে না বলে অনেকে মনে করেন। তিস্তা চুক্তি আমাদের বাঁচা-মরার প্রশ্ন। বাংলাদেশ যে তিস্তা ব্যারাজ তৈরি করেছে তাতে রংপুর, দিনাজপুর ও বগুড়া অঞ্চলের প্রায় ৫০ লাখ হেক্টর জমিতে জলসেচ করার কথা। কিন্তু ভারত গজলডোবায় পানি আটকে দিয়ে আমাদের বৃহত্তম জলসেচ প্রকল্পটিকে ভয়াবহ হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে। শুধু গজলডোবায় নয়, তার উজানে তিস্তায় আরো পাঁচটি বাঁধ দিয়ে তারা পানি সরিয়ে নিচ্ছে। ভবিষ্যতে হয়তো ভারত ফারাক্কার মতো একটি চুক্তি করতে চাইতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ তা কিছুতেই মেনে নিতে পারে না।
এই সীমান্ত নদীগুলোর মধ্যে সর্ববৃহৎ হলো ব্রহ্মপুত্র। এটি চীনশাসিত তিব্বতের কৈলাশ শৃঙ্গে উৎপত্তির পর ভারতের অরুণাচল ও আসাম হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। দৈর্ঘ্য ২৯০০ কিলোমিটার। এ নদীতে ৪০ শতাংশ পানি চীন থেকে, ৪০ শতাংশ ভুটান-নেপাল এবং ২০ শতাংশ ভারত ও বাংলাদেশের বৃষ্টির পানি। চীন ইয়াংলুং-সাংপো প্রকল্পের আওতায় ব্রহ্মপুত্রের প্রায় সব পানি প্রত্যাহার করে নেবে। তারা উত্তরাঞ্চলের মরুভূমি গোবি অঞ্চলে সেচ প্রদান করবে। এই ব্যারাজের মাধ্যমে প্রায় ৮০ হাজার মেটাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনাও করছে। চীন যদি এককভাবে তার প্রকল্প চালিয়ে যায়, তাহলে তিব্বতের ভাটিতে আর পানি পাওয়া যাবে না। তখন ভারত, বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপাল মারাত্মক পানি সঙ্কটে পড়বে। তাই ভারতের উচিত ব্রহ্মপুত্র নদের পুরো অববাহিকার পানিব্যবস্থাপনার দিকে নজর দেয়া। বাংলাদেশের সাথে চীনের সুসম্পর্ক আছে। তাই ভারতের উচিত বাংলাদেশকে এ ব্যাপারে চীনের সাথে দূতিয়ালি করতে উৎসাহিত করা। বাংলাদেশ অবশ্যই নিজের স্বার্থে এ কাজ করবে। ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকায় ১২.০ লাখ হেক্টর জমি এবং এ অঞ্চলে ১০০ কোটি লোকের বাস। তাই ব্রহ্মপুত্র নদের যৌথ ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। এতে চীন, ভারত, নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশ উপকৃত হবে।
সীমান্ত নদী জিঞ্জিরাম, চিতলমারী, ভোগাই-কংশ, নিতাই, সোমেশ্বরী, যাদুকাটা, নয়াগাং ও উখিয়াম নামে বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও রংপুর অঞ্চলের নদীগুলোর উৎপত্তি মূলত মেঘালয়ের গারো পাহাড় ও খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়ে। শুকনো মওসুমে অস্থায়ী বাঁধ ও রেগুলেটর দিয়ে নদীগুলোর পানি সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। ফলে ভাটি অঞ্চলে নদীগুলো মরে যাচ্ছে। পুরনো ব্রহ্মপুত্র মরে যাচ্ছে।
সীমান্ত নদী সুরমা ও কুশিয়ারার মাতৃনদী হলো বরাক। ভারতের মনিপুর রাজ্যের তুইসুই ও তুইরাথং নদী দু’টির মিলিত স্রোতধারার নাম বরাক। নদী দু’টির মিলনস্থল থেকে ৫০০ মিটার পশ্চিমে মনিরামপুর রাজ্যের দুরাচাঁদপুরে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় টিপাইমুখ হাইড্রো ইলেকট্রিক বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। ভারত এখান থেকে ১৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। এর অবস্থান সিলেটের অমলশীদ সীমান্ত থেকে ১০০ কিলোমিটার উজানে। সঙ্কীর্ণ খিরিখাদে মাটি ও পাথরের নির্মিত বাঁধটি প্রায় ১৮০ মিটার উঁচু এবং ৫০০ মিটার দীর্ঘ। টিপাইমুখ ড্যামের ৯৫ কিলোমিটার উজানে ফুলেরতল নামক স্থানে আরেকটি বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা আছে ভারতের। এর মাধ্যমে শুষ্ক মওসুমে সেচের জন্য নিয়ে যাওয়া হবে বরাকের পানি। এতে বরাকের ভাটিতে সুরমা ও কুশিয়ারার অববাহিকা শুকিয়ে যাবে। দক্ষিণে ত্রিপুরার মহারানী নামক স্থানে একটি বাঁধ নির্মাণ করছে ভারত। এর ফলে শুকনো মওসুমে গোমতী নদীর প্রবাহ কমে যাচ্ছে। এর পানির ওপর নির্ভরশীল কুমিল্লার ছোট অনেক সেচ প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সীমান্ত নদী সিলোনিয়া ভারতের ত্রিপুরা থেকে ফেনীর পরশুরাম সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ত্রিপুরায় পাম্প বসিয়ে ও অস্থায়ী মাটির বাঁধ দিয়ে এর পানি সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। বর্ষায় ভারত সে বাঁধ ভেঙে দিয়ে বাংলাদেশে বন্যার সৃষ্টি করে।
ভারতের সাথে বাংলাদেশের যতগুলো অভিন্ন নদী আছে তার প্রতিটি থেকেই একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করছে ভারত। ফেনী নদী এর একটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশের চাহিদার কথা তারা মোটেই গ্রাহ্য করছে না। আন্তর্জাতিক নদীর পানি সব দেশকে সমতার ভিত্তিতে বণ্টন করতে হয়। নীল নদের পানি মিসর, সুদান ও ইথিওপিয়া সমতার মাধ্যমে ব্যবহার করছে। দানিউব নদীর পানি ইউরোপের ১২টি দেশ ব্যবহার করছে। মেকং নদের পানি ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ব্যবহার করছে। কিন্তু ব্যতিক্রম হলো ভারত। সে তার প্রতিবেশীর প্রয়োজনের কথা মোটেই ভাবে না।
আমাদের দরকার আরেকজন মওলানা ভাসানীর। ১৯৭৬ সালের ১৬ মে তিনি বাংলাদেশের জনগণকে নিয়ে ফারাক্কা লংমার্চ করেছিলেন। সে লংমার্চে দলমত নির্বিশেষে সবাই অংশগ্রহণ করেছিল। সে লংমার্চ দেখে ভীত হয়ে ভারতের সরকারও ভয় পেয়ে যায়। ফলে বাংলাদেশের সাথে ’৭৭ সালে ফারাক্কা চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছিল।
ভারত পানির ব্যাপারে দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে আসবে না। তাকে আন্তর্জাতিক চাপে না ফেলতে পারলে বাংলাদেশের পানি পাওয়ার আশা নেই। আমাদের উচিত, পানি ও নদীসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত, হাইড্রোলজিক্যাল ডাটা, নদীর অববাহিকা অঞ্চল ইত্যাদি সংক্রান্ত তথ্য তৈরি করা। এগুলোসহ আমাদের পানির হিস্যার ন্যায্য দাবি আন্তর্জাতিক ফোরামে তুলে ধরে জাতিসঙ্ঘের সব রাষ্ট্রকে অবহিত করা। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আদালতেও যেতে হবে। তা নতজানু পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করলে চলবে না। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের রাজনৈতিক কোন্দল বন্ধ করতে হবে। জাতীয় ইস্যুতে সব দল ও মত এক হয়ে দাবি তুলতে হবে। তখন আমাদের দাবি জোরালো হবে এবং অন্যরা তা মানতে বাধ্য হবে। সব দেশেই জাতীয় বিষয়ে সরকার ও বিরোধী দল এক হয়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করে- ব্যতিক্রম শুধু বাংলাদেশ। জীবন-মরণ পানির ইস্যু নিয়েও আমরা একমত হতে পারি না।
লেখক : পানিবিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদ

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫