ঢাকা, শনিবার,২২ জুলাই ২০১৭

স্বাস্থ্য

ডায়াবেটিস মানেই কি ইনসুলিন?

১৬ মে ২০১৭,মঙ্গলবার, ১৪:৪০


প্রিন্ট

আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষের শক্তির জন্য প্রয়োজন গ্লুকোজ। খাবার খাওয়ার পর জটিল বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় তৈরি গ্লুকোজ কোষে পৌঁছে যায়। তবে তার জন্য একান্ত প্রয়োজনীয় চাবি হলো- ইনসুলিন, যা অগ্ন্যাশয় থেকে নিঃসৃত হয়ে কোষের রুদ্ধ দুয়ার খুলে দেয়। আর তার পরই গ্লুকোজ পৌঁছে যায় কোষের ভেতরে, শক্তি জুগিয়ে উজ্জীবিত করে তোলে দেহকে। লিখেছেন ডা: হাফিজা লুনা

পেটে যদি কোনো কারণে গোলযোগ দেখা দেয় অগ্ন্যাশয়ে, ইনসুলিন আর ঠিকমতো বের হতে পারে না, ফলে গ্লুকোজের জোগানও ব্যাহত হয়; রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়তে থাকে, শক্তির অভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে কোষ। মোদ্দা কথা, অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন নিঃসরণ আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হলে তখনই শরীরের ভেতর নানা রাসায়নিকের হেরফের হয়। রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণও বেড়ে যায়।
অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন নিঃসরণ পুরোপুরি বন্ধ হলে ইনসুলিন ডিপেনড্যান্ট ডায়াবেটিস মেলিটাস বা টাইপ১ ডায়াবেটিস হয়। অন্যান্য দেশে টাইপ১ ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা মোট ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যার ৫ থেকে ৭ পার্সেন্ট । আমাদের দেশে এর হার ১ পার্সেন্টের মতো। অন্য দিকে প্রয়োজনের তুলনায় কিছুটা কম ইনসুলিন নিঃসরণ হলে বা প্রতিবন্ধকতার কারণে ইনসুলিন ঠিকমতো কাজ করতে না পারলে হয় টাইপ২ ডায়াবেটিস মেলিটাস। আমাদের দেশে এটিই প্রধান ডায়াবেটিস। এ ছাড়া কিছু কিছু হরমোনের তারতম্যের জন্য, অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ বা অন্য কোনো সমস্যা হলে, ইনসুলিন সরবরাহে ত্রুটি দেখা গেলে, কোনো ওষুধ বা রাসায়নিকের প্রভাবে বা কুশিং সিন্ড্রোম জাতীয় অসুখের জন্যও সেকেন্ডারি ডায়াবেটিস হতে পারে। বলা বাহুল্য, টাইপ১ ডায়াবেটিসে ইনসুলিন নেয়া ছাড়া কোনো উপায় না থাকলেও টাইপ২তে সরাসরি ইনসুলিন নাও লাগতে পারে। তবে অনেক টাইপ২ ডায়াবেটিস রোগীর অগ্ন্যাশয়ের বিটা কোষ ইনসুলিন নিঃসরণ করতে করতে পরিশ্রান্ত হয়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে ইনসুলিন দেয়া ছাড়া উপায় থাকে না।
পরীক্ষা-নিরীক্ষা
ডায়াবেটিসের কোনো উপসর্গ থাক বা না থাক, যেকোনো অপারেশন বা অন্যান্য অসুখে রক্তের গুøকোজ মাপাটা রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে অনেকেই হয়তো মনোক্ষুণ্ন হন, কিন্তু তাতে রোগীরই লাভ। কেননা শুরুতে ডায়াবেটিস ধরা পড়লে সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আর ডায়াবেটিস ধরা পড়তে দেরি হলে অনেক অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ক্ষতি হবে।
খালি পেটে (কমপক্ষে ৮ ঘণ্টা না খেয়ে থাকার পর) রক্তে গ্লুকোজের স্বাভাবিক পরিমাণ ৩.৫ থেকে ৫.৫ মিলিমোল/লিটার বা ৭৫ গ্রাম গ্লুকোজ ২৫০ থেকে ৩০০ মিলিলিটার পানিতে মিশিয়ে পাঁচ মিনিট ধরে খাবার ২ ঘণ্টা পর রক্তে গ্লুকোজের স্বাভাবিক পরিমাণ হবে সর্বোচ্চ ১১.১ মিলিমোল। যদি খালি পেটে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ ৫.৫ থেকে ৬.৯ মিলিমোল/লিটার বা ৭৫ গ্রাম গ্লুকোজ খাবার ২ ঘণ্টা পর ৭.৮ থেকে ১১.১ মিলিমোল/লিটার হয়, তাকে বলা হবে IGT (Impaired Glucose Talerance); এদের এক-তৃতীয়াংশ পরে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন। আর এক-তৃতীয়াংশ এ অবস্থাতেই থেকে যান। বাকি অংশ স্বাভাবিক অবস্থায় থাকেন। খালি পেটে রক্ত পরীক্ষায় যদি গ্লুকোজের পরিমাণ =৭.০ মিলিমোল/লিটার হয় অথবা ৭৫ গ্রাম গ্লুকোজ খাবার ২ ঘণ্টা পর =১১.১ মিলিমোল/ লিটার হয়, তবে তার ডায়াবেটিস আছে বলে ধরে নেয়া হবে।
মোটা মানুষেরই বেশি ডায়াবেটিস হয়
আজ থেকে আরো ২০ বছর পর উন্নয়নশীল দেশগুলোর ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ২২৮ মিলিয়নে গিয়ে দাঁড়াবে। ২০২০ সালে বাংলাদেশেই ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা হবে শোয়া কোটির মতো। কল্পনা করতে পারেন। আর এ সংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ দৈহিক স্থূলতা। খাদ্যাভ্যাসের দ্রুত পরিবর্তন, তথাকথিত ফাস্ট ফুডের প্রতি আসক্তি, দৈহিক পরিশ্রম বিমুখতার ফলে আমাদের দেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মানুষের দৈহিক ওজন স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যাচ্ছে। তা ছাড়া আছে দ্রুত নগরায়ন।
নগরায়ন ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলোতেও হয়েছে। কিন্তু সেখানে এতটা অল্প সময়ে হয়নি। সেখানকার অধিবাসীরা পরিবর্তনটির সাথে খাপ খাওয়ানোর মতো সময় হাতে পেয়েছিল। কিন্তু আমাদের অঞ্চলে এত দ্রুত নগরায়ন হয়েছে যে, বেশির ভাগ মানুষ এর সাথে তাল মিলিয়ে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করতে পারছে না, বরং এর চটক তাদের বিলাসী ও আলসে করে তুলছে। আমাদের দেশে ১৯৯০ সালে মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ পার্সেন্ট অতিরিক্ত ওজনধারী ছিল। যেটা বর্তমানে ২০ শতাংশের মতো। আর এর সাথে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। বিশেষ করে যাদের শরীরের কেন্দ্রের দিকে (পেটে) মেদ বেশি জমেছে। এটা নিশ্চিত যে, শরীরের অতিরিক্ত ওজন কমিয়ে ফেলতে পারলে ডায়াবেটিসের হাত থেকে রক্ষা পেতে পারেন অনেকেই। আবার যাদের ডায়াবেটিস হয়েছে, তারাও যদি দৈহিক ওজন কাক্সিক্ষত পর্যায়ে নিয়ে আসতে পারেন, তবে তাদের জন্য ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়। টাইপ২ ডায়াবেটিস রোগীদের ৫০ পার্সেন্টের পরিবারের অন্য কোনো সদস্যেরও ডায়াবেটিসে ভোগার ইতিহাস থাকে।
স্ট্রেস ও ডায়াবেটিস
নার্সারির শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধাশ্রমে আবাসিক বয়স্ক মানুষ পর্যন্ত প্রায় সবাইকেই অনবরত মোকাবেলা করতে হচ্ছে স্ট্রেস আর দুশ্চিন্তা, উৎকণ্ঠার। ডায়াবেটিস ডেকে আনতে এ বাড়তি স্ট্রেসের একটি প্রত্যক্ষ ভূমিকা আছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ডায়াবেটিসের অন্যতম ঝুঁকির কারণ হলো স্ট্রেস। স্ট্রেসের আরো কিছু আনুষঙ্গিক কারণ ডায়াবেটিস ডেকে আনতে সহায়তা করে। যেমন স্ট্রেস কাটাতে অনেকেই ধূমপান করেন। নিকোটিনের অনেক অপকারিতার মধ্যে অন্যতম হলো ইনসুলিনের কার্যকারিতার প্রতিবন্ধকতা বাড়িয়ে দেয়, ফলে ডায়াবেটিসের সম্ভাবনা বাড়ে। আবার অনেকে অতিরিক্ত কাজের চাপ থেকে কিছুটা রেহাই পেতে অতিরিক্ত মদ্যপান করেন। আর অবশ্যম্ভাবী ফল হলো রক্তে গ্লুকোজ বেড়ে যাওয়া। অতএব, স্ট্রেস কাটাতে আড্ডা দিন, গান শুনুন, বেড়াতে যান; ধূমপান, মদ্যপান করে বিপদ ডেকে আনবেন না।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫