ঢাকা, শনিবার,২৭ মে ২০১৭

বিবিধ

আজ ঐতিহাসিক ফারাক্কা দিবস

চুক্তি অনুযায়ী ফারাক্কা পয়েন্টে পানি দিচ্ছে না ভারত

সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ

১৬ মে ২০১৭,মঙ্গলবার, ০৬:০৮ | আপডেট: ১৬ মে ২০১৭,মঙ্গলবার, ০৬:১৫


প্রিন্ট
একসময়ের প্রমত্তা পদ্মায় এখন বিশাল বালুচর। হেঁটেই পার হওয়া যায় নদী। রাজশাহী নগরীর পদ্মা গার্ডেন সংলগ্ন এলাকার দৃশ্য। ছবিটি গতকাল তোলা : নয়া দিগন্ত

একসময়ের প্রমত্তা পদ্মায় এখন বিশাল বালুচর। হেঁটেই পার হওয়া যায় নদী। রাজশাহী নগরীর পদ্মা গার্ডেন সংলগ্ন এলাকার দৃশ্য। ছবিটি গতকাল তোলা : নয়া দিগন্ত

গঙ্গাচুক্তি অনুযায়ী ফারাক্কা পয়েন্টে ৪০ বছরের গড় পানিপ্রবাহ বজায় রাখে না ভারত। দেশটি দু-একটি বছর ছাড়া প্রতি বছরই ফারাক্কা পয়েন্টে চুক্তি অনুয়ায়ী পানি কম দিচ্ছে। 
১৯৯৬ সালে সম্পাদিত গঙ্গাচুক্তির অনুচ্ছেদ ২-এর ২-এ বলা আছে যে, অনুচ্ছেদ ১-এ যে নির্দেশনামূলক তফসিল উল্লিখিত আছে এবং যা সংলগ্নি ২-এ দেয়া হয়েছে তার ভিত্তি হলো বিগত ৪০ বছরের ( ১৯৪৯-৮৮) ব্যাপ্তিতে ফারাক্কায় দশ-দিনওয়ারি পানিপ্রবাহের গড় লভ্যতা। উপরোল্লিখিত ৪০ বছরের গড় লভ্যতামতো ফারাক্কায় পানির প্রবাহ সংরক্ষণ করতে উজানের দেশ (ভারত) সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাবে। 
কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী পানিবণ্টন কার্যক্রম শুরুর পর থেকে আজ পর্যন্ত ভারত ফারাক্কা পয়েন্টে ৪০ বছরের গড় পানিপ্রবাহ রাখেনি। চলতি বছরও ফারাক্কা পয়েন্টে ৪০ বছরের গড় পানিপ্রবাহ এবারো নিশ্চিত করেনি ভারত। চলতি বছর এ পর্যন্ত মোট ১৩টি কিস্তির কোনটিতেই গড় প্রবাহ নিশ্চিত করেনি দেশটি। বরাবরের মতো এবারো প্রায় প্রতি কিস্তিতে ফারাক্কা পয়েন্টে পর্যাপ্ত পানি না আসায় কম পেয়েছে বাংলাদেশ। 
১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি অনুযায়ী প্রতি বছরে পানিবণ্টন কার্যক্রম শুরু হয় শুষ্ক মওসুম, অর্থাৎ জানুয়ারির ১ তারিখ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত। 
চুক্তির আওতায় এ বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১০ মে পর্যন্ত যৌথ নদী কমিশন কর্তৃক বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গার পানিবণ্টন সম্পর্কিত পাওয়া তথ্য-উপাত্তে দেখা গেছে, দেশটি (ভারত) ফারাক্কা পয়েন্টে ৪০ বছরের গড় পানি নিশ্চিত করেনি। আর এর কারণে এ বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১০ মে পর্যন্ত ১৩টি কিস্তিতে পানি কম পেয়েছে বাংলাদেশ। 
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চুক্তি মতে পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশনের তরফ থেকে কয়েক দফা তাগিদ ও পানি কম পাওয়ায় প্রতিবাদ জানালেও কাজ হয়নি। প্রতি বছরের মতো এবারো ভারত ফারাক্কা পয়েন্টে সেই ঐতিহাসিক প্রবাহ নিশ্চিত না করে পানি কম দিয়েছে। আর ভারতের পক্ষ থেকে দেয়া জবাবে বলা হয়েছে, গঙ্গাচুক্তি অনুযায়ী ভারত-বাংলাদেশ মিলে পানিপ্রবাহ বাড়াতে সর্বাত্মক চেষ্টা করবে। 
তবে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও যৌথ নদী কমিশন সূত্রে জানা গেছে, গঙ্গার ফারাক্কা পয়েন্টে জানুয়ারির ১ থেকে ১০ তারিখ ১০৭৫১৬; ১১ থেকে ২০ তারিখ ৯৭৬৭৩ এবং ২১ থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত ৯০১৫৪ কিউসেক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করার কথা। গঙ্গাচুক্তি প্রণয়নের সময় ১৯৪৮ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত প্রবাহিত পানির গড় হিসাব করে এই প্রবাহ ধরা হয়েছিল। কিন্তু ভারত এবার জানুয়ারিতে তিনটি কিস্তিতে গঙ্গার ফারাক্কা পয়েন্টে সেই ঐতিহাসিক প্রবাহ নিশ্চিত করেনি, বরং তিন কিস্তিতে যথাক্রমে ৯৭৭৬৬, ৮৫২৯৭ ও ৮৩৯৯৩ কিউসেক ছেড়েছে। অপর দিকে ফেব্রুয়ারির প্রথম ১০ দিনে ৮৬৩২৩, দ্বিতীয় ১০ দিনে ৮২৮৩৯ এবং তৃতীয় ১০ দিনে ৭৯১০৬ কিউসেক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করার কথা ভারতের। অর্থাৎ তারা ফারাক্কা পয়েন্টে পানি ছেড়েছে যথাক্রমে ৭৮৩৮৩, ৭৫৫২৭ ও ৭০১১২ কিউসেক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করেছে। এ বছর মার্চের প্রথম ১০ দিনে চল্লিশ বছরের গড় অনুযায়ী ৭৪৪১৯ কিউসেক পানি নিশ্চিত করার কথা। তবে ভারত মার্চের প্রথম ১০ দিনে গঙ্গায় মাত্র ৬২২৫৬ কিউসেক পানি ছেড়েছে। পরবর্তী প্রায় প্রতিটি কিস্তিতেই দেশটি ফারাক্কা পয়েন্টে ৪০ বছরের গড় পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করেনি। দেখা গেছে, ঐতিহাসিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত না করার কারণে ফারাক্কা পয়েন্টে স্বভাবতই পানি কম আসবে, সেজন্য বাংলাদেশ পানির কষ্টে ভুগছে। 
এমনই বাস্তবতায় আজ ১৬ মে ঐতিহাসিক ফারাক্কা দিবস পালিত হতে যাচ্ছে। ভারতের ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে বাংলাদেশকে মরুকরণের বিরুদ্ধে মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ১৯৭৬ সালের এই দিন লংমার্চ পরিচালনা করেন। দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। 
বাংলাদেশ ন্যাপ
ফারাক্কা দিবস উপলক্ষে এক বাণীতে ন্যাপ নেতৃবৃন্দ বলেন, ভারত মূলত দু’টি উদ্দেশ্যে পানি আগ্রাসন অব্যাহত রেখেছে। এর একটি হচ্ছে রাজনৈতিক কারণে পানিকে ব্যবহার করা আর রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে ব্যর্থ ও পঙ্গু রাষ্ট্রে পরিণত করা। ভারতের পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মওলানা ভাসানীর মতো নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে। তারা বলেন, ভারত যা বলে তা করে না, যা করে তা বলে না। আওয়ামী-বাকশালী চক্র ভারতের সাথে যতগুলো চুক্তি করেছে সবগুলো জাতীয় স্বার্থবিরোধী। বর্তমান সরকার সাম্রাজ্যবাদী ও সম্প্রসারণবাদী শক্তির সহায়তার মতায় টিকে থাকতে চায়। তাদের শেষ রা হবে না, হতে পারে না। আজ সকাল ১০টায় জাতীয় প্রেস কাবের সামনে গঙ্গা-তিস্তাসহ অভিন্ন ৫৪টি নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের দাবিতে বাংলাদেশ ন্যাপ ঢাকা মহানগরীর উদ্যোগে মানববন্ধন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে। একই সাথে সব জেলা কমিটি আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। এ ছাড়া ২২ মে বাংলাদেশ ন্যাপ কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। 
ভাসানী অনুসারী পরিষদ আজ জাতীয় প্রেস কাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। এই আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি থাকবেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। বিশেষ অতিথি থাকবেন সাবেক মন্ত্রী বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, জাতীয় পার্টির সেক্রেটারি জেনারেল মোস্তফা জামাল হায়দার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ও ভাসানী অনুসারী পরিষদের নির্বাহী চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জসীম উদ্দিন আহমদ, জাতিসঙ্ঘের সাবেক পানিবিশেষজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার ড. এস আই খান, বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. দিলারা চৌধুরী, সিনিয়র সাংবাদিক ও ভাসানী অনুসারী পরিষদের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী সিরাজ, নিউএজ পত্রিকার উপদেষ্টা সম্পাদক মোস্তফা কামাল মজুমদার। এতে প্রধান বক্তা থাকবেন ভাসানী অনুসারী পরিষদের মহাসচিব শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী। 
এ দিকে গতকাল ঢাকার কলাবাগানে ফারাক্কা লংমার্চ দিবস জাতীয়ভাবে পালনের দাবিতে আহূত এক সভা নাগরিক পরিষদের আহ্বায়ক মোহাম্মদ শামসুদ্দীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (এমএল) একাংশের আহ্বায়ক হুমায়ুন কবির, গণতান্ত্রিক কর্মী শিবিরের সদস্য সচিব প্রকৌশলী মোজাহারুল হক চৌধুরী শহীদ, দুর্নীতি প্রতিরোধ আন্দোলনের আহ্বায়ক মো: হারুন-অর-রশিদ খান, সিএলএনবির চেয়ারম্যান মো: হারুনুর রশীদ, গ্রিনবাংলা গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি সুলতানা বেগম, প্রতিবাদী তারুণ্যের আহ্বায়ক মো: মাসুদুজ্জামান প্রমুখ। 
আজো প্রেরণার উৎস
মুহা: আব্দুল আউয়াল, রাজশাহী ব্যুরো থেকে জানান, মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে ১৯৭৬ সালের এই দিনে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদরাসা ময়দান থেকে মরণ বাঁধ ফারাক্কা অভিমুখে লাখো জনতার লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়। ভারতীয় পানি আগ্রাসনের প্রতিবাদে ওই দিন বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের বজ্রকণ্ঠ দিল্লির মসনদ পর্যন্ত কাঁপিয়ে দেয়। ওই দিন রাজশাহীর মাদরাসা ময়দান থেকে লংমার্চ শুরু হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে গিয়ে শেষ হয়। দিনটি ছিল রোববার। সকাল ১০টায় রাজশাহী থেকে শুরু হয় জনতার পদযাত্রা। হাতে ব্যানার আর ফেস্টুন নিয়ে অসংখ্য প্রতিবাদী মানুষের ঢল নামে রাজশাহীর রাজপথে। ভারত বিরোধী নানা স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠে গোটা এলাকা। বেলা ২টায় হাজার হাজার মানুষের স্রোত জেলার গোদাগাড়ীর প্রেমতলী গ্রামে গিয়ে পৌঁছায়। সেখানে মধ্যাহ্ন বিরতির পর আবার যাত্রা শুরু হয়। সন্ধ্যা ৬টায় লংমার্চ চাঁপাইনবাবগঞ্জে গিয়ে রাত যাপনের জন্য সে দিনের মতো শেষ হয়। মাঠেই রাত যাপন করার পরদিন সোমবার সকাল ৮টায় আবার যাত্রা শুরু হয় শিবগঞ্জের কানসাট অভিমুখে। 
ভারতীয় সীমান্তের অদূরে কানসাটে পৌঁছানোর আগে মহানন্দা নদী পার হতে হয়। হাজার হাজার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দেন এ লংমার্চে। তারা নৌকা দিয়ে কৃত্রিম সেতু তৈরি করে মহানন্দা নদী পার হন। কানসাট হাইস্কুল মাঠে পৌঁছানোর পর সমবেত জনতার উদ্দেশে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী তার জ্বালাময়ী ভাষণ দেন। মওলানা ভাসানী ভারতের উদ্দেশে বলেন, ‘তাদের জানা উচিত বাংলার মানুষ এক আল্লাহকে ছাড়া আর কাউকে ভয় পায় না। কারো হুমকিকে পরোয়া করে না। তিনি বলেন, আজ রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও কানসাটে যে ইতিহাস শুরু হয়েছে তা অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি করবে।’ মওলানা ভাসানী সেখানেই লংমার্চের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। বাংলাদেশ সীমানার মধ্যে লংমার্চ সমাপ্ত হলেও সে দিন জনতার ভয়ে ভীত ভারতীয়রা সীমান্তে প্রচুর সৈন্য মোতায়েন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে।
ভারতের পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মওলানা ভাসানী সে দিন ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাব ও এর বিভিন্ন ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে যে প্রতিবাদ করেছিলেন, তার সেই সাহসী উচ্চারণ বাংলাদেশের মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে আজো। ভারতের একতরফা ও আগ্রাসী মনোভাবের কারণে ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশের বৃহৎ একটি অঞ্চল মরুভূমিতে পরিণত হতে চলেছে। বিশেষ করে রাজশাহী অঞ্চল ভয়াবহ হুমকির সম্মুখীন। দেশের বৃহত্তম নদী পদ্মা আজ পানির অভাবে শুকিয়ে মরুভূমিতে পরিণত হতে চলেছে। ফলে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অর্ধশত নদী আজ বিলুপ্তির পথে। অন্য দিকে, ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে বরেন্দ্র অঞ্চলের ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর অস্বাভাবিক হারে নিচে নেমে যাচ্ছে। গত কয়েক বছরে স্থানভেদে ২৫ ফুট থেকে ৪০ ফুট পর্যন্ত পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। 
সূত্র জানায়, যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকে বিষয়টি বার বার উত্থাপন করা হলেও তা কোনো সুফল বয়ে আনতে পারেনি। দীর্ঘ দিন ধরে শুধু আশ্বাসের বাণী শোনানো হয়। এ ব্যাপারে ভারতের কোনো ভ্রƒক্ষেপ নেই। ভারত চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকে তার পানির ন্যায্য হিস্যা প্রদান করছে না। সরেজমিন দেখা গেছে, রাজশাহীতে পদ্মা নদীর বুকে বিশাল বিশাল বালিচর পড়েছে। সেখানে ফুটবল খেলা হচ্ছে, গরু-মহিষের গাড়ি চলছে। কোথাও কোথাও ফল ও ফসলের আবাদ হচ্ছে। হেঁটেই এখন নদী পার হওয়া যায়। পদ্মার মূল নদী রাজশাহী শহর থেকে অনেক দূরে (প্রায় পাঁচ কিলোমিটার) সরে গেছে। পদ্মার সেই অপরূপ যৌবন ও সৌন্দর্য আর নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ অবস্থা চলতে থাকলে কিছু দিনের মধ্যে দেশের বৃহৎ এ অঞ্চলটি বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে। মরুকরণ দেখা দেবে। অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। 
মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ফারাক্কা লংমার্চের প্রস্তুতির সময় বিশ্ব নেতাদের এ সম্পর্কে অবহিত করে বার্তা পাঠান। তিনি জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব ড. কুর্ট ওয়াল্ডহেইম, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড, চীনের নেতা মাও সেতুং, সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী আলেক্সি কোসিগিন প্রমুখের কাছে তারবার্তা পাঠিয়ে ভারতের ওপর তাদের প্রভাব খাটিয়ে গঙ্গার পানি বণ্টনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা প্রাপ্তির ব্যাপারে সহযোগিতা কামনা করেন। এ ছাড়া মওলানা ভাসানী জনসভা থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে ফারাক্কার ফলে বাংলাদেশে এরই মধ্যে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হচ্ছে তা সরেজমিন দেখতে আসার আহ্বান জানান। 
স্থানীয়রা বলছেন, ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাবে দেশের উত্তরাঞ্চলসহ বৃহৎ একটি অংশ মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। ভারতের একঘেয়েমি ও অপ্রতিবেশীসুলভ আচরণের কারণে বাংলাদেশ আজ চরম ক্ষতির শিকার। এর ফলে এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ চলছে। দাবি উঠেছে, ফারাক্কা বাঁধের কারণে দেশের যে ক্ষতি হয়েছে, সেই ক্ষতিপূরণ ভারতের কাছ থেকে আদায় করতে হবে। বাংলাদেশ সরকারকে সেই ক্ষতিপূরণ আদায়ে ভারত সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা।
সূত্র জানায়, ফারাক্কা বাংলাদেশের কৃষি, শিল্প কারখানাসহ সব কিছুতেই মারাত্মক ক্ষতি করেছে। তবে এসব ক্ষতির বিষয়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই। বিভিন্ন সূত্রে এ সংক্রান্ত কিছু তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায়। ২০১৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ‘নদী ও পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন- রাজশাহী’ আয়োজিত সাধারণ সভায় একটি ঘোষণাপত্র অনুমোদিত হয়। ওই ঘোষণাপত্রের একটি অংশে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের একটি সমীক্ষার উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ফারাক্কায় বাঁধ দেয়ার কারণে বাংলাদেশের প্রায় ৯৩ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। প্রতি বছর ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। তবে এ ক্ষতির পরিমাণ বর্তমানে আরো বেশি হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। 
নদী ও পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট মো: এনামুল হক নয়া দিগন্তকে বলেন, ১৯৭৬ সালের ১৬ মে বাংলাদেশের নদীগুলোর যে পরিস্থিতি ছিল আজ চার দশক পরে তা আরো ভয়াবহ অবস্থায় দাঁড়িয়েছে। ফারাক্কার প্রতিক্রিয়া ও প্রভাবে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের গঙ্গা-পদ্মা ছাড়াও অন্যান্য ছোট ও মাঝারি নদ-নদী শুকিয়ে গেছে। নদীর তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা এখন অনেকটাই মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। এর ফলে এক ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয় অতি আসন্ন। শুধু গঙ্গা নয়, তিস্তা, মহানন্দা, বারাক নদীতে বাঁধ এবং আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের মাধ্যমে একতরফা পানি প্রত্যাহার করা হচ্ছে। ভারত বলে আসছে, বাংলাদেশের ক্ষতি হয়- নদীকেন্দ্রিক এমন কোনো প্রকল্প তারা বাস্তবায়ন করবে না। কিন্তু পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি বলেন, ভয়াবহ এ অবস্থা থেকে উত্তোরণে সর্বস্তরের দেশপ্রেমিক মানুষকে সোচ্চার ও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। 
এনামুল হক বলেন, ভারত চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকে পানি দেবে না, এটা এখন অনেকটা পরিষ্কার। কারণ এতদিনেও তারা চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকে পানির প্রাপ্যতা বুঝিয়ে দেয়নি। তিনি বলেন, জাতিসঙ্ঘের পানিপ্রবাহ আইন ১৯৯৭-এর বিধান অনুযায়ী এবং জাতিসঙ্ঘের মাধ্যমেই বিষয়টির সুরাহা করতে হবে। এ জন্য সরকারকে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে হবে। তিনি বলেন, ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশের যে ক্ষতি হয়েছে, সেই ক্ষতিপূরণ ভারতের কাছ থেকে আদায়ে বাংলাদেশ সরকারকে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। 
গত রোববার রাজশাহীতে ফারাক্কা লং মার্চ দিবস উদযাপন কমিটির উদ্যোগে এক সংবাদ সম্মেলনে ফারাক্কাজনিত কারণে বাংলাদেশে পানির অভাবে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ও ক্ষতি হয়েছে, তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলোÑ উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় আট কোটি মানুষ এবং এক-তৃতীয়াংশ এলাকা পানির অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, গঙ্গা-কপোতাক্ষ প্রকল্পের ৬৫ শতাংশ এলাকায় সেচ কার্যক্রম চালানো সম্ভব হচ্ছে না, অতিরিক্ত লবণাক্ততার জন্য জমির উর্বরা শক্তি কমে গিয়ে পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনের প্রায় ১৭ ভাগ নষ্ট হয়ে গেছে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় হাজার হাজার হস্তচালিত পাম্প অকেজো হয়ে গেছে, দেশের প্রায় ২১ শতাংশ অগভীর নলকূপ ও ৪২ শতাংশ গভীর নলকূপ ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে, ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের বিষাক্ত প্রভাবে পশ্চিমাঞ্চলের অনেক জেলায় টিউবওয়েলের পানি খাবার অযোগ্য হয়ে পড়েছে, নদী শুকিয়ে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ যে পানি উত্তোলন করা হয় সেটা পূরণ (রিচার্জ) হচ্ছে না, ফারাক্কার প্রভাবে নদীর জীবনচক্র ধ্বংস হয়ে গেছে, ইলিশের বিচরণত্রে পদ্মায় আর ইলিশ আসে না, নদীর বুকে জেগে উঠেছে বিশাল ধু ধু বালুচর, নদীর মূলধারা বিভক্ত হয়ে পড়েছে অসংখ্য সরু ও ক্ষীণ স্রোতধারায়, প্রায় ১৫০০ কিলোমিটার নৌ-পথ বন্ধ হয়ে গেছে।
রাজশাহীতে বিশাল গণজমায়েত ও কলসি মিছিল 
ভারতের পানি আগ্রাসনের কারণে যে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে সে সম্পর্কে রাজশাহীসহ দেশবাসীর কাছে সঠিক তথ্য তুলে ধরতে এবং সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতে রাজশাহীতে বিশাল গণজমায়েত ও কলসি মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী আজ মঙ্গলবার বিকেল ৪টায় নগরীর বড়কুঠি সংলগ্ন পদ্মার চরে কলসি মিছিল বের করা হবে। কলসি মিছিল শেষে নগরীর সাহেব বাজার বড় মসজিদ চত্বরে গণজমায়েত অনুষ্ঠিত হবে। গত রোববার নগরীর মালোপাড়ায় নদী ও পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
আয়োজকেরা জানান, ফারাক্কা লংমার্চ দিবস উদযাপন কমিটি রাজশাহী এ কর্মসূচির আয়োজন করেছে। এ কর্মসূচির সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছে রাজশাহীর বিভিন্ন পেশাজীবী ও সামাজিক সংগঠন।
গণজমায়েতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন কবি, গবেষক ও কলামিস্ট ফরহাদ মজহার। বিশেষ অতিথি থাকবেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রফেসর ড. আবুল কালাম আজাদ, প্রফেসর ড. এম সায়েদুর রহমান, প্রফেসর ড. মোহা: এনামুল হক, প্রফেসর ড. কে বি এম মাহবুবুর রহমান ও প্রফেসর ড. মো. ফজলুল হক। প্রধান বক্তা থাকবেন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি কবি আবদুল হাই শিকদার। এতে সভাপতিত্ব করবেন ফারাক্কা লংমার্চ দিবস উদযাপন কমিটি রাজশাহীর সমন্বয়ক এবং নদী ও পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের আহবায়ক অ্যাডভোকেট মো: এনামুল হক।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫