ঢাকা, সোমবার,২১ আগস্ট ২০১৭

রকমারি

মাকে মনে পড়ে আমার ...

ড. তাজুল ইসলাম; বিজ্ঞানী ও শিক্ষক-ক্যাটেড্রাল স্কুল, নরওয়ে

১৪ মে ২০১৭,রবিবার, ১৯:২৫


প্রিন্ট

আমি ঢাকার যাত্রাবাড়ীর ছেলে। আমার বাবার নাম চান মিঞা। সবাই হাজী চান মিঞা কন্ট্রাক্টর বলে ডাকত। সেই সময়ের ভীষণ দাপুটে ছিলেন আমার বাবা। আমার মা শায়েস্তা বেগম ছিলেন তার বাবা-মায়ের আট সন্তানের মধ্যে তৃতীয়। মাত্র ১০ বছর বয়সে মায়ের বিয়ে হয়। ছোট্ট শিশুমেয়েটির শ্বশুরবাড়িতে এসে বিশাল সংসার আর যৌথ পরিবার নিয়ে তেমন সমস্যা ছিল না। সব কিছু খুব সহজভাবে মেনে নিয়েছেন। যাত্রাবাড়ী এলাকার ‘জেলেপাড়া’ নামে একটি হিন্দু অধ্যুষিত নতুন এলাকা গড়ে উঠেছিল। সেই জায়গায় দাদাদের ছিল পৈতৃক আবাসস্থল। সেটা ১৯৭০-৭১ সালের কথা- দোতলা, গ্রিল দিয়ে ঘেরা সাদা গোল টাইপের একটি বাড়ি। চার দিকে আম, কাঁঠাল, জাম, পেয়ারা, লিচু নানা জাতের গাছ ছিল। বাড়ির ছাদে উঠলেই সব হাতের নাগালে। প্রথমতলা ও দোতলায় ছিল অনেক রুম। মা-বাবা নিচতলায় থাকতেন আর আমরা দোতলায়। আমার মায়ের চার সন্তানের মধ্যে আমি তৃতীয় অর্থাৎ আমরা তিন ভাই এক বোন। আমি নরওয়েতে পড়াশোনা শেষ করি। তারপর নরওয়ের ক্যাটেড্রাল স্কুলে বিজ্ঞান ও গণিতের শিক্ষক হিসেবে কাজ করছি দীর্ঘ দিন। মাস্টার্স শেষ করার পর গবেষণার কাজে আত্মনিয়োগ করি। আবিষ্কার করি রাশিয়ার এক গ্যাসক্ষেত্র থেকে ব্যাকটেরিয়ার একটি নতুন পর্ব। বাংলাদেশের হরিপুর গ্যাসক্ষেত্র থেকে মাটি নিয়ে আরো দুটি ব্যাকটেরিয়া আবিষ্কার করি। যেটা ২০০৮ সালে পিএনএএস জার্নালে ছাপা হয়। একই বছর আমি ইউনিভার্সিটি অব বারগেন থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করি। ২০০৭ থেকে ২০১০ সাল গবেষণার কাজে আমাকে প্রায়ই দেশে যেতে হতো। তখন মায়ের সাথে আমার দেখা হতো। মায়ের আদরপ্রত্যাশী হয়ে মায়ের কাছাকাছি বসে খেতে বসতাম। গল্প করতাম, মা খুব খুশি হতেন। সে অনেক দিন আগের এইচএসসি ছয়টি লেটারসহ পাস করার পর আমি নরওয়ে চলে আসার মনস্থির করলাম, তখন মা আমাকে কিছুতেই একা আসতে দেবেন না। অনেক চিন্তাভাবনা করে মেজ ভাই রফিকসহ দু’জনকে চলে যাওয়ার অনুমতি দিলেন। আমার মেজভাই রফিক শুধু আমার ভাই নন, ও আমার সার্বক্ষণিক বন্ধু বটে। ছোটবেলা থেকে সারা দিন পড়াশোনা করতাম। মা ছিলেন পড়াশোনার উৎসাহদাতা। তিনি আমার পড়াশোনার ব্যাপারে কাউকে কোনোরকম ব্যাঘাত সৃষ্টি করার সুযোগ দিতেন না। একবার ঈদ সামনে। আমি বরাবরই ভালো রেজাল্ট করি। তাই মা আমাকে খুব দামি আর সুন্দর শার্ট প্যান্ট কিনে দেন। সেগুলো পেয়ে তো আমি মহাখুশি, আনন্দে লাফাচ্ছি। অথচ মা আর কারোর জন্য তখন কিছুই কেরেননি। তার মানে এই নয় যে কিনবেন না। আসলে মার্কেটে গিয়ে আমারটা কেনার পর অন্যগুলো কেনার যথেষ্ট টাকা ব্যাগে ছিল না। তাই দেখে আমার মেজ ভাই কেঁদেকেটে অস্থির হয়ে মায়ের সাথে রাগ করে ক’দিন কথাই বলেননি। পরে অবশ্য মা আবার মার্কেটে গিয়ে সবার জন্যই শপিং করে এনেছিলেন। ঈদের দিনটা ছিল আমাদের জন্য মহা আনন্দের দিন। সকালে ঈদের নামাজ সেরে মায়ের হাতের সেমাই, পায়েশ খেতাম। তারপর মা গরুর গোশত ভুনা, মুরগির রোস্ট, পোলাও রান্না করতেন। আমরা যৌথ পরিবার না হলেও এর চেয়ে কম কিছু ছিলাম না। কারণ আমাদের আশপাশেই চাচারা বড় বড় বাড়ি করে ছেলেমেয়ে নিয়ে বসবাস করতেন। সুতরাং ভালো খাবার আমরা সবাই এক সাথেই খেতাম। তাই ছোটকালে কখনো মনে হয়নি আমরা দূরের। আমার মায়ের মনটা ছিল বিশাল। মা সবাইকে এত সাহায্য-সহযোগিতা করতেন, খাওয়াতেন যে এখনো তার সেসব শুভাকাক্সক্ষী দূরদেশ থেকে মায়ের খোঁজখবর নেয়। ঈদের দিন মা আমাদের কাপড়চোপড় পরিয়ে খাইয়ে খালা-মামা-চাচাদের সালাম করতে যেতে বলতেন।
মা চাইতেন আমি যেন বড় ডাক্তার হই। কিন্তু রক্ত দেখলে আমার কী যে ভয় লাগত বলে বোঝাতে পারব না। আমি ছোটবেলা থেকেই ভীতু প্রকৃতির ছিলাম। কেউ জোরে ধমক দিলে, অ্যাক্সিডেন্টের রক্ত দেখলে বুকের ভেতর থেকে একটা প্রচণ্ড ভয় আমাকে আড়ষ্ট করে ফেলত। তাই শেষ পর্যন্ত আর ডাক্তারি পড়ার সাহস করতে পারিনি। এ জন্য অনেক সময়ই আমি নিজেই নিজের ভেতর সঙ্কুচিত হয়ে যাই। তবে মায়ের ছোট ছেলে তাজুল যে, এখন ড. তাজুল ইসলাম হয়েছে, দেশ-বিদেশের মানুষ তাকে চেনে, এটা মা বুঝতে পেরেছেন। গত বছর যখন বাংলাদেশে গিয়েছিলাম, তখন ‘কালের কণ্ঠ’ আমার দুটো আবিষ্কার নিয়ে নিবন্ধন ছাপাল। আমার ছবি নিউজ পেপারে বের হলো- তখন মা বুঝলেন ছেলে তার জগৎখ্যাত একজন বিজ্ঞানী হয়েছে। আমার ছোট বোন মিনুর কাছ থেকে শুনেছি মা পত্রিকায় ছাপা হওয়া আমার ছবি আর লেখাটা সবাইকে দেখান। অথচ আজ তেরো বছর মা আমার বিছানায় প্যারালাইজড হয়ে পড়ে আছেন। হাঁটাচলা করতে পারেন না। যে মানুষটার রান্নাবান্না ও তদারকিতে এত বড় পরিবার সুন্দর সুচারুরূপে পরিচালিত হচ্ছিল, সে মানুষটাই আজ নিথর-নিশ্চল। বড় ভাই নজরুল ইসলাম মা-বাবাকে দেখাশোনা করেন, বোন মিনু শ্বশুরবাড়ি থেকে মাঝে মধ্যে এসে মাকে সেবাযত্ন করেন। আমি তাই তাদের প্রতি ভীষণ কৃতজ্ঞ। মাঝে মধ্যে নিজেকে বড্ড বেশি স্বার্থপর বলে মনে হয়। আমি আসলেই মা-বাবার জন্য কিছুই করতে পারিনি। অথচ মা ছোটবেলায় আমার জন্য কত কিছুই না করেছেন।
তখন আমি ব্যাডমিন্টন জুনিয়র ন্যাশনাল টিমে খেলি, সবাই জানে আমি এক নম্বর খেলোয়াড় অথচ সেবার আমি চার নম্বর খেলোয়াড়ের সাথে হেরে যাই। দুঃখ-অপমানে আমার মন-প্রাণ কাঁদছিল। বাসায় ফিরে নিজের হাত ভেঙে ফেলব বলে ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় ঘুষি মারি। সাথে সাথে গ্লাস ভেঙে আমার হাত রক্তে ভেসে যায়। মা আমার অবস্থা দেখে তো ভয়ে অস্থির। দৌড়ে আমাকে জড়িয়ে বুকে চেপে ধরেন। বোঝান, আদর করেন আর বলেন, ‘বাবা তাজু, এত ভেঙে পড়েছ কেন। খেলায় তো হারজিত থাকবেই। এতে দুঃখ পাওয়ার কিছু নেই। রফিকও আমাকে সে দিন অনেক বুঝিয়েছিল আর প্র্যাকটিস করার কথা বলেছিল, যাতে ওরা আমাকে আর কখনো হারাতে না পারে। সেই প্র্যাকটিস আমার আজও চলছে। আর কোনো দিন কেউ আমাকে হারাতে পারেনি। আমার মায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা ঠিক কতটুকু ছিল জানা নেই। অথচ মায়ের তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা, জ্ঞানের গভীরতা ছিল অপরিসীম। যার কারণে বাবা ব্যবসা করে যা উপার্জন করেছেন, মা এর সঠিক ব্যবহার করে দ্বিগুণ তিন গুণ সম্পদ বাড়িয়েছেন। আমরা তিন ভাই আজ উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত একমাত্র মায়ের উৎসাহ ও সহযোগিতায়। কারণ ঘরে গৃহশিক্ষক নিয়োগ, ভালো স্কুলে পাঠানো সময়মতো পড়তে বসানো, সবই মায়ের নির্দেশেই হতো। হঠাৎ দুই মাস আগে আমার হার্টে তিনটি ব্লক ধরা পড়ল। সাথে সাথে ওপেন হার্ট সার্জারি করা হলো। পোস্ট অপারেটিভ রুমে থাকাকালীন হঠাৎ আমার প্রেসার কমে যাওয়ায় আবার হার্ট অ্যাটাক হলো, সাথে সাথে ডাক্তারেরা ওটিতে নিয়ে আবার অপারেশন করলেন। এ ধরনের অবস্থা লাখ, হাজার রোগীর মধ্যে দু-একটা হয়। আমার ভাগ্য ভালো মায়ের অপরিসীম আশীর্বাদে এ যাত্রায় বেঁচে গেছি। জ্ঞান ফেরার পর আমার বুক ফেটে কান্না আসছিল। ছোট্ট শিশুর মতো মনটা ছুটে গিয়েছিল মায়ের কাছে। ইচ্ছে করছিল মায়ের কাছে ছুটে যাই। যেমন করে মা ছোটবেলায় জ্বর হলে সারা রাত মাথায় হাত বুলিয়ে পানিতে কাপড় ভিজিয়ে মুছে দিতেন আর আমি দ্রুত সেরে উঠতাম- তেমনি মা আমাকে সারিয়ে তুলবেন। ‘মা, তোমায় আমি কতটা ভালোবাসি কোনো দিন মুখ ফুটে বলতে পারিনি। তুমি আমাকে এই পৃথিবীর আলো বাতাসে বড় করেছ- মানুষের মতো মানুষ হওয়ার পথ দেখিয়েছ, এসব তোমার অবদান, তোমাকে আমি হাজার কোটিবার বলছি মাগো, ভালোবাসি তোমায়।

অনুলিখন- রুমা ইসলাম

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫