ঢাকা, মঙ্গলবার,১২ ডিসেম্বর ২০১৭

নারী

এই মা’দের কথা

আব্দুর রাজ্জাক, ঘিওর (মানিকগঞ্জ)

১৪ মে ২০১৭,রবিবার, ১৯:২১


প্রিন্ট


সন্তানকে বড় করে তুলতে মায়েরা সব কিছু উজাড় করে দিয়েছেন। বড় হয়ে সন্তানরা কর্মব্যস্ততার মাঝে মাকে ভুলে থাকলেও মা ভোলেন না কখনো। এমনি কয়েকজন মায়ের জীবনচিত্র তুলে ধরা হলো, যে মায়েদের সন্তান থাকতেও মা ডাক শোনা হয় না। সামর্থ্যবান সন্তান থাকতেও যে মায়েদের জীবন চলে কঠোর কায়িক শ্রম আর অন্যের দয়ায়।
জেলার দৌলতপুরের চর এলাকার প্রবীণ লালতারা বেওয়ার বয়স ৬০ পেরিয়ে গেছে। জেলা শহরের এক বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন দুই যুগেরও বেশি সময়। কোলে শিশু ছেলে আর পাঁচ বছর বয়সী এক মেয়ে রেখে তার স্বামী নিরুদ্দেশ হন ৩০-৩৫ বছর আগে। জীবনের তাগিদে শিশুসন্তানকে কোলে নিয়েই করতে থাকেন বিভিন্ন কায়িক শ্রম। অবুঝ শিশুদের মুখপানে চেয়ে তার জীবনের স্বর্ণালি সময়ে শুরু করা সেই হাড়ভাঙা খাটুনি, তা যেন এ জীবনে আর ফুরায় না। অন্যের বাড়ি ঝিয়ের কাজ করেই তিলতিল করে জমানো টাকায় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। আদরের নাড়িছেঁড়া ধন একমাত্র ছেলে একটি গার্মেন্টে কাজ করে। বিয়ে করে তারা সন্তানসহ ঢাকায় থাকে। খোঁজ নেয় না মায়ের। বয়সের ভারে লালতারা বেওয়ার শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা অসুখ-বিসুখ। এখন আর আগের মতো কাজ করতে পারেন না। দুবেলা দু’মুঠো ভাত খাচ্ছেন তিনি ঠিকই কিন্তু তা অন্যের দয়ায়। জানালেন, ‘বছর তিনেক আগে ঈদের দিন তার ছেলে আসছিল; ৩০০ টাকা দিয়ে গেছে। মেয়ের বিয়া অইছে ম্যালা বড় বাড়িতে; আমার পরিচয় দেয় না, ওগো খুব লজ্জা লাগে। সারাডা জীবন রক্ত পানি কইরা ওগোরে বড় করলাম যাতে শেষ বয়সে ওরা আমারে দ্যাহে (দেখে), তা আমার কপালে সইল না। এমন কপাল আল্লায় যেন কাউরে না দ্যায়। তবুও দোয়া করি আল্লায় যেন ওগোরে সুখে রাখে।’ কথা বলার সময় দু’চোখের কোণে পানি টলমল করছিল। বারবার আঁচল দিয়ে পানি মোছার চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হন। একপর্যায়ে কেঁদে ওঠেন হাউমাউ করে... অস্ফুট স্বরে শুধু বললেন, ‘ওগো দেখবার খুউব মন চায়, কত দিন দেখি না ওগোরে। কতদিন মা ডাক শুনি না।’
শুধু বেঁচে থাকার তাগিদে বৃদ্ধ বয়সে এসেও ভিক্ষা করতে হচ্ছে এক অসহায় মা হাজেরা বেগমকে। ঘিওরের তরা এলাকায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ভিক্ষা করছেন তিনি। বয়সের ভারে বৈশাখের তপ্ত দুপুরে ঠিকমতো পথও চলতে পারছিলেন না। ছেলে রায়হান বিয়ে করে শ্বশুরবাড়িতে থাকে। একটিবারও খোঁজ নেয় না গর্ভধারিণী মায়ের। তবু সন্তানের প্রতি তার কোনো আক্ষেপ নেই। তবুও তারা সবসময় দোয়া করে তার সন্তান যেন ভালো থাকে।
তেমনি কান্না মিশ্রিত এসব মায়ের দুঃখ গাথার বিপরীতে আছে কিছু সুখের পঙ্ক্তিমালা। সন্তানদের সুখের জন্য একজন মা যে কতটা কষ্ট করেন তার একটি উদাহরণ মানিকগঞ্জের আরুয়া ইউনিয়নের বাউলিকান্দা গ্রামের মর্জিনা বেগম। ১৮ বছর আগে দুই শিশুসন্তান রেখে মর্জিনা বেগমের স্বামী ঢাকায় কাজের খোঁজে গিয়ে আর ফেরেননি। পরে জানতে পারেন তিনি মারা গেছেন। এরপর থেকেই শুরু হয় তার জীবনযুদ্ধ। সংসারের হাল ধরতে কখনো অন্যের বাড়িতে, কখনো আবার কাজ করেছেন ফসলের মাঠে। এখনো মর্জিনা বেগম কেয়ার বাংলাদেশের হয়ে ইউনিয়ন পরিষদের একজন তালিকাভুক্ত মাটি কাটা শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। কিন্তু এই সংগ্রামী নারী তার ছেলেকে বানাচ্ছেন এমবিবিএস ডাক্তার। ছেলে রিপন বিশ্বাস ঢাকার একটি মেডিক্যাল কলেজের শেষ বর্ষের ছাত্র। মেয়ে সুরমা আক্তার এইচএসসি পরীক্ষার্থী। তাকেও আইনজীবী বানাতে চান মা মর্জিনা।
মর্জিনা বেগম জানান, অভাবের মধ্যে দুই ছেলেমেয়ের লেখাপড়াকে আত্মীয়স্বজন আর প্রতিবেশীরা বাঁকা চোখে দেখতেন। তাদের লেখাপড়া বন্ধ করে দিয়ে কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন অনেকে। কিন্তু ছেলের একের পর এক ভালো রেজাল্টে সবাই খুশি হয়েছেন। এ পর্যন্ত আসার পেছনে এলাকাবাসীও অনেক আর্থিক সহযোগিতা করেছেন। মুখে একগাল তৃপ্তির হাসি হেসে তিনি জানান, আজ আর আমার কোনো কষ্ট নেই। আমি সব কষ্টের কথা ভুলে গেছি। ছেলে আমার ডাক্তার হইছে, গরিব দুঃখীর সেবা করতে পারবে। মেয়েকে উকিল বানাব, যেন সেও মানুষকে আইনি সেবা দিতে পারে। ছেলে রিপন বিশ্বাসও তার মায়ের এই কষ্টে অঝরে কাঁদে। তার স্বপ্ন একদিন সে তার মায়ের মুখে পরিতৃপ্তির হাসি ফোটাবেই। তার গর্ব সে একজন আদর্শ মায়ের গর্ভে জন্মেছিল।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫