ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২২ জুন ২০১৭

অবকাশ

মধুর আমার মায়ের হাসি

প্রতিটি দিন হোক মায়ের জন্য

মো: মোস্তাফিজুর রহমান ভূইয়া

১৪ মে ২০১৭,রবিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

বাংলাদেশে মা দিবস বা বাবা দিবস প্রচারমাধ্যমে প্রচার ও জনগণের মধ্যে এ দিবসের প্রভাব পড়া শুরু হয়েছে বেশি দিন নয়। শুরু হওয়া থেকেই বিরক্ত হতাম। ভাবতাম, তাদের নিয়ে আবার দিবস কী! প্রতিদিনই মা-বাবা দিবস। কিন্তু ২০১৫ সালে মা দিবসের রাতেই যে মা না ফেরার দেশে চলে যাবেন তা তো কস্মিনকালেও ভাবিনি। কিছু দিন মায়ের ঘাড়ের নিচে পিঠের ব্যথা, স্থানীয়ভাবে মাকে ডাক্তারের কাছে নিলাম কিন্তু ওষুধ সেবনে কিছু হয় না। এরই মধ্যে এক রাতে হঠাৎ পিঠের ব্যথা বেড়ে যাওয়ায় মিরপুরের ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালে নিয়ে গেলাম ইমার্জেন্সিতে। তারা ইসিজি করে মত দিলেন হার্টের কোনো সমস্যা না। ভর্তি করাতে বললাম। তারা সমস্যা নেই ও বেড খালি না থাকায় বাসায় নিয়ে আসতে বললেন। অগত্যা আর কী করা।
বাসায় আনার পাঁচ-সাত দিন পর আরো অবস্থার অবনতি! মা প্রলাপ বকা শুরু করলেন, খিঁচুনি দিয়ে চোখ উল্টে গিয়ে দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম। তাড়াতাড়ি অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার পথে বেশ কয়েকবার খিঁচুনি আর চোখ উল্টে মূর্ছা যাওয়ার অবস্থা। এবার বাসা থেকেই ল্যাব এইড হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার নিয়ত করলাম। আগের হাসপাতাল হার্টের কোনো সমস্যা নেই বলে নিশ্চয়তা দেয়ায় ইমার্জেন্সিতে নিয়ে মেডিসিন বিভাগে ভর্তি করলাম। ঘণ্টা দেড়-দুইয়ের মধ্যেই তারা সিদ্ধান্ত জানালেন যে, মায়ের মেডিসিনজনিত সমস্যা নয়, সমস্যা হার্টেরই। হৃদরোগ বিভাগের প্রফেসর জাহের সাহেবের তত্ত্বাবধানে মাকে ভর্তি করলাম। উনি বললেন এখনই এনজিওগ্রাম করাতে হবে। ডিজিটাল এক্সরে দেখালেন এক পাশের হৃৎপিণ্ড থেকে রক্ত চলাচল বন্ধ হওয়ায় এ অবস্থা। এনজিওগ্রাম করে রিং না পড়ালে সর্বোচ্চ ৭-৮ ঘণ্টার মধ্যে অসার হয়ে মারা যাবেন। আর রিং পরালে বাঁচার সম্ভাবনা ফিফটি ফিফটি। খরচ বললেন সাড়ে তিন লাখ টাকা। তিন দিনের বেশি সিসিইউতে রাখতে হলে (এর মধ্যে জ্ঞান না ফিরলে) প্রতিদিনের জন্য ২৫ হাজার টাকা হারে অতিরিক্ত দিতে হবে। সাথে সাথেই রাজি হয়ে বললাম, ‘আল্লাহ ভরসা, আপনি চিকিৎসা করুন।’ তথ্যপ্রযুক্তি উন্নত হওয়ায় পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে মুহূর্তেই খবরাখবর জানা ও জানান যায়। দীর্ঘ প্রবাসে অবস্থানরত প্রবাসী ভাই অ্যাম্বুলেন্সে থাকতেই ফোন দিলে বললেন মোস্তাফিজ, দীর্ঘ প্রবাসজীবনে মা-বাবার পাশে থাকতে পারিনি। টাকার চিন্তা আমার ওপর ছেড়ে দাও। মায়ের চিকিৎসায় যাতে কোনো অবহেলা না হয়। ফোনটি যেন বুকের ওপর বসা ভাবনার জগদ্দল পাথরটি সরিয়ে দিলো মুহূর্তেই। রিং বসানো হলো। সিসিইউর ১৭ রোগীর মধ্যে মা সত্তরোর্ধ। সর্বনি¤œ ৩২ বছরের যুবক, যার জীবনের কোনো শঙ্কা নেই, সবাই ভেবেছিল। কিন্তু সবার আন্দাজকে মিথ্যা প্রমাণিত করে যুবক সবার আগে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। তার স্ত্রী স্বামীর অসময়ে চলে যাওয়ার হতাশায় ফোরে গড়াগড়ি খাচ্ছেন। বিলাপ করছেন, অতীতের বিভিন্ন দাম্পত্যকালীন স্মৃতি ঘিরে। অবুঝ ছোট সন্তানদ্বয় মায়ের অবস্থা দেখে ভড়কে গিয়ে মা ও অন্য সবার দিকে দেখছে বড় বড় চোখ করে। বুকের মাঝখানটা কেমন ধড়ফড়িয়ে ওঠে, রক্তের চাপ বেড়ে যায়। রক্ত যেন শিরদাঁড়া বেয়ে মাথায় ওঠে, মাথাব্যথায় টনটনিয়ে ওঠে। আজীবন দেখা মায়ের বর্তমান মুখটি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। স্ত্রী আর আমি রাত পার করে দিলাম সিসিইউর বাইরে। ক্ষমতাসীন দলের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পরের বছরের ৫ জানুয়ারি থেকে লাগাতার হরতাল চলছে। ঢাকা সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন। ঢাকার বাইরের আত্মীয়স্বজন ফোনের পর ফোন, সবাইকে সান্ত্বনা দেইÑ ‘এসে কী করবেন, আল্লাহর কাছে দোয়া করেন।’
সারা রাত সারা দিন দাঁড়িয়ে থাকায় পা ফুলে উঠেছে। কান্ত, হতাশা, মাতৃবিচ্ছেদের ভয় প্রভৃতিতে মনের অস্থির অবস্থা। সন্ধ্যার দিকে হোন্ডা করে ভাগিনা রাজন নোয়াখালী থেকে হাসপাতালে হাজির। মামাতো ভাই সুমনও সন্ধ্যায় এলো। সুমন ও ভাগিনা আমাদের দু’জনকেই বাসায় চলে যেতে বলল। ভাগিনা হাসপাতালে থাকবে। শারীরিক অবস্থা ও তাদের অনুরোধে বাসায় গেলাম। জোর করে সামান্য কিছু খেয়ে এশার নামাজ পড়ে শুয়ে পড়লাম। শরীর কান্ত হলেও সামান্য ঘুমের পরে ঘুম ভেঙে যায় বারবার। বিছানা ছেড়ে অজু করে মধ্যরাতে তাহাজ্জুদের অভ্যাস কোনো দিন ছিল না। জীবনের দ্বিতীয় বা তৃতীয়বারের মতো দুই রাকাত করে চার রাকাত তাহাজ্জুদের নামাজ পড়লাম। রাতে শোয়ার সময় স্ত্রীকে বলেছিলাম আমার হায়াতের বিনিময়েও মা বাঁচলে আমি খুশি। এ কথায় স্ত্রী কেমন ফ্যালফ্যাল করে অন্য দিকে দূরে তাকিয়ে নির্বাক হয়ে যায়। 
নামাজন্তে স্বল্প জানা দোয়া দুরুদ, কুরআন পড়ে আল্লাহর দরবারে হাত তুললাম, মার হায়াত দারাজ করার আকুতি আমার হায়াতের বিনিময়েও রোনাজারির মাধ্যমে জানাতে লাগলাম, দয়াময়ের দরবারে। মুনাজাতেই অবচেতন মনে পূর্বভাবনা বা সিদ্ধান্ত ছাড়াই অন্তত তিন মাসের হায়াত চাইলাম। ফজরের ঘণ্টাখানেক আগে ভাগিনা ফোন করে জানালÑ ‘নানুর জ্ঞান ফিরেছে, আমি কথা বলেছি। আমাকে চিনতে পেরেছে।’ তখনই হাসপাতালে যেতে চাইলাম কিন্তু সম্ভব হলো না।
মা সম্পূর্ণ সুস্থ, এক মাস পর পর ডাক্তারের কাছে নিতে হবে। হাঁটেন ভোরে। অভ্যাস মতো দীর্ঘক্ষণ নামাজ পড়েন। তিন মাসের মধ্যে বা কিছু বেশি সময়েই মা দিবসে চ্যানেল আইর মা দিবসের অনুষ্ঠানে সর্বশেষ গান হচ্ছে মধুর আমার মায়ের হাসি...। রাতের খাওয়ার পর মাকে ওষুধ খাইয়ে অন্য দিনের মতোই শুইয়ে দিলাম। কিছুক্ষণ পরে পাশের রুমে নিজেও শুয়ে পড়লাম। ওই রাতেই সময় জানি না মা রুমে এসে ডাক দিলেন, ধড়ফরিয়ে উঠলাম। মা বলছেন ‘মোস্তাফিজ, আমি আর বাঁচব নারে।’ মাকে বিছানায় শোয়াতে চাইলাম। মা নিজের রুমে ফিরে গেলেন তাড়াতাড়ি। পেছনে পেছনে এসে জড়িয়ে ধরে বিছানায় নিতে চাইলাম। মা ফোরে শুয়ে পড়লেন কিছুক্ষণের মধ্যেই না ফেরার দেশে চলে গেলন মা, কাকতালীয়ভাবে মা দিবসেই। আমার মতো অভাজনের দোয়া বিধাতা শুনলে এত সময় দিলেন কেন। ভাবলেই কেমন অব্যক্ত যন্ত্রণা আর কষ্টে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি হ্যালুসিনেশন শুনিÑ মধুর আমার মায়ের হাসি...
লেখক : অ্যাডভোকেট
দেওভোগ, মুন্সীগঞ্জ

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫