ঢাকা, শুক্রবার,২০ অক্টোবর ২০১৭

রকমারি

মাকে যেন ভুলে না যাই

মিলি সুলতানা

১৩ মে ২০১৭,শনিবার, ১৮:২৪


প্রিন্ট

নদীর তলদেশে নিমেষে যাওয়া যায় কিন্তু মায়ের ভালোবাসার গভীরতা পরিমাপ করা যায় না। ‘মা’ যেন সীমার মাঝে অসীম। প্রতি বছরের মতো এবারও মা দিবস এমন একটি সময়ে এসেছে, যে সময়ে মায়েদের কান্নার শেষ নেই।
সকালের নাশতায় একটা জিনিস আমার খুবই অপছন্দের। সেটা হলো দুধ দিয়ে সিরিয়াল। বিভিন্ন রকমের পুষ্টিকর সিরিয়াল আছে। কর্নফ্লেক্স, ফ্রস্টেড ফ্লেক্স, অ্যাপেল সিনামন, হানি স্ন্যাক্স, গ্র্যানোলা, গোল্ডেন পাফস্, হানি নাট চেরিওস, স্প্রিংকল্ড ডোনাট ক্রাঞ্চ, চেরিওস হোল গ্রেইন ওট, রেইজিন ব্র্যান ক্রাঞ্চ, কোকোয়া পাফস, ইত্যাদি জাতের সিরিয়াল দেখে আসছি গত আট বছর যাবৎ। আমার দুই সন্তান দুধ সিরিয়াল খেয়ে স্কুলে যায়। স্কুলের নাশতায় শর্টকাট মেরে দেয়া আর কি।
সাধারণত বাচ্চারা ঘুম থেকে ওঠার সময় অনেক মন খারাপ করে। আরামের ঘুম বিসর্জন দিয়ে ওদের স্কুলের জন্য তৈরি হতে হয়। কখনো কখনো বেসিনের সামনে টুথব্রাশ হাতে দাঁড়িয়ে ঝিমাত আমার বাবুটা। আমি তো মা। এমন দৃশ্য দেখে বুক হুহু করে ওঠা স্বাভাবিক। ভাবি, ওদেরকে হুড়মুড় করে রেডি করিয়ে স্কুলে পাঠিয়ে তাদের মা স্বার্থপরের মতো নির্বিঘেœ কয়েক ঘণ্টার ঘুম দেয়। রুটি ডিম পরোটা খাওয়ার সময় থাকে না বলে দুধ সিরিয়ালই হল শর্টকাট ব্রেকফাস্ট। ওদের বাবাও অফিসে যাওয়ার আগে দুধ সিরিয়াল গেলে দুঃখী দুঃখী মন করে। আমি সব বুঝি। কিন্তু বাস্তবতা যে মেনে নিতে হবে। কর্তা হয়তো আশা করেন তার গিন্নি ঘি তেলে মচমচে পরোটা ডিম ভাজি আলুভাজি দিয়ে উনাকে নাশতা পরিবেশন করবে। কিন্তু মনের আশা মনেই তালাচাবি মেরে রাখা উচিত। আমি ওদিকে ধ্যান দেই না, ইচ্ছা থাকলেও পারা যায় না।
প্রবাসে সংসারের কাজের মতো অসম্ভব কঠিন কাজ আর অন্যটি নেই। বাইরের আট ঘণ্টা চাকরি এর চেয়ে অনেক স্বস্তিকর। আমরা বাঙালি, স্বভাবতই কিচেনের সাথে আমাদের বিরাট ব্যাপার স্যাপার থাকে। আমেরিকানদের কিচেন অনেক ঝকঝকে তকতকে। কারণ তারা আমাদের মতো গাদাগাদা রান্না করে না। তেল মসলা ব্যবহার করে না। চুলায় ময়লা জমে না। তারা বেকড ফুডে অভ্যস্ত। আমরা বাঙালিরা বেক করা ফুড খেতে অভ্যস্ত নই। পোলাও বিরিয়ানি ভাত মাছ গোশত ভর্তা করি। রান্নার পর সিঙ্ক ও চুলা পরিষ্কার করতেই হবে। নাহলে গ্রিজি হয়ে যায় চুলা ও চুলার আশপাশের দেয়াল। ফ্যান্টাস্টিক কিচেন ক্লিনার স্প্রে করে চুলা পরিষ্কার করার পর মনে আসল শান্তি আসে।
বলছিলাম ব্রেকফাস্ট হিসেবে দুধ সিরিয়ালের কথা। এই নাশতা বিগত আট বছরে আমি মুখেও তুলে দেখিনি। কেন জানি দুধ সিরিয়াল খেতে প্রচণ্ড অনীহা আমার। শিশুরা খায় আমি ওদের দিকে তাকিয়ে ভাবি, আল্লাহ ওদের বুদ্ধি বাড়িয়ে দিও। ওরা যেন সিরিয়াল নিয়ে কোনো দিন আন্দোলন শুরু না করে। আমার আম্মা যখন আমেরিকায় থাকতেন দুধ সিরিয়াল খেতেন। আরেকটা নাশতা আম্মার খুব পছন্দের ছিল। বেগল উইথ এগ অ্যান্ড চিজ স্লাইস। ছোটবেলায় বনরুটি নামের এক ধরনের গোল পাউরুটি খেতাম। গ্রামে বলত বনরুটি। পাউরুটির সাইজ যদিও স্কয়ার। এই রুটি রাউন্ড অর্থাৎ গোল শেপের। মোটা দুটো পিস একটার সাথে আরেকটা লাগানো থাকে। ঠিক বার্গারের মতো।
ফ্রাইপ্যানে অল্প তেল দিয়ে ডিম অমলেট করে ফ্রাইপ্যান থেকে ডিম তুলে রাখতে হয়। এরপর বেগল অর্থাৎ বনরুটির দুই সাইড চুলায় সেঁকে অমলেট করা ডিমটা বেগলের মধ্যে রেখে ডিমের ওপর এক স্লাইস চিজ দিয়ে বেগলের বাকি অংশ দিয়ে ডিম ও চিজ ঢেকে দিয়ে খুব সাবধানে খুন্তি দিয়ে বেগলের দুই সাইড সামান্য উল্টে দিতে হয়। যাতে চিজ স্লাইস সামান্য গলে যায়। খুব টেকনিক্যালি এই নাশতা বানাতে হয়। বেগল বানানো আমি শিখেছি আমার সেজো ভাবীর কাছ থেকে। অনেকে অনেকভাবে খায়। টোস্টারে দিয়ে খায়। কিন্তু আমি সেজো ভাবীর পদ্ধতি অনুসরণ করি।
আম্মার অন্যতম পছন্দের এই নাশতা আমারও পছন্দের তালিকায় চলে আসে। ২০১৫ সালে আমার আম্মা শেষবার আমেরিকায় এসেছিলেন। এখন উনি বাংলাদেশে। আবার আমেরিকায় আসবার মতো সেই শারীরিক শক্তি সামর্থ্য উনার নেই। প্রায় সকালে আমরা মা মেয়ে একসাথে বেগল খেতাম। চা খেতাম। আম্মা তার জীবনের নানা কাহিনী শেয়ার করতেন। আমি খেয়াল করতাম, খুব মনোযোগ দিয়ে যখন তরুণী বেলার কাহিনী শুনতাম তখন আম্মা খুব খুশি হতেন। মনোযোগী শ্রোতা সবাই আশা করে। এটা ঘরে বাইরে যেখানেই হোক না কেন।
সেই আমি এখন সকালের নাশতায় বেগল খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। কেন জানেন? আমার আম্মা বেগল খান না বলে। বালাদেশে বেগল নেই। আম্মা খাচ্ছেন না, তাই আমিও খাচ্ছি না। একদিন আমার কন্যা শখ করে তার বাবাকে দিয়ে বেগল কিনে আনাল। আমি রান্নাঘরে বেগল তৈরি করছি আর চোখের জল ফেলছি। ছেলেটা বুঝল তার মায়ের কান্নার কারণ। আমার বুকে যন্ত্রণার তুফান বইছিল। বেগল যেন আম্মার জন্য বানাচ্ছিলাম। কি অব্যক্ত সেই কষ্ট। বুক থেকে এই কষ্ট নদীর স্রোতের মতো যদি ছেড়ে দিতে পারতাম, কিছুটা অন্তত শান্তি পেতাম। বুকের নদীতে শক্ত বেড়িবাঁধের উপস্থিতি টের পেলাম। কষ্টগুলো যেন দলা পাকিয়ে আছে। কবে আম্মাকে দেখব।

নিউ ইয়র্ক

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫