ঢাকা, শুক্রবার,২৩ জুন ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

চিহ্ন

জোবায়ের রাজু

১৩ মে ২০১৭,শনিবার, ১৭:৩৯


প্রিন্ট

টানা এক মাস হাসপাতালের বিছানায় কাটিয়ে ক্যান্সার রোগের কাছে হার মেনে মা চুপচাপ মারা গেলেন। ভোরে বাবার ফোন কলের আচমকা রিংটোনে যখন আমার ঘুম ভাঙে, রিসিভ করার আগেই বুঝতে পারলাম বাবা এমন কোনো দুঃসংবাদ শোনাবেন।
মা দীর্ঘ দিনের সংসারজীবনে তার দুই সন্তানকে সমান মমতা বিলাতে কোনো দ্বিধা রাখেননি। তবুও মায়ের এই মৃত্যুসংবাদ শুনে আমি স্বাভাবিকই ছিলাম। গলা ফাটানো কান্না তো দূরের কথা, আমার চোখে জলও আসেনি। শ্যামা আমার পাশে গাঢ় ঘুমে মগ্ন। সে জানে না আজ সে জীবনের কী জিনিস চিরতরে হারিয়েছে।
শ্যামাকে নিয়ে সকালে আমি যখন হাসপাতালের নিচতলায়, সে আপত্তির সুরে জানাল ‘দাদা, আমি যাব না। সুঁই সুতা দেখলে আমার ডর করে।’ কোনো কথা না বলে তাকে টেনে ৩০৫ নাম্বার কেবিনে নিয়ে এলাম।
করিডরে বাবার সকরুণ মুখ দেখেও আমার ভেতরে শোকের আবেগ আসেনি। বেডে সাদা কাপড়ে ঢেকে রাখা হয়েছে মায়ের মৃতদেহ। লাশ দেখতে আমার ভালো লাগে না। মায়ের লাশ একবারও দেখলাম না। ক্যান্সারে বিকৃত হয়ে যাওয়া যে মায়ের মুখের দিকে এত দিন তাকাইনি, আজ তার মৃত মুখও দেখতে ইচ্ছে করছে না।
মায়ের লাশ ঘিরে কতগুলো অচেনা মানুষ। এরা কারা! বাবা নিচুগলায় বললেন, ‘এরা তোর খালা আর মামিরা। ওই যে সাদা দাড়িওয়ালা মুরব্বি, উনি তোর নানাজান।’
জীবনে এই প্রথম আমার মায়ের পক্ষের পরিজনদের দেখছি। নানাজানকেও এই প্রথম। ইনিই তাহলে সেই নানাজান, যার ওপর জীবনভর আমার মায়ের রাগ আর ক্ষোভ ছিল গগনচুম্বী।
পঁচিশ বছর আগে মা যখন আমার বাবাকে ভালোবেসে তার বিত্তবান বাবার রাজমহল ছেড়ে এক কাপড়ে চলে এসেছেন বাবার কুঁড়েঘরে, তার পর থেকে নানাজান তার মা-মরা বড় মেয়েকে (আমার মা) ক্ষমা করেননি। প্রাচুর্যে বড় হয়েও আমার মা যখন তার সৎমায়ের সংসারে দিন দিন অবহেলার পাত্রী হয়ে উঠেছেন, তখন একটুখানি সুখের জন্য ভালোবাসার মানুষের কাছে চিরতরে সেই যে চলে এসেছেন, এই পঁচিশ বছরে একবারও বাপের বাড়ি যাননি। এমনকি নানাজানও এত বছরে তার প্রথম সন্তানটির একটু খোঁজ নেননি। মা মুখে না বললেও এই শোকে রোজ যে গুমরে কাঁদতেন, আমি সব জানি।
মেয়ের ক্যান্সার হয়েছে, এই সংবাদ নানাজান কার মুখে যেন জেনেছেন। মেয়েকে দেখতে না এলেও মেয়ের চিকিৎসার খরচ চালাতে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়েছেন, বাবা তার অদেখা শ্বশুরের লোক মারফত পাঠানো সেই টাকা গ্রহণও করেছেন। আর্থিক সঙ্কটে ভোগা বাবা হয়তো তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে বাঁচাতে শ্বশুরের প্রতি সব অভিমান ভুলে টাকাটা প্রয়োজনীয় মনে করেছেন।
আজ মা মারা গেছেন। এই সংবাদ পেয়ে নানাজান দলবল নিয়ে মৃত মেয়েকে দেখতে হাসপাতালে ছুটে এসেছেন।
সাদা ধবধবে পাঞ্জাবি পরা নানাজান বাবাকে বললেন, ‘শাহনাজের দাফন আমার বাড়িতেই হবে, যদি তুমি আপত্তি না করো। সেখানে আমাদের পারিবারিক কবরস্থানে শাহনাজ তার মায়ের কবরের পাশে থাকবে।’ এই বলে নানাজান কাঁদতে লাগলেন। কান্নামাখা কণ্ঠে বাবা বললেন ‘আমি রাজি। তাই হোক।’
সকাল ১০টায় অ্যাম্বুলেন্সে করে মায়ের লাশ নিয়ে আমরা রওনা দিলাম কেশারখিল গ্রামে। জীবনে এই প্রথম নানার বাড়ি যাচ্ছি মাকে নিয়ে। মায়ের লাশ নিয়ে।
কেশারখিল ব্যাপারিবাড়ির প্রকাণ্ড উঠোনে খাটিয়ায় রাখা হলো মায়ের লাশ। শ্যামা, বাবা আর আমি কাতর চোখে দেখছি নানাবাড়ির চোখধাঁধানো পরিবেশ। নানাজানরা পয়সাওয়ালা শুনেছি, কিন্তু এত যে রাজকীয় হাল, জানতাম না।
মায়ের লাশ দেখতে প্রতিবেশীদের ঢল নেমেছে। এ বাড়ি থেকে সব কিছু ছেড়ে যে মেয়ে একদিন চলে গেছে, পঁচিশ বছর পর সে মেয়ে লাশ হয়ে ফিরেছে বলে হয়তো তাদের এত আগ্রহ। খাটিয়া ঘিরে জটলার ভেতর থেকে কারো কারো প্রবীণ গলার কান্না আসছে। এরা সম্ভবত মায়ের চাচী-জেঠি শ্রেণীর কেউ, যাদের স্নেহপরায়ণ গল্প প্রায়ই মা আমাকে বলতেন চোখের জল ফেলে।
বিকেলে নানীর কবরের পাশে মায়ের কবর হলো। বাবা চোখের জল মুছছেন বারবার। নানাজানও। শ্যামা আমার গলা জড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে গেল। ঘুমন্ত শ্যামাকে নিয়ে নানাজানের বিশাল ঘরে ঢুকলাম। লাখ টাকার পালঙ্কে শুইয়ে দিলাম শ্যামাকে। মুন্নি নামে আমার এক খালা এসে বললেন, ‘তোমাকে শরবত করে দিই?’ আমি বললাম ‘না’। শ্যামা তৎক্ষণাত ঘুম থেকে উঠে গেল। এই অট্টালিকা ঘর দেখে তার চোখে রাজ্যের কৌতূহল। অবাক কণ্ঠে বলল, ‘এ কার বাড়ি দাদা?’ জবাব দিলাম না।
দাফন শেষে নানাজান, বাবা, আরো কারা কারা যেন ঘরে এলো। সোফায় বসে নানাজান বাবাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলেন। শোকে ভারী হলো ঘর। চোখের সামনে অচেনা যাদের দেখছি, সবার চোখে পানি।
দেয়ালজুড়ে এ পরিবারের সব সদস্যের বিভিন্ন বয়সের আলাদা আলাদা ছবি ঝুলছে। আমার সৎমামা আর খালাদের কত ছবি দেখা যাচ্ছে। না, আমার মায়ের কোনো ছবিই তো এখানে নেই। হয়তো সারা ঘরে খুঁজলেও মায়ের কোনো চিহ্ন পাওয়া যাবে না। নানাজান কিংবা এ ঘরের অন্য মানুষগুলো হয়তো আমার মায়ের সব চিহ্ন এ ঘর থেকে মুছে ফেলেছেন আরো অনেক আগেই।
না, আমার মায়ের চিহ্নহীন এই ঘরে আর থাকতে পারব না। বড় কষ্ট হচ্ছে আমার। বাবাকে বললাম, ‘চলেন, শ্যামাকে নিয়ে আমরা এখান থেকে এবার চলে যাই।’ আমি যেন কোনো অবাক করা কথা বলেছি, সে ভঙ্গিমায় উপস্থিত সবাই আমার দিকে তাকিয়ে রইল।

আমিশাপাড়া, রাজু ফার্মেসি, নোয়াখালী

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫