ঢাকা, শনিবার,২২ জুলাই ২০১৭

চট্টলা সংবাদ

চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে ব্যবসায়ীদের আতঙ্ক জলাবদ্ধতা

ওমর ফারুক চট্টগ্রাম ব্যুরো

১১ মে ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার কারণে কর্ণফুলীর তীরে খাতুনগঞ্জ, আসাদগঞ্জ, চাক্তাই, কোম্পানিগঞ্জ, টেরিবাজার এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছে দেশের বৃহত্তম পাইকারি বাজার। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসহ প্রয়োজনীয় সব কিছু পাওয়া যায় এ বাজারে। দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীদের শিল্প-বাণিজ্য শুরু এখন থেকে। এখানকার বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী সারা দেশে সরবরাহ করা হয়। দেশের সব আর্থিক প্রতিষ্ঠান ব্যাংক-বীমার শাখা আছে এখানে। এসব ব্যাংক প্রতি কার্যদিবসে হাজার কোটি টাকা লেনদেন করে। অথচ সময়ের প্রয়োজনে এ পাইকারি বাজারের অবকাঠামোগত কোনো উন্নয়ন হয়নি। ফলে এক পশলা বৃষ্টিতে এখানকার অবস্থা হয়ে যায় খুব খারাপ। আর কয়েক দিনের টানা বর্ষণে স্থবির হয়ে পড়ে দেশে ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের ব্যবসা-বাণিজ্য।
এখনকার ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, জোয়ারের পানিতে ডুবে যায় মধ্যম চাক্তাই, নতুন চাক্তাই, চর চাক্তাই, পুরনো চাক্তাই, মকবুল সওদাগর রোড ও আসাদগঞ্জের প্রতিটি সড়ক। এ ছাড়া খাতুনগঞ্জ সড়কের পাশে হামিদুল্লাহ মার্কেটে গত বর্ষায় পানি ছিল গলা সমান। পাশাপাশি চান্দমিয়া গলি, ইলিয়াছ মার্কেট, বাদশা মার্কেট, সোনা মিয়া মার্কেট, নবী মার্কেট, মাল্লা মার্কেট, চাক্তাই মসজিদ গলি, ড্রাম পট্টি, চাল পট্টি ও এজাজ মার্কেটসহ বেশির ভাগ মার্কেটেই পানি ঢুকে পড়ে। চাক্তাই এলাকার চাল পট্টিতে কয়েক শ’ চালের দোকানে এবার পানি উঠে প্রচুর চাল নষ্ট হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন চাল বিক্রেতারা। তারা আরো বলেন, গত বছর জলাবদ্ধতা ও জোয়ারের কারণে প্রায় ৮০ শতাংশ দোকান ও আড়তে পানি ঢুকে পড়েছিল। এ জন্য তারা চাক্তাই-রাজাখালী খালসহ গুরুত্বপূর্ণ খালের মুখগুলো ভরাট হওয়াকে দায়ী করেছেন। বর্ষার আসতে আর মাত্র দুই মাস বাকি। এখনো জোরালোভাবে শুরু হয়নি খাল খনন ও পরিষ্কারের কাজ। এবারো এসব এলাকার ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন জলাবদ্ধতায় কোটি কোটি টাকার পণ্য নষ্ট হতে পারে।
ট্রেডবলিও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, দেশের মোট ভোগ্যপণ্যের ৪০-৫০ শতাংশ খাতুনগঞ্জে বিকিকিনি হয়। প্রতিদিন গড়ে ৮০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয় এ বাজারে। কিন্তু অবকাঠামো উন্নয়নের অভাবে এখানকার ব্যবসায়ীরা প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন। স্লুইস গেট না থাকা ও চাক্তাই-রাজাখালী খাল কার্যত ভরাট হওয়ায় খাতুনগঞ্জে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। জনপ্রতিনিধিদের এসব সমস্যা জানানো হলেও কোনো প্রতিকার হয়নি। অথচ ভোগ্যপণ্য আমদানিকারকদের জন্য বর্ষাকাল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় ব্যবসায়ীরা চাহিদার সাথে সঙ্গতি রেখে পণ্য আমদানি করেন। বর্ষা ও জলাবদ্ধতার কারণে প্রতিবারের ভেঙে পড়ে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা। ফলে পণ্য চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যাংকঋণসহ প্রয়োজনীয় খরচ পরিশোধে লোকসানে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হন অনেক ব্যবসায়ী।
এ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, আমাদের আতঙ্কের নাম জলাবদ্ধতা। গত বছর বাজারের এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০ দোকান ও গুদামে পানি ঢুকে কাঁচা মাল ও ভোগ্যপণ্যসহ প্রায় শতকোটি টাকার মালপত্র নষ্ট হয়ে যায়। তারা বলেন, চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের প্রায় প্রতিটি সড়কে চার-পাঁচ ফুট পানি জমে; যা গত ২৪ বছরে এটি বাজারে সর্বোচ্চ পানি। এর আগে ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে এখানে এ পরিমাণ পানি উঠেছিল।
খাতুনগঞ্জ ব্যবসায়ী সমিতির তথ্য মতে, দেশের বৃহৎ এ পাইকারি বাজারে স্বাভাবিক সময়ে ৮০০ থেকে এক হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। রোজার মাসে লেনদেনের পরিমাণ এর চেয়েও বেশি। সামনে রোজার মাসের বেচাকেনা বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু কয়েক বছর ধরে এসব এলাকায় জলাবদ্ধতা নিরসনে কোনো প্রকল্প নেয়া হয়নি। এতে আমরা এখন জলাবদ্ধতার আতঙ্কে আছি। শঙ্কায় আছি লোকসানের। বারবার সংশ্লিষ্ট সবার সাথে যোগাযোগ করলে মিলে আশার বাণী কিন্তু বাস্তবায়ন এখনো দেখিনি।
বন্দর সুবিধা ও নদী তীরবর্তী বাজার হওয়ায় খাতুনগঞ্জের জৌলুস দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়লেও বর্তমানে নদীর জোয়ার-ভাটার কারণেই বর্ষা মওসুমে পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে সেখানে। কয়েক বছর ধরে ভারী বর্ষায় সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় পণ্য নষ্ট হওয়া নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এ েেত্র ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়া প্রতি বছরের ভোগ্যপণ্য বাণিজ্যের ব্যবসায়িক তি রোধ করা সম্ভব নয় বলে জানান পাইকারি ব্যবসায়ীরা। সরেজমিন চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ ঘুরে দেখা যায়, খাতুনগঞ্জ, চাক্তাই ও আসাদগঞ্জ এলাকার চাক্তাই খাল সীমিতভাবে খনন ও পরিষ্কারের কাজ চলছে। অন্য দিকে গতকাল পর্যন্ত রাজাখালের খনন ও পরিষ্কারের কাজ শুরু হয়নি। অন্যান্য খালে আবর্জনায় ভর্তি ও পানির প্রবাহ তেমন নেই।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ ছগীর আহমদ বলেন, নগরীর চাক্তাই-রাজাখালী খালসহ গুরুত্বপূর্ণ খালের মুখগুলো ভরাট হয়ে গেছে। ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের নামে বন্দর কর্তৃপ এসব খাল সরু করে ফেলেছে। আর দায়িত্বে থাকলেও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন খালগুলো মানসম্পন্নভাবে খনন ও পরিষ্কার করতে পারছে না, এতে বৃষ্টির পানি ও জোয়ারের পানি খাল দিয়ে প্রবাহিত হতে না পেরে পাড় উপচে বাজারের দিকে ঢুকে পড়ে। আর বৃষ্টি কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হলে তো রা নেই। এতে লোকসান গুনতে হয় ব্যবসায়ীদের।
গতবারে জলাবদ্ধতায় কয়েক শ’ কোটি টাকার তি হয়েছে দাবি করে খাতুনগঞ্জের জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রশাসনের কাছে পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরে খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন। এ ব্যাপারে সাধারণ সম্পাদক ছগীর আহমদ বলেন, নৌপথে বাণিজ্য পুনরুদ্ধার ও সম্প্রসারণের জন্য কর্ণফুলী নদী কার্যকরভাবে খনন এবং চাক্তাই খালসহ শাখা খালগুলো নৌযান চলাচলের উপযোগী করে তোলা এবং খাতুনগঞ্জের দেিণ পাথরঘাটা, আশরাফ আলী সড়ক, উত্তরে দেওয়ান বাজার, পূর্বে শাহ আমানত সেতু পর্যন্ত বাণিজ্যিক অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা দরকার। জলাবদ্ধতা নিরসনে চাক্তাই-রাজাখালী খালের মুখে জলকপাট নির্মাণ ও দ্রুত সময়ের মধ্যে বারইপাড়া থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত নতুন খাল খনন প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রয়োজন। মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী নগরের বিপ্লব উদ্যান থেকে বহদ্দারহাট পর্যন্ত নতুন খাল খনন প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাংক ঋণে সুদের হার এক অঙ্কের ঘরে নিয়ে আসা আবশ্যক।

 

 

অন্যান্য সংবাদ

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫