ঢাকা, সোমবার,২১ আগস্ট ২০১৭

রকমারি

শ্রমজীবী মানুষের ঢাকা

ফয়েজ হিমেল

০৮ মে ২০১৭,সোমবার, ১৮:১৩ | আপডেট: ০৮ মে ২০১৭,সোমবার, ১৮:৪৮


প্রিন্ট

প্রতিনিয়ত গ্রাম ছেড়ে জীবিকার সন্ধানে ঢাকামুখী জনস্রোত বাড়ছে। ন্যূনতম আয়ের অন্যতম উৎসে পরিণত হয়েছে ঢাকা। চাকরি, ব্যবসায় সুবিধা ছাড়াও শ্রমমূল্য বেশি হওয়ায় গ্রামের বেকার ও দরিদ্ররা ঢাকায় আসছেন। সবার উদ্দেশ্য একটিই। সামান্য আয়-রোজগারে পথের সন্ধান পাওয়া। আর এসব কর্মহীন ও কর্মোপযোগী মানুষের ভিড়ে চাপ বাড়ছে শহরের ফুটপাথ ও বাণিজ্যিক এবং আবাসিক পাড়ায়।আধুনিক সুযোগ-সুবিধার খোঁজে গ্রামের মানুষেরা ঢাকামুখী হচ্ছেন। তবে দেশের উন্নয়নের স্বার্থে এই শহর ঝুঁকিমুক্ত রাখার দিকে বিশেষ নজর দেয়া উচিত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে দীর্ঘ দিন ধরে বারবার উঠে এসেছে বসবাসের অনুপযুক্ত হিসেবে ঢাকা মহানগরীর নাম। তাদের মতে, এর পরও যদি কারো টনক না নড়ে তাহলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলেও মনুষ্য সৃষ্ট কারণেই একদিন পরিত্যক্ত হতে পারে ঢাকা।  প্রতি বছর গড়ে ছয় লাখ ১২ হাজারের ওপরে মানুষ ঢাকা শহরে যুক্ত হচ্ছেন। আর প্রতি মাসে আসছেন অর্ধলাখের ওপরে। অধিকাংশই কাজের সন্ধানে এসে ঢাকায় থেকে যাচ্ছেন। মূলত বন্যা-খরা, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিভিন্ন কারণে গ্রাম থেকে লোকজন এসে শহরে ভিড় করেন। বিশেষ করে রোজার মাসে এবং ঈদকে সামনে রেখে মওসুমি অনেক শ্রমজীবীরাও ঢাকায় আসেন বাড়তি রোজগারের আশায়।বর্তমানে গ্রামের ছেলেপেলেরা বড় হলেই শহরমুখী হয়ে উঠছে। এলাকায় যা

রা থাকে তারাও কৃষিকাজে জড়িত হতে চায় না। আগে অনেকে ঢাকা গেলেও ধান কাটা মওসুমে ঠিকই এলাকায় চলে আসত, কিন্তু এখন আর ফেরে না। নিরক্ষর বা স্বল্পশিক্ষিত মানুষেরা গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী হওয়ায় কৃষি খাতে শ্রমিকের সংখ্যা দিন দিন কমছে। শ্রমিকের অভাবে চাষাবাদে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন কৃষকেরা। ফলে গ্রামের বেশির ভাগ কৃষিজমি হয়তো খালি ফেলে রাখছে কিংবা অন্য কাজে ব্যবহার করছে। বিশেষজ্ঞরা এমন পরিস্থিতিকে দেশের কৃষির জন্য বড় হুমকি বলে মনে করছেন। তবে গ্রামে কৃষিশ্রমিক না মিললেও ঢাকার মোহাম্মদপুর টাউন হল মার্কেটের পাশে, বসিলা, মিরপুর, বারিধারাসংলগ্ন নতুনবাজার, কাওরান বাজার, উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, মহাখালী, বাবুবাজারসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন সূর্য ওঠার পরপরই বসে শ্রমজীবী ‘মানুষের হাট’। কিশোর থেকে বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ সবাই শ্রম বিক্রির জন্য বসে ওই হাটে। কেউ দক্ষ-রাজমিস্ত্রি কিংবা কাঠমিস্ত্রির মতো নির্দিষ্ট কিছু পেশার হলেও বেশির ভাগই বসে থাকে যেকোনো ধরনের কাজের অপেক্ষায়। মাটিকাটা, মালামাল বহন, নির্মাণকাজের জোগালি, রাস্তাঘাট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, যে কাজই হোক, তারা করতে চায়।ঢাকার মতো বিকল্প শহর গড়ে ওঠেনি, তাই মানুষ ঢাকায় ছুটছেন। নানা কারণে মানুষ এই শহরে আসছেন। বিশ্ববিদ্যালয় পড়তে, চাকরির সন্ধানে, বেঁচে থাকার জন্য জীবন-জীবিকার তাগিদে, ভালো স্বাস্থ্যসেবা নিতে ও ভালো স্কুলে পড়তে। দক্ষতা বাড়ানোর জায়গা এ শহর। এখানেই সব প্রশাসনিক দফতর। আমাদের সব উন্নয়নকার্যক্রম এবং পরিকল্পনা ঢাকাকেন্দ্রিক। মানুষকে নানা কারণে ঢাকা আসতে বাধ্য করা হচ্ছে। ঢাকামুখী এ স্রোত থামাতে না পারলে সমস্যার সমাধান হবে না। যে কারণে মানুষ ঢাকায় আসে সেসব কারণ গ্রামে নিয়ে যেতে হবে। ঢাকাকেন্দ্রিক একমুখী উন্নয়ন বন্ধ করে বিভাগীয় এবং জেলা শহরগুলোতে উন্নত শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান এবং উন্নত জীবনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। যাতে সামান্য কারণে মানুষকে ঢাকায় আসতে না হয়। মানুষ কেন ঢাকায় আসে?গাবতলীতে রাস্তার পাশে গালে হাত দিয়ে বসে আছেন রাহেলা বেগম। ৩৫ বছর বয়সী এই মানুষটি প্রতিদিন সকাল ৬টার পর কাজের অপেক্ষায় বসে থাকেন রাস্তার পাশে। তার সাথে দেখা মিলল এ রকম নিত্যদিনের অন্য কাজ সন্ধানী অচেনা শতেক সহকর্মীর। রাহেলা জানান, তিনি কয়লা জাহাজ থেকে ট্রাকে উঠানোর কাজ করেন। কোনো দিন কাজ পান, আবার অনেক দিন শূন্য হাতেও ফিরে যান। কাজের খোঁজে ১৮ বছর আগে এই শহরে এসেছেন। ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা থানায় তার বাড়ি। বাড়িতে এক কাঠা জমি ছাড়া আর কিছুই নেই। এ কাজ করেই রাহেলার কোনো রকম সংসার চলে। গাবতলীতে আরো কথা হয় কাজের সন্ধানে আসা চল্লিশোর্ধ্ব সেলিনা বিবির সঙ্গে। তিনিও একই কাজ করেন। দুই বছর আগে তিনি ঢাকায় এসেছেন।  গুলিস্তানে লেবুর শরবত বিক্রি করছেন মনসুর উদ্দিন। এসএসসি পাস করে জামালপুরের প্রত্যন্ত এক গ্রাম থেকে পাঁচ বছর আগে তিনি ঢাকা এসেছেন। তবে শহরে বসবাস ব্যয়বহুল হওয়ায় পরিবার-পরিজন থাকে গ্রামেই। তিনি বলেন, ঢাকা শহরে এসেছি কিছু উপার্জনের আশায়। যখন যে কাজ পাই তা করি। এখন গরম মওসুমে শরবত বিক্রি করছি। মাঝে মাঝে সন্ধ্যার পরে ফুটপাথে কাপড়ও বিক্রি করি। কাওরান বাজারে কথা হয় সাতক্ষীরা থেকে আসা রবিউল নামে এক ভ্যানচালকের সঙ্গে। আগে অন্যের মাঠে কৃষিকাজ করতেন। দিনমজুর ছিলেন। কঠোর পরিশ্রম করেও দুই বেলা ভাতের ব্যবস্থা করতে কষ্ট হতো। দারিদ্র্যের কশাঘাতে টিকতে না পেরে চলে আসেন ঢাকায়। প্রথমে কাওরান বাজারে কুলির কাজ করেন। এখন ভ্যানগাড়ি চালিয়ে আয়-রোজগার করছেন। তার মতে, তুলনামূলক ভালো আয় হয়। আবদুস শুকুর মগবাজার ফ্লাইওভারে শ্রমিকের কাজ করছেন। প্রায় তিন বছর ঢাকায় আছেন। গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ভালুকায়। তার মতে, গ্রামে বছরের সব সময় কাজ থাকে না। সে কারণে ঢাকায় চলে আসা। এখানে কাজ কষ্টের হলেও নিয়মিত উপার্জন হচ্ছে।কাওরান বাজারে কথা হয় সাইফুলের সঙ্গে। সে জানায়, তার বাড়ি খুলনার পাইকগাছায়। পড়াশোনা করেছে ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত। বাবা অন্যের চিংড়িঘেরে কাজ করতেন। এখন সেখানেই কৃষিকাজ করেন। বর্গাচাষি হিসেবে ধান চাষ করেন। ঢাকায় কেন এই প্রশ্নের জবাবে সাইফুল বলে, ‘জমির কাদাপানিতে কাম কইরতে ভালো লাইগতে ছিল না। এলাকার মানুষ কামলা কইয়ে ডাকিছে, আবার ঘরে কারেন্ট নেই, লবণপানি, আর সব সময় কামকাইজও থাইকত না। ছয় মাস আগে রাগ কইরে একজনের সাথে ঢাকায় চইলে আইসেছি। কড়াইল বস্তিতে থাইকতেছি। রাজের জুগালি কইরতেছি। দিনে ৪০০ টাকা করি পাচ্চি।’ 

ছবি: ইমশিয়াত শরীফ

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫