ঢাকা, মঙ্গলবার,২৩ মে ২০১৭

মিউজিক

ধন্যবাদ না দিতে পারার বেদনা

০৭ মে ২০১৭,রবিবার, ১৬:১২


প্রিন্ট

লাকী ভাইয়ের নিবিড় সান্নিধ্যে থাকার বিরল সৌভাগ্য হয়েছে আমার, বিশেষত তার শেষ দিনগুলোয়। প্রায় দেড় বছর আগে তার অসুস্থতা ধরা পড়ার পর থেকে অনেকটা পথ একসাথে হেঁটেছি আমরা। মানুষ চিরকাল থাকে না। ফিরে যেতে হয় সবার। নিজের ফিরে যাবার গল্পটাও জানা ছিল তার। লাকী আখান্দ নামের এ বিস্ময় মানুষটিকে নিয়ে লিখেছেন এরশাদুল হক টিংকু

গান গাওয়ার ক্ষেত্রে গানের কথা কিংবা সুরের প্রশ্নে অত্যন্ত খুঁতখুঁতে ছিলেন লাকী ভাই। নিয়াজ মোহাম্মদের মতো গুণী শিল্পীও ‘আজ এই বৃষ্টির কান্না’ গানের রেকর্ডিংয়ের এক পর্যায়ে বলতে বাধ্য হয়েছেন, ‘দোস্ত, তোমার পায়ে পড়ি, আমারে মাফ কইরা দেও! আমি এইটুকুই পারি। আর পারব না।’ সামিনা, ফাহমিদা আপারাও গান গাইতে গেলে খুব ভয়ে ভয়ে থাকতেন লাকী ভাইয়ের সামনে। নিজের গানের সামান্যতম বিকৃতি মেনে নিতেন না কখনো তিনি।

লাকী ভাইয়ের হৃদয়মন অভিভূত করে দিয়েছিল বাংলার মানুষের ভালোবাসা। প্রথম যখন মানুষ তার অসুখের খবর জানল, এবং যেভাবে তারা প্রতিক্রিয়া দেখাল, তার কাছে এটা মনে হচ্ছিল এক বিস্ময়। দেশে এবং দেশের বাইরে যে তার এতো ভক্ত, এতো মানুষ তাকে ভালোবাসে, অভিভূত হয়ে তিনি বারবার বলতেন, আমাকে এত মানুষ ভালোবাসে! তার অসুখের খবরে চিকিৎসা সহায়তার উদ্দেশ্যে কনসার্ট আয়োজন শুরু হলো প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রে, তারপর কানাডা ও ইউরোপে। এসব ঘটনা জানার পর তার মনের ভেতর ছটফটানি, প্রবল আলোড়ন তৈরি হলো। আমাকে বলতেন, একটু সুস্থ হলেই আমি নিজে ওদের কাছে যাব। তুমি আমার ভিসা লাগানোর ব্যবস্থা করো। ওরা আমাকে এত ভালোবাসে, আমিও ওদের মাঝে হাজির হব। ওদের গান শোনাব। প্রথমে নিউইয়র্ক যাব, সেখান থেকে কানাডায়। রকেটদের ওখানে যাব। আশিকুজ্জামান টুলু সেখানে আছে। ওরাওতো বড় কনসার্ট করেছে? ওখান থেকে ইউরোপ আসব। লন্ডনে, ওখানেও তো তিতাসরা শো করেছে, না? জুয়েলরা? আচ্ছা, ফ্রান্সেও কী ওরা কোনো শো করেছে? ফ্রান্স থেকেও যোগাযোগ করেছে। আচ্ছা কোন দেশটা কাছে? কোন দেশ থেকে শুরু করলে ভালো হয়? কীভাবে যাওয়া যায়? আচ্ছা, একটা ওয়ার্ল্ড ট্যুর প্ল্যান করতে হবে। ওরা আমার জন্য করেছে, আমারতো ওদের জন্য কিছু করতে হয়।
আমি তার সামনে বসে বসে শুনছি আর ভাবছি, অসুস্থ একটা লোক। বিছানায় শোয়া। উঠতে পারছেন না। অথচ তিনি প্ল্যান করছেন, আমি এটা করব। আমি এটা করে দিয়ে যাব। অথচ করতে পারছেন না। সবখানে যেতে পারছেন না। শেষ পর্যন্ত যাওয়া হয়নিও আর। এই যে একটা না পারার কষ্ট, ভালোবাসার প্রতিদান দেয়ার আকুতি অথচ দিতে না পারার কষ্ট! আমি কবে যাব? এই আমার পার্সপোর্ট কোথায় বলতো? তুমি কী ভিসা লাগাইছো, বলতো? বারবার বলতেন।
একদিন ইউনাইটেড হাসপাতালে বারবার যখন এসব কথা বলছেন তখন রকেট ভাইয়ের ভিডিও ফোন কল, আমি কেবিন থেকে বাইরে এলে জানতে চান, উনার অবস্থা কী? আমি বললাম, একটু আগেই তো দেখলেন শুয়ে আছেন। উনি কী উঠতে পারেন? আমি বললাম, না। উনি কীভাবে ওয়ার্ল্ড ট্যুরে আসবেন? আমি কেঁদে দিলাম। একজন মানুষ, যতো অসুখই থাক, মনের সবটুুক জোর দিয়ে বলছে, সে ওয়ার্ল্ড ট্যুরে বের হবে। গান শোনাবে তার প্রিয় মানুষগুলোকে। আমি কীভাবে তাকে বলব, লাকী ভাই আপনি অনিরাময় রোগে আক্রান্ত। আপনি আর হয়ত কখনও সুস্থ হবেন না। এটাতো আর বলা সম্ভব হয়নি। আমরা তাকে বলেছি, লাকী ভাই, আপনি আর একটু ভালো হয়ে উঠলে আমরা অবশ্যই যাব।
এটা ছিল তার একটা আক্ষেপ। ভালোবাসার প্রতিদান দিতে চেয়েছিলেন মানুষগুলোর কাছে গিয়ে, দিতে পারলেন না। লাকী ভাইয়ের অসুস্থ হওয়ার পর প্রথম এগিয়ে এলেন গীতিকার আসিফ ইকবাল এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী কবি মাহবুবুল হক শাকিল। এদের তৎপরতা আর উদ্যোগে শিল্পীকে পাঁচ লাখ টাকা দিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর ব্যক্তিগতভাবে বেশকিছু টাকা দিলেন শাকিল ভাই। যদিও নিজের শেষ সম্পত্তিটুকু বিক্রি করে হলেও চিকিৎসা করাবেন তবু কারো কাছ থেকে কোনো সহায়তা নিতে নারাজ ছিলেন তিনি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহযোগিতার বার্তায় তার সেই জিদ অপসৃত হলো। প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা মানেই তো জাতীয় স্বীকৃতি। তিনি বললেন, এইটা আমি নিতে পারি। প্রধানমন্ত্রীর এ পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে আরো অনেক মানুষ জানল, সেই সময়ে অনেক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি এগিয়ে এলো সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে। 
একদিন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর ভাই এলেন বিএসএমএমইউতে। কথা প্রসঙ্গে নিজেই বললেন, আমি পিএমের কাছে আপনার ধন্যবাদ পৌঁছে দেব। টেনশনের কিছু নাই। সর্বশেষ ৩ মে, মঙ্গলবার, জাতীয় সংসদে লাকী ভাইয়ের ওপর শোক প্রস্তাব আনা হলো। খুব খারাপ লাগছে আজ, মৃত্যুর আগে ধন্যবাদ জানিয়ে যেতে পারলেন না তাদেরকে, যাদেরকে জানাতে চেয়েছিলেন।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫