ঢাকা, মঙ্গলবার,১২ ডিসেম্বর ২০১৭

রকমারি

জীবনযুদ্ধ

তারেকুর রহমান

০৬ মে ২০১৭,শনিবার, ১৮:৩৪


প্রিন্ট

বিকেলে আনমনে হাঁটছি। সূর্য আস্তে আস্তে অস্ত যেতে শুরু করল। হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলো। বলা নেই কওয়া নেই বৃষ্টি ঝরতে শুরু করল। কালো মেঘে পুরো আকাশ ঘিরে ফেলল। মুহূর্তের মধ্যেই অন্ধকার নেমে এলো। রাস্তায় মানুষ আশ্রয় খোঁজার জন্য দৌড়াদৌড়ি করতে লাগল। আমিও দৌড়াতে শুরু করলাম। কিছুক্ষণ পর নিজেকে একটা প্লাস্টিকের ছাউনি দেয়া পিঠা দোকানে আবিষ্কার করলাম। ঠিক পিঠা দোকান বলা যায় না। শীতকালে এখানে পিঠা বিক্রি হয়। আর এখন বেগুনি, পেঁয়াজু। মিরপুর আসার পর থেকে এই দোকানে এসে অসংখ্যবার খেয়েছি। দোকানদার একজন নারী। বয়স ৫৫-৬০ বছর হবে। আমি তাকে খালা বলি। খালা এত দিনে আমার নামটাও মুখস্থ করে ফেলেন। আজ দোকানে কোনো কাস্টমার নেই। সম্ভবত হঠাৎ বৃষ্টি আসায় সবাই নিরাপদ জায়গায় চলে গেছে। খালাকে বললাম,
-খালা কয়েকটা গরম গরম পেঁয়াজু দেন।
-দিতাছি বাবা, তুমি ছাউনির ভিতরে ঠিকমতো ঢুইকা বসো। মাথায় বৃষ্টির পানি পড়লে জ্বর অইব।
তার কথা শুনে মাথা ভেতরে ঢুকিয়ে বসলাম। আমার প্রতি তার মমত্ববোধ দেখে অবাক হলাম। এতক্ষণে পেঁয়াজু বানানো হয়ে গেছে। পেঁয়াজু খাচ্ছি আর খালার সাথে কথা বলছি,
-খালা আপনার কে কে আছে?
কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। কেমন যেন আনমনা হয়ে গেলেন।
-খালা আপনাকে জিজ্ঞেস করছি আপনার কে কে আছে?
-আমার দুইটা পোলা ছাড়া আর কেউ নাই।
-আঙ্কেল বুঝি মারা গেছে? কোনো কিছু না ভেবেই জিজ্ঞেস করলাম।
-না।
-তাহলে?
-ও আরেক জায়গায় বিয়া কইরা চইলা গেছে।
-আপনাদের খোঁজখবর নেয় না?
-না, কোনো দিন খোঁজখবর নেয়নি। আমার না হয় না নিলো, কিন্তু ওর দুইটা পোলারও খোঁজখবর নেয়নি।
খালার কথা শুনে তার প্রতি খুব মায়া হলো।
-কয় বছর আগে আপনাদের রেখে চলে যায়?
-১৭-১৮ বছর অইব।
-এত বছর আগে?
-হ, তখন আমার বড় পোলার বয়স ছয় বছর আর ছোট পোলার সাত মাস। এ অবস্থায় আমাদের রাইখা ও চইলা যায়।আমি আর কোথাও বিয়া বসি নাই। এই দুইটা পোলার মুখের দিকে চাইয়া বিয়া বসতে মন চায়নি।
এ কথা বলেই খালা চোখ মুছতে শুরু করলেন। এরপর আবার বলা শুরু করলেন,
-কী করুম বুঝে উঠতে পারি নাই। কেউ আমারে কাজ দেয় নাই। এরপর কিছু না পাইয়া এই ব্যবসায় নামছি।
-আপনার ছেলেরা এখন কী করে?
-বড়ডা ম্যাট্রিক পর্যন্ত পড়েছে। পরীক্ষা দেয় নাই। অনেক চেষ্টা করছি তারে পড়াশোনা করাতে, পারি নাই। এহন একটা গ্যারেজে কাজ করে। আর ছোড পোলাডা ইন্টারে পড়ে। তোমাগো দোয়ায় ও ভালো পড়াশোনা পারে।
-আপনার ছেলে কাজ করে তাহলে আপনি এত কষ্ট করেন কেন?
-কষ্ট না করলে খামু কী? ছোড পোলাডারে পড়ামু ক্যামনে?
-কেন বড় ছেলে ইনকাম করে না?
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বলতে লাগলেন,
-বড় পোলাডা বিয়া করার পর থেইক্যা আলাদা থাকে। আমাগো কোনো খোঁজখবর নেয় না।
-কী বলেন!
- হ বাবা, আমি ওরে বদদোয়া দিই না। ও ভালো থাকুক এই দোয়া করি। শত অইলেও ও আমার পোলা।
-খালা আপনের ইনকাম কেমন হয়?
-এই কোনোমতে চলে। মাঝে মাঝে ভালো হয়, মাঝে মাঝে খারাপ হয়। যে দিন ইনকাম খারাপ হয় ছোড পোলাডার লাইগা অনেক কষ্ট লাগে। ওরে ভালো কিছু খাওয়াইতে পারি না এই জন্য।
-আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
-গরিবের আবার পরিকল্পনা। ছোড পোলাডা পড়াশোনা করতে চায়। ওরে মানুষের মতো মানুষ করুম।
-ও যদি আপনার খোঁজ না নেয় তখন কী করবেন?
-না নিলে না নেক। ওরা ভালো থাকলেই আমি ভালো থাকুম। আমি আর বাঁচুম কয় দিন। সারা জীবন তো কষ্ট কইরা গেছি। বাকি জীবনও কষ্ট করুম। কপালে যা লেখা আছে তা অইব।
বৃষ্টি থেমে গেল। আমারও যাওয়ার সময় হয়ে গেল। টাকা দিয়ে চলে এলাম। আসার সময় নিজের মধ্যে এক অপরাধবোধ কাজ করল। প্রায়ই এখানে এসে পিঠা খেয়ে গেলাম কিন্তু খালা কেমন আছে জানতে চাইনি। প্রতিদিন বহু লোক এসে এখানে পেঁয়াজু, বেগুনি খেয়ে যায়। কেউ খালার মনের কষ্টের কথা জানে না। কেউ তার যন্ত্রণার কথা জিজ্ঞেস ও করে না। জীবনের সাথে যুদ্ধ করা এই নারী কেমন করে বেঁচে আছে কেউই জানে না।

মিরপুর, ঢাকা

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫