ঢাকা, শনিবার,২২ জুলাই ২০১৭

আগডুম বাগডুম

মুহিবুলের হাসি

শওকত নূর

০৬ মে ২০১৭,শনিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

মুহিবুলকে খুঁজে না পাওয়ার খবর চার দিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। কারণ, ওর নানু সম্ভাব্য সব জায়গায় ওকে খুঁজে না পেয়ে খুব অস্থির হয়ে ওঠেন। পথঘাটে যাকে পান, তাকেই থামিয়ে মাথা চুলকিয়ে বলেন, আমার মুহিবুলকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না; কী করি এখন? কী একটা হয়ে গেল! বলতে পারো তোমরা, আমার মুহিবুল কোথায়?
তার মাথার চুল অগোছাল, গায়ের পাঞ্জাবি কাঁধে ঝোলানো; হাতের খাঁচায় মুহিবুলের পোষা ময়নাপাখি। পাখিটাও তার সাথে বারবার চেঁচিয়ে বলে, মুহিবুলকে খুঁজে পাওয়া যায় না। কী করি এখন? কী একটা হয়ে এলো? কী হলো?
কার্তিক মাস। বাইম মাছ ধরার মওসুম। নদীতে বড়শি ফেলে ঝোপের আড়ালে চুপচাপ বসে আছি। আড়াল থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসি আমি। মুহিবুলের নানুর উদভ্রান্ত চেহারা দেখে চমকে উঠি। তিনি কাঁদো কাঁদো হয়ে বলেনÑ রিয়াজ, আমাদের মুহিবুলকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ওকে কি কোথাও দেখেছ? কোথায় গেল মুহিবুল?
কেন, কী হয়েছে? কখন থেকে পাওয়া যাচ্ছে না ওকে? উৎকণ্ঠায় বলি আমি।
স্কুল থেকে ফিরেই প্রতিদিন আমার সাথে দেখা করে। ওর নানীর হাতে খাবার খায়। ময়নাপাখি নিয়ে বারান্দায় বসে। বাপ-মাহারা নাতি আমার। স্কুল থেকে এসে আজ কী মনে করে বইপুস্তক ছুড়ে মেরে দৌড়ে বেরিয়ে যায়। তাও তো ঘণ্টা তিনেক হয়ে গেল। কোথায় যাবে বলো দেখি।
আচ্ছা, আসুন আমার সাথে। দু’জন মিলে খুঁজি। বলে হাঁটা ধরি।
মুহিবুলের নানুকে নিয়ে আমি সোজা চলে যাই গোসাইপাড়ার পেছনের ঘন ঝোপে। ওখানে একদিন ওকে নিয়ে বকুল গোটা খেতে গিয়েছিলাম। সেদিন ফিরে আসার পথে ওকে ঝোপের দিকে বারবার ফিরে তাকাতে দেখেছি। কেন জানি মনে হলো আজ ওকে ওখানেই পাওয়া যাবে। ঠিক সেই বকুলগাছটাতে। কিন্তু সেখানে গিয়ে রীতিমতো হতাশ হই। কোনো গাছেই মুহিবুল নেই। তাহলে ও গেল কোথায়?
ঝোপ থেকে বেরিয়ে দু’জন হাঁটা ধরি। ভিন্ন দিকে কিছুদূর এগোনোর পর দেখি এক ঘাসমাঠে একপাল ভেড়ার পেছনে কেউ একজন চুপচাপ বসে আছে। পেছন থেকে আমরা সমস্বরে বললাম, কে ওখানে? বসে আছে কে?
নড়ে উঠে ফিরে তাকায় সে। দেখি আর কেউ নয়। জীর্ণ পোশাকে কালো কাপড়ে মাথা ঢেকে বসে আছে আমাদেরই মুহিবুল। বললাম- মুহিবুল, তুমি এখানে? এই ভেড়ার পালের কাছে? কী ব্যাপার? দৌড়ে যান ওর নানু। ওকে বুকে জড়িয়ে কেঁদে ফেলেন। কিন্তু মুহিবুল নির্বাক। আমি বললামÑ মুহিবুল, কী মনে করে এখানে? স্কুল থেকে এসে খাওয়া-দাওয়াও নাকি করোনি আজ? কোনো দুঃখ মনে?
হুঁ! মুহিবুল মুখ খোলে।
কী এমন দুঃখ?
কাসের ওরা শুধু ব্যঙ্গ করে। আমি ছোট্ট বলে প্রতিদিন হাসাহাসি করে। আজ ওপরে তুলে ধরে লাফিয়েছে। আমার কান্না পেয়েছে। মন খুব খারাপ।
হুঁ! বুঝলাম। কিন্তু মুহিবুল, তুমি কি সত্যিই ছোট? হেসে বললাম আমি।
হুঁ।
তবে বড় কে?
ওই যে ওরা, যারা ব্যঙ্গ করে।
মানুষের বড়ত্ব কিসে জানো?
না। মুহিবুল বিস্ময়ে তাকাল।
মানুষের বড়ত্ব তার মনুষ্যত্বে। সে মতে, তুমি ওদের চেয়ে বড়। শুধু গায়েপায়ে বড় হলেই তাকে বড় বলা যায় না। মনের দিক থেকে বড় হতে হয়। বড় হতে হয় বুদ্ধিতে। বুদ্ধি ও মনুষ্যত্বে যে বেশি বড়, সেই প্রকৃত বড়। দেখবে, ওরা একদিন নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে লজ্জিত হবে।
হুঁ।
তোমার তো জ্ঞানবুদ্ধি বেশ ভালো। দেখতেও তুমি বেশ। তবে আর দুঃখ কেন? চলো বাড়ি চলো। আর কখনো এমন কাজ করবে না। কত দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তোমার নানা-নানী, জানো?
মুহিবুল কিছু না বলে আমাদের সাথে বাড়ির পথে হাঁটা ধরে। এ সময় খাঁচার ভেতর থেকে ওর ময়নাপাখিটা বারবার বলতে থাকে, কে বড়? কে? মুহিবুল বড়। আমাদের মুহিবুল বড়। বড়... অ! অনেক বড়।
শুনলে তো মুহিবুল! বললাম আমি।
মুহিবুলের মুখে হাসি ফোটে। ওর নানু বিস্ময়ে হতবাক।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫