ঢাকা, বুধবার,২২ নভেম্বর ২০১৭

ঘটনা-দুর্ঘটনা

সোচ্চার কিশোরীরা : কমেছে ১৫ বছরের নিচে বিয়ের হার

বাসস

০৫ মে ২০১৭,শুক্রবার, ১২:১৫


প্রিন্ট

বাল্যবিয়ে সমাজের একটি ব্যাধি। বাংলাদেশে গ্রাম অঞ্চলে বাল্যবিয়ে যেন একটি নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। গ্রামাঞ্চলে কখনো কখনো আর্থিক অস্বচ্ছলতা, কখনোবা সামাজিক কারণে অনেক বাবা-মা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই মেয়ের বিয়ে দিয়ে নিজের দায়িত্ব শেষ করতে চায়। কিন্তু অল্প বয়সে বিয়ের কারণে মেয়েটির জীবনে আসতে পারে নানা বিপর্যয়। তবে বর্তমানে শিক্ষা এবং সামাজিক সচেতনতার কারণে বাল্য বিয়ে অনেক কমে এসেছে। আবার কখনো কখনোবা যাদের বিয়ে ঠিক করা হয় সেই কিশোরীরাই ঠেকিয়ে দিচ্ছে তাদের বাল্যবিয়ে।

তেমই একজন ঝালকাঠীর শারমিন আক্তার। বিয়েতে রাজী না হওয়ায় পাত্রের সঙ্গে কয়েক দিন একটি কক্ষে আটকে রেখেছিলেন তার মা। এক পর্যাযয়ে বন্দী দশা থেকে পালিয়ে এসে তিনি মায়ের বিরুদ্ধেই মামলা ঠুঁকে দেন। নবম শ্রেণীতে পড়ার সময় পনেরো বছর বয়সে তার মা তাকে বিয়ে দেয়ার আয়োাজন করেছিলো। স্কুলের বন্ধু, সাংবাদিক এবং থানা পুলিশের সহায়তা নিয়ে শারমিন আকতার মায়ের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বিয়ে বন্ধ করেছিলেন। প্রতিবাদী এ মেয়েটির গল্পটি জেনে গেছে গোটা বিশ্ব। নিজের বাল্যবিয়ে ঠেকিয়ে দেয়া কিশোরী যুক্তরাষ্ট্র থেকে পেয়েছেন সাহসী নারীর পুরস্কার।

২৯ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল উইমেন অব কারেজ অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন ঝালকাঠির মেয়ে শারমিন আক্তার। যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসে গিয়ে ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণের গৌরব সাহসী করে তুলছে এ দেশের কিশোরীদের।

শারমিনের সেই ভূমিকা অনুপ্রাণিত করেছে ময়মনসিংহের নান্দাইলে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে কাজ করা এক দল কিশোরীকে। ‘ঘাসফুল’ নামে একটি সংগঠন তৈরি করেছেন ওই কিশোরীরা। নান্দাইল পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেনীর চারজন এবং নবম শ্রেণীর তিনজন মিলে বাল্যবিবাহ ঠেকাতে এবং মেয়েদের উত্ত্যক্তকরণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার লক্ষ্যে বছর খানেক আগে সংগঠনটির কার্যক্রম শুরু করে। এসব ছাত্রীদের বয়স ১৩-১৪ বছর। সংগঠনটির কাজে সহায়তা দিচ্ছে একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা। এখন পর্যন্ত তিনটি বাল্যবিয়ে বন্ধে ভূমিকা রেখেছেন তারা।

ঘাসফুলের সদস্য সানজিদা ইসলাম বলেন, আমরা চাই না কোনো মেয়ে বাল্যবিয়ের শিকার হোক। তাই কোথাও এ ধরনের কোনো খবর পেলে আমরা প্রথমে অভিভাবকদের বোঝানোর চেষ্টা করি। অনেক সময় তারা আমাদের ভুল বোঝেন। কিন্তু আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাই। শেষমেশ কাজ না হলে প্রশাসনের সহায়তা নেই। তবে শুধু নান্দাইল নয়, এক দিন সারা দেশেই বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে এ ধরনের কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়বে বলে আশা করেন এই কিশোরী।

জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সালমা আলীর মতে, কিশোরীদের একের পর এক বাল্যবিবাহ রুখে দেয়ার ঘটনা অন্য কিশোরীদেরও অনুপ্রাণিত করবে। আমরা বাল্যবিয়ে আইনের বিতর্কিত ধারা দিতে বলেছিলাম। সেটি বাদ না দিলেও কিশোরীরা তার সঠিক জবাব দিচ্ছেন। এর মানে দেশে পরিবর্তন আসবেই।

প্রতিবাদ করে বিয়ে ঠেকাতে না পেরে আত্মহত্যার মত ঘটনাও ঘটছে। গত ২৯ জানুয়ারি বরিশালের হিজলা সদর উপজেলায় বাল্যবিবাহের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বৈশাখী আক্তার (১৪) নামে ৮ম শ্রেণীর এক ছাত্রী গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে। জয়পুরহাট জেলার আক্কেলপুরে গত ১৭ এপ্রিল বাল্যবিয়ে ঠেকাতে না পেরে আত্মহত্যা করে নবম শ্রেণীর ছাত্রী মার্জিয়া সুলতানা।

বাল্য বিয়ে ঠেকাতে প্রশাসনও আগের যেকোন সময়ের চেয়ে তৎপর। বিশেষ অবস্থা ছাড়া ১৮ বছরে আগে বিয়ে নয়, সরকারের এমন কঠোর অবস্থান নিয়ে আসছে ইতিবাচক পরিবর্তন। মাঠপর্যায়ে স্থানীয় প্রশাসন ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে কিছু বাল্যবিয়ে আটকে দিচ্ছে। টাঙ্গাইল ও নীলফামারীতে স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে সাম্প্রতিক সময়ে বন্ধ হয়েছে দু’টি বাল্যবিবাহ । ২০১৭ সালের শুরু থেকে এ পর্যন্ত কমপক্ষে ১২টি বিয়ের আয়োজন নিজের বা প্রশাসনের চেষ্টায় ঠেকানোর খবর দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। তবে প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের বিয়ে ঠেকিয়ে দেয়ার প্রকৃত সংখ্যাটি আরও বেশি।

ব্যক্তি, পরিবার, সংগঠন এবং প্রশাসনের ইতিবাচক ভূমিকায় বাল্যবিয়ের ক্ষেত্রে যে ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে তা পরিসংখ্যানের দিকে নজর দিলেই বুঝা যায়।

বাংলাদেশে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই ৭৩ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়। এশিয়া চাইল্ড ম্যারেজ ইনিশিয়েটিভ শীর্ষক জরিপের এক প্রতিবেদন এই তথ্য প্রকাশিত হয়েছিলো ২০১৫ সালের নভেম্বরে। ওই জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়, ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সেই ২৭ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়।

সর্বশেষ ২০১৬ সালের শেষের দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগ থেকে প্রকাশিত এক জরিপের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে ১৫ বছর বয়সের নিচে বিয়ের হার গত ২ দশকে কমেছে ৩০ শতাংশ। ১৯৯৫ সালের দিকে যেখানে ১৫ বছরের কম বয়সে বিয়ের হার ছিলো ৩৯.৩ শতাংশ তা এখন কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৯.১ শতাংশে। এই জরিপে দেখা যায় ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোরীদের বিয়ের হার কমেছে। জরিপে দেখা যায় ২০ বছর আগে ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী মেয়েদের বিয়ের হার ছিলো ৩৯ শতাংশ যা এখন ৫ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৩৪ শতাংশে।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, দেশে নারী শিক্ষার হার বেড়েছে এবং এর ফলে মানুষের সচেতনতাও বেড়েছে। বাল্য বিবাহ রুখে দাঁড়ানোর এটাই অন্যতম কারণ। তাছাড়া বাল্য বিয়ে বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার জন্য প্রশাসনকে নিদের্শ দেয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী প্রশাসনও মাঠে কাজ করছে। যার ফলে বাল্য বিয়ের হার ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। আমরা আরো কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছি যাতে ভবিষ্যতে এই হার আরো কমে যাবে। যারা বাল্য বিয়ে বন্ধে ভূমিকা রাখবেন বিশেষ করে কিশোরীরা তাদেরকে আমরা পুরস্কৃত করার চিন্তা করছি। যাতে করে অন্যান্য মেয়েরাও উদ্বুদ্ধ হয়।

বাল্যবিয়ের বিশেষ বিধান নিয়ে যারা সমালোচনা করেন তাদের উদ্দেশে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা বলছি ১৮’র আগে বিয়ে নয় তবে বিশেষ বিধানের কোনো অপব্যবহার হবে না। কাজেই আপনারা সমালোচনা না করে মানুষের সচেতনতা বাড়ান।

মূলত শিক্ষা এবং সচেতনতাই বাল্য বিয়ে বন্ধের বেলায় মুখ্য ভুমিকা পালন করতে পারে। এজন্য সমাজের সকল নাগরিককে সচেতন হতে হবে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫