ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২২ জুন ২০১৭

দিগন্ত সাহিত্য

রবীন্দ্রনাথের প্রহসন চিরকুমার সভা

ড. মুহাম্মদ জমির হোসেন

০৫ মে ২০১৭,শুক্রবার, ০০:০০


প্রিন্ট

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) রচিত চিরকুমার সভা (১৯২৬) প্রসন জাতীয় রচনা। বাংলা সাহিত্যে প্রহসন বা Farce রচনার পথিকৃৎরূপে মধুসূদন দত্তের নাম স্মরণযোগ্য। সংস্কৃত সাহিত্যে সমাজের কুরীতি শোধনার্থে অসঙ্গতি-অনাচার সংবলিত হাস্যরসাত্মক একাঙ্ক নাটককে সাধারণত প্রহসন নামে অভিহত করা হয়। নাটক মূলত দুই প্রকারের হয়ে থাকেÑ ট্র্যাজিডি ও কমেডি। করুণ রসাত্মক নাটককে সাধারণত ট্র্যাজিডি হিসেবে অভিহিত করা হয়ে থাকে। অন্য দিকে, সমাজের অসঙ্গতিকে হাস্যরসাত্মক ভঙ্গিতে কমেডি শ্রেণীর নাটকে উপস্থাপন করা হয়। রবীন্দ্ররচিত চিরকুমার সভা নাটকটিও কমেডি শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত।
রবীন্দ্রনাথ ‘গোড়ায় গলদ’ (১২৯৯), ‘বৈকুণ্ঠের খাতা’ (১৩০২), ‘চিরকুমার সভা’ (১৩৩২) প্রভৃতি প্রহসন রচনা করেন। এর মধ্যে চিরকুমার সভাই সবিশেষ গুরুত্বের অধিকারী। সমাজ সচেতন ও শিল্পসুষম রচনা সৃষ্টি হিসেবে এটি অন্যতম। সমকালীন সমাজবাস্তবতার বাতাবরণ সৃষ্টিতে চিরকুমার সভা বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সমালোচকদের মতে, এটি স্বামী বিবেকানন্দ প্রবর্তিত কৌমার্যব্রতী আন্দোলনের প্রচ্ছায়া অবলম্বনে রচিত। রবীন্দ্রনাথও চিরকুমার সভা রচনাকালীন পর্বে নানাবিধ সমাজ সংস্কারমূলক কর্মে নিমগ্ন ছিলেন । একজন কর্মীরূপে তিনি প্রত্যক্ষ বাস্তবতার সাথে নিজেকে যুক্ত করেন। সমাজের যত অযৌক্তিক অনাচার নিরসনকল্পে নিজের সর্বস্ব সঁপে দিয়েছেন। স্বামী বিবেকানন্দ নবীন স্বপ্নে ভারতবর্ষ গঠনের ব্যাপারে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন। তার কিছু কিছু বৈপ্লবিক কর্মপদ্ধতি বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে, যা রবীন্দ্রনাথের মধ্যেও উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। আমরা যে সময়ের কথা আলোচনা করছি তখন স্বামী বিবেকানন্দ ভারতে তার নতুন সন্ন্যাসী সম্প্রদায় গঠনের আয়োজনে ব্রতী। শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে কৌমার্য ব্রত গ্রহণ করিয়া দেশবাসীর জন্য একটি নবীন চেতনা দেখা দিয়েছিল। আমাদের মনে হয় এই প্রহসন রচনার সময় সন্ন্যাসের নতুন আন্দোলনকে বিদ্রƒপ করিবার উদ্দেশ্য পরোক্ষভাবে লেখকের মনে ছিল (রবীন্দ্রজীবনী ও রবীন্দ্রসাহিত্য-প্রবেশক, শ্রী প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, কলিকাতা, পৃ: ৪৬১)
রবীন্দ্রনাথের পূর্বেও প্রহসন রচনায় একটা ধারাপরম্পরা অব্যাহত ছিল। এসব রচনা, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও হীন প্রয়াসে গড়ে উঠেছে। ফলে শিল্প সৃষ্টিতেও তা মারাত্মকভাবে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। রবীন্দ্রনাথই প্রথম নৈর্ব্যক্তিক ও নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রহসন রচনায় স্বার্থকতা দেখিয়েছেন। এক উদার নির্মল, অসাম্প্রদায়িক ও শিল্পবোধ নিয়ে প্রহসন রচনা করেন। রবীন্দ্রনাথই প্রথম বাংলা-সাহিত্যে ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপহীন, স্বচ্ছ, অনাবিল হাস্যরসের প্রবর্তক (রবীন্দ্র-নাট্য-পরিক্রমা, উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, পৃ: ৬৮৮)। প্রহসন রচনার মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন হাস্যরসবিশিষ্ট শিল্পসৃষ্টি গড়ে তোলাই ছিল রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশ্য। কোনো প্রকার ভেদবুদ্ধিজনিত উদ্দেশ্যঅšে¦ষা এখানে স্থান পায়নি। নিটোল হাস্যরসের উজ্জ্বলতায় এসব প্রহসন শিল্পসুন্দর রূপ ধারণ করেছে। এ ছাড়া তাঁর প্রহসনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য পরিশীলিত রুচিবোধ ও শব্দচয়নে সুতীè পারদর্শিতা, হাস্যরস সৃষ্টিতে রবীন্দ্রনাথের অপূর্ব রীতিমতো বিস্ময়কর। এখানে ব্যাপকভিত্তিক সমাজসচেতনতার পরিচয় মেলে। বিশ শতকের গোড়ার দিক্কার নানাবিধ সমাজসমস্যা এই নাটকে প্রতিফলিত হয়েছে। চিরকুমার সভার সভাপতি চন্দ্রমাধববাবুর মাধ্যমে এসব সমাজচিত্র অভিব্যঞ্জিত হয়ে ওঠে। নাটকে দেখা যায়, কৌমার্যব্রত ধারণ করে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আত্মনিয়োগ করাই চিরকুমারদের মূল উদ্দেশ্য। সভ্যগণের সভাপতি চন্দ্রবাবুর মধ্যে এই দেশপ্রেমের বহির্প্রকাশ লক্ষ করা যায়। এসব সমস্যার মধ্যে কৃষি, সমবায়, পরিবার, কুটির শিল্প, উদ্ভিদ, প্রাণী, ভূগোল ও নারী স্বাধীনতা ইত্যাদি বিষয় স্থান পেয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে চন্দ্রবাবুর একটা নিজস্ব মতামতও উপস্থাপিত হয়েছে। এসব বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ব্যক্তিগতভাবেও সারা জীবন চিন্তাভাবনা করেছেন, এর মধ্যে সমবায় পদ্ধতিতে কৃষি কাজের সংস্কারমুখী ভাবনাটি অধিকতর রূপে প্রাধান্য পেয়েছে। ‘চিরকুমার সভা’ নাটকে দেখা যায়Ñ
‘চন্দ্রবাবু। ....যতক্ষণ সকলে মিলে একটা কাজে নিযুক্ত না হবো ততক্ষণ আমরা যথার্থ এক হতে পারব না।
এছাড়া এই নাটকের অন্যতম চরিত্র শ্রীশের মুখেও অনুরূপ বক্তব্য ফুটে উঠেছেÑ
‘শ্রীশ। ... আমাদের সকলকে সন্ন্যাসী হয়ে ভারতবর্ষের দেশে দেশে গ্রামে গ্রামে দেশহিতব্রত নিয়ে বেড়াতে হবে। আমাদের দলকে পুষ্ট করে তুলতে হবে। আমাদের সভাটিকে সূক্ষ্ম সূত্র স্বরূপ করে সমস্ত ভারতবর্ষকে গেঁথে ফেলতে হবে। তা ছাড়া এই নাটকে কৃষি ও কৃষকের উন্নতিকল্পে নানাবিধ সংস্কার ভাবনা বেশ গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হয়। যেমন, চন্দ্রবাবু প্রসঙ্গক্রমে বলেন, ...গরুর গাড়ি, ঢেঁকি, তাঁত প্রভৃতি আমাদের দেশী অত্যাবশ্যক জিনিসগুলিকে একটু-আধটু সংশোধন করে যাতে কোনো অংশে তাদের সস্তা বা মজবুত বা বেশি উপযোগী করে তুলতে পারি সে চেষ্টা আমাদের করতে হবে। ... তাদের সেই চিরকালের ঢেঁকি-খানির কিছু পরিবর্তন করতে পারলে তবে তাদের সমস্ত মন সজাগ হয়ে উঠবে। পৃথিবী যে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই, এ তারা বুঝতে পারবে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫