ঢাকা, সোমবার,২১ আগস্ট ২০১৭

বিবিধ

পরলোকতত্ত্ব ও রবীন্দ্রনাথ

শামসুদ্দোহা চৌধুরী

০৪ মে ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৫:১৬


প্রিন্ট

মৃত্যু আছে বলেই হয়তো মানুষ বেঁচে থাকার সাধটা এত তীব্রভাবে অনুভব করতে পারে। ইহকালের এক অধ্যায় শেষ হলে পরকালের নতুন যাত্রা শুরু হয়। এ যেন এক ঘর থেকে আরেক ঘরে নিষ্ক্রমণ। মাঝখানে শুধু একটা দরজা। পারলৌকিক জীবন সম্পর্কে আমাদের ধর্মীয় পুস্তকের পাশাপাশি বিভিন্ন মনীষী, পণ্ডিত লোকেরাও লিখেছেন প্রচুর। স্যার অলিভার লজ, ইয়েটস, ইম্যানুয়েল কান্ট, কোনানডয়েল ও ব্রাউনিং লিরকের মতো পাশ্চাত্যের মনীষীরাও এ নিয়ে চিন্তাভাবনা করেছেন। ছায়ামূর্তিকে সবাই পাকড়াও করতে চেয়েছেন কিন্তু পারেননি। এ প্রসঙ্গে ব্রাড স্ট্রাইগারের ভয়েসেস ফরম বিয়ন্ড এবং উইথ দি ডেড বই দু’খানি উল্লেখযোগ্য। বঞ্চিত আছে যে প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন কোনো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সম্মুখীন হলে মিডিয়ামের সাহায্যে পরলোকগত আত্মার সাথে পরামর্শ করতেন। এ ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও বাদ যাননি। এ ছাড়া ঠাকুর বাড়িতে প্লানচেট চর্চা বহুকাল আগে থেকেই হতো, মহর্ষি দেবেন্দ্র ঠাকুরের বাড়িতে এ প্লানচেট নিয়ে অনেক চিন্তাভাবনাও হতো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম দিকে এ প্রেতলোক সম্পর্কে এক ধরনের সংশয়ের দোলায় দুলতেন। কিন্তু যখন এক কিশোরী কবি উমা সেনের মিডিয়ামকে অবলম্বন করে কাদম্বরী দেবী, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, মৃণালিনী দেবী, কবি সত্যেন সেন, বড় মেয়ে বেলা, মেঝো মেয়ে রানী এবং কবি সতীশ রায়ের আত্মা আনেন তখনই রবির চোখের দরজা খুলে যায়। তিনি অনুভব করেন সেই তিন হাজার বছর আগের মিসরীয়দের পরলোক সম্পর্কীয় ডেডবুকের কথা। মিডিয়াম উমা সেনের হাত ধরে যেসব উত্তর বেরিয়ে আসে, সেসব উত্তর সম্পর্কে রবি ঠাকুর বলেছেন, পৃথিবীতে কত কিছু তুমি জান না তাই বলে সেসব কিছু কী নেই। কতটুকুই বা জান। জানাটা এতটুক না জানাটাই অসীম। সেই এতটুকুর ওপর চোখ বন্ধ করে মুখ ফিরিয়ে নেয়াও চলে না। আর এত লোক দল বেঁধে মিছে কথা বলবে এও আমি মনে করতে পারি না। কিন্তু যে বিষয়ে প্রমাণ করা যায় না আবার অপ্রমাণও করা যায় না সে বিষয়ে মন খোলা রাখাই স্বাভাবিক। যেকোনো দিকে ঝুঁকে পড়াটার নামই হলো গোঁড়ামি (মংপুতে রবীন্দ্রনাথ) এ বিষয়ে মংপুতে রবীন্দ্রনাথ মৈত্রীয় দেবীকে আরো কিছু কথা বলেছিলেন, যা সিসটেমেটিকেলি প্রুভড হবে না তাতেই অবিশ্বাস্য, কটা বিষয় প্রমাণিত হয়েছে এ সংসারে। তা ছাড়া এমন কিছু থাকা সম্ভব যা প্রমাণ হতে পারে না। এই তো বুলা (উমা সেন) কী করে লিখত বলত ও কেন মিছে কথা বলবে, কি লাভ ওর এ ছলনা করে... এমন কথা বুলা বলেছে যে, তার বিদ্যা বুদ্ধিতে সম্ভব নয়, একটু সময় না নিয়ে আমি প্রশ্ন করা মাত্র তার ভালো ভালো উপযুক্ত উত্তর সব অসম্ভব করে লিখে যেতো, তা হলে ওকে অসামান্যা বলতে দ্বিধা কেন। আমি কী প্রশ্ন করব ওতো আগে থেকেই জানত না যে, প্রস্তুত হয়ে আসবে গড় গড় করে সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেবে। এই ধারণা নতুন বৌঠান (কাদম্বরী দেবী) আমার সাথে কিভাবে কথা বলবে এ ব্যাপারটা তো ওর জানার কথা নয়। মিডিয়ামে উমা বলতো বোকা ছেলে, এখনো তোমার বুদ্ধি হয়নি। এ ধরনের কথা একমাত্র নতুন বৌঠানই আমাকে বলতে পারতেন। তা ছাড়া আরো অনেক কথা বলে ছিলেন তা অবিশ্বাস করাও কঠিন ব্যাপার। রবীন্দ্রনাথের এ ধরনের বক্তব্যগুলো আলোচনা করলে বোঝা যায় রবীন্দ্রনাথ পরলোকে বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের এ পরলোকচর্চা নেশায় পেয়ে বসেছিল। রবীন্দ্রনাথের এ প্রেতলোক চর্চা চলে ইউরোপে পাড়ি জমানোর আগ পর্যন্ত। এরপর মিডিয়াম উমা সেনের মৃত্যুতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেতলোক চর্চায় ভাটা পড়ে যায়। রবীন্দ্রনাথই হয়তোবা একমাত্র কবি যিনি পরলোকচর্চা নিয়ে বেশি মাথা ঘামিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ প্লানচেটে আত্মা আনতেন। মিডিয়াম উমা সেনের হাতে থাকত কলম আর খাতা। রবীন্দ্রনাথ প্রশ্ন করতেন উমা সেন খাতায় তা ফসফস করে লিখে যেতেন। মিডিয়াম উমা সেনকে নিয়ে কবি হয়তো জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে অথবা শান্তিনিকেতনের কোনো রুদ্ধদ্বার কক্ষে বসতেন, সাথে থাকতেন রবীন্দ্রনাথের পরলোক প্রশ্ন লিপিকার ড. অমীয় চক্রবর্তী।
রবীন্দ্র সদন কর্তৃপক্ষ সে খাতাগুলো যতœসহকারে রেখেছেন। এ খাতাগুলো থেকে রবি ঠাকুরের অনেক পারলৌকিক জিজ্ঞাসার উত্তর পাওয়া যায়। ঠাকুর বাড়ির নতুন বৌঠান কাদম্বরী দেবী। জ্যোতিরিন্দ্র নাথ ঠাকুরের স্ত্রী। বলতে গেলে রবীন্দ্রনাথ কাদম্বরী দেবীর হাতেই মানুষ। কিশোর কবি রবি ঠাকুরের অনেক কাহিনীই নতুন বৌঠানের সাথে ছিল জড়িত। ঠাকুর বাড়িতে কাদম্বরী দেবী যখন এলেন কাদম্বরী দেবীর বয়স তখন নয় আর রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন সাত বছর। নিঃসঙ্গ জীবনে তিনিই ছিলেন সঙ্গী। রবি ঠাকুরের সাহিত্য জীবন বিকাশের মূল অনুপ্রেরণা দানকারী। রবি ঠাকুরের বহু কবিতায় ও গানে কাদম্বরী দেবীর কথা উঠে এসেছে। কাদম্বরী দেবীর সাথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বেড়াতে গিয়েছেন দার্জিলিং, চন্দননগর। ছবি ও গান বইখানি রবীন্দ্রনাথ উৎসর্গ করেছিলেন কাদম্বরী দেবীর নামে। কাদম্বরী দেবী আত্মহত্যা করেন ১৮৮৪ সালে মাত্র ২৫ বছর বয়সে। সেই শোক রবীন্দ্রনাথ কখনো ভুলতে পারেননি। জীবন সায়াহ্নে এসে বারবার নতুন বৌঠানের কথা স্মরণ করেছেন।
১৯২৯ সালে মিডিয়ামের মাধ্যমে রবি ঠাকুর যখন নতুন বৌঠানকে আনেন সে সময় কাদম্বরী দেবী রবিকে বলেছিলেন, বোকা ছেলে এখনো তোমার বুদ্ধি হয়নি। রবীন্দ্রনাথ সেই বৃদ্ধ বয়সেও কাদম্বরী দেবীর পুরনো সম্বোধনে খুশি হয়েছিলেন। ১৯২৯ সালের ৪ নভেম্বর কাদম্বরী দেবী আসলেন মিডিয়ামকে অবলম্বন করে। রবীন্দ্রনাথ প্রশ্ন করেছিলেন :
- কে?
Ñ নাম জিজ্ঞাসা করো না, তুমি যা ভাবছ আমি তাই। তারপর মিডিয়ামে যেসব কথা বেরল, সে ভারি আশ্চর্য এর সত্যতা আমি যেমন জানি, দ্বিতীয়জন আর কেউ জানে না। আরেক দিন ১৯২৯ সালের ২৮ নভেম্বর আবার নতুন বৌঠান।
Ñ কে?
Ñ এখন তো সন্ধ্যা বেলা। কিন্তু এখন তো আসব না জানো।
Ñ না এখন কোনো কাজ নেই।
Ñ আমি একটা কথা বলে চলে যাব, জানি কিছুক্ষণ তোমার এখানে আসা আমার সম্ভব হবে না।
Ñ আমার কাছে আসার দরুণ তোমার কোনো ক্ষতি হয়েছে কি না?
Ñ না, আমি বুঝতে পারছি না আমি কার ভেতর দিয়ে আসব।
Ñ ওইখানে যে মিডিয়াম আছে তার ভেতর দিয়ে তো আসতে পার?
আবার ১৯২৯ সালের ২৯ নভেম্বর রাত।
Ñ কে?
Ñ কুলহারা সমুদ্রে আমার তরী ভাসিয়েছিলাম, আজো দাঁড়িয়েছি সেই চেনা ঘাটে।
Ñ তুমি নাম বলবে না?
Ñ না।
Ñ একটি কবিতা লিখে দেবে।
Ñ আমার বিদ্যে কি তোমার অজানা।
Ñ আমি তোমার কথা শান্তিনিকেতনে অনেক দিন ভেবেছিলুম, আমার শরীর ভালো ছিল না। তখন তোমার কথা ভেবেছি, তুমি জানতে?
Ñ জানি, আমি আসতে পারিনি, মনে মনে এসেছিলুম, কেমন করে তা বোঝাব।
Ñ আমি তোমাদের কিছু বুঝতে পারিনি। কী করে আস, কী করে যাও, কী করে থাক কিছুই বুঝতে পারিনি।
Ñ শেষ রাতে শিরশিরে হাওয়ায় তুমি যখন গায়ের কাপড়টা টেনে নিলে আমি এসেছিলুম তখন?
Ñ আমি তোমাকে মনে মনে বলেছিলুম একদিন যে আমার অসুখ করেছে তুমি যদি এসে থাক তবে তুমি আমাকে সেবা করে যাও।
Ñ তুমিতো চাও, কিন্তু ভালো করে দেয়ার মতো শক্তি তো আমার নেই। তাই খুব অভাব বোধ হয়। তোমাকে কী মুশকিলেইনা ফেলেছি।
Ñ কিছু মুশকিলে ফেলোনি, তোমার যে রূপ আছে সে কি আগের মতো, তোমায় আমরা যেমন দেখেছিলাম।
Ñ কবির ভাষায় বলা যায়, কারো বা ঝড়ের হাওয়ার মতো আসা কারো ফুরফুরে হাওয়া।
শুধু কাদম্বরী দেবীই নয়, মৃত কবিদের প্রেতাত্মা সম্পর্কেও রবীন্দ্রনাথের আগ্রহ ছিল প্রচুর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরলোকচর্চায় তারাও এসে উপস্থিত হতেন। কবি সুকুমার রায় (মৃত্যু ১৯২৩), কবি সত্যেন দত্ত (মৃত্যু ১৯২৩), অকাল প্রয়াত কবি সতীশ রায় (১৯০৪) এবং কবি অজিত চক্রবর্তী (মৃত্যু ১৯১৮), এই সব মৃত কবির আত্মা কবি প্লানচেটে মিডিয়াম উমা সেনের মাধ্যমে আনতেন এবং তাদের সাথে দীর্ঘ সময় সুখ-দুঃখের আলাপচারিতায় নিমগ্ন থাকতেন।
বহুমাত্রিক ঐশ্বরিক প্রতিভার অধিকারী রবীন্দ্রনাথের পারলৌকিকচর্চা চলেছিল দীর্ঘদিন। মিডিয়াম উমা সেনের মৃত্যুতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এ পারলৌকিকচর্চায় ভাটা পড়ে যায়।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫