ঢাকা, বৃহস্পতিবার,১৪ ডিসেম্বর ২০১৭

বিবিধ

রবীন্দ্র কবিতার প্যারডি

ড. আশরাফ পিন্টু

০৪ মে ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৫:১৩


প্রিন্ট

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রারম্ভ যুগে এক ধরনের অনুকৃতিমূলক ব্যঙ্গ কবিতার প্রচুর সন্ধান মেলে। এ কবিতাগুলো সাধারণত বিখ্যাত কবিদের জনপ্রিয় কবিতার অনুকরণে হাস্যরসাত্মক ব্যঙ্গরচনা। এগুলোকে প্যারডি বলা হয়। আধুনিক যুগের শুরুতেই কবি ঈশ্বর গুপ্ত অসংখ্য ব্যঙ্গ কবিতা রচনা করেছিলেন; এগুলোর মধ্যে তৎকালীন বাউল ও কর্তাভজা গানেরও কিছু প্যারডি আছে। তবে মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ মহাকাব্যকে কেন্দ্র করে প্রথম প্রকৃত প্যারডি লেখা শুরু হয়। মেঘনাদবধ কাব্যের প্রথম প্যারডি লেখেন জগদ্বন্ধু ভদ্র ছুচ্ছন্দরীবধ কাব্য শিরোনামে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেও (বালক বয়সে) মেঘনাদবধ-এর বিরূপ সমালোচনা করেছিলেন। তিনি চিরকুমার সভা প্রহসনে মেঘনাদবধ-এর কয়েক পঙ্ক্তির প্যারডি করেছিলেন। তবে রবীন্দ্রনাথ প্যারডি খুব কম লিখেছেন কিন্তু বাংলা সাহিত্যে তাঁর কবিতা ও গানের অনেক প্যারডি হয়েছে। নজরুলের মতো তিনিও প্যারডি রচয়িতাদের হাত থেকে রক্ষা পাননি। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় তো তাঁকে নিয়ে আনন্দ বিদায় নামে আস্ত একটি প্রহসনই লিখে ফেলেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের একটি গানে আছে-
সে আসে ধীরে, যায় লাজে ফিরে,
রিনিকি ঝিনিকি রিনিঝিনি মঞ্জু মঞ্জীরে।
দ্বিজেন্দ্রলাল রায় আনন্দ বিদায়-এ প্যারডি লিখলেন-
সে আসে ধেয়ে, এন ডি ঘোষের মেয়ে,
ধিনিক ধিনিক ধিনিক, চায়ের গন্ধ পেয়ে।
আনন্দ বিদায় গ্রন্থের মূল উদ্দেশ্য ছিল রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গানকে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করা। এ গ্রন্থে দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রবীন্দ্রনাথকে নগ্নভাবে আক্রমণ করতেও দ্বিধা করেননি। এর জবাব কবি নিজে না দিলেও প্রমথ চৌধুরী দিয়েছিলেন ‘সাহিত্যে চাবুক’ নামক একটি প্রবন্ধে। তিনি বলেছেন, ‘প্যারডি হচ্ছে সাহিত্যে মুখ ভেংচান। প্যারডি নিয়ে নাটক হয় না, তার কারণ দু’ঘণ্টা ধরে লোকে একটানা মুখ ভেংচে যেতে পারে না। আর যদিও কেউ পারে ত দর্শকের পক্ষে তা অসহ্য হয়ে ওঠে।’
রবীন্দ্রনাথের সোনার তরী একটি বিখ্যাত কবিতা। এ কবিতাটিকে নিয়ে অনেক প্যারডি রচিত হয়েছে। এ কবিতার অনুকরণে সজনীকান্ত দাসের প্যারডির নাম ‘মানের তরী’ এবং সতীশচন্দ্র ঘটকের প্যারডির নাম ‘সোনার ঘড়ি’। মূল কবিতার অংশবিশেষসহ এদের দু’জনের প্যারডির কিয়দংশের উদ্ধৃতি দিচ্ছি-
গগনে গরজে মেঘ ঘনবরষা
কূলে একা বসে আছি নাহি ভরসা।
রাশি রাশি ভারা ভারা
ধানকাটা হলো সারা
ভরানদী ক্ষুরধারা
খরপরশা,
কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা।
সজনীকান্ত দাস লিখেছেন-
ভবনে গরজে প্রিয়া, নাহি ভরসা
কখন ঝরিবে জানি মান বরষা
করে বুঝি করে তাড়া
রাশি রাশি ভারা ভারা
বরষিয়া গালিধারা খরপরশা,
ভাবিতে ভাবিতে প্রাণে নাহি ভরসা।
আর সতীশচন্দ্র ঘটক লিখেছেন-
গগনে উঠিল ঊষা হল ফরসা
ঘরে একা বসে আছি, নাহি ভরসা,
রাশি রাশি ভারা ভারা
বইপড়া হল সারা
ব্রিফ নাই পড়ি ধারা
আঁখি সরসা,
পড়িতে পড়িতে বই হল ফরসা।
এ প্যারডিদ্বয়ে নির্দোষ হাস্যরস ফুঠে উঠেছে। নির্দোষ হাস্যরসের প্যারডি পাঠকমনে অফুরন্ত রসের সৃষ্টি করে; এমন প্যারডি মূলকবিতার সমালোচনামূলক উৎকৃষ্টতর নতুন সৃষ্টি হতে পারে।
রবীন্দ্রনাথের আরেকটি বিখ্যাত কবিতা ‘সবুজের অভিযান’-এরও একাধিক প্যারডি হয়েছে। ‘সবুজের অভিযান’ কবিতাটির প্রথমাংশ-
ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা
ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ
আধ মরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।
এ কবিতার প্যারডি-
ওরে হুতুম, ওরে আমার প্যাঁচা
ভর সাঁঝেতে শ্যাওড়া ডালে
প্রাণ খুলে তুই চ্যাঁচারে আজ চ্যাঁচা।
(প্যাঁচা : সজনীকান্ত দাস)
উপর্যুক্ত ‘প্যাঁচা’ শিরোনামের প্যারডি ছাড়াও সজনীকান্ত রবীন্দ্রনাথের ‘পুরস্কার’, ‘কচ ও দেবযানী’ ও ‘ভাষা ও ছন্দ’ প্রভৃতি কবিতারও প্যারডি লিখেছেন।
রবীন্দ্রনাথের ‘উর্বশী’ কবিতাটি নিয়েও বহু প্যারডি রচিত হয়েছে। এ প্যারডিকারদের মধ্যে অনেক বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিকও রয়েছেন। যেমন সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছেন ‘সর্বশী’, বনফুল লিখেছেন ‘শালা’, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন ‘শালী’, সুধাংশু শেখর গুপ্ত লিখেছেন ‘শ্যালিকা’ এবং সজনীকান্ত দাস লিখেছেন ‘শীতলা মূলকবিতার কিয়দংশসহ অন্য দু-একটি প্যারডির উদ্ধৃতি দিচ্ছি-
নহ মাতা, নহ কন্যা, নহ বধূ, সুন্দরী রূপসী,
হে নন্দনবাসিনী উর্বশী।
গোষ্টে যবে সন্ধ্যা নামে শ্রান্ত দেহে স্বর্ণাঞ্চল টানি
তুমি কোন গৃহপ্রান্তে নাহি জ্বাল সন্ধ্যাদীপখানি।
(উর্বশী : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
প্যারডি-১ : সর্বশী
নহ ধেনু, নহ উষ্ট্রী, নহ ভেড়ী, নহ গো মহিষী,
হে দামুন্যা-চারিণী সর্বশী,
ওষ্ঠ যবে আর্দ্র হয় জিহ্বাসহ তোমার বাখানি
তুমি কোন হাঁড়িপ্রান্তে নাহি রাখ খণ্ড মুণ্ডখানি।
(সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত)
প্যারডি-২ : শালা
সামান্য মনুষ্য নও, নও শুধু গৃহিণীর ভ্রাতা
হে শ্যালক, হে স্বভাব শালা।
বহুদেশে বহুবেশে বহুবার দেখেছি তোমারে
রচিয়াছি তব জয়মালা।
(বনফুল)
এ ছাড়া রবীন্দ্রনাথের ‘ভোরের পাখি’, ‘চিরআমি’, ‘তোমরা ও আমরা’, ‘শরৎ’, ‘চঞ্চলা’, ‘দূরাকাক্সক্ষা’ ইত্যাদি কবিতাসহ বহু কবিতার প্যারডি রচিত হয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, কোনো কোনো কবি ব্যক্তিগত ঈর্ষা থেকে কিছু প্যারডি রচনা করলেও অধিকাংশই অনাবিল হাস্যরসের জন্য প্যারডি রচনা করেছেন। বড় কবিদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা ও গান নিয়ে বেশি প্যারডি রচিত হয়েছে; এটা তাঁর জনপ্রিয়তা ও প্রমাণ করে। কেননা জনপ্রিয় ও উন্নত রচনা ব্যতীত প্যারডি রচনা করলে পাঠকসমাজে তা সমাদৃত হয় না।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫