ঢাকা, মঙ্গলবার,২৭ জুন ২০১৭

বিবিধ

সত্তরের গীতিময় ছড়াকার আবদুর রহমান

রেজা ফারুক

০৪ মে ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৫:০১


প্রিন্ট

ঢাকার সাহিত্যাঙ্গন যখন মুক্তিযুদ্ধের দামামায় উন্মাতাল ঠিক সে সময় এক ঝাঁক তরুণ ছড়াকার ও শিশুসাহিত্যিক শিশুতোষ গদ্য ও ছড়া সাহিত্য নিয়ে তুমুল সৃষ্টিতে বিভোর। তখনই ওই ছড়াকারদের মধ্যে এক তরুণ ছড়াকার তার সুচারু রচনাশৈলীর মধ্য দিয়ে খুব অল্প সময়ের মধ্যে সাহিত্যাঙ্গনে বিশেষ পরিচিতি অর্জন করতে সক্ষম হন। তার সৃষ্টিশীলতা এতটাই পাঠককে বিমুগ্ধ করে- যা ওই সময়ে ছিল এক বিশাল ব্যাপার। তার রূপোঝুরি ছড়া সাহিত্যের রচনা সৃষ্টির পরিপ্রেক্ষিতে সাহিত্য বোদ্ধারাও ওই তরুণের বিমুগ্ধ পাঠকে পরিণত হন।
তৎকালীন ঢাকার সাহিত্য আড্ডায় অন্যদের মধ্যে তার শৈল্পিক সৃষ্টিশীলতা নিয়ে আলোচনায় মুখর হতো চায়ের টেবিল। তারপর ক্রমান্বয়ে একদিন তিনি ছড়া-সাহিত্য রচনায় অপরিসীম দক্ষতার মধ্য দিয়ে হয়ে ওঠেন পাঠকনন্দিত ছড়াকার। তিনি হলেন স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের ছড়া সাহিত্যের অনবদ্য গীতিময় ছন্দসচেতন ছড়াকার আবদুর রহমান।
দৈনিক আজাদের ‘মুকুলের মাহফিল‘, দৈনিক বাংলার ‘সাত ভাই চম্পা‘, দৈনিক ইত্তেফাকের ‘কচিকাঁচার আসর‘ এবং দৈনিক সংবাদের ‘খেলা ঘর‘ শিশুসাহিত্য পাতায় চোখ রাখলেই নিয়মিত চোখে পড়ত ছড়াকার আবদুর রহমানের ছড়া। ওই সময়ে আবদুর রহমানের ছড়া মানেই এক অন্যরকম আবেশ, ভিন্ন এক আনন্দময় আবেদনের রেশ ছড়িয়ে পড়া নক্ষত্রপুঞ্জের মতো।
আবদুর রহমানের ছড়া এবং কিশোর কবিতা মধ্য সত্তর থেকে আশির দশকের পুরো সময়জুড়ে শিল্প ও নান্দনিকতার রঙপেন্সিলে অঙ্কিত হয়ে ছোটদের মনকে যেমন রাঙিয়ে তুলত, তেমনি বড়দের হৃদয়কেও জাদুকরী মোহবিষ্টতায় আচ্ছন্ন করে রাখত। ছড়াকার আবদুর রহমান তার রচিত ছড়ার প্রতিটি পঙ্ক্তির গহিনে ছড়িয়ে দিয়ে এক অনশ্বর বর্ষণমুখর ধারাপাত পাঠককে নদীর কল্লোলের মতো জড়িয়ে নেয় মিহিন আর মায়াবি ভালোলাগার মধুর আমেজে।
যেমন একটি ছড়া পাঠ করা যাক-
বিকেল যেনো নিকেল করা
রোদের কিরণ মিষ্টি
নরম বায়ে পরম আদর
যায় হারিয়ে বিষ্টি।
তার ছড়া যেমন শিশুদের মনের অলিন্দে ফেলে রৌদ্রের উজ্জ্বলতা। তেমনি বড়দের মনোজগতেও অনুরণন তোলে গভীর মুগ্ধতায়।
আবদুর রহমানের ছড়া প্রতিনিয়ত বহুমাত্রিক বিষয়ের লঙ রোডে বিছিয়ে দেয় জ্যোৎস্নাঙ্কিত কুহকজ্বলা রাত্রির নাক্ষত্রিক দিগন্তের ছায়া। আর ওই ছায়ার প্রতিটি স্তবকে ফুটিয়ে তোলে ভোরের বিশুদ্ধ শিশির ধোয়া বকুল আর গন্ধরাজের মতো একেকটি ছড়ার বিনম্র অবয়ব। তার প্রকাশিত ছড়াগ্রন্থসমূহের প্রতিটি ছড়ায় জাগিয়ে দিয়েছেন এমন এক আলোর ঝিলিক। যে আলোর ঝিলিকের সিল্কি রেণুতে বিচ্ছুরিত হয় সমকালীন প্রেক্ষাপট, জীবনবোধ, মানবিকতা, আনন্দ ও স্বপ্নবিলাসী এক অপরিসীম নীলিমা মগ্নতা। যে মগ্নতায় ডুবে যায় নির্জন দুপুর বেলা আর নিঝুম বিকেলের প্রান্ত রেখায় পাখির পালকের মতো নরোম ছোঁয়ার আস্তরণ।
পাঠ করা যাক আরও একটি ছড়ার ক’টি লাইন-
ফুলের বনের বিষের কাঁটা
তবুও ছোঁয়া কষ্ট নয়
তোমার মনে কিশের কাঁটা
রহস্য যে পষ্ট নয়।
মুক্তিযুদ্ধ, প্রকৃতি, জীবন সংগ্রামের গল্পকথা আধুনিক মোটিফে আবদুর রহমানের ছড়া ও কিশোর কবিতার পরতে পরতে শিল্পীর জলরঙ ছবির মতো উদ্ভাসিত হয় স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য আর উপলব্ধির চন্দ্রাচ্ছন্নের গভীর ঘোরের অতল থেকে। আর এভাবেই তিনি হয়ে উঠেছেন এই সময়ের এক নন্দিত ছড়া-সাহিত্যিক।
তার একটি ছোট্ট রোমান্টিক ছড়া-
কে ভাঙে
রমণীর লজ্জা
ফুলসজ্জা
ফুলসজ্জা!
তাই বলা চলে আবদুর রহমানের ছড়া তার সময়কে অতিক্রম করে ভবিষ্যতের পথেও ছড়িয়ে দিয়ে যায় ক্রিস্টালের বর্ণোজ্জ্বল মার্বেলগুচ্ছ। কিশোরের দুরন্ত দুপুরের নির্ঘুম চঞ্চলতা আর কিশোরীর যুথবব্ধ গোল্লাছুটের লোকজ শৈল্পিকতাকে বুকে ধারণ করে হয়ে উঠেছে আবহমান বাংলার চিরায়ত ছড়া সাহিত্যিকের এক অমোঘ অংশীদার। একইভাবে নাগরিক জীবনের ছবিটাও আবদুর রহমানের ছড়ার আকাশে উড়ন্ত মেঘের রোয়ার গুঞ্জরনকে স্পন্দিত করে এক ভিন্ন ডাইমেনশন সৃষ্টি করেছেন। আর এভাবেই ছড়া সাহিত্যের খ্যাতির রুমালকে তিনি স্বাচ্ছন্দে রেখেছেন তার সৃষ্টির বুক পকেটে তুলে। প্রকৃতির অপরূপ আবেগ তার জীবনের সার্বজনীনতাকে আবদুর রহমান তার স্বকীয় বৈশিষ্টের রঙে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন ছড়ার ক্যানভাসে। আর এভাবেই তিনি হয়ে উঠেছেন নন্দিত এক ছড়াকার। পেয়েছেন পাঠকপ্রিয়তা- সব বয়সী পাঠকের।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫