ঢাকা, বুধবার,২৪ মে ২০১৭

নারী

কাম না করলে না খাইয়া থাহন লাগব

আবদুর রাজ্জাক

৩০ এপ্রিল ২০১৭,রবিবার, ১৮:২৬


প্রিন্ট

হান মে দিবস। আমাদের দেশের নারীশ্রমিকদের নিয়ে এই দিনে প্রতি বছরের মতো এবারও র‌্যালি হবে। অনেক আশ্বাসের বাণীও শুনবে তারা। তারপর আবার সব আগের মতো। নারীশ্রমিকদের মজুরি বৈষম্য থেকেই যাবে। উন্নত হবে না তাদের কর্মপরিবেশ। আর যদি আর একটা রানা প্লাজার মতো ঘটনা ঘটে তাহলে প্রাণ বেশি যাবে নারীশ্রমিকেরই। এর কি কোনো প্রতিকার নেই?

ইটভাটার শ্রমিক জমিলা বেগমের বয়স ৬০ পেরিয়েছে বছরখানেক আগেই। পুখুরিয়া এলাকায় থাকেন অন্যের দয়ায় এক পরিত্যক্ত ভিটেবাড়িতে। স্বামী মানিক মিয়া অনেক আগে তাকে ছেড়ে অন্যত্র বিয়ে করে সংসার করছে। দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে জমিলার দুঃখের উপাখ্যানে একটিবারের জন্যও শামিল হয়নি তার পাষণ্ড স্বামী। সূর্য ওঠার আগেই শুরু হয় তার কাজ; সূর্য ডোবার পরও যেন তা শেষ হয় না। এমনি করে কেটে গেছে জীবনের ৩০টি বছর। ছেলে এখন বিয়ে শাদী করে আশুলিয়ার থাকে, স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই চাকরি করে। খোঁজ নেয় না বৃদ্ধা দুঃখিনী মায়ের। বৃদ্ধা জমিলার ঠিকানা এখন এনবি ব্রিক্সের তপ্তভাটায়। বয়স হয়ে গেছে, এখন আর আগের মতো শক্তি-সামর্থ্য নেই। তবুও পেটের তাগিদে তার জীবন যুদ্ধ যেন ফুরায় না। বৈশাখের খরতাপ আর চুলার আগুনে যেন ঝলসে গেছে তার শরীর। ও খালা শ্রম দিবস কী? জানেন কি না প্রশ্ন শুনেই, বললেন তা তো জানি না বাপু, ‘খালি জানি কাম না করলে না খাইয়া থাহুন লাগব’। এই বয়সে কেন এই আগুনের পাশে এত কষ্ট করে কাজ করছেন? পাশে বসে জিজ্ঞেস করতেই ‘ধুলোকালি মাখা গাল বেয়ে জলে ভিজে গেল চোখ দুটো। শিশুর মতো হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বললেন, মায়ের পরিচয় দিতে খুব লজ্জা লাগে তার ছেলের। তবুও দোয়া করি আল্লায় যেন ওদের সুখে রাখে। জমিলা বেগম বলেন, ‘আগুনের পাড়ে ১৫০ টাকা রোজের কাম (কাজ) করি। এই বয়সে আর শরীরে কুলায় না। এমন কপাল যেন আল্লায় আর কারেও না দেয়...।
জমিলার মতো এমন হাজারো নারী শ্রমিক জানেন না, মে দিবস বা শ্রমদিবস কী? ওরা বোঝে এক দিন কাজ না করলেই না খেয়ে থাকতে হবে। নিতান্তই পেটের তাগিদে ইটভাটার আগুনে ঝলসানো ওদের ভাগ্য। মে দিবস তাদের কাছে কোনো গুরুত্বপূর্ণ দিন নয় বলেই পেটের তাগিদে এ দিনেও তারা কাজে ব্যস্ত থাকেন। জীবিকার টানে জীবনযুদ্ধে ভাটার আগুনের সাথে সংগ্রাম করছে নাম না জানা হাজারো নারী শ্রমিক। লক্ষ্য একটাই, সারা দিন রোদে পুড়ে হাড়ভাঙা খাটুনির পর একমুঠো চাল নিয়ে বাড়ি ফেরা। পথের পানে চেয়ে থাকে তাদের পঙ্গু স্বামী আর সন্তানেরা।
ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড থেকে আধা কিলোমিটার দূরেই পাঁচটি ইটভাটা। এখানে রয়েছেন শতাধিক নারীশ্রমিক। পুরুষের পাশাপাশি এই ইটভাটায় নারীরা কাঠফাটা রোদে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে চলেছেন প্রতিদিন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অবিরাম কাজ করছেন তারা। নারী বলে ন্যায্যমজুরিও জুটছে না তাদের কপালে। তার পরও এ বিষয়ে উচ্চস্বরে কেউ কোনো শব্দ তুলছে না। কথা হয় আতা ব্রিকসের নারী শ্রমিক ফুলজান, পাখি, সূর্য বেগম, মরিয়ম, সমীরন, খোদেজা, রুপজান, রেখার মতো প্রায় ২৫ নারীশ্রমিকের সাথে। এদের একজন ফুলজান বেগম। বয়স ৫০-এর কাছাকাছি। সদর উপজেলার উকিয়ারা গ্রামের শহিদ উদ্দিনের মেয়ে ফুলজানের স্বামী হাকিম উদ্দিন সাত বছর আগে দুর্ঘটনায় মারা যান। রেখে যান চার সন্তান। স্বামীর মৃত্যুর পর তার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। সন্তানদের মুখে দু’বেলা খাবার তুলে দিতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন কাজের সন্ধানে। কখনো মাটি কাটার কাজ, কখনো ইটভাটায় কয়লা ভাঙার কাজ, আবার কখনো রাজমিস্ত্রির জোগান দিয়েছেন। ফুলজানের চেহারা রোদ ও আগুনের তাপে পুড়ে বিবর্ণ হয়ে গেলেও এতটুকু বিশ্রামের অবকাশ নেই তার। হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তিনি। কথা বলার এক ফাঁকে দু’চোখের কোণে পানি টলমল করছিল। বারবার কাপড়ের আঁচল দিয়ে পানি মোছার চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হন। একপর্যায়ে কেঁদে ওঠেন হাউমাউ করে। শুধু বলেন, ‘আমাগোর মতো মানুষের কষ্টের কথা আপনে লেইখ্যা কী করবেন।’
কথা হয় সদর উপজেলার গড়পাড়া ঘোনা গ্রামের সমেজ মিয়ার সাথে। তিনি জানালেন, ‘ইটভাটায় কাজ করা আর জাহান্নামের আগুনে পোড়া সমান কথা। সন্তানদের মুখের দিকে তাকাইয়া আগুনে পুড়ে কাজ করতে অয়।’
আরেক নারীশ্রমিক মরিয়ম বেগম। স্বামী ইমান আলী মানসিক ভারসাম্য না থাকায় অনেক আগেই স্ত্রী-সন্তানদের ফেলে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন। কোথায় আছেন কেউ জানেন না। তিন সন্তানকে লালন পালন করতেই তিনি ইটভাটায় শ্রমিক হিসেবে হাড়ভাঙা কাজ করে চলেছেন। মাটি কাটার আরেক শ্রমিক রাহেলা বেওয়া বলেন, ‘রোদে পুড়ে কাজ করি। কিন্তু উচিত ট্যাহা পাই না। বেটা মাইনষে (পুরুষরা) যদি ৩০০ ট্যাহা পায় তাইলে আমরা কেন ১৭০ ট্যাহা পামু। এই বৈষম্য কী কোনো দিন দূর হবে না। এ রকম মাটির কাটার মাঠে, হোটেলের রান্নাঘরে কিংবা ইটভাটায় কয়েক হাজার নারীশ্রমিক রোদে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাচ্ছেন। তাদের এই কষ্টের মূল্য কেউ দিচ্ছে না। এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকা ঘুরে মাটি কাটা নারীশ্রমিকদের সাথে কথা হয়। তারা জানান, মে দিবসে তাদের কাছে কোনো গুরুত্বপূর্ণ দিন নয়। এ দিবসের তাৎপর্য কী তা বেশির ভাগ নারীশ্রমিকই জানেন না। তাই তো মে দিবসেও তারা পেটের তাগিদে কাজ করে থাকেন। তাদের ভাষ্য, এক দিন কাজ না করলে ঘরে ছেলে-সন্তান নিয়ে না খেয়ে থাকতে হবে।
কথা হয় ঘিওর উপজেলা বানিয়াজুরী-বাঠুইমুড়ি বেড়িবাঁধের ওপর বসবাসরত মাটি কাটার কাজে নিয়োজিত নারী শ্রমিক শেফালি সরকার, গীতা রানী সরকার ও ঝরনা সরকারের সঙ্গে। এরা তিনজনই বিধবা। স্বামীর মৃত্যুর পর সন্তানদের লালন পালন করতে কেউ ২০ বছর, কেউ ১০ কিংবা আট বছর ধরে মাটি কাটার কাজ করে যাচ্ছেন। তিনজনই জানালেন, জীবন সংগ্রাম করে অনেকটা পথ পার করতে হয়েছে তাদের। জীবনের শেষ দিকে এসেও কষ্ট তাদের পিছু ছাড়ছে না। আর শ্রমদিবস নিয়ে তাদের নেই কোনো মাথাব্যথা। তাদের কথা একটাই- এক দিন কাজ না করলে পরিবার নিয়ে না খেয়ে থাকতে হবে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫