ঢাকা, সোমবার,২১ আগস্ট ২০১৭

নারী

যে শ্রমের মূল্য শুধুই ভালোবাসা

খন্দকার মর্জিনা সাঈদ

৩০ এপ্রিল ২০১৭,রবিবার, ১৮:০৫


প্রিন্ট

শ্রমের মূল্যায়নের কথা উঠলেই আমরা কর্মক্ষেত্রের ৮ ঘণ্টা বেতনমাফিক কাজকেই বুঝি। হতে পারে তা দৈনিক হিসাবে বা মাসকেন্দ্রিক। অনেক সময় ত্রিমাসিক, বছরব্যাপীও এ হিসাব-নিকাশ হয়ে থাকে। তবে শতাব্দী পেরিয়েছে। পেরিয়েছে যুগ-যুগান্তর। কিন্তু সেই প্রচলিত ধারায় এখনো যে শ্রমটি বিরাজমান। বর্তমান সময়েও বহাল তবিয়তে জায়গা করে আছে তা হলো গৃহিণীদের সংসারপ্রেম। সম্পর্ক বা ভালোবাসার বিনিময়েই যে শ্রমের মূল্য। অথচ নেই যে পেশায় এক দিনেরও ছুটি। একদণ্ড অবসর বা পেনশনের নেই কোনো ব্যবস্থা। তবুও তারা একমনে তা করে যাচ্ছেন। এবং বলতে দ্বিধা নেই, এরা আছেন বলেই এখনো পারিবারিক প্রথা প্রচলিত আছে। আছে ঘরে ফেরার সুখ। আর এ নিয়েই কথা হয় অগণিতদের মধ্য থেকে মাত্র ক’জনের সাথে। গৃহিণী, রুবিনা ইয়াসমিন কণা। তিন সন্তানের মা। স্বামী অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। অবসর নিয়েছেন তা-ও তিন-চার বছর হতে চলল। কণা জানান, তাদের দাম্পত্য জীবনের বয়স এবার ৩৭ পেরিয়ে যাবে। এই দীর্ঘ পথ চলায় তাকে এক হাতেই সামলাতে হয়েছে সংসার। স্বামীর চাকরির কারণে বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়েছে। শিশুদের পড়াশোনা, ভবিষ্যতের কথা ভেবে আমাকে সবসময় ঢাকাই থাকতে হয়েছে। স্বামীর অনুপস্থিতিতে কাঁচা বাজার, ছেলেমেয়েদের স্কুলে আনানেয়া, ঘর গৃহস্থালীর কাজ সব একার দায়িত্বেই দিতে হয়েছে সামাল। অনেক সময় গৃহপরিচারিকাও থাকত না। তখন দুই হাতেই ঘরে-বাইরে যাবতীয় কাজ সারতে হতো। প্রাপ্তিতা এটুকু যে, তিন সন্তানই যথাযথ শিক্ষায় হয়েছে শিক্ষিত। পেনশনের টাকায় এই প্রবীণ বয়সে স্বামী আমাকে একটা ফ্ল্যাট উপহার দিয়েছেন। সন্তানরা তাদের বেতন থেকে কিছু হাতে ধরিয়ে দেয়। পারিবারিক অনুষ্ঠানগুলোয় দেয় সুন্দর সুন্দর উপহার। তবে দুঃখ এটুকুই, একান্ত শখগুলো পূরণ করতে স্বামী-সন্তানদের দিকে হাত বাড়াতে হয়। নিজস্ব উপার্জন, সম্বল বলতে নেই কিছুই। এ বয়সেও পারি না হাত খুলে কাউকে দান করতে, করতে খরচ এবং পছন্দনীয় খাবার, শাড়িটি কিনতে। এর জন্য আগে স্বামী। এখন নির্ভর করতে হচ্ছে সন্তানদের ওপরে। হ্যাঁ, সংসারের যাবতীয় খরচ নিজ হাতে করি বটে। দিনআন্তে এরও সঠিক হিসাব-নিকাশ দিতে হয় বলেও জানান এই গৃহিণী।
সেলিনা আফরোজ মিতু। মিতু চার সন্তানের মা। স্বামী আমেরিকা প্রবাসী। দুই বছর পরপর তিন মাসের জন্য দেশে আসেন। প্রতি মাসে সংসার খরচ বাবদ পাঠান টাকা। কিন্তু মিতুর নিজস্ব যে একটা খরচ থাকতে পারে, স্বামী এ ব্যাপারে থাকেন নিরুত্তাপ। মিতু জানান, এ নিয়ে অনেক বাগি¦তণ্ডা হয়েছে। স্বামী কৌশলে বারবারই বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। উত্তরে শুধু শুনতে হয়েছে, তোমার সংসার, তোমার ছেলেমেয়ে। তোমার হাত দিয়েই তো সব খরচ করো। এখান থেকে নিজের জন্য কিছু বের করে নিও। সেলিনা আফসোস করে বলেন, তবু বলে না আলাদাভাবে কিছু নিও। সন্তানরা বড় হচ্ছে। বাড়ছে ওদের খরচের পরিসরও; দায়িত্ব, ব্যস্ততা। তিনি শুধু গোনা টাকা, মাঝে মধ্যে ফোনে কথা বলে দায়িত্ব সম্পন্ন করেন। সময় বের করে নিজে যে একটা কিছু করব তাও পারছি কই! সব দিক মিলিয়ে নিজেকেই দিতে হচ্ছে ছাড়। সে হোক আর্থিক, মানসিক শারীরিক সব বিষয়েই। শুধু পারিবারিক সুখ, সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যতের চিন্তা মাথায় রেখেই বলে জানান সকাল ৫টা বেজে ৩০ মিনিট থেকে মধ্যরাত অবদি নিরলস পরিশ্রম করে যাওয়া এই মা।
গৃহিণী আতিয়া ইয়াসমিন বেবী। দুই সন্তানের মা। দুই সন্তানের মা হলে কী হবে, একটি যৌথ পরিবারের কর্ণধার। আতিয়া জানান, তার অবিবাহিত দুই দেবর। প্রতিবন্ধী এক ননদসহ প্রবীণ শ্বশুর-শাশুড়ি যাবতীয় দেখাশোনা এককভাবে না করতে হলেও রান্না, মেহমানদের আপ্যায়ন, গৃহপরিচারিকাদের পরিচালনার দায়িত্ব তাকেই পালন করতে হয়। দুই সন্তানই স্কুলে পড়ছে। যে কারণে স্কুল শেষে কোচিংয়ের আনা-নেয়া। পড়াশুনার তদারক করা। মাসিক বাজার। কার কী দরকার, পছন্দের খাবার। জন্মদিনসহ বিশেষ বিশেষ দিনগুলোর কথা মনে করে পরিবারের সবার আনন্দের বিষয়টিও আমাকে ভাবতে হচ্ছে। কিন্তু আমি যখন কারো কাছে বাড়তি কিছু আশা করি, তখনই বাধে বিপত্তি। হোক তা বাড়তি কিছু সময়। কিছু টাকা। পরিপাটি একটি ফ্ল্যাট যেটিকে নিজের মতো করে পারব সাজাতে। পারব কোনো কিছুর প্রাপ্তিতার মূল্যায়নে হলেও মূল্যায়ন বাবদ পেতে। যেহেতু নিজের বলতে কোনো সময়ই থাকছে না হাতে। এদের জন্যই অকাতরে দিচ্ছি বিলিয়ে। পারছি না, শিক্ষিত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও উপার্জন করতে। সেহেতু এটুকু দাবি তো করতেই পারি। কিন্তু কার দাবি কে শোনে! গভীর অনুযোগের সুরেই জানান, গৃহিণী আতিয়া ইয়াসমিন বেবী। এ বিষয়ে শ্রম মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ফরিদা খানমের সাথে কথা বললে তিনি জানান, খেয়াল করলে দেখবেন প্রায়ই ইলেট্রনিক ও নিউজ মিডিয়ায় এ বিষয়টি ওঠে আসছে। গৃহিণীদের গৃহকর্মের মূল্যবোধে সেøাগান তুলছে পুরুষরাও। কারণ এদের মা, বোন, মেয়েও তো একজন নারী, যাদের প্রতি সমবেদনা যেমন আছে, আছে অকৃত্রিম ভালোবাসা, দায়িত্ববোধও। আশার কথা হচ্ছে দিন দিনই এ দায়িত্ববোধের প্রতি মানুষ সচেতন হচ্ছেন। স্ত্রীর কাজে হাত লাগাচ্ছেন। তাকে বিশ্রাম নেয়ার সুযোগ করে দিচ্ছেন। মাস শেষে সংসার খরচের পাশাপাশি হাতে দিচ্ছেন পছন্দনীয় উপহার, কিছু টাকা। বছরে ৬-৯ মাসে একবার কেউ কেউ যান পারিবারিক সফরেও, যা গৃহিণীদের মানসিকভাবে যেমন ভালো রাখে, নিত্যদিনের একঘেঁয়েমি ঘুচিয়ে চলার পথকে আনন্দদায়ক করে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫