ঢাকা, বুধবার,২৪ মে ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

চিকিৎসায় কমিশন বাণিজ্য বন্ধ করা হোক

কাজী সুলতানুল আরেফিন

২৮ এপ্রিল ২০১৭,শুক্রবার, ১৮:৩৯


প্রিন্ট

সব কিছুতেই রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাণিজ্য ঢুুকে গেছে। বিপদে পড়ে অসুস্থ হয়ে চিকিৎসার জন্য ছুটে আসা সাধারণ মানুষ এর শিকার। খামের বিনিময়ে বা অন্য সুবিধার বিনিময়ে কিছু ডাক্তার অনেক নিম্নমানের ওষুধ অনুমোদন করে এর কোম্পানিগুলোকে সুবিধা দিয়ে থাকেন। আর টেস্টের কথা তো পুরনো কাসুন্দি। মনমতো জায়গায় টেস্ট না করালে ডাক্তার প্রায় সেটার ওপর চোখ রাখেন না। চিকিৎসা নিয়ে ব্যবসায়ের ব্যাপারটায় কি কারো বিবেক নড়ে ওঠে না? হাসপাতালগুলোর সামনে সারি সারি মোটরসাইকেল থাকে ওষুধ কোম্পানিগুলোর। কে কিভাবে কাকে ম্যানেজ করবে শুধু সেই নিরন্তর প্রচেষ্টা। মোটরসাইকেলের সারি দেখলে মনে হয় শোরুম। উন্নত দেশগুলোর মতো প্রেসক্রিপশনে ওষুধের জেনেরিক নাম লেখার নিয়ম থাকলে এমনটি হয়তো হতো না। এমন কর্মকাণ্ড বন্ধ করা হোক।
মানুষের জীবন রক্ষার জন্য ওষুধের মাধ্যমে চলে আপ্রাণ চেষ্টা। গ্রামবাংলার মানুষের একটি বিশাল অংশের ওষুধের প্রতি রয়েছে দুর্বলতা। তারা কোনো ডাক্তারের পরামর্শ বা নির্দেশনা ছাড়াই ওষুধ কিনতে ভালোবাসে। সে সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে কিছু অসাধু ও মুনাফালোভী। সাধারণত নামীদামি ওষুধ কোম্পানিগুলোর যে ওষুধগুলো বাজারে বেশি চলে, সে ওষুধগুলোর আদলে, অর্থাৎ দেখতে একই রকম করে নি¤œমানের কিছু ওষুধ বাজারে ছাড়া হচ্ছে। এই ওষুধে মুনাফার পরিমাণ প্রায় তিন থেকে চারগুণ বেশি হওয়ায় কিছু ফার্মেসি সেগুলোর দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে। আবার এ ওষুধগুলো বেশির ভাগ নি¤œ আয়ের লোক বা অল্পশিক্ষিত ও অশিক্ষিত লোকদের মধ্যে সুযোগ বুঝে বিক্রি করা হচ্ছে। অনেক সময় দেখা গেছে, শুধু দেখতে একই রকম এবং ভালো কোম্পানিগুলোর সাথে মিল রেখে নি¤œমানের ওষুধ বাজারজাত করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ভিটামিন-জাতীয় কিছু কৌটার ওষুধে বেশি ‘দুই নম্বরি’ করা হচ্ছে। যে ব্যবসায়ের সাথে মানুষের জীবন-মরণ জড়িত, সে ব্যবসায় কোনো নিয়মকানুন ছাড়াই যত্রতত্র চলছে। মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে মুনাফালোভীরা। অসাধু বাণিজ্য করে যারা তাদের ধিক্কার জানাই। সবাইকে ওষুধ কিনতে সাবধান হওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি। এবার বলা যাক কিছু প্রাইভেট হাসপাতাল আর ডায়াগনস্টিক সেন্টার নিয়ে। হায়রে কপাল! এ খাত নাকি এখন মুনাফা অর্জনের এক বৃহৎ খাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠান দেয়ার শুরুতেই সেবার আগে মুনাফার কথা ভাবা হয়। লোক ঠকানো মুনাফার রাস্তা বন্ধ করা হোক।
কিছু বাণিজ্যিক হাসপাতালের খপ্পরে পড়ে মানুষ আজ বিপন্ন। একজন মানুষ রোগে আক্রান্ত হয়ে এমনিতেই অসহায় হয়ে পড়ে। থাকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। এই দুর্বলতার সুযোগ নেয় কিছু অসাধু বাণিজ্যিক প্রাইভেট হাসপাতাল বা ক্লিনিক। এরা প্রথমে রোগীদের ধরার জন্য বিভিন্ন এজেন্টের মাধ্যমে কমিশনের জাল বিছায়। রোগী এসব হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর নানা রকম অপ্রয়োজনীয় টেস্ট করিয়ে বড় আকারে বিল করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়। এই টাকা থেকে ওই এজেন্ট বা দালাল নির্দিষ্ট হারে কমিশন পায়। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হচ্ছে- অনেক চিকিৎসকও এই কমিশন পান। এটা লজ্জাকর নয় কি? রোগীর টাকা থেকে চিকিৎসক নিজেও কিছু কমিশন খাচ্ছেন! হাসপাতালের বিল নিয়ে হয়রানি করার কিছু চিত্র মাঝে মধ্যে সংবাদপত্রে প্রকাশ পায়। মৃত মানুষকে আইসিইউতে রেখে বড় অঙ্কের বিল তৈরির কিছু খবর পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছিল। জেলা শহরগুলোতে দিনের পর দিন ব্যাঙের ছাতার মতো ক্লিনিক আর ল্যাব গড়ে উঠছে। ল্যাব আর ক্লিনিক যেন বাণিজ্যের অন্যতম সেক্টর। প্রশাসনের উচিত এটা দেখা যে, কোনো শহর বা জেলায় ক’টি ল্যাব বা ক্লিনিক আসলে প্রয়োজন; কারা এসব প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত? আর এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত কর্মচারীদের কী যোগ্যতা আছে তাও খতিয়ে দেখা দরকার। একজন রোগী তার রোগ নির্ণয়ের জন্য টেস্ট করার ক্ষেত্রে দেখতে হবে, ওই ক্লিনিক বা হাসপাতালের মুখ্য উদ্দেশ্য কী এবং এর টেস্ট করার মান ঠিক আছে কি না! অনেক ক্ষেত্রে এক ল্যাবের টেস্ট রিপোর্ট অন্য ল্যাব বাদ দিয়ে দেয়। এতে রোগীর অনেক টাকা অপচয় হয়।
একজন অসুস্থ মানুষের টাকা থেকে কাউকে কমিশন না দিয়ে সে টাকা রোগীকে ছাড় দেয়া হোক। আর রোগী সংগ্রহের জন্য এভাবে মার্কেটিং করা হয় কেন? প্রাইভেট হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলো কি চায় না এ দেশের মানুষ সুস্থ থাকুক। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের নজর দেয়া উচিত। এ ধরনের ক্লিনিকগুলোতে রোগীদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়। এ বিল, সে বিল করে প্রচুর টাকা নেয়া হয়। বেশির ভাগ ক্লিনিকের বিলে দেখা যায়, চিকিৎসক যতবার রোগী দেখতে যাচ্ছেন ততবার তার ভিজিট যোগ করা হচ্ছে। কিছু ক্লিনিকে চুক্তির মাধ্যমে সিজার বা অপারেশন করা হয়। এ ক্ষেত্রে এজেন্টরা একটি নির্দিষ্ট রেটে অপারেশন করতে চুক্তি করে। কিন্তু পরে বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে সেই রেট আর থাকে না। চুক্তি ভেঙে রোগীকে নাজেহাল করা হয়। রোগী রিলিজের সময় কিছু ক্লিনিকের আয়া, সুইপার, ওয়ার্ডবয় থেকে শুরু করে দারোয়ান পর্যন্ত বখশিশের জন্য চেপে ধরেন। যেন ঈদ এসেছে আর রোগী রিলিজ মানে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। এই মনোভাব অসহায় মানুষকে আরো অসহায় করে তুলেছে। গরিব আরো নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। কেউ কেউ তো হাসপাতাল বা প্রাইভেট ক্লিনিকে যাওয়ার কথা শুনলে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন- না জানি কত টাকা লাগবে! এখন আরেকটি ব্যাপার দেখা যাচ্ছে, কিছু প্রাইভেট ক্লিনিকে ঢুকতেই ডাক্তারের সাক্ষাতের বিলের চার্ট টাঙানো থাকে। প্রথম সাক্ষাতে এত...দ্বিতীয় সাক্ষাতে...তৃতীয় সাক্ষাতে... আবার রিপোর্ট দেখাতে এত...! কিন্তু রিপোর্ট দেখাতে টাকা লাগবে কেন? রোগী নিয়ে এ ধরনের বাণিজ্য করা লোকদের চিন্তা করা দরকার, অসুস্থ লোক বা রোগী কোনো টাকার খনি বা গাছ নন। অসুস্থতা কোনো বাণিজ্যিক বিষয় হতে পারে না। মানবতার কথা চিন্তা করে চিকিৎসা-বাণিজ্য বন্ধ এবং চিকিৎসায় সব কমিশন অবৈধ ঘোষণা করা দরকার। এসব বিষয় খতিয়ে দেখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

পূর্ব শিলুয়া, ছাগলনাইয়া, ফেনী
Arefin.feni99@gamil.com

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫