ঢাকা, বুধবার,২২ নভেম্বর ২০১৭

ইসলামী দিগন্ত

ইসলামে শ্রমজীবী মানুষের মর্যাদা

ড. মেহরান মাহমুদ

২৮ এপ্রিল ২০১৭,শুক্রবার, ০০:০০


প্রিন্ট

পৃথিবীর সবচেয়ে নির্যাতিত শ্রেণী হলো শ্রমিক শ্রেণী। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হিসেবে শ্রমজীবীদের সব সমস্যার সঠিক ও ন্যায়ানুগ সমাধান দিয়েছে। মহানবী সা:-এর ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক মতাদর্শের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং অনন্য বৈশিষ্ট্যের দিক হলো, তা শ্রমের মর্যাদা ও তাৎপর্যকে উজ্জ্বলতায় স্থাপন করেছে এবং মালিক ও শ্রমিকের সম্পর্ককে এমন অবস্থানে পৌঁছিয়েছে যা সত্যিই ঈর্ষনীয়। মহানবী সা: শিখিয়েছেন, শ্রমিকও মানুষ, এদেরও বাঁচার অধিকার আছে। এরা তোমাদের ভাই। মালিকপরে উচিত মহান আল্লাহ তাদের প্রতি যেভাবে অনুগ্রহ করেছেন, তার কৃতজ্ঞতাস্বরূপ শ্রমিকদের যথার্থ পাওনা পরিশোধ করা। মহানবী সা: বলেছেন, ‘সাবধান! মজুরের শরীরের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি মিটিয়ে দাও (তিরমিজি)।
ইসলামে মালিকের ধারণা : ‘মালিক’ শব্দটি আরবি। অর্থ অধিকারী ইত্যাদি। তবে শ্রমিক মালিকের েেত্র ধারণাটি ইসলামে নেই। কারণ, ইসলামি অর্থনীতিতে মালিকের পৃথক কোনো অস্তিত্ব নেই। ইসলামে মনিবকে ‘রব’ বলা যেমন নিষিদ্ধ তেমনি শ্রমিককে ‘আবদ’ বলতেও কঠোর ভাষায় নিষেধ করা হয়েছে। আলোচ্য প্রবন্ধে মালিক বলতে নিয়োগকর্তা বা নিয়োগকারী কর্তৃপকে বোঝাবে।
ইসলামের দৃষ্টিতে শ্রম ও শ্রমিক : শ্রম ও শ্রমিক পরস্পর ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শ্রম হলো, শারীরিক ও মানসিক কসরতের মাধ্যমে কোনো কাজ আঞ্জাম দেয়া। যিনি কাজটি আঞ্জাম দেন তিনি শ্রমিক এবং যে কাজটি সম্পন্ন করা হয় তা উৎপাদন। পুঁজি, শ্রম ও এদের সংগঠনের মাধ্যমে মালিক যা আহরণ করে তা হলো উৎপন্ন দ্রব্য। সাধারণত পুঁজিহীন মানুষ, যারা তাদের পুঁজি বিনিয়োগের উপায় না থাকায় নিজেদের গতর খেটে পেট চালান, তাদের শ্রমিক ও তাদের কাজটিকে শ্রম বলা হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে হালাল কাজে ও হালাল পথে শ্রম বিনিয়োগ কিছুমাত্রও লজ্জার ব্যাপার নয়, বরং এ হচ্ছে নবী-রাসূলগণের সুন্নাত।
মালিকের গুণাবলি : শ্রমিককে সুন্দরভাবে পরিচালনার জন্য মালিকের বিশেষ কিছু গুণাবলি থাকা প্রয়োজন। যেমন :
সময় ও মজুরি নির্ধারণপূর্বক লোক নিয়োগ : পারস্পরিক সুসম্পর্ক বজায় রাখার েেত্র মালিকের প্রথম এবং প্রধান কর্তব্য হলো সময় ও মজুরি নির্ধারণ করে শ্রমিককে কাজে নিয়োগ করা। নতুবা শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দেবে এবং উৎপাদন ব্যাহত হবে। হাদিসে এসেছে, ‘মহানবী সা: শ্রমিকের মজুরি নির্ধারণ না করে তাকে কাজে নিয়োগ করতে নিষেধ করেছেন (বায়হাকি)।’
কাজের ধরন ও পরিধি নির্ধারণ : মালিক শ্রমিককে দিয়ে কী ধরনের কাজ করাবে, কী পরিমাণ কাজ করাবে তা আগেই নির্ধারণ করে নেয়া উচিত। কারণ কোনো শ্রমিককে এক কাজের জন্য নিয়োগ করে অন্য কাজ করানো জায়েজ নয় (আল-হিদায়া)।
শ্রমিকের পারিশ্রমিক নিয়ে তালবাহানা না করা : শ্রমিকের পারিশ্রমিক নিয়ে তালবাহানা না করা মালিকের অন্যতম দায়িত্ব। মহানবী সা: বলেছেন, ‘শ্রমিকের পারিশ্রমিক ও ঋণ পরিশোধ নিয়ে তালবাহানা করা জুলুম (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)।’
শ্রমিকের মৌলিক অধিকারের জোগান দান : শিা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থান ইত্যাদি সবার মৌলিক অধিকার। শ্রমিকদের এ অধিকারের নিশ্চয়তা বিধানের দায়িত্ব তাদের নিয়োগকর্তার ওপর বর্তায়। মহনবী সা: বলেছেন, ‘অধীনস্থদের খোরপোষ দিতে হবে (সহিহ মুসলিম)।’
শ্রমিকের গুণাবলি : শ্রমিকের এমন কিছু গুণাবলি থাকা প্রয়োজন যা শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক অটুট রাখার েেত্র সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। ইসলাম মালিকদের ওপর অনেক দায়িত্ব যেমন অর্পণ করেছে তদ্রƒপ শ্রমিকের ওপরও আরোপ করেছে কিছু আবশ্যক ন্যায়নীতি। যেমন :
আমানতদারিতা : শ্রমিকের ওপর অর্পিত দায়িত্ব অবশ্যই আমানতদারিতার সাথে সম্পন্ন করতে হবে। অন্যথায় তাকে মহান আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘সর্বোত্তম শ্রমিক সেই ব্যক্তি যে শক্তিশালী ও আমানতদার (দায়িত্বশীল) হয় (সূরা কাসাস : ২৬)।’
সংশ্লিষ্ট কাজের দতা ও যোগ্যতা : দায়িত্বপ্রাপ্ত কাজের জ্ঞান, যোগ্যতা ও দতা তার থাকতে হবে। শারীরিক ও জ্ঞানগত উভয় দিক থেকেই তাকে কর্মম হতে হবে।
কাজে গাফিলতি না করা : ইসলাম কাজে গাফিলতিকে কোনোমতেই সমর্থন করে না। আল্লাহ বলেন, ‘দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়, যারা লোকের কাছ থেকে মেপে নেয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে আর যখন তাদের জন্য মেপে অথবা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয় (সূরা মোতাফফিফিন : ১-৩)।’ আয়াতের অর্থ হলো, নিজে নেয়ার সময় কড়ায়গণ্ডায় আদায় করে নেয়। কিন্তু অন্যকে মেপে দিতে গেলে কম দেয়। ফকিহগণের মতে, এখানে তাওফিফ বা মাপে কম-বেশি করার অর্থ হলো, পারিশ্রমিক পুরোপুরি আদায় করে নিয়েও কাজে গাফিলতি করা। অর্থাৎ আয়াতে ওই সব শ্রমিকও শামিল যারা মজুরি নিতে কমতি না করলেও কাজে গাফিলতি করে; কাজে ফাঁকি দিয়ে ওই সময় অন্য কাজে লিপ্ত হয় বা সময়টা অলস কাটিয়ে দেয়। তাদের কঠোর শাস্তির হুমকি দেয়া হয়েছে।
নিজের কাজ হিসেবে করা : কাজে নিয়োগ পাওয়ার পর শ্রমিক কাজকে নিজের মনে করে সম্পন্ন করবে। অর্থাৎ পূর্ণ দায়িত্বশীলতার সাথে, স্বতঃস্ফূর্ততার সাথে কাজটি সম্পাদন করে দেয়া তার দায়িত্ব হয়ে যায়।
আখিরাতের সফলতার জন্য কাজ করা : একজন শ্রমিক তার শ্রমের মাধ্যমে যে অর্থ উপার্জন করবে তা যেন হালাল হয় এবং এর বিনিময়ে পরকালীন সফলতা লাভে ধন্য হয় তার প্রতি ল রাখবে। সেবার মানসিকতা নিয়ে পরম আগ্রহ ও আনন্দের সাথে কাজটি সম্পন্ন করাই হবে শ্রমিকের নৈতিক দায়িত্ব।
ইসলামের দৃষ্টিতে মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক : শ্রমিক ও মালিকের (নিয়োগকর্তা) মধ্যে কী ধরনের সম্পর্ক হওয়া উচিত ইসলামে এর সঠিক দিকনির্দেশনা রয়েছে। ইসলাম তাদের মধ্যে পারস্পরিক সহানুভূতির ভিত্তিতে এক সৌভ্রাতৃত্বমূলক সম্পর্ক কায়েম করে। ইসলাম তাদের মাঝে এমন কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, যাতে তাদের মধ্যকার সম্পর্ক রু, কঠিন ও অমানবিক না হয়ে তা হয় মানবিক, ভ্রাতৃত্বমূলক ও সম্প্রীতির। মহানবী সা: বলেন, ‘তারা (অধীনস্থ ব্যক্তিরা) তোমাদের ভাই। মহান আল্লাহ তাদের তোমাদের অধীনস্থ করেছেন। মহান আল্লাহ কারো ভাইকে তার অধীনস্থ করে দিলে সে যা খাবে তাকে তা থেকে খাওয়াবে এবং সে যা পরিধান করবে তাকে তা থেকে পরিধান করতে দেবে। আর যে কাজ তার জন্য কষ্টকর ও সাধ্যাতীত তা করার জন্য তাকে বাধ্য করবে না। আর সেই কাজ যদি তাকে দিয়েই সম্পন্ন করতে হয়, তবে সে তাকে অবশ্যই সাহায্য করবে (সহিহ বুখারি)।’
বৈরী মনোভাবই শ্রমিক ও মালিকের চলমান সমস্যা : বর্তমানে যা দেখা যাচ্ছে তা হলো, মালিক শ্রেণী ও শ্রমজীবী শ্রেণীর মধ্যে এক সঙ্কটাপন্ন অবস্থা বিরাজ করছে। যার অশুভ প্রভাব সাধারণ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়ে বড় বড় কলকারখানাগুলোকেও গ্রাস করছে। তাই কর্মনির্জীবতা এখন সব প্রতিষ্ঠানেরই প্রধান অভিযোগ। এর কারণ হলো মালিক বা নিয়োগকর্তা চায় শ্রমিক থেকে বেশি কাজ আদায় করতে এবং অধিক হারে মুনাফা হাতিয়ে নিতে। আবার একজন সাধারণ শ্রমিক স্বাভাবিকভাবে চায় স্বল্প পরিশ্রমে নামমাত্র শ্রম ব্যয় করে বেশি পারিশ্রমিক আদায় করে নিতে। এতে প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বাড়–ক বা কমুক সেটা তাদের দেখার বিষয় নয়। আর এর একমাত্র কারণ হলো, শ্রমিক শ্রেণীর সাথে মালিক শ্রেণীর অসম আচরণ, অকল্যাণমূলক পারিশ্রমিক নির্ধারণ এবং নিরন্তর তাদের ওপর একচেটিয়া জুলুমের রোলার চালিয়ে যাওয়া। এই বৈষম্য আজ শ্রমিক বা শ্রমজীবী মানুষকে বেপরোয়া ও অনৈতিক করে তুলেছে। সুতরাং মহানবী সা:-এর শ্রমশিায় মালিক ও শ্রমিকের জন্য সমন্বয় সাধনকারী এক পথনির্দেশনা রয়েছে। যাতে উভয় শ্রেণীরই উদ্ভূত সমস্যার সমধান বিদ্যমান।
শ্রমিকদের অধিকার ও সরকার : ইসলামের দৃষ্টিতে সরকার মালিক শ্রমিকসহ সব ধরনের মানুষের অভিভাবক। সব স্তরের মানুষের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। শ্রমিকদের বেলায় তাদের যথাযথ স্বার্থরার ব্যাপারে সরকারি হস্তপে অধিকতর উপযোগী ও সবিশেষ কাম্য।
বস্তুত ইসলামি সমাজে শ্রমিক, মালিক, সরকারÑ প্রত্যেকেই পবিত্রতম মহান সত্তা আল্লাহর কাছে দায়ী। এ অনুভূতিই সর্বস্তরের মানুষের যাবতীয় কার্যাবলি নিয়ন্ত্রণের এক শক্তিশালী নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। এ জন্য নিন্মোক্ত হাদিস দুটো বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। মহানবী সা:-এর ঘোষণা : ‘যারা অন্যের প্রতি দয়া করে রহমান-অতি অতি দয়াবান প্রভু তাদের প্রতিও দয়া করেন (আবূ দাউদ ও তিরমিজি)।’
‘সৃষ্টিকুল আল্লাহর পরিবারভুক্ত। আর আল্লাহর কাছে সেই অধিকতর প্রিয়, যে আল্লাহর পরিবারভুক্তদের প্রতি অনুগ্রহশীল (মিশকাত)।’
উপসংহার : মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা: শ্রমজীবী মানুষ ও খেটে খাওয়া অসহায় ুধার্ত শ্রেণীর প্রতি কেমন সযতœ দৃষ্টি রাখতেন, তা আমরা উল্লিখিত আলোচনা দিয়ে অনুমান করতে পারি। তিনি মালিক ও শ্রমিককে পরস্পর ভাই ভাই হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি যখন এই পার্থিব জীবনের সব সম্পর্ক ঘুচিয়ে মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে যাত্রা করছিলেন, সেই অন্তিম মুহূর্তে তাঁর পবিত্র মুখে যে শেষ শব্দটি ধ্বনিত হয়েছিল, সেটাও ছিল এই শ্রমিক শ্রেণীর প্রতি তাঁর সযতœ দৃষ্টি ও সহমর্মিতার সৌহার্দ্যপূর্ণ আশ্বাস। তিনি তখন বলেছিলেন, তোমরা সব সময় তোমাদের নামাজ ও তোমাদের অধীনদের প্রতি সহমর্মিতা ও দায়িত্বপূর্ণ দৃষ্টি রাখবে (আল আদাবুল মুফরাদ)।’’
লেখক : গবেষক

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫