ঢাকা, রবিবার,২৮ মে ২০১৭

ইসলামী দিগন্ত

শিশুস্বার্থ রায় রাসূলুল্লাহ সা:

মুফতি মুহাম্মাদ রাশিদুল হক

২৮ এপ্রিল ২০১৭,শুক্রবার, ০০:০০


প্রিন্ট

জুলুম-নির্যাতন মানবসভ্যতার আদিম বিষফোঁড়া হলেও প্রাক-ইসলাম যুগে এর প্রাদুর্ভাব ছিল নজিরবিহীন। হেন অত্যাচার নেই যে, সে যুগে হয়নি। সাধারণত দুর্বল মানুষ সবলের হাতে নির্যাতিত হয়। কিন্তু প্রতিরোধের কোনো মতা বা এর বোধশক্তিই যার নেই, সেই নবজাতক শিশুর ওপরও তখন নির্যাতনের খড়গ নেমে এসেছিল। আর সেই খড়গধারী মৃত্যুদূত অন্য কেউ ছিল না, স্বয়ং পিতাই নিজ ঔরসজাত শিশুকে হত্যা করত। দারিদ্র্যের শঙ্কা বা সমাজের চাপের মুখে পিতা নিজ কন্যাশিশুকে সাজিয়ে-গুছিয়ে নিয়ে যেত মরুপ্রান্তরে। গর্ত খুঁড়ে বলত, ‘দেখ তো মা গর্তটা কেমন হলো’। শিশু সে দিকে ঝুঁঁকতেই ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে মাটি দেয়া শুরু করত। শিশুকন্যার আকুতি বা চোখের পানি পাষাণ বাবার হৃদয়ে এতটুকু মমতার উদ্রেক ঘটাতে পারত না। তাই কন্যাকে বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার কথা বললে মায়েদের কলিজার পানি একেবারে শুকিয়ে যেত।
রাসূলুল্লাহ সা: ঘুণে ধরা ফোকলা একটি জাতির আমূল সংশোধন করে সেটিকে পৃথিবীর একটি আদর্শ জাতিতে উন্নীত করতে সম হয়েছেন। একটি বর্বর সমাজের প্রতিটি ব্যাধি চিহ্নিত করে সেগুলোর মূলে প্রতিষেধক প্রয়োগ করে ধীরে ধীরে সমাজের অবয় ও নীতিনৈতিকতার ধস রোধ করেছেন। শিশু-নির্যাতনের বেলায়ও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। জাহিলি যুগে অন্যান্য অপরাধের পাশাপাশি শিশু-নির্যাতনও ব্যাপকতা পেয়েছিল। কেবল কোরাইশ ছাড়া সব গোত্রের প্রায় প্রতিটি পরিবারেই ব্যাধিটি সংক্রমিত হয়েছিল। (আততাহরির ওয়াত তানভির : ৩০/১৪৬) শিশু-নির্যাতন প্রতিরোধ এবং শিশুস্বার্থ রক্ষায় রাসূল সা:-এর আদর্শ বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই, জঘন্য এই অপরাধটি নির্মূল করার ল্েয তিনি আইনানুগ কঠোর শাস্তির ব্যবস্থার সাথে সাথে নানামুখী সামাজিক সচেতনতামূলক পদপে গ্রহণ করেছিলেন।
ইসলামি লয়ে হত্যার সর্বোচ্চ শাস্তি হলোÑ ধারাল অস্ত্র দ্বারা মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু শিশু হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের েেত্র আরো কঠোর শাস্তির নমুনা রয়েছে ইসলামে। রাসূলুল্লাহ সা:-এর জীবদ্দশায় এক ডাকাত একটি কিশোরীর অলঙ্কার ছিনিয়ে নিয়ে তাকে প্রস্তরাঘাতে নৃশংসভাবে খুন করে। তার মৃত্যুদণ্ড কোনো স্বাভাবিকপর্যায়ে দেয়া হয়নি, বরং তাকেও ওই কিশোরীর মতো পাথরে পিষে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। (মুসলিম : ৪৪৫৪)
শিশু নির্যাতন রোধে রাসূলুল্লাহ সা: আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি গড়ে তুলেছিলেন সামাজিক সচেতনতা। এ জন্য গ্রহণ করেছিলেন নানামুখী কার্যকর পদপে। বর্তমান সমাজে বাসার কাজের ছেলে বা মেয়ে নির্যাতিতের ঘটনা অসংখ্য। অথচ ঘরে কাজ করা শিশুসেবকদের েেত্র রাসূলুল্লাহ সা:-এর আদর্শ দেখুন। তিনি এ জাতীয় শিশু নয়, বরং শিশু কৃতদাসকেও সন্তানের মর্যাদায় উন্নীত করে আমাদের জন্য অনুপম আদর্শ স্থাপন করে গেছেন।
হজরত জায়েদ ইবনে হারেসা রা: ছোটবেলায় মায়ের সাথে বেড়াতে গিয়ে অপহৃত হন। দস্যুরা তাকে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেয়। হাত বদল হয়ে তিনি ওঠেন পবিত্র মক্কার উক্কাজ মেলায়। হজরত হাকিম ইবনে হিজাম রা: তাকে নিজ ফুপুু হজরত খাদিজা রা:-এর জন্য খরিদ করে নিয়ে যান। নবীজির সাথে বিয়ের পর আম্মাজান জায়েদ রা:-কে নবীজির খেদমতে নিয়োজিত করেন। পরে হজরত জায়েদ রা:-এর পিতা তার খুঁজে মক্কায় এসে তার সন্ধান পান। তিনি নবীজি সা:-এর কাছে মুক্তিপণের বিনিময়ে নিজ সন্তানকে ফেরত চাইলে তিনি বলেন, ‘ইচ্ছা করলে সে আমার সাথে থাকতে পারে। চাইলে আপনাদের সাথেও যেতে পারে। বিনিময়ে আমাকে কিছুই দিতে হবে না।’ এ কথার পর হজরত জায়েদ রা: নবীজি সা:-এর সাথেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তার বাবা ুব্ধ হলে তিনি জবাবে বলেন, ‘আমি এই মানুষটির কাছ থেকে এমন আচরণ পেয়েছি যে, তাঁকে ভিন্ন অন্য কাউকে নির্বাচন করা আমার পে সম্ভব নয়’। এ কথা শুনে নবীজি সা: বললেন, ‘তোমরা সাী থেকো। জায়েদ আমার পুত্র।’ রাসূলুল্লাহ সা:-এর এই মহানুভবতায় তার বাবা খুশি মনে ফিরে যান। ইসলামের আবির্ভাবের আগ পর্যন্ত মক্কা নগরীর মানুষ হজরত জায়েদ রা:-কে ‘মুহাম্মদ-তনয়’ বলেই ডাকত। (আলইসাবাহ : ৪/৩৭)
অন্য পরিবারের শিশুদের প্রতিও রাসূলুল্লাহ সা:-এর আচরণ ছিল অত্যন্ত কোমল। একজন নবী হিসেবে ধর্মীয় কোনো ব্যাপারে ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ তার সহ্য না হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু ভিন্ন ধর্মের শিশুদের বেলায়ও তিনি তা সহ্য করেছেন এবং সুকৌশলে সংশ্লিষ্ট বালককে সংশোধন করেছেন। একবার কিছু মুশরিক বালক আজান শুনে অনেকটা ব্যঙ্গ করেই শব্দগুলো আওড়াতে লাগল। নবীজি সা: তাদের একজনকে ডেকে এমন আচরণ করলেন যে, সে শুধু ইসলাম গ্রহণই করেনি, বরং সময়ে ‘রাসূলের মুয়াজ্জিন’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছে। (সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৩/১১৭) একবার এক দুস্থ বালিকা গোত্রীর লোকদের হাতে নিগ্রহের শিকার হয়ে নবীজি সা:-এর কাছে এলে তিনি মসজিদে নববির আঙ্গিনায় তার বাসস্থানের ব্যবস্থা করেন। (ফতহুল কারি : ২/২৮১) তিনি আনসার সাহাবি সাাৎকালে তাদের শিশুদের সালাম দিতেন। তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। (মুসলিম : হা. ৪২৯৭)
আদব-শিষ্টাচার শিা দেয়ার ব্যাপারেও রয়েছে রাসূলুল্লাহ সা:-এর অনুপম আদর্শ। গবেষণায় দেখা যায়, শিশুদের আদব-শিষ্টাচার ও শাসনের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সা: ১৮টি ধারা অবলম্বন করেছেন। তাতে শিশুকে প্রহারের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। (তাআমুল আরোসুল মাআ আলআতফাল : ১৮৪) রাসূলুল্লাহ সা: নিজের বা অন্য পরিবারের কোনো শিশুকে জীবনে কোনো দিন প্রহার করেননি। সবাইকে মমতা দিয়েছেন।
এমনকি নামাজের মধ্যেও শিশুরা তাঁর মমতা লাভে ধন্য হয়েছে। পৌত্রী উমামা রা:-কে কাঁধে নিয়ে নামাজ আদায় করেছেন। (বুখারি : ৫৯৯৬) শৈশবে হজরত হাসান রা: তার কাঁধে চড়েছেন। (বুখারি : ৩৭৪৯) তাকে চুমু খেতে দেখে এক ব্যক্তি বলেছিল, আমার ১০টি সন্তান। তাদের কাউকে আমি চুম্বন করিনি। রাসূলুল্লাহ সা:-এর জবাব ছিল, ‘যে মানুষ স্নেহ করে না, সে অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত’। (বুখারি : ৫৯৯৭) রাসূলুল্লাহ সা: দেড় হাজার বছর আগে নিজের অনুপম আদর্শ, কর্মপদ্ধতির আলোকে আগত বিশ্বের জন্য একটি শিশুবান্ধব পৃথিবীর রূপরেখা রেখে গেছেন।
শিশুস্বার্থ রায় সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। চলমান সময়েও বিশেষজ্ঞ মহল বিষয়টি উপলব্ধি করে। এ েেত্র সামাজিক দায়িত্বটাই মূল। প্রথমত দায়িত্ব পরিবারের। তাদের শিশুকে যথাযথভাবে লালন-পালন করতে হবে।
নিজেকে একজন মুসলিম হিসেবে পরিচয় দিতে হলে শিশুদের প্রতি স্নেহসুলভ আচরণ ও তাদের স্বার্থ রা করা আমাদের জন্য অপরিহার্য বৈকি। ছোটকে স্নেহ না করে প্রকৃত মুমিন-মুসলমান দাবি করার অবকাশ নেই। কারণ, প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ সা: ছোটদের স্নেহ না করে প্রকৃত মুসলমান হওয়ার অবকাশ রেখে যাননি। তিনি ইরশাদ করেন: ‘যে ছোটদের স্নেহ করে না, সে আমাদের নয়’। (সুনানে আবু দাউদ : ৪৯৪৩) সর্বোপরি একজন আদর্শ মানুষ হতে হলে এবং আগামী প্রজন্মকে একটি সুন্দর পৃথিবী উপহার দিতে হলে শিশুস্বার্থ রার বিকল্প নেই।
লেখক : ইমাম

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫