ঢাকা, বুধবার,২২ নভেম্বর ২০১৭

আলোচনা

‘ভেঙে আবার গড়তে জানে সে চির সুন্দর’

মোহাম্মদ সফিউল হক

২৭ এপ্রিল ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৬:২৫


প্রিন্ট


বৈশাখ সাহসী, ক্ষ্যাপা, বৈরী, অশান্ত, অসীম, মারমুখো ও নির্দয়। কিন্তু তার সৃজনক্ষমতা শিল্পীর সুনিপুণ সৌকর্যকে হার মানায় প্রেমিকের অন্তর সাধনায় বিশ্বাস ও প্রেমের মাত্রাযোগ ঘটায় এ বৈশাখ। চৈত্রের দাবদাহে জীবন যখন মরুপ্রায়, রোদে পুড়ে কাদামাটি ঠনঠনে, তখনই বৈশাখ আনে ঝড়, সাথে পানির ফোয়ারা, বিজলীর ছোড়া পুঞ্জীভূত শিলা থেকে ঘূর্ণির শঠতা। বৈশাখের অস্তিত্ব আমাদের হৃদয়ে গ্রথিত। সমগ্র অস্তিত্বে বৈশাখ প্রভাব ফেলে। এ প্রভাব থেকে সমাজের কোনো স্তরই বাদ পড়ে না। কবি-সাহিত্যিকরা বৈশাখ বিষয়ে আন্দোলিত হন। তারা গদ্যে ও কাব্যে বৈশাখের প্রতি ভালোবাসা নিবেদন করেন। ধ্বংস-সৃষ্টি, বিরহ-মিলন, সুখ-দুঃখ, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি সব কিছুই উঠে আসে শিল্পীদের বিভিন্ন প্রকার শিল্পের বাঁকে-বাঁকে। সম্রাট আকবরের সময় থেকে খাজনা আদায়ের মাস বৈশাখ থেকে শুরু হলেও বর্তমানে তা পরিবর্তিত হয়ে প্রাণের মেলার উৎসবে পরিণত হয়েছে। কবি-সাহিত্যিকরা প্রাণের মেলার এ উৎসবকে শব্দে ধরে রাখতে বারবার প্রয়াসী হয়েছেন।
কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী বাংলা সাহিত্যের একজন শ্রেষ্ঠ কবি। মানবিকতার প্রকরণে উজ্জ্বল এই কবির ‘কালকেতু উপাখ্যান’ সমাজ ও মানুষের আনন্দ-বেদনার নিটোল ছবি হয়ে আজো বর্তমান। এ কাব্যে কালকেতু ও ফল্লরার দাম্পত্য জীবনের সুখ-দুঃখের বর্ণনা দিয়েছেন চমৎকারভাবে। এ উপাখ্যানটিতে নারী চরিত্র ফুল্লরার বারো মাসের দুঃখ বর্ণনায় বৈশাখ মাসের বিবরণ পাই আমরা। মুকুন্দ লিখছেন ফুল্লরার বৈশাখ মাসের যাতনার কথা ‘পাশেতে বসিয়া রামা কহে দুঃখবাণী।/ভাঙ্গা কুড়্যা ঘরখানি পত্রে ছাওনী॥/ভেরাণ্ডার খাম তার আছে মধ্য ঘরে।/প্রথম বৈশাখ মাসে নিত্য ভাঙ্গে ঝড়্॥/েপুণ্যকম্ম বৈশাখেতে খরতর খরা।/তরুতল নাহি মোর করিতে পসরা॥/পদ পোড়ে খরতর রবির কিরণ।/শিরে দিতে নাহি আঁটে অঙ্গের বসন॥/বৈশাখ হৈল আগো মোর বড় বিষ।/মাংস নাহি খায় সর্ব্ব লোকে নিরামিষ॥’
‘আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে/বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে।’ রবিঠাকুরের এ কবিতাটি আমরা শৈশব-কৈশোরে পথে-ঘাটে, ঘরে-বাইরে মনের অজান্তেই বহুবার আবৃত্তি করেছি। এর মধ্য দিয়ে আমরা পরিচিত ভুবনের চেনা বারান্দায় মনে মনে দাঁড়িয়েছি কতবার, কে জানে! কিন্তু চেতনায় কি সত্যিই বৈশাখ কোনো দাগ ফেলতে পেরেছে? বৈশাখের রুদ্র রূপ কি আমাদের ভাবনার গীতল জায়গাটিকে শীতল রেখেছে সব সময়? কবি রবীন্দ্রনাথ বৈশাখের মধ্যে অদৃশ্য নৃত্য মাতম দেখেছেন। ‘নিঃশব্দ প্রখর’ বৈশাখকে তিনি আলোড়ন এবং হুতাশনের শীর্ণ সন্ন্যাসী ভেবেছেন। কখনো মনে করেছেন জলহীন-নদীতীরে শস্যশূন্য অসীম মাঠে ‘উদাসী প্রবাসী’ এ প্রবল দারুণ বৈশাখ! বৈশাখের আসা-যাওয়ার অন্তরালে তিনি অগ্নি আর বৈরাগ্যের শান্তিপাঠ অনুভব করেছেন। ক্লান্তকণ্ঠ কিংবা ক্ষীণ শ্রান্তস্বর থেকে মন্ত্রের অবাধ-উদার উচ্চারণে কিংবা দুঃখ-সুখ আশা ও নৈরাশ্য বিতাড়নে বৈশাখকে ভেবেছেন প্রেরণা ও অপার শক্তি। এমন সত্য তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন তার ‘বৈশাখ আবাহন’ কবিতায়Ñ ‘এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ/তাপস নিঃশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে/বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক/যাক পুরাতন স্মৃতি যাক ভুলে যাওয়া গীতি/অশ্রু বাষ্প সুদূরে মিলাক/মুছে যাক সব গ্লানি। মুছে যাক জরা/অগ্নিস্নানে দেহে-প্রাণে শুচি হোক ধরা।’
বৈশাখের মতোই রুদ্র, অশান্ত, বিপ্লবী, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। কবি নজরুলকেও বৈশাখের প্রবলতা-প্রচণ্ডতা নাড়া দিয়েছিল। ভেতরে ও বাইরে তিনি যেন বৈশাখের তাণ্ডবের জন্যই প্রতীক্ষা করছিলেন। জীবনের জ্বালা ও যন্ত্রণা দূর করতে কালবৈশাখীকে আহ্বান জানিয়েছেন নজরুল। বৈশাখের প্রবল বাউলা বাতাসে মরা গাঙে বান ডাকার মতো ‘ঘুণ-ধরা বাঁশে ঠেকা-দেওয়া’ পুরনো ভগ্ন ছাদে নতুনের ছোঁয়া লাগবে এটিই কবির প্রত্যাশা। নজরুল ভেবেছিলেন সব বদ্ধতা পেরিয়ে মানুষ প্রাণের দোলায় মেতে উঠবে বৈশাখের ঝড়ের ভেতর দিয়ে, রাতের অন্ধকারকে ঢেকে দেবে দিনের আলো। কাব্যিক ব্যঞ্জনার মাধ্যমে দৃপ্ত কণ্ঠে তিনি উচ্চারণ করেন- ‘ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবৈশাখীর ঝড়/তোরা সব জয়ধ্বনি কর/তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর/প্রলয় নূতন সৃজন বেদন/আসছে নবীন জীবনধারা অসুন্দরে করতে ছেদন/তাই যে এমন কেশে- বেশে/মধুর হেসে/ভেঙে আবার গড়তে জানে সে চির সুন্দর। ’
ফররুখ আহমদের কবিতায় বৈশাখ এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মানসদৃষ্টিতে। ফররুখের চোখে বৈশাখ উদ্দাম জীবনবাদী, জীবন সংগ্রামের নির্ভীক সেনানী, ‘কারুনের সঞ্চিত মৌচাক’, ‘ধ্বংসের নকীব’, ‘মর্দে মুজাহিদ’। বৈশাখ তার কবিতায় দুর্দান্ত গতিমান রূপকে প্রতীকায়িত, আপসহীন, নিরপেক্ষ, স্পষ্টবাদী। বৈশাখ’ কবিতায় তিনি বলেন- ‘সংগ্রামী তোমার সত্তা অদম্য, অনমনীয় বর্জ্য দৃঢ় প্রত্যয় তোমার/তীব্র সংঘর্ষের মুখে বিশাল সৃষ্টিকে ভেঙে অনায়াসে কর একাকার/সম্পূর্ণ আপোসহীন, মধ্যপথে কোন দিন থামেনাতো জানে না বিরতি/তোমার অস্তিত্ব আনে ক্ষণস্থায়ী এ জীবনে অবিচ্ছিন্ন অব্যাহত গতি/প্রচণ্ড সে গতিবেগ ভাঙে বস্তি, বালাখানা, ভেঙে পড়ে জামশিদের জাক/লাভ-ক্ষতি সংজ্ঞাহীন, নিঃশঙ্ক, নিঃসঙ্গ তুমি/হে দুর্বার, দুর্জয় বৈশাখ।’
পল্লী কবি জসীম উদদীন প্রাণের কবি, মানুষের হৃদয়ের কবি। অন্তরের সূক্ষ্মতম অনুভূতি প্রকাশে তিনি নিবিড়ভাবে পারদর্শী। বৈশাখকে তিনি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। একধরনের ভালোবাসার কোমলতা দিয়ে তিনি নির্মাণ করেছেন বৈশাখকে। ‘বোশেখ শেষের মাঠ’ কবিতায় বলেছেন- ‘বোশেখ শেষে বালুচরের বোরো ধানের ধান/সোনায় সোনা মিলিয়ে দিয়ে নিয়েছে কেড়ে প্রাণ/বসন্ত সে বিদায় বেলায় বুকের আঁচল খানি/গেঁয়ো নদীর দু’পাশ দিয়ে রাখায় গেছে টানি/চৈত্র দিনের বিধবা চরের সাদা থানের পরে/নতুন বরষ ছড়িয়ে দিলো সবুজ থরে থরে/ না জানি কোন গেঁয়ো তাঁতি গাঙ চালিবার ছলে/জল ছোঁয়া তার শাড়ির কোণে পাড় বুনে যায় চলে/মধ্য চরে আউশ ধানের সবুজ পারাবার/নদীর ধারে বোরো ধানের দোলে সোনার পাড়/দিনের বেরাগিনী সবুজ আঁচল সনে/মুখ খানিরে আবছা ঢেকে সাজল বিয়ের কনে।’
কবি গোলাম মোস্তফা নববর্ষের আগমনকে আশীর্বাদ হিসেবে দেখেছেন। তিনি বৈশাখকে তেজোদীপ্ত টগবগে ঘোড়ার দৌড়ানোর সাথে তুলনা করেছেন। নববর্ষ সব হতাশাকে মুছে ফেলে নিয়ে আসে প্রাণের জোয়ার। ‘নববর্ষের আশীর্বাদ’ কবিতায় তিনি বলেছেনÑ ‘ওই এলোরে ওই এলো/নতুন বর্ষ ওই এলো/তরুণ তপন ওঠলোরে/ধ্বস্ত তিমির ছুটলোরে/নওরোজের এই উৎসবে/ওঠ জেগে আজ ওঠ সবে/সুপ্তি ভাঙো চোখ খোলো/দুঃখ হতাশ শোক ভোলো/চাও কেন আর পশ্চাতে/চাইলে হবে পসতাতে/হও আজিকে অগ্রসর/নূতন আশা ব্যগ্রতর...।’
কবি আহসান হাবীব বৈশাখকে কল্যাণময় হিসেবে দেখেছেন। সে শুভ সংবাদের বার্তা বাহক। যার আগমন সাড়া জাগায় প্রকৃতি প্রাণে। ‘হে বৈশাখ’ কবিতায় তিনি বলেছেন- ‘মৃগনাভি-দুলনায় নিজেকেই নিজে মুগ্ধ করে রেখেছ/ঊষার লালিত্যে/আর মধ্য দিনের আগমনে তুমি অকৃত্রিম/তোমাকে আমি কী দিতে পারি/কী দেব বলো হে বৈশাখ।’
কবি আল মাহমুদের প্রার্থনা- বৈশাখ ধ্বংস করুক ‘বিভেদকারী পরগাছাদের’। যারা পরের শ্রমে দালান গড়ছে, বোশেখের তাবত তাণ্ডব তাদের বাড়তি অহেতুক বাহাদুরি গুঁড়িয়ে ফেলুক। পুরনোকে পেছনে ফেলে নতুনের আহ্বান যদি বৈশাখের প্রেরণা হয়ে থাকে, তবে সব অপরাধীর শাস্তি হোক! সব শোষক তলিয়ে যাক বোশেখের বাউলা বাতাসের বন্যায়! কবির ‘বোশেখ’ কবিতা থেকে খানিকটা পাঠ নিতে পারি- ‘যে বাতাসে বুনোহাঁসের ঝাঁক ভেঙে যায়/জেটের পাখা দুমড়ে শেষে আছাড় মারে/নদীর পানি শূন্যে তুলে দেয় ছড়িয়ে/নুইয়ে দেয় টেলিগ্রাফের থামগুলোকে।/সেই পবনের কাছে আমার এই মিনতি/তিষ্ঠ হাওয়া, তিষ্ঠ মহাপ্রতাপশালী,/গরিব মাঝির পালের দড়ি ছিঁড়ে কী লাভ?/কী সুখ বলো গুঁড়িয়ে দিয়ে চাষির ভিটে?/বেগুন পাতার বাসা ছিঁড়ে টুনটুনিদের/উল্টে ফেলে দুঃখী মায়ের ভাতের হাঁড়ি/হে দেবতা, বলো তোমার কী আনন্দ,/কী মজা পাও বাবুই পাখির ঘর উড়িয়ে?’
নিজেকে নতুন করে অদম্য ভঙ্গিতে দেখার প্রয়াস পেয়েছেন কবি সৈয়দ শামসুল হক তার ‘বৈশাখ’ কবিতায়। নতুন পৃথিবী, নতুন নীলিমা, নতুন চোখ উন্মোচিত হয়েছে কবির বোধে। কবি সচকিত হয়েছেন, নিজেকে চিনতে পেরে আনন্দিত হয়েছেন। তিনি লিখেছেন- ‘আমি কে?/আমি পারিনে চিনতে আজ/কি অবাক কি অবাক/পুরোনো আমাকে নতুন নতুনে/সাজিয়েছে বৈশাখ/দু’চোখ আমার নতুন নীলিমা/নতুন পৃথিবী ডাকে/দেখি বারবার উৎসব দিনে/বাংলায় বাংলাকে।’
বৈশাখ বাঙালির প্রাণকে বিকশিত করার মাস। নতুন কল্পনা, চিন্তা ও পরিকল্পনা উন্মোচনের সময় এটি। প্রবল ভাবাবেগ আর উচ্ছ্বাসের ভেতর দিয়ে ঘটে মানুষের প্রাণের বিকাশ। এটি স্ফুরণ ও স্ফীতির মাস। বাংলাদেশ কবিতার দেশ। বাঙালির প্রাণে তাই বৈশাখের উচ্ছ্বাস আর কবিতার আনন্দ থাকে মিলেমিশে। বৈশাখে মেলায় মেলায় প্রাণের উচ্ছ্বাসে যেমন আনন্দিত হতে দেখা যায় বিপুল লোককে, তেমনই কবিতার আনন্দেও ভাসে কারো কারো মন। বৈশাখ আমাদের সমাজের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। এটি আমাদের সংস্কৃতির বড় উপাদান। সাহিত্যে, শিল্পে রয়েছে বৈশাখের অনন্ত ঐতিহ্য।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫