ঢাকা, বুধবার,২৬ জুলাই ২০১৭

গল্প

কেঁদেছিলাম একবার

শাওন আসগর

২৭ এপ্রিল ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৬:১২


প্রিন্ট

একদিন আমি দুটো মোবাইল ফোন ব্যবহার করি। একটি পারসোনাল অন্যটি করপোরেট। আমার করপোরেট মোবাইলে একটি মেসেজ ভেসে ওঠে। শোকবার্তা : ‘মি. আশিকুল কাদিরের পিতা মুনশি আলী আসগর আজ সকাল ১০.৪৫ মিনিটে ইন্তেকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না... রাজিউন।’ আমরা শোকসন্তপ্ত পরিবারের জন্য আন্তরিক সমবেদনা জানাচ্ছি এবং আল্লাহর দরবারে বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। অবশ্য এই মেসেজটি প্রচারের আগেই আমরা পেয়ে যাই-মৃত্যুর এক অমোঘ শোকাবহ সংবাদ।
পরিবারের অন্যদের জড়ো করতে আমি পারসোনাল মোবাইলে যথেষ্ট চেষ্টা চালিয়ে গেছি।
কারণ মৃত ব্যক্তি আমার বাবা। করপোরেট মোবাইলের সংবাদটি চার দিকে ছড়িয়ে পড়ায় এই কষ্টের দিনেও আমাকে অনেক কল রিসিভ করতে হয়েছে। এ-ও-সে-তিনি অনেকেই সমবেদনা জানাচ্ছেন এবং এই বিরহে যেনো ভেঙে না পড়ি সে জন্য অনেক সাহস ও ধৈর্যের কথা বলে যাচ্ছেন। তাদের কথা ও সমবেদনায় সময় যাচ্ছে অথচ একবারের জন্যও আমার চোখে এক ফোঁটা অশ্রু আসেনি। তার পরও করপোরেট কালচারের প্রতি আমার শ্রদ্ধা।
দাউদকান্দি ব্রিজ পার হওয়ার আগেই বহনকারী লাইটেস মাইক্রো বাসটির চাকা ফেটে যায়। অথচ এই চার লেনের নতুন মসৃণ পথে এমনটি হওয়ার কথা নয়। চালক খুবই বিরক্ত। উষ্মা প্রকাশ করে সে গাড়িটিকে অনেকটা রিস্ক নিয়ে টেনে হিঁচড়ে ব্রিজ পার করে। ব্রিজের ওপরে উঠতে গিয়ে জীবনের যে কষ্টকর শ্রম ও ত্যাগ তা যেন খতিয়ে দেখছি নতুন করে। ওপারে যেতে যেতে চাকাটির আয়ু বাবার মতোই একেবারে শেষ।
শীতের আড়ষ্টতা কেটে গেছে ক’দিন হলো। এবার শহরে শীত পড়েনি বললেই হয়।
আমার সঙ্গী সাথীরা গরমে ঘেমে উঠেছে। তার ওপর আবার চাকা পাংচার। দাউদকান্দি ব্রিজ পার হলে চাকা পরিবর্তনের জন্য নতুন করে বিড়ম্বনায় পড়তে হলো। সবাই নেমে পড়ি গাড়ি থেকে। এরই মধ্যে ধুলোর মরুভূমিতে নেয়ে গেলাম। দূরপাল্লার গাড়ি শরীর ঘেঁষে যাচ্ছে আর ধুলোর প্রলেপ দিয়ে গা ভাসাচ্ছে সবার।
বাবা চলে গেলেন বিরাশি বছর বয়সে। মেঝো জেঠাও একই বয়সে গেছেন। বড়ো জেঠা পঁচাশি বছর। সে দিকে আর না-ই বা গেলাম। অনেক চেষ্টা-তদবির করে আবার রওনা হলাম। বাড়ি যাচ্ছি বাবার লাশের কাছে। চির ঘুমের বন্ধ চোখের পাতার কাছে। যাচ্ছি বাবার শিয়রের কাছে, খাটের কাছে, কাফনের কাছে, শাদা ধবধবে কাপড়ের কাছে।
গাড়ি চলছে। পথের বাঁকে বাঁকে গাড়ি মোড় নিতেই আমি বাবাকে দেখি। কারণ এ পথে বাবার সাথে কতবার এসেছি, ফিরেও গেছি। বড় সন্তান বলে আমার আদর কদর ছিল ভিন্ন। সারাদিন বাবা বাবা মনে করে কোনো কষ্ট অনুভব করিনি অথচ কোথা থেকে এক দমকা হাওয়া এসে বিষাদের ছায়া আমার চোখে মুখে গায়ে জড়িয়ে দিয়ে যায়। কিছুক্ষণ আগেও আমি স্বাভাবিক ছিলাম অন্যদের সাথে আলাপনে কথায়। এখন আর ভালো লাগছে না। এখন মনে হচ্ছে আমার পথ যেন অনেক দীর্ঘ-অনেক যন্ত্রণার।
ইলিয়টগঞ্জের পথে গাড়ি ঘুরিয়ে দিলাম যেন ময়নামতির জ্যামে না পড়ি। এ সিদ্ধান্তটি ভালো হয়েছে বলে সবাই আমাকে আশ্বস্ত করে। আমি কী তা হলে বিপদেও ঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি বা মাথা ঠাণ্ডা রেখে কাজ করতে পারি? নিজেই নিজের সাথে কথা বলি। পাশের জমিগুলো সবুজ রঙের বিছানা হয়ে স্যাৎ স্যাৎ করে পেছনে যায়। নতুন পিচঢালা পথের বাঁকে বাঁকে গাড়ির গতি স্লো হতেই মনে হয় পেছনে সটকে পড়ে অলস কোনো অজগর। পথের প্রাণী বয়স্ক ছাল ওঠা কুকুর, ছাগল বা কারো গৃহপালিত গরুর পাল আমাদের গতি রুখতে পারে না। কেবল একটি জলাশয় চরম ধৃষ্টতায় সূর্যের লাল আলো আটকে রেখেছে কিছু সময়। আর সব পালায় পালায় বাবার মতোই সবাই পালায়। পথ ছেড়ে কাজ ছেড়ে দায়িত্ব ছেড়ে পালায় কোনো অন্য ঠিকানায়।
বাবা না বলেই হঠাৎ চলে গেলেন। আমি গেল সপ্তাহেও তাকে দেখতে গেলাম। তার মাথা হাতের আঙুল ধরে ধরে আদরের সাথে কথা বললাম। কিন্তু সে আমার দিকে দেখেও দেখল না। কথাও বলল না। সে কী তবে ধরেই নিয়েছিল যে আমি তাকে ক্ষমা করিনি। সে কি তবে বুঝতে পেরেছিল তার জন্য আমার যত আবেগ-টান সব ছিল ঠুনকো। সব কিছুর ভেতর কৃত্রিমতার আবরণ দিয়ে আমি কেবলি সময় ক্ষেপণ করছিলাম!
বাবা না বলে চলে যাওয়ায় আমি কষ্ট পাচ্ছি না। একদম পাচ্ছি না।
কারণ কয়েক যুগ আমি তার সাথে কোটি কোটি কথা বিনিময় করেছি কেবল চোখের ভাষায়। তিনি জানতেন-পড়তেন আমার ওই ভাষা। আমার চোখে ক্ষোভ ঘৃণার অগ্নি তাকে দহন করত। তাকে জ্বালাত, কষ্ট দিত। কিন্তু মুখ ফুটে প্রতিবাদ করার সাহস তার ছিল না।
অত যে বয়স হলো তার, অত বয়স হলো আমার তবু দু’জনের ভেতর ছিল বিরাট ব্যবধান।
অথচ বাড়ির লাউ-পুঁই-ধনেপাতা-লেবু-বরই-আম-জাম-কাঁঠাল-কলা নিজে না খেয়ে বাবা আমার এ শহরের বাসায় পাঠাতেন আগে। জমির আলে চাল, পুকুরের মাছ, নারকেলÑ আমাকেই আগে দিতেন আর অন্য ভাইবোনদের বাসায় যেত পরে।
বাবা জানতেন তিনি চলে যাবেন। জানতেন তার সময় শেষ, জানতেন এই সংসারে সে এখন অপাঙ্ক্তেয়। এখানে তার মূল্য কমে যাচ্ছে। ছেলের বউরা বা মেয়ের জামাইরা তাকে আর আগের মতো বিবেচনা করে না। তার সিদ্ধান্তের প্রতি সবার শ্রদ্ধাবোধ নষ্ট হচ্ছে বলেই তিনি হয়তো শেষ সময়ে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছেন। কথা তিনি বলতেন মিন মিন করে বাইরে। উঠানের দিকে তাকিয়ে অন্য কারো সাথে।
অন্য কোনো মানুষ কি তার কাছে ছিল? আমরা দেখিনি কিন্তু তাহলে কার সাথে কথা বলতেন।
কেউ না জানলেও আমি জানতাম। আমি জানতাম বলেই সকালে তার মৃত্যু সংবাদ শুনে বাড়ির সবাইকে বলেছি- ঝাড় থেকে বাঁশ কেটে রেড়ি করো। কবর খুঁড়ো গোসল করাও। তোমরা তৈরি থাকো। আজ মাগরিবের আগেই তাকে কবরে শোয়ানো হবে।
হয়তো কেউ কেউ ভাবতে পারে অত তাড়াহুড়োর কী আছে। গাঁও-গেরামের আত্মীয়রা আসবে। সময় নিয়ে আস্তে ধীরে কাজ করলেই ভালো। কিন্তু আমি তা চাইনি। আর আমি সবার বড় বলে এ সিদ্ধান্তের বাইরে কেউ যায়নি।
বাড়ির কিছু স্থান দখল করে নতুন সড়ক হয়েছে বলে যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক ভালো হয়েছে। এর জন্য অনেক বছর অপেক্ষার করলাম আমরা। তবু কাঠখড় অনেক পুড়িয়ে শেষমেশ হলো তো। বাড়ি পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যা গড়িয়ে গেল। কথামতো মাগরিবের পর নামাজে জানাজা হলো না। দুটো মসজিদেই ঘোষণা এলো বাদ এশা বাবার নামাজে জানাজা হবে।
গাড়ি থেকে নেমে সোজা উঠানের দিকে আমাদের চোখ গেল। বড় উঠানজুড়ে লোকজন। মেয়ে, পুরুষ, ছেলে, বুড়োদের ভিড় ঠেলে পৌঁছলাম বাবার লাশের কাছে। বাবার মুখ ঢাকা। সাদা কাফনে মোড়ানো আমাদের বাবা। বাবা আমাকে না বলেই চলে গেছেন। এই না বলার কারণ কেউ জানে না আমি ছাড়া।
আমি যাচ্ছি বাবার শিয়রের দিকে। বাড়ির নারকেল গাছের পাতার নীরবতা টের পাই। পুকুরের জলের নীরবতা নেমে আসে আমার শরীরে। সব লোকই আমাকে দেখে একদম শব্দহীন হয়ে গেছে। শুধু অদূরের কোনো ঘর থেকে একটু মিহি কান্নার শব্দ আসছে, হয়তো সারা দিন কেঁদে কেঁদে এখন ক্লান্ত, গলা ধরে এসেছে কারো। আমি বাবার শিয়রের কাছে দাঁড়াই। একমুহূর্ত দু’মুহূর্ত এক মিনিট দুই মিনিট এভাবেই।
ধীরে ধীরে বাবার শিয়রে হাঁটু গেড়ে তার মুখের কাপড়টুকু সরাই। দেখি তাকে নয়ন ভরে, দেখি কয়েক মিনিট; কয়েক বছর, কয়েক যুগ তাকে দেখি। আমার বয়স যত তত বছর ধরে তাকে দেখি। ছাপ্পান্ন বছর ধরে। আমি তাকে বলতে চাইÑ বাবা কিছু বলো। কিছু বলে যাও সবার সামনে। আমারও বলার ছিল। বাবা চোখ খোল, প্লিজ বাবা কিছু বলো।
বাবা কথা বলেন না। গত সপ্তাহে ও বলেননি। গত মাসে না। গত বছর ও না। গত চল্লিশ বছরেও সে কথাটি বলেনি, যা আমি শুনতে চেয়েছিলাম। বাবা লজ্জায় অপমানে চোখ বন্ধ করে আছেন। আমি বলি- বাবা আজ তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম। কথা বলো প্লিজ। বাবার মুখে, মাথায়, দাড়িতে হাত বুলাই- বাবা বলো, কিছু বলো।
কাঁদি আমি। আশ্চর্য, সারাদিন এক ফোঁটা জল আমার চোখে আসেনি। এখন ছলছল পানির ঝরনা বইছে এই চোখে। আমি ঠোঁট চেপে, মুখ চেপে কাঁদি। সাথে অন্যরাও কাঁদে। বাবার জন্মস্থান কোরবানপুরের কাঁচা সড়ক, ওখানের পুকুর গোপাট গাছ-গাছালি পক্ষী সব যেন আমার সাথে কান্না জুড়ে দেয়। আমার পিতামহ মুনশি ফয়েজ আহমেদ তার আবেগের সব উজাড় করে আমার ভেতর চালান করে দেন- আমি কাঁদি। স্বাধীনতা যুদ্ধে বাবার আহত হওয়া শরীরের বাঁকে বাঁকে এখন কান্নার উপকরণ ভেসে ওঠে। দুলু কাকা, মুজিবর কাকা, তাহের মামা, খায়ের মামা- সবার মুখ মনে করি আমি। কাঁদি। সেই ছোটবেলায় বাবার কাঁধে চড়ে দৌলতপুরের খালটি পার হয়েছিলাম সেই খালের সবটুকু জল আজ আমার চোখের গাংয়ে ঢেউ তুলে। আমি কান্নায় ভেঙে পড়ি। মুরাদনগরের পরিচিতজনদের কান্নার সব পানি আমার চোখে জমা হয়। দৌলতপুরের মানুষ কাঁদে। বাড়ির উঠানজুড়ে কান্নার রোল। ঘরের আসবাব টিওবঅয়েল বেড়ার ফাঁকফোকরে কান্নার চিহ্ন। ওই দূরে ঘনীভূত সন্ধ্যাতারার বিষণœতায় চাঁদের বিরহ আলোয় বাবার মুখোচ্ছবি। আমি কাঁদি কাঁদি। কেঁদে কেঁদে বাবাকে জড়িযে ধরি বুকে নেই।
তাকে কাঁধে নেই। কবরে নেই- শোয়াই অন্ধকার গহবরে। নীরবে নিভৃতে শুয়ে থাকেন আমাদের বাবা। শরীরের ওপর মাটি ছিটিয়ে দেই। বাবা আজ শরীরের পুরনো পোশাক বিছানা টুপি সেন্ডেল তসবিহ জায়নামাজ রেখে শুয়ে আছেন। সবাই ফিরে আসি বিমর্ষতার হালকা কুয়াশার চাদর জড়িয়ে। গাঁয়ের এই বৃক্ষতরুলতা কুয়াশার আবরণে বাবা একা। রাতের চাঁদ ম্লান আলো ছড়িয়ে দেয় কবরের গাছপালায়।
কবর থেকে বাড়ি ফেরার পথে আমার পারসোনাল মোবাইলে আরেকটি মেসেজ দেখি। লন্ডন থেকে মা পাঠিয়েছেন : ক্ষমা করে দিয়েছি তোর বাবাকে। তুইও ক্ষমা করে দে। নিজে কবরে নেমে তাকে স্পর্শ করিস। রাগ করিস না, আমি চল্লিশ বছর অপেক্ষায় ছিলাম কবে তার মৃত্যু হবে। আজ দুপুরে খবর পেয়েই ক্ষমা করে দিয়েছি।
দীর্ঘ সময় ধরে কেঁদেছিলাম একবার। আমি আর কাঁদি না। হয়তো...।

 

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
সকল সংবাদ

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫