ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২৩ নভেম্বর ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

সমুদ্রে অফুরন্ত সম্ভাবনা

হেলেনা জাহাঙ্গীর

২৬ এপ্রিল ২০১৭,বুধবার, ১৮:৪৫


প্রিন্ট

আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে সীমানা বিরোধের অবসান হয়েছে। এক বিশাল অঞ্চলজুড়ে (স্থলভাগের প্রায় ৮০ শতাংশ) বাংলাদেশের একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ অঞ্চলে বাংলাদেশ তার সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে পারবে। কিন্তু সে কাজটি খুব সহজ নয়। জলভাগে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর জন্য আর্থিক ও কারিগরি ক্ষেত্রে যে ব্যাপক প্রস্তুতি থাকা দরকার ছিল, তার প্রায় কিছুই ছিল না বাংলাদেশের।
বঙ্গোপসাগরের প্রাথমিক সম্পদ হচ্ছে মাছ। সমুদ্রসীমা রক্ষার ক্ষমতার দিক থেকে আগে যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল বিশ্বে ১৩৭তম, এখন তা উঠে এসেছে ৪৬তম অবস্থানে। গ্যাস, খনিজসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের জন্য উন্নত দেশগুলোর সাথে আলোচনা চলছে। এর মধ্যেই বেশ কয়েকটি ব্লকে গ্যাস আহরণের জন্য বিদেশী কয়েকটি কোম্পানির সাথে চুক্তিও হয়েছে। আশা করা যায়, ২০২৫ সালের আগেই সমুদ্রের গ্যাসও বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত করা যাবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের নিজস্ব অনুসন্ধান ও উত্তোলনের সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যেও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। এসবই আমাদের আশান্বিত করে। সমৃদ্ধ অর্থনীতির দেশ হওয়ার স্বপ্ন দেখায়।
বাংলাদেশ দুনিয়ার অন্যতম ঘনবসতি দেশ। গত চার দশকে বর্ধিত জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে বসতবাড়ি, স্কুল-কলেজ, রাস্তাঘাট, শিল্প-কলকারখানাসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণে কৃষিজমি ব্যবহৃত হওয়ায় তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। দেশে এখন চাষযোগ্য জমির অপ্রতুলতা যেমন দেখা দিচ্ছে, তেমন শিল্প স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় জমি পাওয়া যাচ্ছে না। সাগর প্রান্তে জমি উদ্ধার করা সম্ভব হলে এ সঙ্কট থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা পাওয়া যাবে। সাগর প্রান্তে নিঝুম দ্বীপের আশপাশের জমি উদ্ধার করে বনায়ন এবং পর্যটন জোন গড়ে তোলা হলে পর্যটন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়া অবস্থার অবসান ঘটানো সম্ভব হবে। উদ্ধার করা জমিতে বনায়ন করা হলে ভূমি ক্ষয় যেমন রোধ করা সম্ভব হবে, তেমনি উপকূলবর্তী এলাকা ঘূর্ণিঝড় ও টর্নেডোর আঘাত থেকে রক্ষা পাবে। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় অবস্থিত গ্যাস ব্লকগুলোয় ৪০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার গ্যাস ব্লকের ১০টি ভারত ও ১৮টি মিয়ানমার দাবি করে আসছিল। এসব ব্লকে বিভিন্ন সময় দেশের পক্ষ থেকে অনুসন্ধান চালাতে গেলেও সম্ভব হয়নি। ভারত ও মিয়ানমারের বাধার কারণে ফিরে আসতে হয়েছে; কিন্তু আন্তর্জাতিক আদালতের সমুদ্রবিষয়ক রায়ে এ বাধার অবসান ঘটেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্জিত সমুদ্রসীমায় আনুমানিক ৪০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) আর ভূ-সীমায় মজুদ রয়েছে ১২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। বর্তমানে প্রতি বছর দেশে এক টিসিএফ গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। সে হিসেবে আগামী ১২ বছর পর দেশে গ্যাসের সঙ্কট দেখা দেবে। সমুদ্রসীমায় গ্যাস আবিষ্কৃত হলে এ সঙ্কট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশে সমুদ্র অর্থনীতির ধারণা বাস্তবায়নে সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এবং বিমান ও পর্যটনবিষয়ক মন্ত্রণালয় সহযোগিতা কাঠামো প্রস্তুতকরণে যৌথভাবে কাজ করছে। কিভাবে সমুদ্র সম্পদ যথাযথ কাজে লাগানো হবে সে বিষয়ে কাজ করে যাচ্ছে। বঙ্গোপসাগরের এ অঞ্চলে প্রাণিজ সম্পদের পাশাপাশি গ্যাস হাইড্রিড, জিরকন, ইলমেনাইট, ম্যাগনেটাইটসহ বিভিন্ন মূল্যবান খনিজসম্পদের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, প্রতিবেশী মিয়ানমার ও ভারত বঙ্গোপসাগরে নিজ নিজ সীমানায় এ ধরনের খনিজসম্পদের সন্ধান পেয়েছে। ভারত তার জাতীয় বাজেটে ২০০ কোটিরও বেশি রুপি সমুদ্র সম্পদ আহরণে বরাদ্দ রেখেছে। আর মিয়ানমার চীনের সাথে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে তার সমুদ্রসীমার মধ্যে থাকা সম্পদ আহরণে কাজ করছে।
সাগরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর জন্য আমাদের শুধু অর্থ বা প্রযুক্তির অভাব নয়, দক্ষ জনবলেরও অভাব রয়েছে। সাগরে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হওয়ার পরিপূর্ণ সুফল পেতে দক্ষ জনবল সৃষ্টির ওপর আমাদের সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। আর এ কাজটি করতে হবে অত্যন্ত পরিকল্পিত ও দ্রুত। প্রয়োজনে আমাদের জনবলকে সমুদ্রসম্পদ আহরণে দক্ষ দেশগুলোতে পাঠিয়ে এ কাজে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন ও প্রশিক্ষণের সুযোগ করে দিতে হবে। তারও আগে সমুদ্রসম্পদ রক্ষায় আমাদের আরো মনোযোগী হতে হবে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫