ঢাকা, মঙ্গলবার,১২ ডিসেম্বর ২০১৭

রকমারি

মিন্টুর পাঠশালা

২২ এপ্রিল ২০১৭,শনিবার, ১৭:২৭ | আপডেট: ২২ এপ্রিল ২০১৭,শনিবার, ১৮:২৮


প্রিন্ট

সানি রহমান মিন্টু। মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার গিলণ্ড গ্রামের হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান। তার কাজই তাকে আর পাঁচজন সাধারণ মানুষ থেকে করেছে আলাদা। অনন্যসাধারণ হয়ে উঠেছেন তিনি।
মিন্টু নিজ উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন অবৈতনিক পাঠশালা। যেখানে দরিদ্র পরিবারের সন্তানেরা বিনা খরচে লেখাপড়া শিখছে। একজনও যাতে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত না হয়। সে জন্য তার এ প্রয়াস। এসব নিয়ে লিখেছেন আবদুর রাজ্জাক

কখনও অতি সাধারণ মানুষের ঘরেই জন্ম হয় অসাধারণ কিছু মানুষের। যাদের কর্মপরিধির আলোক রশ্মি পৌঁছে যায় বহু মানুষের স্বপ্নের কাছে। যে কাজে হাসি ফোটে সমাজের অবহেলিত আর দরিদ্রদের মুখে। আর সেই কর্মমূল্যায়নের স্বীকৃতির থাকে মানবহৃদয়ে।
তেমনি শিক্ষা বিস্তারের এক আলোকময় কারিগর সানি রহমান মিন্টু। মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার গিলণ্ড গ্রামের হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান। বাবা মোতালেব হোসেন ঝালমুড়ি বিক্রি করে সংসার চালান। এলাকার হতদরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েরা যাতে শিক্ষার আলো থেকে ঝরে না যায়, সে জন্যই নিজ উদ্যোগে নিজ গ্রামে গড়ে তুলেছেন ‘শিক্ষার আলো’ নামে একটি পাঠশালা। ব্যতিক্রমী শিক্ষার আলো পাঠশালাই হচ্ছে এলাকার দরিদ্র ছেলেমেয়েদের শিক্ষালয়। যেখানে গিলণ্ড, জয়নগর ও শৈলকুড়া গ্রামের অসচ্ছল কৃষক, দিনমজুর, রিকশাচালকের সন্তানদের বিনা পয়সায় পড়ানো হয়। তার কাজই তাকে আর পাঁচজন সাধারণ মানুষ থেকে করেছে আলাদা। অনন্যসাধারণ হয়ে উঠেছেন তিনি।
লেখাপড়া করতে গিয়ে প্রতিনিয়তই দারিদ্র্যের সাথে যুদ্ধ করে মিন্টু নিজেকে তৈরি করেছেন একজন আদর্শবান মানুষ হিসেবে। অর্থের অভাবে নিজে ভালো কোনো শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়তে না পারলেও তিনি কখনোই মনোবল হারাননি। তাই এলাকার হতদরিদ্র কোনো ছেলেমেয়েরা যাতে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত না হয় সে জন্যই নিজ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘শিক্ষার আলো’ নামে পাঠশালাটি। ব্যতিক্রমী এই পাঠশালায় গ্রামের হতদরিদ্র শিশুদের বিনামূল্যে পাঠদান করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন মানিকগঞ্জ সরকারি দেবেন্দ্র কলেজের মাস্টার্স শেষ বর্ষের ছাত্র এই মিন্টু।
শিক্ষার আলো পাঠশালার তত্ত্বাবধায়ক সানি রহমান মিন্টু জানালেন, ২০১১ সালে তারা কয়েক বন্ধু মিলে গ্রামের দরিদ্র শিশুদের জন্য বিনামূল্যে একটি পাঠশালা খুলেছিলেন। একসময় বন্ধুরা সবাই সেই পাঠশালার হাল ছেড়ে দিলে কিছু দিন পাঠশালাটি বন্ধ থাকে। কিন্তু হাল ছাড়েননি মিন্টু। ২০১৪ সালে সব বাধাবিপত্তি পেরিয়ে শিক্ষার আলো নামে পাঠশালাটির কার্যক্রম নতুন করে শুরু করেন তিনি।
মিন্টু বলেন, আমি খুবই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। বাবা ঝালমুড়ি বিক্রি করে আনেক কষ্টে আমাদের সংসার চালান। অর্থের অভাবে নিজে কখনো প্রাইভেট পড়তে পারিনি। সেই উপলব্ধি থেকেই আমি শিক্ষার আলো পাঠশালাটি প্রতিষ্ঠা করেছি। যাতে এলাকার দরিদ্র ছেলেমেয়েরা আমার পাঠশালা থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রাইমারি স্কুলে গিয়ে ভালোভাবে লেখাপড়া করতে পারে। অর্থের অভাবে যাতে কারো লেখাপড়া বন্ধ হয়ে না যায়, তাই আমি নিজে প্রাইভেট পড়িয়ে যা রোজগার করছি তার প্রায় সবটুকুই এই পাঠশালার দরিদ্র শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় ব্যয় করছি। আমার কাছে শিক্ষা নিতে কোনো ছাত্রছাত্রীকে একটি পয়সাও দিতে হয় না। বরং খাতা ও কলমসহ যার যা প্রয়োজন তার সবটুকুই আমি বহন করে আসছি আমার সাধ্যমতো। শিক্ষাদানের পাশাপাশি আমি সামাজিকভাবে মাদকবিরোধী আলোচনা এবং বাল্যবিয়ে রোধে কাজ করে যাচ্ছি।
ভোরের সূর্য ওঠার পরপরই মিন্টুর পাঠশালায় শুরু হয় শিক্ষাকার্যক্রম। বর্তমানে সেখানে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণীর ৬৩ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। সকাল পৌনে ৬টা থেকে ৭টা পর্যন্ত পঞ্চম শ্রেণী, ৭টা থেকে সোয়া ৮টা পর্যন্ত তৃতীয় শ্রেণী ও চতুর্থ শ্রেণীর ছেলেমেয়েদের শিক্ষা দান করা হয়। এরপর শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ প্রাইমেরি স্কুলে শিক্ষাকার্যক্রমে অংশ নেয়। মিন্টুর পাঠশালায় বিনামূল্যে শিক্ষা নিয়ে ওই শিক্ষার্থীদের বাইরে কোনো ধরনের প্রাইভেট পড়তে হয় না। মিন্টুর এই পাঠশালায় যেসব ছেলেমেয়ে শিক্ষা নিচ্ছে তারা বেশির ভাগই হতদরিদ্র পরিবারের। যারা তাদের সন্তানদের শিক্ষক রেখে প্রাইভেট পড়াতে পারেন না তারাই এই পাঠশালার সদস্য।

মিন্টুর পাঠশালায় পড়তে আসা চতুর্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থী আরিফা আক্তার জানাল, বাবা টেম্পো চালায়। তাই লেখাপড়ার জন্য বাইরে কোনো স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়তে পারি না। সে জন্য মিন্টু স্যারের পাঠশালায় পড়ে প্রতিদিন স্কুলে যাই। মিন্টু স্যার সব সময় যত্নসহকারে আমাদের পড়ান। পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র রাজিব জানাল, মিন্টু স্যার আমাগো খুব ভালোভাবে পড়ালেখা বুঝিয়ে দেন। এখান থেকে পড়া শিখে স্কুলের পড়া দিতে সহজ হয়। তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র রাজিব জানায়, আমরা গরিব মানুষ। টাকা দিয়ে কোথাও প্রাইভেট পড়তে পারি না। তাই মিন্টু স্যারের কাছে টাকা ছাড়া পড়তে পারছি। শুধু তা-ই নয়, মিন্টু স্যার আমাগো প্রতি মাসে খাতা ও কলম কিনে দেন।
পঞ্চম শ্রেণীর প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী সুমন মিয়ার বাবা পান্নু মিয়া বলেন, মিন্টু নিজেও গরিব ঘরের সন্তান। তাই গরিবের দুঃখ সে বোঝে। এলাকায় আমাদের মতো গরিব মানুষের ছেলেমেয়েকে মিন্টু খুবই যতœসহকারে শিক্ষাদান করায় আমরা উপকৃত হচ্ছি। তার কাছে লেখাপড়া করার কারণে আমাদের ছেলেমেয়ের প্রাইভেট পড়তে হয় না। স্বামীপরিত্যক্ত রশি বেগম জানান, তার মেয়ে চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ে। অর্থাভাবে মেয়েকে তিনি প্রাইভেট পড়াতে পারেন না। তাই বিনামূল্যে মিন্টুর কাছে মেয়েকে পড়তে পাঠান।
অদম্য মেধাবী সানি রহমান মিন্টু বলেন, একটি এনজিওর দোচালা ঘরের ভেতর বর্তমানে ৬৩ জন ছাত্রছাত্রীকে শিক্ষা দিতে খুবই সমস্যা হচ্ছে। আমার কোনো চাওয়া নেই, শুধু সরকারের কাছে একটাই আহ্বান পাঠশালাটি টিকিয়ে রাখতে একটু জায়গা আর একটা ঘরের প্রয়োজন।
এলাকার সমাজসেবক উজ্জ্বল খান বলেন, মিন্টুর এই উদ্যোগকে আমি স্যালুট জানাই। এলাকার অনেক গরিব ছেলেমেয়ে টাকার অভাবে প্রাইভেট পড়তে পারে না। তাদের জন্য মিন্টুর শিক্ষার আলো পাঠশালাটি অনেক উপকারে আসছে।
স্থানীয় নবগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান রাকিব হোসেন ফরহাদ বলেন, মিন্টু এলাকার গরিব ছেলেমেয়েদের যেভাবে বিনামূলে শিক্ষাদান করে আসছে এটা প্রশংসনীয়। শুধু চেয়ারম্যান হিসেবেই নয়, একজন সচেতন মানুষ হিসেবে মিন্টুর পাঠশালা চালাতে যদি কোনো সহযোগিতার প্রয়োজন হয় সেটা আমি করব।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫