ঢাকা, শনিবার,২৭ মে ২০১৭

শেষের পাতা

বাজেট অর্থায়ন সঞ্চয়পত্রনির্ভর

চাপ বাড়ছে ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপনায়

আশরাফুল ইসলাম

২২ এপ্রিল ২০১৭,শনিবার, ০০:০০ | আপডেট: ২২ এপ্রিল ২০১৭,শনিবার, ০৭:০৪


প্রিন্ট

চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি অর্থায়নের জন্য জাতীয় সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৯ হাজার ৬১০ কোটি টাকা। কিন্তু আট মাসেই (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) এ খাত থেকে ঋণ নিয়েছে ৩৩ হাজার ২৮২ কোটি টাকা। অর্থাৎ পুরো বছরের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আট মাসেই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ঋণ নিয়েছে ১৩ হাজার ৬৭২ কোটি টাকা। সঞ্চয়পত্র থেকে অধিক মাত্রায় ঋণ নেয়ায় ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেয়া কমিয়ে দিয়েছে। ফলে চাপ বাড়ছে ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপনায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সাধারণের অর্থ দিয়ে বাজেট ঘাটতি অর্থায়ন করায় দুই ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে। প্রথমত. সরকারের ব্যাংক ঋণ সমন্বয়ের নেতিবাচত প্রভাব পড়ছে মুদ্রানীতিতে। এতে মুদ্রাসরবরাহ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতিকে আরো উসকে দেয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। মুদ্রাসরবরাহ কমানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে অর্থ তুলে নিচ্ছে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় বেড়ে গেছে। দ্বিতীয়ত. সরকারের ঋণ পরিশোধ ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এতে সরকারের সামগ্রিক ঋণের পরিমাণ বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) সরকার বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে ব্যাংকবহির্ভূত খাত থেকে ঋণ নিয়েছে ২৯ হাজার ৯৯৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমেই নেয়া হয়েছে প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকা, যেখানে গত বছরের একই সময়ে ছিল ১৬ হাজার ৬০২ কোটি টাকা। ফলে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের কোনো ঋণ নিতে হয়নি, বরং সুদে আসলে ফেরত দিয়েছে ১৭ হাজার ৬৭৫ কোটি টাকা।
ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, সঞ্চয়পত্র থেকে অধিক হারে ঋণ নেয়ার কারণ হলো দেশের চলমান বিনিয়োগ মন্দা। বিদ্যুৎ, গ্যাস সঙ্কটসহ অবকাঠামো সুবিধার অভাব দীর্ঘ দিনের। এর সাথে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। ফলে ব্যাংকের বিনিয়োগ স্থবিরতা দীর্ঘ মেয়াদে রূপ নিয়েছে। দীর্ঘ দিন ধরে কাক্সিক্ষত হারে নতুন বিনিয়োগ চাহিদা না থাকায় ব্যাংক আমানত সংগ্রহে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ে। এক সময় ১০০ টাকার আমানত নিতে যেখানে সর্বোচ্চ ১৪ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করা হতো, সেটা এখন তা ক্ষেত্রভেদে ৫ টাকায় নেমে এসেছে। ব্যাংকের আমানতের সুদের হার কমলেও সঞ্চয়পত্রের সুদের হার অপরিবর্তিত রয়েছে। ফলে মানুষ ব্যাংকে আর নতুন করে আমানত না রেখে সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এর ফলে রেকর্ড পরিমাণ সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ হতে থাকে।
মুদ্রানীতিতে নেতিবাচক প্রভাব : বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ব্যাংক ঋণ সমন্বয় করায় নেতিবাচত প্রভাব পড়ছে মুদ্রানীতিতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রতি সপ্তাহে যে পরিমাণ ঋণ নেয়ার কথা তা সরকার নিচ্ছে না, অথচ যে ঋণ মেয়াদ শেষ হচ্ছে তা পরিশোধ করা হচ্ছে। এতে বাজারে টাকার সরবরাহ বেড়ে যাচ্ছে। টাকার সরবরাহ বেড়ে গেলে মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মুদ্রানীতির অন্যতম লক্ষ্য হলো বাজারে টাকার সরবরাহ স্বাভাবিক রেখে মূল্যস্ফীতি সহনীয় রাখা। কিন্তু সরকার ব্যাংক থেকে যে হারে ঋণ নেয়ার কথা তা নিচ্ছে না, উপরন্তু যে ঋণ মেয়াদ শেষ হচ্ছে তা ফেরত দেয়া হচ্ছে। এর ফলে বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে যেখানে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ৩৮ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকা, সেখানে চলতি অর্থবছরের সাত মাসে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ না নিয়ে বরং ফেরত দিয়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সঞ্চয়পত্র থেকে অধিক হারে ঋণ নেয়ায় দুই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। প্রথমত. সরকারের ঋণ পরিচর্চা ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। জনগণের ঘাড়ে অতিরিক্ত ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। এর ব্যাখ্যা করে ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে সর্বনিম্ন ৭ শতাংশ সুদ পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নিলে সর্বোচ্চ সুদ পরিশোধ করতে হয় সাড়ে ১১ শতাংশ। বর্তমান যে ঋণ নেয়া হচ্ছে তা পরিশোধ করতে হবে আগামী পাঁচ বছর পরে। এতে আগামী পাঁচ বছর পরে যে সরকার থাকবে তাদের ঘাড়ে এ ঋণ চাপবে। দ্বিতীয়ত সমস্যা হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতিতে। কারণ প্রতি সপ্তাহে যে পরিমাণ ঋণ নেয়ার কথা তা নেয়া হচ্ছে না। বরং পরিশোধ করা হচ্ছে। এ ভাবে রিজার্ভ মানি বেড়ে যাচ্ছে। আর রিজার্ভ মানি বেড়ে যাওয়ায় বাজারে অতিরিক্ত মুদ্রাসরবরাহ হচ্ছে। এতে মূল্যস্ফীতিকে আরো উসকে দেয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে প্রতি সপ্তাহেই বাংলাদেশ ব্যাংক সাত দিন, ১৪ দিন ও ৩০ দিন মেয়াদি বাংলাদেশ ব্যাংক বিলের মাধ্যমে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে টাকা তুলে নিচ্ছে। এতে ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি ১০০ টাকায় পরিশোধ করছে দুই টাকা ৯৮ পয়সা। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের তারল্য ব্যবস্থাপনা ব্যয় যেমন বাড়ছে তেমনি ব্যাংকগুলোরও তহবিল ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫