ঢাকা, মঙ্গলবার,২৫ এপ্রিল ২০১৭

শেষের পাতা

ওরা রক্ত দেয়, প্রাণ বাঁচায়

এম মাঈন উদ্দিন মিরসরাই (চট্টগ্রাম)

২২ এপ্রিল ২০১৭,শনিবার, ০০:০০


প্রিন্ট
রক্তের বন্ধনে মিরসরাইয়ের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে অতিথিদের সাথে সংগঠনের কর্মীরা : নয়া দিগন্ত

রক্তের বন্ধনে মিরসরাইয়ের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে অতিথিদের সাথে সংগঠনের কর্মীরা : নয়া দিগন্ত

কাউসার, রনি, মিনহাজ, ইমন, মেহেদী, নাজমুল, রিয়াদ, শাওন, আবির ও শাকিল তারা সবাই শিক্ষার্থী। কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে কেউ বা কলেজে পড়াশোনা করেন। ২০১৫ সালে ১২ এপ্রিল একত্র হয়ে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। ফেসবুকে গড়ে তোলেন ‘রক্তের বন্ধনে মিরসরাই’ নামে একটি অনলাইন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।
প্রথমে এরা সংখ্যায় ৭-৮ জন থাকলেও এখন প্রায় অর্ধশতে উন্নীত হয়েছে। মুমূর্ষুকে রক্তদান, রক্ত জোগাড় করে দেয়া এখন তাদের নেশায় পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন চার-পাঁচ ব্যাগ রক্ত সরবরাহ করে যাচ্ছে এই সংগঠনটি। কিছুটা চ্যালেঞ্জিং তবু রক্তদাতা- গ্রহীতাদের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করার এই কঠিন কাজই করার নেশা পেয়ে বসে তাদের মধ্যে। এ দেশে রক্তের অভাবে আর কেউ মারা যাচ্ছে না, এই সংবাদটি যে দিন শোনা যাবে সে দিনই হবে এই তরুণদের স্বপ্ন ছোঁয়ার দিন।
জানা গেছে, মুঠোফোন বা ফেসবুক (রক্তের বন্ধনে মিরসরাই) পাতায় একজন মুমূর্ষু রোগীর খোঁজ পেলেই হলো। প্রাণসঞ্চারি রক্ত দিতে ছোটে তারা। শুধু কি তাই, অন্য রক্তদাতা সংগঠনগুলোর সাথেও তাদের রয়েছে ভালো বোঝাপড়া। এক দল উদ্যমী তরুণ দুই বছর ধরে এভাবেই আর্তমানবতার সেবায় নিজেদের নিয়োজিত করেছেন।
সংগঠনটির উদ্যোক্তাদের একজন নাজমুল হাসান। বারইয়ারহাট কলেজের বিএ দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র নাজমুল বলেন, মাসে আমরা ১০০ থেকে ১২০ ব্যাগ রক্তের ব্যবস্থা করে দিই। আমাদের সংগঠনের সবাই পরিবারের সদস্যদের মতো হয়ে গেছেন। ধর্মীয় ভেদ নেই।
একজনের রক্তের প্রয়োজন হলে তিনি কিভাবে সহায়তা পেয়ে থাকেন জানতে চাইলে নাজমুল বলেন, রক্ত পেতে আমাদের ফেসবুক পেজে পোস্ট দিতে হবে। এই পোস্ট পাওয়ার পর আমরা কিছু তথ্য চেয়ে রক্তের সন্ধানকারীর কাছে মেসেজ পাঠাই। সন্ধানকারীদের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার পর রক্তের গ্রুপ উল্লেখ করে আমাদের বন্ধুদের কাছে তা পৌঁছে দিই। আমরা অ্যাডমিনরা সার্বণিকভাবে খবরাখবর রাখি। রক্তের সন্ধান পাওয়ার পর তা সরবরাহ করি। অনলাইনে অভ্যস্ত নন এমন ব্যক্তিদের কিভাবে সেবা দেয়া হয় জানতে চাইলে নাজমুল বলেন, সে েেত্র আগ্রহী ব্যক্তিকে মোবাইল ফোনে সেবা দেয়া হয়। ০১৮৪৬-৮৮৪৭০১ (কাউসার, সংগঠনের সভাপতি) নম্বরে ফোন করে রক্তের চাহিদা জানালেও আমরা সেবা দেয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করে থাকি।
সংগঠনটির সভাপতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ফরহাদ মাহমুদ কাউসার। তিনি বলেন, ২০১৪ সালের অক্টোবর মাসে উপজেলার মিঠানালা রামদয়াল উচ্চবিদ্যালয়ে আমি নিজের উদ্যোগে একটি ব্ল্যাড ক্যাম্পের আয়োজন করি। এরপর চট্টগ্রাম পলিটেকনিক্যালের ছাত্র ফখরুল ইসলাম ইমন, চট্টগ্রাম সিটি কলেজের আশরাফ ভূঁইয়া, বারইয়ারহাট কলেজের মেহেদী হাসান, নাজমুল হাসান, আরাফাত আজিজ, শাকিল শাহব, ফেনী কলেজের রিয়াদ শাওন মিলে ‘রক্তের বন্ধনে মিরসরাই’ নামে ফেসবুকে একটি ফ্যান পেজের মাধ্যমে সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু করি। সেই থেকে আমরা কোনো বিনিময় ছাড়া মুমূর্ষু রোগীর জন্য রক্ত সরবরাহ করছি। সারা দেশে আমাদের রয়েছে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে আমাদের নক করলেই আমরা সচেষ্ট হই রক্তের ব্যবস্থা করতে।
তিনি আরো বলেন, এই কাজে কোনো ছুটির দিন নেই। রাত-দিন ২৪ ঘণ্টাই রক্তের চাহিদা থাকে। যখন তখন ফোন আসে। পালা করে আমাদের কেউ না কেউ সারা দিন অনলাইনে অ্যাক্টিভ থাকেন। চাহিদা পাওয়া মাত্রই তা পূরণের জন্য তৎপর হয়ে পড়েন।
রক্তদান করা ছাড়াও অনলাইনভিত্তিক এই স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন শীতবস্ত্র বিতরণ, ব্লাড গ্রুপিং সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন, অসহায় রোগীদের সাহায্য ইত্যাদি করে থাকে।
জানা গেছে, গরিব রোগী হলে অনেক সময় সংগঠনের সাথে জড়িতরা রক্তের ব্যাগও কিনে দেন। তাদের পকেট থেকে জনপ্রতি মাসে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা খরচ হয়। এই টাকা তারা খুশিমনে ব্যয় করেন।
সংগঠনের সদস্য মেহেদী বলেন, খুব খারাপ লাগে রক্তের খোঁজে এসে যখন কেউ অন্য ধর্মাবলম্বীর রক্ত নিতে অপারগতা দেখিয়ে বিকল্প খুঁজতে অনুরোধ করেন। জীবন বিপন্ন হওয়ার উপক্রম অথচ অন্য ধর্মাবলম্বীর রক্ত নেবেন না মানুষের এটা কেমন বিবেচনা, বুঝি না। এ েেত্র ধর্মের যে কোনো বিধিনিষেধ নেই, আমাদের সবাইকে তা বুঝতে হবে।
মজার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে সংগঠনের সভাপতি ফরহাদ মাহমুদ কাউসার বলেন, তরুণদের অনেকেই এখন ১৮ বছর পূর্তি উদযাপন করেন রক্তদান করে। অনেক দম্পতি রক্তদানের মাধ্যমে বিবাহবার্ষিকী পালন করেন। আমাদের সমাজে এই ধরনের চর্চা নিশ্চয়ই শুভ লণ।
উদ্যোক্তারা জানান, এ কর্মসূচি সফল করা কিছুটা চ্যালেঞ্জিং। তবু রক্তদাতা-গ্রহীতাদের মধ্যে সেতুবন্ধ রচনার এই কঠিন কাজ করার নেশা পেয়ে বসে তাদের। ধীরে ধীরে এ কাজের সাথে অনেকে একাত্মতা প্রকাশ করেন। বর্তমানে এলাকার প্রতিটি হাসপাতাল, কিনিকে এ সংগঠনের নেতৃস্থানীয়দের সব রকম তথ্য দেয়া আছে। ২৪ ঘণ্টার যেকোনো সময় একটি ফোন করলে, মেসেজ পাঠালে অথবা ফেসবুকে জানালেই তারা ছুটে যান রোগীর কাছে। স্বজনদের সাথে কথা বলে জোগাড় করে দেন রক্ত।
সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রনি বলেন, এই কাজটি আমাদের রক্তের সাথে মিশে গেছে। বলতে পারেন নেশার মতো। আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে নিজেরাই একটি ব্ল্যাড ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করব। সেই ল্েয কাজ করে যাচ্ছি।
গত ১২ এপ্রিল ছিল রক্তের বন্ধনে মিরসরাইয়ের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ওই দিন সকালে মিরসরাই জেলা পরিষদ মিলনায়তনে কেক কেটে সংগঠনের জন্মদিন উদযাপন করা হয়। অনুষ্ঠানে কল্যাণ দাশকে ৪৮ বছর বয়সে সর্বোচ্চ ৯৭ ব্যাগ রক্তদানকারী এবং রক্তের বন্ধনে মিরসরাই সংগঠনের উপদেষ্টা সুজন মণ্ডলকে ৩৫ বছর বয়সে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩৯ ব্যাগ রক্তদানকারী হিসেবে সম্মাননা দেয়া হয়। আলোচনাসভায় অংশ নেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কায়সার খসরু, সমাজসেবা কর্মকর্তা জসীম উদ্দিন, সাংস্কৃতিক ব্যক্তি অধ্যাপক ডা: জামশেদ আলম, মিরসরাই প্রেস কাবের সভাপতি শারফুদ্দীন কাশ্মীর, সাধারণ সম্পাদক নুরুল আলম কমফোর্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন প্রমুখ। অতিথিরা এলাকার শিতি তরুণদের এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তাদের সব কাজে পাশে থাকার কথা জানান।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো: জসীম উদ্দিন বলেন, এরাই বদলে দিতে পারে একটি সমাজ ও রাষ্ট্র। তাদের যেকোনো মহতি উদ্যোগে সরকারের সমাজসেবা অধিদফতর পাশে থাকবে।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন
চেয়ারম্যান, এমসি ও প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : শিব্বির মাহমুদ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫